পূর্বকথা: “কালো রঙের সেই ডায়েরিটা বুক সেলফে রাখা থাকত৷ অনেকবার জানতে চেয়েছি ওতে কী লেখা আছে৷ মুচকি হেসে পিসি বলতেন, ‘ও একটা ছোট্ট দেশের কথা’৷ পড়তে চেয়েছিলাম৷ অবলীলায় সেটা দিয়েছিলেন…”

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: কী বলছেন দাদা! আচমকা আমাকে যেন ভূত বলে মনে করল প্রধান৷ তারপর হাঁ করে তাকিয়ে রইল৷ তার স্পষ্ট জবাব, ‘আপনি মিথ্যে বলছেন৷ এরকম কিছু হলে এভাবে আপনি ভুটানে ঘুরতেন না’৷ বুঝলাম, ওকে আমার পারিবারিক কথা বলা বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে৷ আসলে বিশাল পারো জং-এর সামনে দাঁড়িয়ে আবেগ সামাল দেওয়া কঠিন হয়েছিল৷ তাই কথার ফাঁকে ভুটান সরকারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক প্রধানকে বলে ফেলেছিলাম৷ কিছুটা শুনেই বড়বড় চোখ করে প্রধান আমাকে আরও একবার মেপে নিল৷ ঠিক যেমনটা করেছিল ফুন্টশোলিংয়ের বাজারে৷ যখন থলির মতো একটা ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে ওকে বলেছিলাম, ‘ঘুরিয়ে দিও ভাই ভুটান দেশটা…’৷

দিনের পর দিন পারো শহরের কথা শুনেছি৷ পিসি বলতেন, ‘বুঝলি সে এক আশ্চর্য কেল্লা৷ ছোট্ট নদীর উপর বিশাল কাঠের সেতু৷ খুব সকালে সেখান দিয়ে একটা-দুটো টাট্টু ঘোড়া চলে যেত৷ নিচে কাঁটাঝোপের মধ্যে শিশির জমে থাকে৷ যদি কখনো যাস তাহলে দেখিস৷ পারো জং আমার কাছে তাই বিশেষ আকর্ষণীয়৷ অনেক শোনা গল্পকে মিলিয়ে নিতে সকালের দিকে চলে এসেছি সেখানে৷ কী আশ্চর্য! ভোরের নিঝুমপুরী হয়ে থাকা শহরটা দেখে মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা৷ সেই বিশাল দরজা আর সেতু একইরকম আছে৷ গল্পে শোনা রূপকথার দেশ আমার কাছে হুড়মুড়িয়ে চলে এসেছে৷ সেই অলীক দেশের নদীর জলে পাথরে ঠোক্কর খেয়ে ছোট্ট ছোট্ট ফেনার মালা তৈরি হয়৷ ঘন সবুজ-কালচে শ্যাওলা আঁকড়ে ধরে পাথরকে৷ শুকিয়ে আসা ঘাসের হলদে শীষ জলের ছোঁয়ায় বুলবুলির মতো নাচতে থাকে৷ নিস্তব্ধ পারো শহর আমার কাছে এমনই৷ একটা ছোট্ট ভুটানি মেয়ে একছুট্টে কাঠের পুলটা পেরিয়ে শহরের দিকে চলে গেল৷ এক ঝলক দেখলাম ওর গালে দুটো লাল ছোপ৷

