(পূর্ব কথা) ‘রোজ একই চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছে রাজা পালদেন থন্দুপকে৷ আর কি ধরে রাখা সম্ভব হবে নিজেদের অবস্থান ? পরিস্থিতি বদলাচ্ছিল দ্রুত৷ ভারতেই কি অন্তর্ভুক্তি মেনে নিতে হবে ? দিল্লির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে৷ ঘরের মাটিতে রাজনৈতিক উত্তাপ আর বাইরে থেকে কূটনীতির চাপ সবমিলে সিকিম রাজপরিবার জুড়ে নেমে আসছিল যবনিকার পর্দা…’ 

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: রাত বাড়লে ঘিরে নেয় ঠাণ্ডা৷ দূরের পাইন বন থেকে ভেসে আসে হাওয়ার শব্দ৷ সিকিমের রাজধানী শহরের সঙ্গে হিম বাতাসের বিশেষ বন্ধুত্ব৷ পরিচিত দৃশ্য, তবুও কত নতুন৷ এমনই কিছু ভাবছিলেন রাজা পালদেন৷ অশান্ত মনে বার বার ফিরে আসছে পুরনো কথা৷ কাউকে এসব বলার নয়৷ প্রাসাদের অলিন্দ লাগোয়া বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকলেন সিকিম রাজ৷  নিস্তব্ধ রাত ধীরে ধীরে সিকিম প্যালেসকে ঘিরে নিচ্ছে কূটনৈতিক জালে৷

চিঠিটা আজই এসেছে৷  নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো হয়েছে সেই চিঠি৷ কয়েকটি ছত্রে  ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সিকিম সফরের কথা বলা হয়েছে৷ এতেই লুকিয়ে আছে সিকিমের ভবিষ্যৎ ৷ দিল্লি-গ্যাংটক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইন্দিরার সফর কতটা গুরুত্ব রাখে সেটা ভালই বুঝতে পারেন রাজা পালদেন থন্দুপ নামগিয়াল৷ জানালা থেকে সরে এলেন তিনি৷ রাত অনেক হল৷  কুয়াশা মাখা জীবন দেখার জন্য আরও একটা নতুন দিনের দ্বারে পৌঁছে যাচ্ছে গ্যাংটক শহর৷

নয়াদিল্লি, ১৯৬৮এপ্রিল মাস৷ গরমে পুড়ছে দিল্লি৷ বেলা বাড়লেই ধোঁয়াটে ভাব তৈরি হয়৷ শুকনো গরমে কাবু দিল্লিবাসী৷ জনজীবনে ছড়িয়েছে গরমের ক্লান্তি৷ এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিশেষ কর্মব্যস্ততা৷ তৈরি হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধীর সিকিম সফরসূচি৷ শেষ হয়ে আসছে ষাটের দশক৷ বাড়তে থাকা রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে ক্ষমতা হারানোর দুঃস্বপ্ন দেখছে সিকিমের চোগিয়াল রাজপরিবার৷ অন্যদিকে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আচমকা প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী৷ কুর্সিতে বসার পর থেকেই সিকিম নিয়ে বিশেষ চিন্তিত হয়েছিলেন নেহরু তনয়া৷

