(পূর্ব কথা) রাজতান্ত্রিক সিকিম৷ এও যে এক ড্রাগনভূমি৷ কখনও সেই ড্রাগন ফুঁসে উঠে তেড়ে গিয়েছে বজ্রড্রাগন ভুটানের দিকে৷ দুই ড্রাগনের লড়াইয়ে গরম হয়েছে হিমেল বাতাস৷ আসলে সিকিম-ভুটান সম্পর্কে আত্মীয়তা, ক্রূরতা সব মিলেমিশে একাকার৷ স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত সরকার তাই পূর্বসূরি ব্রিটিশদের দেখানো পথেই সিকিমকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল…’

প্রসেনজিৎ চৌধুরীচল্লিশ দশকের শেষ ও পঞ্চাশ দশকের শুরু৷ মাঝে একটি বছরের ব্যবধান৷ এই সময়টি উত্তরবঙ্গ লাগোয়া আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকার ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ এই সময়েই ভারত-ভুটান-চিন-সিকিম এই চারপক্ষ একে অপরকে বুঝে নিতে শুরু করে৷ ড্রাগনভূমির প্রসঙ্গ নিয়ে ক্রমশ কূটনীতির জালে জড়িয়ে পড়ছি৷ অদ্ভুত লাগছে, যখন দেখছি এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসছে ১৯৪৯-৫০ সালের কথা৷

চিন স্বাধীনতা লাভ করেছিল ১৯৪৯ সালে৷ সেই বছরের ৮ আগস্ট ভারত ও ভুটানের মধ্যে বন্ধুত্বের চুক্তি সম্পন্ন হয়৷ এর দশ দিনের মাথায় আরও এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে ব্রিটিশ করদ রাজ্য কোচবিহার স্বেচ্ছায় ভারত ভুক্তি মেনে নেয়৷ ১৯৪৯ সালের ২৮ আগস্ট কোচবিহারের সর্বশেষ ‘স্বাধীন’ রাজা জগদ্বীপেন্দ্র নারায়ণ ভারত ভুক্তির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন৷ ড্রাগনভূমি ভুটানের সঙ্গে কোচবিহারের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে৷ এই গপ্পো পরে হবে৷ নজর ফেরানো যাক সিকিমের দিকে৷ ঐতিহাসিক আরও এক চুক্তির বলে ১৯৫০ সালে সিকিম ও ভারত পরস্পর কাছাকাছি চলে আসে৷

তিনশ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে (১৬৪২-১৯৭৫) পার্বত্য ভূখণ্ড সিকিম তার ‘স্বশাসিত’ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল৷ পাহাড়ি দেশটির শাসকরা ছিলেন বিখ্যাত চোগিয়াল বংশের৷ চিন-তিব্বত লাগোয়া সিকিম স্বভাবতই বৌদ্ধ প্রভাবিত এলাকা৷ এখানকার ভাষা, রুচি, সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে ভুটান-চিন ও তিব্বত৷ হিমালয়ের অতুলনীয় সৌন্দর্য উপচে পড়েছে সিকিমের সর্বত্র৷ পাইনের ছায়া-ফার্নের চমক-রডোডেনড্রনের ঝলকে মুগ্ধ হতে হয়৷ প্রকৃতি অকৃপণ হাতে রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে এখানে৷ সিকিম সত্যি স্বর্গভূমি৷

এমনই সুন্দর দেশে ৩৩৩ বছর ধরে ক্ষমতাসীন চোগিয়াল (নামগিয়াল) রাজপরিবার৷ আধুনিকতাকে উপেক্ষা করে বজ্র ড্রাগনের দেশ ভুটান যেমন নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল, ততটা না করলেও সিকিম নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যায়৷ তবে ভারত স্বাধীনতা পেতেই সেখানকার ভৌগলিক রাজনৈতিক অবস্থান কূটনৈতিক স্তরে বিশেষ গুরুত্ব পায়৷ সেই পরিস্থিতিতে সিকিমের রাজপরিবারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দানা পেকে উঠেছিল৷ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন সিকিম রাজ তাসি নামগিয়াল (রাজত্বকাল ১৯১৪-১৯৬৩)৷ পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক উদ্দেশ্য পালনে মগ্ন ছিলেন ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার হরিশ্বর দয়াল৷

গ্যাংটক, ১৯৫০
ডিসেম্বর

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে৷ অনেকটা তেমনই অবস্থা হয়েছে ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার হরিশ্বর দয়ালের৷ ভারত-ভুটান-চিন ও সিকিমের সীমান্তে মিশে থাকা বিতর্কিত ভূমি ‘চুম্বি উপত্যকা’ নিয়ে তাঁর গোপন রিপোর্টে সাড়া দেয়নি দিল্লি৷ চিন যে সেখানে সেনা প্রবেশ করাবে তা বেশ ভাল বুঝেছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক৷ দিল্লি থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি এবার সিকিমের কূটনীতিতেই বেশি মন দিলেন৷