সকাল হচ্ছিল নিজের মতো৷ আমি স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ সামনে বিশাল পারো জং৷ ‘কাঠের পুলটা পার হয়ে গেলেই পড়বে পাথুরে বাঁধানো পথ৷ তারপর দেখবি, রাস্তাটা ঘুরে উপরে উঠে গিয়েছে৷ পুরোটাই বাগান৷ ওখানে থরে থরে আপেল ধরে থাকে৷’ অবর্ণনীয় সেই রূপকথা মিলিয়ে দেখার ইচ্ছে হল৷ এগিয়ে আসি পুলটার দিকে৷ সেটায় ওঠার আগে বিশাল কাঠের দরজা পেরিয়ে ঢুকতে হয় অন্ধকার এক কক্ষে৷ ঠাণ্ডা যেন এখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে৷ আর তার গায়ে লেপ্টে আছে ভেড়ার লোমের কম্বল৷ উপরের দিকে দুটো ঘুলঘুলি৷ সেখান থেকে ঠিকরে আসা আলোতে ঝলকে উঠবে তীক্ষ্ণ তলোয়ারের ফলা৷ কক্ষের দুদিকে দুটো বিশাল দরজা৷ তার একটা দিয়ে বাইরে এলেই পড়বে সেই পাথুরে পথ আর আপেল বাগান৷

দস্তানা পরা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ (চিন সীমান্তের কাছে উত্তরাখণ্ডের তুষারে ঘেরা গাঁয়ে গিয়েও পরিনি)৷ কিন্তু এই অন্ধকার কক্ষের মধ্যে আমার হাতগুলো অসাড় হয়ে এল৷ ইতি উতি চেয়ে দেখলাম৷ কেউ নেই৷ অসাড়তা কাটাতে ফস করে ধরিয়ে ফেললাম সিগারেট৷ (পাঠক ভুটানের মাটিতে ভুলেও এই কাজটি প্রকাশ্যে করবেন না৷ ধরা পড়লে ভুটানি হোক আর ভিনদেশি সবার কপালেই বড়সড় দুঃখ নেমে আসবে৷ প্রকাশ্যে ধূমপান এই দেশে বড়সড় অপরাধ) যাইহোক সেই শীতল ভোরে নাক-মুখ দিয়ে অনর্গল ধোঁয়া বের করে কী যে তৃপ্তি হয়েছিল তা লিখে বোঝানো কঠিন৷ ধূমপায়ীরা জানেন তামাক মেশানো বিষপানের আরাম!

কোনো ভুটানি রক্ষীর নজরে পড়িনি৷ সবে সিগারেটের মাঝখানে আগুনটা গিয়েছে, এমন সময়…
টিং টিং…টিং টিং শব্দে বুকটা ধড়াস করে উঠল৷ এই রে এবার হাতে নাতে পাকড়াও!! প্রাণ বাঁচাতে সিগারেটের টুকরোটা পাথুরে মেঝেতে ফেলে দিই৷ সেটাকে চাপা দিতে তার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকি৷ টিং টিং…টিং টিং…টিং টিং আবার সেই শব্দ৷ এবার আরও একটু কাছে৷ জংয়ের পাথুরে পথ দিয়ে দুটো ছোট্ট ঘোড়া নেমে আসছে৷ পিঠে তাদের বস্তা৷ নিজের খেয়ালে গলার ঘণ্টি দুলিয়ে পুলটা পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ওরা…আমার মনে পড়ছে সেই গল্পটা ‘‘বুঝলি সে এক আশ্চর্য কেল্লা ৷ ছোট্ট নদীর উপর বিশাল কাঠের সেতু৷ খুব সকালে সেখান দিয়ে একটা-দুটো টাট্টু ঘোড়া চলে যেত’৷

সময় নাকি বহমান৷ এ তাহলে কোন সময় ? প্রায় পঞ্চাশ-বাহান্ন বছর আগের মুহূর্ত এখনো এত সজীব হয়ে আছে ৷ মুহূর্তটা না এলে হয়তো গল্পটা গল্পই থেকে যেত৷ নীরবতা ভেঙে দুটো ঘোড়ার চলে যাওয়া মিশিয়ে দিয়েছে দুই সময়কে৷ এই তাহলে কালচক্রের ফের৷ অন্ধকার কক্ষে জমাট বেধে আছে সেই গল্পে শোনা সময়৷ আর আমি সমকালীন প্রতীক হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছি? বিশাল এই পার্থিব আরশিতে আমার প্রতিবিম্ব কোথায় ? কুয়াশায় আবছা সেই সকালে উত্তর পাইনি৷ মন অলিন্দে এমন জটিল আবেদন শুনে আলাদীনের সেই আশ্চর্য প্রদীপ দৈত্য হয়ত মাথা চুলকে বলত-জাঁহাপনা আমি তো শুধু কাজের লোক৷