তীব্র কূটনৈতিক ঝঞ্ঝার মুখে দাঁড়িয়ে আছে সিকিম৷ গোয়েন্দা বিভাগ থেকে এমনই তথ্য পাচ্ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ সতর্কবার্তায় বলা হচ্ছিল, সিকিমের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিতে চায় চিন৷ তবে ক্ষমতাসীন চোগিয়াল রাজবংশ ভারতের বন্ধুত্ব স্বীকার করে চুক্তি করেছে আগেই৷ তারা কি আদৌ কথা রাখবে ? কংগ্রেসের ঘরোয়া আলোচনা এমনই প্রশ্নে উত্তপ্ত হচ্ছিল৷ অন্যদিকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করছিলেন গোয়েন্দা অফিসাররা৷ মেঘের দেশের খবর পৌঁছে যাচ্ছিল ঘর্মক্লান্ত দিল্লি পর্যন্ত৷
গ্যাংটক, ১৯৬৮ সেই ইন্দিরাকে নবরূপে দেখবে সিকিমবাসী৷ তাঁর সফরের সুব্যবস্থা করেছে সিকিমের চোগিয়াল রাজ সরকার৷ প্রথমবার (১৯৫৮) সালে যখন এসেছিলেন তখন তিনি নেহরু তনয়া হিসেবে সুপরিচিত৷ একদশক পর পরিস্থিতি উল্টে গিয়েছে৷ সেদিনের ইন্দিরা এখন প্রধানমন্ত্রী৷ স্বশাসিত তথা ‘স্বাধীন’ সিকিম সফর করবেন তিনি৷ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি রাখা হবে না৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাগত জানাচ্ছে সিকিম সরকার৷ দিল্লিতে এই বার্তা পাঠিয়ে দিলেন রাজা পালদেন থন্দুপ নামগিয়াল৷ মেঘে ঢাকা দেশ, স্নিগ্ধ ফার্ন-পাইনের হাওয়া বয় এমন কুয়াশা ঘেরা শীতল সিকিম আরও একবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হল৷

১৯৬৮ সালের ৫ এপ্রিল৷ দিনটা তেমন ঠাণ্ডা নয়৷ সিকিমের রাজধানী শহর গ্যাংটকে বিশেষ ব্যস্ততা৷ বড় সড়কের ধারে জমা হয়েছেন অনেকে৷ ক্রমশ বাড়ছে ভিড়৷ থেকে থেকে ভেসে আসছে চোগিয়াল রাজপরিবার বিরোধী স্লোগান৷ তবে সতর্ক আছে প্রহরীরা৷ এসেছেন ভিভিআইপি অতিথি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী৷ একদশক আগের সেই ইন্দিরা এখন পরিণত রাজনীতিক৷ তাঁকে একবার কাছে থেকে দেখতে চান সিকিমিরা৷ ক্রমশ ভিড় ঠেকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে৷ বাঁধভাঙা জনতা রাস্তার উপরেই উঠে আসতে চায়৷ জনপ্লাবন একবার ছড়িয়ে পড়লে কী হবে তাই ভেবে চিন্তিত সিকিম রাজ পালদেন থন্দুপ নামগিয়াল৷ পরিস্থিতি আঁচ করেই তড়িঘড়ি সমাধানের পথ নিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ নেমে এলেন গাড়ি থেকে৷ পরনে গাঢ় নীল শাড়ির উপর হাল্কা জ্যাকেট৷ এমনই ইন্দিরাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ গ্যাংটক শহর৷ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান, তারপরেই হর্ষধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ি শহরের সর্বত্র৷ জনতাকে ‘নমস্কার’ জানালেন তিনি৷ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিম রাজ হাত নাড়লেন৷ উল্লাসে ফেটে পড়ল ভিড়৷

ছবি- গ্যাংটকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (১৯৬৮)                        সৌ: Sikkim Royal Photograph

বিদেশ সফরে ইন্দিরা গান্ধী৷ এই ‘বিদেশ’ হল সিকিম৷ বাবা জওহরলাল নেহরু ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি সিকিম সফর করেছিলেন৷ ইন্দিরা হলেন দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি সেই ধারা বজায় রাখলেন৷ ১৯৬৮ সালের ৫-৬ এপ্রিল দু’দিনের সিকিম সফর করেন ইন্দিরা৷ সেই সফরেই তিনি বুঝেছিলেন বৌদ্ধভূমি সিকিমের অধিগ্রহণ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ জনতার উল্লাস সেই ইঙ্গিত দিয়েছে৷

