(পূর্ব কথা) বিংশ শতকের মধ্যভাগে ভুটানে পৌঁছে গিয়েছিলেন নেহরু-ইন্দিরা৷ তখন নক্ষত্র জগতে ছুটে চলেছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার অতি গর্বের স্পুটনিক-১ মহাকাশযান৷ তার রাডারে ধরা পড়ছিল নীল-সবুজ রঙের অপার্থিব সৌন্দর্যের ধরিত্রী৷ আর বহু নিচে সেই দুনিয়ার এক রহস্যজনক দেশ ভুটান মেতে উঠেছিল কালচক্রের নব প্রহরে…’

প্রসেনজিৎ চৌধুরীপ্রধানমন্ত্রী নেহরুর ভুটান সফরে যে কূটনৈতিক বন্ধুত্ব জমাট হয়েছিল তা এখনও অটুট ৷ সম্প্রতি (২০১৭) ভুটান-চিন ও ভারতের সীমান্তে মিশে থাকা চুম্বি উপত্যকার ডোকলাম ভূখণ্ডে চিনা সেনার অবস্থানে বিতর্ক প্রবল আকার নেয়৷ তার জেরে বিশাল চিনের প্রতি তীব্র কূটনৈতিক আক্রমণ করে ছোট্ট ভুটান৷ পাল্টা জবাবও দেয় চিন৷ বেজিংয়ের তরফে জানানো হয়েছিল, ডোকলাম ইস্যু থেকে থিম্পুর দূরে সরে থাকলেই ভালো৷ পরিস্থিতি এমন হয় যে নয়াদিল্লির ভুটানি দূতাবাস থেকে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতের প্রতিও কূটনৈতিক গরম বার্তা দেওয়া হয়৷ এভাবে আচমকা ভুটানের ফুঁসে ওঠায় চমকে গিয়েছে দুনিয়া৷ বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মপ্রধান রাষ্ট্রগুলি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে৷ কূটনৈতিক দোলাচলের মধ্যে ভুটান পরে জানিয়ে দেয় পরিস্থিতি যাই হোক ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট থাকবে৷

প্রসঙ্গটিতে এলাম এই কারণে যে, ভারত-ভুটান ‘বন্ধুত্ব’ তৈরির হোতা জওহরলাল নেহরুর অবস্থান নিয়ে গত কয়েকটি পর্বে দীর্ঘ আলোচনা করেছি৷ তাঁর ভুটান সফরে যে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, এখনও তারই জেরে চিন-ভুটান সীমান্ত নিয়ে নিশ্চিত থাকেন দিল্লিওয়ালারা৷ কূটনীতিকদের ধারণা, ১৯৬২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা অর্থাৎ ম্যাকমোহন লাইন পার করে চিনা ফৌজ বারবার ভারতে ঢুকলেও ভুটানের সীমান্ত পার করতে ততটা ঝুঁকি নেবে না৷ এরকম কিছু করলে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সংগঠন ও দেশগুলির প্রবল প্রতিবাদের মুখে পড়তে পারে চিন৷

অর্থ শতাব্দী পার হয়েছে নেহরু-ইন্দিরার সেই ঐতিহাসিক ভুটান সফরের৷ ১৯৫৮ সালের পর ড্রাগনভূমি সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ উত্তরোত্তর বেড়েছে৷ ১৯৫৯ সালে তিব্বতের রাজধানীতে চিনের সেনা অভিযান, ধর্মীয় গুরু চতুর্দশ দলাই লামার লাসা ত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় নেওয়া সবই ছিল আন্তর্জাতিক জ্বলন্ত ইস্যু৷ ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধ (মতান্তরে সীমান্ত সংঘর্ষ) ঘিরে পরিস্থিতি আরও গরম হয়ে উঠেছিল৷ ১৯৬৭ সালেও কিছু বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে দু’পক্ষের৷ তিব্বতে ততদিনে উড়তে শুরু করেছে কমিউনিস্ট চিনের পতাকা৷ অভিযোগ উঠেছে গণহত্যার৷ বস্তুতপক্ষে ষাটের দশকটি ভারত ও চিনের পক্ষে ছিল যথেষ্ট ঘটনাবহুল৷ দুই যুযুধান পক্ষের মাঝে পড়েও ভুটান কিন্তু কূটনৈতিক স্থিরতা ধরে রাখে৷ ঐতিহাসিক ভুটান সফর শেষ করে দিল্লিতে ফিরে নেহরু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ তাঁর নেতৃত্বে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (নির্জোট আন্দোলন) তখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়৷ এমন সময় তাল কাটল৷ স্তম্ভিত হল দুনিয়া৷