’৫০ দশকের শুরু থেকে চোগিয়ালদের বিরোধী ক্ষোভ সিকিমে দানা পাকছিল৷ নেতৃত্বে উঠে আসছিলেন ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত কাজী লেন্দুপ দোরজি৷ তরুণ এই সিকিমি নেতার জনপ্রিয়তা দেখে কূটনীতির পাশা খেলা শুরু করে দিল্লি৷ বিপদের আঁচ পেয়ে যায় সিকিম সরকার৷

ছবি- সিকিম রাজা তাশি নামগিয়াল

চিন সীমান্তের গায়ে লেপটে থাকা সিকিম অধিগ্রহণে বিশেষ নজর দেয় ভারত সরকার৷ সেই কাজে আত্মনিয়োগ করেন হরিশ্বর দয়াল৷ কূটনীতির লোক তিনি, এই ধরণের কাজ পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যান৷ দিল্লির সবুজ সংকেত পেয়েই সিকিম ঘিরে একের পর এক পাশার দান চালতে থাকেন তিনি৷ যার ফল হিসেবে উঠে আসে ভারত-সিকিম চুক্তি৷ ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে থাকা সিকিমের চোগিয়াল রাজপরিবার অবশেষে ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে৷

চুক্তিনামার তৃতীয় অনুচ্ছেদের প্রথমে লেখা হয়েছিল…’The Governm ent o f India will be responsible for the defence and territorial integrity o f Sikkim. It shall have the right to take such measures as it considers necessary for the defence of Sikkim or the security of India, whether preparatory or otherwise, and whether within or outside Sikkim. In particular, the Government of India shall have the right to station troops anywhere within Sikkim’

অর্থাৎ সিকিমকে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত ভারত৷ বাড়তে থাকা জনরোষ সামাল দিতে ভারতের সঙ্গে হাত মেলানো ছাড়া কিছুই করার ছিল না সিকিম রাজ তাশি নামগিয়ালের৷ স্বস্তি পেয়েছিল নয়াদিল্লি৷ স্বস্তি পেয়েছিলেন নেহরু৷ আর ঐতিহাসিক দু’টি চুক্তি(ভারত-ভুটান ও ভারত-সিকিম)-তে স্বাক্ষর করে নিজেই ইতিহাসের অংশীদার হয়ে গেলেন হরিশ্বর দয়াল৷ চোগিয়াল বিরোধী যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল তা সাময়িক বন্ধ হয়৷

চুক্তি অনুসারে সিকিম ও ভারতের মধ্যে আসা যাওয়ার নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল৷ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কারণে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যে খুবই জরুরি তা মেনে নিয়েছিলেন রাজা তাসি নামগিয়াল৷ ফলে পঞ্চাশের দশকে শিলিগুড়িকে ভিত্তি করে বাণিজ্য বৃহত্তর আকার নিতে শুরু করে৷ ষাটের দশকের শুরুতে ফুলে ফেঁপে বড় আকার নেয়৷ উত্তরবঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয় শিলিগুড়ি৷

১৯৫০ সালের চুক্তির জেরে সিকিমে রাজতন্ত্র বিরোধী ক্ষোভের আগুন সাময়িক কমেছিল৷ সেটি ষাটের দশকে বড়সড় আকার নিতে শুরু করে৷ নেতৃত্বে সেই কাজী লেন্দুপ দোরজি৷

১৯০৪ সালে পূর্ব সিকিমের এক লেপচা পরিবারে জন্ম সিকিমের ভাবী উত্তরসূরির৷ বিখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের কেন্দ্র রুমটেক গুম্ফায় তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন৷ পরে তিনি গ্যাংটকে এক তিব্বতি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন৷ ফের ধর্মশিক্ষার জন্য রুমটেক গুম্ফায় তিনি ফিরে যান৷ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সেখানকার প্রধান লামা হিসেবে টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন৷ পরে তাঁর উদ্যোগেই পশ্চিম সিকিমে কিছু বিদ্যালয় খোলা হয়৷

লেন্দুপ দোরজির উদ্যোগে ১৯৪৫ সালে সিকিম প্রজা মণ্ডল প্রতিষ্ঠা হয়৷ ১৯৫৩ সাল সিকিম কংগ্রেসের সভাপতি হন ৷ ততদিনে চোগিয়াল রাজপরিবারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিতে শুরু করেছে৷ এই পরিস্থিতিতে লেন্দুপ দোরজি সিকিমের প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে যান৷ পরবর্তী সময় ছিল আরও উত্তাল৷ ছোট্ট সুন্দর সিকিম রাজনৈতিক উত্তাপে ক্রমশ তেতে উঠছিল৷
চলবে