সফর শেষে নির্বিঘ্নে দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ দ্রুতগতিতে বাঁক নিচ্ছিল সিকিমের রাজনীতি৷ চোগিয়াল রাজপরিবার বনাম সিকিম স্টেট কংগ্রেসের দ্বন্দ্বে ভারি হয়ে উঠছিল বাতাস৷ যুযুধান দু’পক্ষের লড়াইয়ে মিশে আছে রাজতান্ত্রিক সিকিম থেকে গণতান্ত্রিক ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাওয়ার ইতিহাস৷ এই তীব্র রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে এক সূক্ষ্ম লড়াই ধীরে ধীরে তার শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দিচ্ছিল৷ এর কেন্দ্রে ছিলেন দুই মহিলা৷ সিকিমের অন্দরমহলে কান পাতলে এখনও শোনা যায় রানি হোপ কুক ও জনপ্রিয় কংগ্রেস নেতা লেন্দুপ দোরজির স্ত্রী এলিসা মারিয়ার নিঃশব্দ দ্বন্দ্বের কথা৷ আশ্চর্য ব্যাপার, এই দুজনের কেউই সিকিমি নন৷ তবু তাঁদের লক্ষ্য ছিল যে করেই হোক সিকিমের ‘ফার্স্ট লেডি’ পদ৷ ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্খা তাঁদের টেনে নিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক ঘেরাটোপের অতল গভীরে৷ ভবিষ্যৎ বলেছে, দুজনের কেউই সুখী হতে পারেন নি৷

তিনশ বছরের বেশি সময়ে ক্রমান্বয়ে বারো জন রাজা বসেছেন সিকিমের সিংহাসনে৷ সংঘর্ষ, কূটনীতির জালে বারে বারে জড়িয়েছে চোগিয়াল পরিবার৷ অথচ এই ভূখণ্ড শান্তির প্রতীক৷ ১৬৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া সিকিমের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল দুই মহিলার নিঃশব্দ ক্ষমতা দখলের লড়াই৷ ড্রাগনভূমির ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে মেলে এই কাহিনী৷

ছবি- কাজিনি এলিসা মারিয়া ও রানি হোপ কুক

আমেরিকান হোপ কুক ও স্কটিশ এলিসা মারিয়া, এই দুই শ্বেতাঙ্গিনীকে সিকিমে টেনে এনেছিল জীবনের পথ৷ মেঘ-পাহাড় যেখানে হাত ধরাধরি করে চলে, তিস্তার উদ্দাম স্রোত যেখানে প্রকৃতির বীণা বাজায় এমন দেশে তাঁদের সংসার শুরু হয়েছিল৷ তিব্বতি শাস্ত্রের গবেষিকা হোপ কুক হয়েছিলেন সিকিমের রানি৷  এলিসা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে বার্মা (মায়ানমার) মুলুকে সেবার কাজ নিয়েছিলেন৷ পরে জনপ্রিয় সিকিমি নেতার স্ত্রী৷ জীবনের বাঁকে একসময় কুক ও এলিসা যখন মুখোমুখি হলেন তখন সিকিম গরম হয়ে উঠেছে৷ তবে ক্ষমতা দখলের নিঃশব্দ সংঘর্ষে হোপ কুক ও এলিসা মারিয়া কেউ জয়ের মুখ দেখেননি৷ সিকিম ইস্যুতে আসলে জয়ী হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ হিমালয়ের কূটনীতি এসব যত্ন করে ধরে রেখেছে৷
কালের নিয়মেই শেষ হল ষাটের দশক৷ সময়ের কালচক্র ভর করে বিংশ শতকের সত্তর দশকে পৌঁছে গেল দুনিয়া৷ এই দশকেই সিকিম আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অশান্তির আগুন৷ ছোট্ট ভূখণ্ডে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার নিতে শুরু করে৷ এদিকে রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের ধাক্কায় ফের যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হয় ভারত-পাকিস্তান৷ ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ইন্দিরার কূটনৈতিক কৌশল প্রত্যক্ষ করলেন বিশ্ববাসী৷ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয় পূর্ব পাকিস্তান৷ সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র৷ এসবের মাঝে দিল্লির পক্ষে সিকিমের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি৷ এমনই সময়ে এক অনভিপ্রেত ঘটনায় চোগিয়াল রাজপরিবারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়৷ এই ঘটনার শুরু দার্জিলিং শহরে৷                                                                   চলবে