লাসা, ১৯৫৯

দেশের অন্যতম কূটনৈতিক-বৃহত্তম অঞ্চল তিব্বতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে সেনা অভিযান শুরু করে চিন সরকার৷ ‘বিদ্রোহ দমন’ করতেই অভিযান চলছে এমনই জানিয়ে দেয় মাও সে তুং সরকার৷ তিব্বতের আকাশে তখন কালো মেঘ৷ বিশাল চিনা সেনাবাহিনী ঘিরে নিতে শুরু করেছে লাসা শহর৷ তিব্বতি ধর্মীয় সরকার বুঝল পতন আসন্ন৷ চতুর্দশ দলাই লামার গদি টলোমলো৷ সাময়িক বাধা দিয়ে হয়ত কয়েকটি দিন চিনা ফৌজকে রুখতে পারা সম্ভব৷ তারপর ? ধুসর ঠাণ্ডা ঘিরে রাখা পোতালা প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷ তৈরি হচ্ছিল তিব্বতি সেনা৷ আর চিনা ড্রাগনের থাবার নিচে মৃত্যুভয়ে থরথর করে কাঁপছিল বৌদ্ধতন্ত্র সাধনার ভূমি৷ ১৯৫৯ সালের ১০ মার্চ চিনা সৈন্য সরাসরি অভিযান শুরু করে৷ সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই চমকে যায় দুনিয়া৷ নিষিদ্ধ দেশের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ৷

আগেই তিব্বতের ধর্মীয় সরকারের মন্ত্রীপরিষদ ঠিক করেছিল, যে করেই হোক চতুর্দশ দলাই লামাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে৷ সেই অনুযায়ী অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে লাসা ত্যাগ করেন তরুণ তিব্বতি ধর্মগুরু৷ এদিকে তিব্বতের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা বাড়ছিল ভারতের৷ দলাই লামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নে সদর্থক অবস্থান নিয়েছিলেন নেহরু৷

১৯৫৯ সালের ১৭ মার্চ লাসার বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ ত্যাগ করলেন চতুর্দশ দলাই লামা৷ তখন মাঝরাত৷ কয়েকজন দেহরক্ষী ও কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ‘বুদ্ধভূমি’ ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করলেন তিব্বতি ধর্মগুরু৷ লাসা শহরকে ক্রমশ ঘিরে নিচ্ছে চিনের সেনা৷ তাই অত্যন্ত গোপনে চলেছে কয়েকজন৷ সে এক অন্তহীন যাত্রাপথ৷ আদৌ কি গন্তব্যে পৌঁছতে পারা যাবে ? গুটিগুটি চলতে থাকা সেই দলটির সবাই ভাবছিলেন তাদের ভবিতব্য৷ দলটির মধ্যমণি এক ছিপছিপে কিশোর৷ সে সন্ত্রস্ত৷ লোমের কম্বলে ঢেকে রেখেছে মুখ৷ আর তাকে ঘিরে রেখেছে দেহরক্ষীরা৷ যে কোনও হামলা রুখতে তারা মরিয়া৷ পাথুরে রাস্তা ধরে বেশকিছুটা এগিয়ে গেল সেই দলটি৷ এবার সামনে বিশাল প্রান্তর৷ চমরি গাইয়ের পিঠে চড়ে দলটি ছোট্ট ছোট্ট কদমে পৌঁছে গেল সেখানে৷ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পিছনের দিকে তাকালেন যুবক দলাই লামা৷ দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল৷ শেষবারের মতো লাসার মাটি থেকে পোতালার প্রাসাদটা দেখলেন চতুর্দশ দলাই লামা৷ অন্ধকারে ঢেকে আছে সেই প্রাসাদ৷ ঠিক যেন অপেক্ষারত জাহাজ৷ ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পেলেই সে বন্দর ছেড়ে যাত্রা শুরু করবে৷ হাজার বছরের তিব্বতি তন্ত্রের শাসনের শেষ তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ ঠাণ্ডা কুরে কুরে ঢুকছিল কম্বলের ফাঁক দিয়ে৷ অসাড় হয়ে যাওয়া হাতে চমরির লাগাম ধরেছিলেন দলাই লামা৷ সেই রাতে লেখা হয়েছিল তন্ত্র সাধনার বলে হাজার বছরের বেশি ক্ষমতায় টিকে থাকা এক ধর্মীয় সরকারের পতন কথা৷