অন্ধকার সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম৷ পাথুরে পথটা দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করি৷ ধীরে ধীরে বিশাল পারো জং আমায় আবিষ্ট করে নেয়৷ পথের দুপাশে আপেল বাগান এখন শুকনো৷ মরশুম শেষ হয়ে গিয়েছে৷ দুটো একটা ডালের পাতা প্রহর গুনছে ঝরে যাওয়ার৷ বাগানটা নিচে আর উপরে বিশাল জং৷ কঠিন তার গঠন শৈলী৷ সামনের দিকে গেলে বিশাল বেদী৷ সেখানে নিয়ম করে দেশটার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়৷ হলদে পতাকায় ড্রাগনের ছবি জ্বলজ্বল করে৷ উদ্দাম পাহাড়ি হাওয়ায় সেই পতাকা ভুটান রাষ্ট্রের পরিচয় ঘোষণা করে৷ রাজকীয় ভুটানি আর্মির পাহারা আছে এখানে৷ সশস্ত্র রক্ষীদলের সামনে দিয়ে চলে আসি৷ কঠিন তাদের চোখ৷ এরকমই কঠিন চোখে ওরা চেয়েছিল সেবার- ভারত সীমান্তের জঙ্গলে৷ ফার্ন আর শ্যাওলায় ছড়িয়ে থাকা অজস্র কার্তুজের খোল পেরিয়ে ওরা ঢুকে গিয়েছিল গভীর থেকে গভীর জঙ্গলে৷ ধংস করেছিল একের পর এক জঙ্গি শিবির৷ এই কথা আরও পরে বলব৷

পারো জং আসলে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র৷ পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৈরি এই ইমারত পরে কয়েকবার সংস্কার হয়ে বর্তমান আকার নিয়েছে৷ বিশাল চার দেওয়ালের মধ্যে ধরা আছে বিখ্যাত তিব্বতি লামা নাগাওয়াং নামগিয়ালের কথা৷ তিনিই তিব্বতি সংস্কৃতি থেকে পৃথক ভুটানের অস্তিত্ব-পরিচয় গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর৷ চতুর্দশ শতকে এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন ছোট বড় গোষ্ঠী পরস্পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল৷ তাদের একত্রিত করে একটি দেশ গড়ে তুলেছিলেন এই তিব্বতি লামা৷ জন্ম নিয়েছিল ভুটান নামের ড্রাগনভূমি৷ বৌদ্ধধর্মের আড়ালে ডাকিনী বিদ্যায় আবিষ্ট তিব্বত থেকে তাই পৃথক পরিচয় পেয়েছে ভুটান৷ অথচ এই দেশের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে আছে তিব্বতের হাওয়া৷ ভুটানিদের শিরায় শিরায় বইছে সেই ডাকিনী তন্ত্রের বীজ৷ তবে শান্ত সমাহিত বৌদ্ধতন্ত্রের ছোঁয়ায় সুপ্ত আছে সেই বিদ্যে৷

বিশাল পারো জং ঘুরে আমার মনে হচ্ছিল এসব কথা৷ অনেক উঁচুতে দেওয়ালের এক কোনায় জমাট আকার নেওয়া মাকড়সার ঝুলে ধরা আছে সেই কথা৷ ড্রাগনভূমিকে একীকরণের মূর্ত প্রতীক হয়েই থাকবেন নাগাওয়াং নামগিয়াল৷ জং থেকে দূরে পারো চু তীরে ছোট্ট শহর ততক্ষণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷ অনেকবার শোনা সেই গল্পের পাথুরে পথটা ধরে কাঠের পুলটা পেরিয়ে নিচে নেমে এলাম৷
চলবে