চৈতালী চট্টোপাধ্যায়: সকালে রাস্তায় বেরোলাম। দেখলাম ঝমঝম করে বেজে চলেছে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে-র বাজনা। ভালোবাসার। মেয়েটির হাতে গোলাপ। ছেলেটি দিয়েছে। মেয়েটির কোমর জড়িয়ে তার দেহরক্ষীর মতো চলেছে ছেলেটি। দেহরক্ষী?

নাকি, সম্পত্তিজ্ঞান? আর ওই যে গোলাপ!সে তো শুধু আজকের জন্য। কালই ওর প্রস্তাবে সাড়া না পেলে মেয়েটির মুখে অ্যাসিড ঢেলে দিতে কোনও দ্বিধা হবে না প্রেমিকের। যে চাষজমিতে নিজে কর্ষণ করতে পারা গেল না তা নষ্ট করতে বিন্দুমাত্র হাত কাঁপে না পুরুষের।

আমাকে মার্জনা করবেন। ভ্যালেন্টাইনস্ ডে-র সন্তরা মাথায় থাকুন,এই রঙিন দিবসে কালো বসন্তের কিসসা শোনাতে বসেছি আমি। কী করব! আমি যে জন্মলগ্ন থেকেই কন্যাসন্তান আর সেই সূত্রে, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।আর, সেই বৈষম্য থেকেই আত্মরক্ষার তাগিদে যখন তখন কাঁটা খাড়া হয়ে ওঠে আমার। শজারুর মতো।

মনে পড়ছে ২০১১ সালের ভ্যালেন্টাইনস্ ডে। রিঙ্কু দাসের শ্লীলতাহানির চেষ্টা চলছিল, সেই সময় প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছিল তার ভাই। আজও বিজ্ঞাপনে জ্বলজ্বল করে মেয়ে বাঁচাও মেয়েকে শিক্ষিত কর। বউ পোড়ানোর খবরে ভর্তি আবহের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন দেখায়, শ্বাশুড়ি বলছে বউমা তো আমার বন্ধু, মেয়ে…।

এইসব ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় মেয়েদের অবস্থান, এমন অত্যাধুনিক যুগেও।যার থেকে পরিত্রাণের জন্য এসব চোখ-ধুয়ে-দেয়া বিজ্ঞাপন। সমাজ ও পরিবারের মনও ধুয়ে যায় যদি, সেই আশায়।

মেয়েদের জন্য অভয়ারণ্যের কথা তুলি আমরা। কেননা, নিগৃহীতা ধর্ষিতা মেয়েও যে কোনও একদিন স্বপ্ন দেখেছিল এক তরুণ হাতে নয়নাভিরাম ফুলের বোকে, হাঁটু মুড়ে জানতে চাইছে উইল ইয়ু বি মাই ভ্যালেন্টাইন টুডে? তারপর কখনও নয়ানজুলিতে রক্তাক্ত যে মেয়েটিকে পাওয়া যায় যার দেহে তখনও প্রাণ আছে, সে হয়তো।

১৪ফেব্রুয়ারির রাতে প্রেম সেরে ফুরফুরে হয়ে ফিরতে ফিরতে ফাঁদে ধরা পড়ে আর শুনতে পায়, চল শালি, আজ রাতে তুই-ই আমাদের ভ্যালেন্টাইনওয়ালি!

লজ্জায় কুঁকড়ে যাই এই ভ্যালেন্টাইনস্ ডে-র কুৎসিত মাহাত্ম্যে।যত বেশি অন্ধকার অপমান তত বেশি ভালোবাসার দিনের ঝাঁ চকচকে নকল আলো! বিশ্বায়নও গুটিগুটি পায়ে আমাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে এই দিনটিকে। চারদিকে সাজিয়ে দিয়েছে ব্র্যান্ডেড পণ্যের সমারোহ, জীবন্ত ভোগ্যপণ্যদের জন্য।

কাকে ভালোবাসা বলব আমি? কালিঘাটে আদিগঙ্গার প্রায় মজে-যাওয়া জলের ধারে যে সারিসারি ঘর, সেখানে ইয়াসমিন, যূথিকারা আমাকে শুনিয়েছিল রাজপুত্র পক্ষীরাজে চেপে, স্রেফ প্রেমের কথা বলে নিয়ে এসে রেখে গেছে যৌনকর্মীদের আস্তানায়। কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে আতঙ্ক হয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে। যে ষোড়শী আজ নাচতে নাচতে তার ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে বেরিয়ে গেল, ওর বাবা মার সামনেও ভয় হয়ে এসে দাঁড়াচ্ছে, দিনটি। ফিসফিস করে জানতে চাইছে, মেয়ে আজ রাতে বাড়ি ফিরবে তো?

তবু, তবু্ও ভালোবাসার দিন থাক,রোজ। রোজই মেয়েদের জন্য সম্মান, সমমর্যাদার দিন থাক।এই পয়লা ফাল্গুনে আমার কবিতায় আমি লিখে রাখি :
একটি পলাশ ফুটবে।

আমি সেইদিকে চেয়ে আছি