ছবি- ভারতে প্রবেশের পর চতুর্দশ দলাই লামাকে গার্ড অফ অনার

তাওয়াং, ১৯৫৯
এখনকার অরুণাচল প্রদেশ তখনকার নেফা (North- East Frontier Agency)সীমান্ত এলাকা৷ সেখানকার বিশাল বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্র তাওয়াং গুম্ফা ঘিরে তখন উত্তেজনার পারদ৷ বহু মানুষ অপেক্ষা করে আছেন৷ রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে আসাম রাইফেলস জওয়ানরা৷ ৩০ মার্চ৷ একটানা ১৩ দিনের রুদ্ধশ্বাস যাত্রার শেষ হল৷ গোপনে দুর্গম পথ পার করে চতুর্দশ দলাই লামা প্রবেশ করলেন ভারতের মাটিতে৷ আসাম রাইফেলসের কড়া পাহারায় তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে৷ সেদিন তাওয়াং জুড়ে খুশির ছোঁয়া৷ ধর্মগুরু নিরাপদেই পৌঁছে গিয়েছেন৷ এই সংবাদটি পাঠিয়ে দেওয়া হল নয়াদিল্লিতে৷ স্বস্তি পেলেন নেহরু৷ সেই সঙ্গে লম্বা হতে শুরু করল অস্বস্তির কালো ছায়া৷ এরপর চিনের অবস্থান কী হবে? ঠাণ্ডা তাওয়াংয়ের শান্ত জনপদ পেরিয়ে দিল্লিতে শুরু হয়েছিল গুঞ্জন৷ রাজধানীর কূটনৈতিক মহলের সিগারেটের ধোঁয়ায় পাক খাচ্ছিল চিনের সীমান্ত নীতি৷ আর দলাই লামার ভারত প্রবেশের মাত্র দু’বছরের মাথায় ১৯৬২ সালে চিনা ড্রাগনের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় ভারতীয় সেনা৷

স্বাধীনোত্তর ভারতের কাছে ষাটের দশকটি তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ৷ বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক তত্ত্বের ঘাত-প্রতিঘাতের সময় হিসেবে চিহ্নিত এই দশক৷ আমি একুশ শতক থেকে পিছনের দিকে চলতে শুরু করেছি৷ ড্রাগনভূমি ভুটান-সিকিমের অশ্রুত কাহিনী খুঁজতে গিয়ে আমায় পৌঁছে যেতে হয়েছে সেই পঞ্চাশ-ষাট দশকে৷ প্রায় অনালোচিত এই কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে তিব্বত বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়৷ কারণ তিব্বতি ধর্মগুরু চতুর্দশ দলাই লামার ভারতে প্রবেশের পর পাঁচটি দশক পার হলেও তাঁকে চিন এখন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবেই চিহ্নিত করে৷ সেই রেশ ধরে অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিন উত্তেজনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে৷

চলবে