(পূর্ব কথা) এবার কে নেবে সেই ঘাঁটির দখল? উঠে যায় সেই প্রশ্ন৷ চলতে থাকে টালবাহানা৷ চিনের মাটিতে তখন সংঘটিত হচ্ছিল গণবিপ্লব৷ নেতৃত্বে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে তুং৷ পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল ১৯৫০ সালে…’

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: কী ঘটছিল সিকিম সীমান্তের ওপারে তা পরিষ্কার হচ্ছিল না৷ গ্যাংটকে থাকা ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার হরিশ্বর দয়াল ‘সোর্স’ কাজে লাগালেন৷ কিছু খবর আসতে লাগল৷ যা শুনলেন, তাতেই মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়৷ ততদিনে তিব্বত ভূখণ্ডে পৌঁছে গিয়েছে বিশাল চিনা ফৌজ৷

১৯৫০, পুনাখা 
ডিসেম্বরের সকাল৷ ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে গিয়েছে ভুটানের রাজধানী পুনাখা৷  বিশাল দুর্গ (জং)-এর সামনে মো চু(নদী)- গতি হারিয়েছে৷ দুর্গের জানালা থেকে অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি দেখছিলেন ভুটান নরেশ জিগমে ওয়াংচুক৷ মনটা বিক্ষিপ্ত৷ খবর এসেছে সীমান্ত থেকে৷ ওপারে তিব্বতের পরিস্থিতি খুবই খারাপ৷ লাসা বনাম কমিউনিস্ট চিনের দ্বন্দ্বে বাড়ছে চিন্তা৷  যদি চিনা সৈন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভুটানে প্রবেশ করে? সুশিক্ষিত সেই সেনাকে রুখতে পারবে না তাঁর সেনা৷ তাহলে কী হবে?  এই প্রশ্নে বারে বারে ভাবাচ্ছিল রাজা জিগমে ওয়াংচুককে৷ সেরকম যদি কিছু হয়, তাহলে ভারত কি পাশে থাকবে? এক বছর আগে দার্জিলিংয়ে যে চুক্তি (১৯৪৯) হয়েছিল  তাতে ভুটানকে সবরকম দিকে থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছিল ভারত৷ এটুকুই যা ভরসা৷ চিন্তিত ভুটান রাজ সরে এলেন জানালা থেকে৷ উত্তুরে তিব্বতি শুকনো হাওয়ায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না৷

কিছু পরের ঘটনা৷ মো নদীর উপরে থাকা পুনাখা জং-এর বিশাল ফটক ঘড়ঘড় করে খুলে গেল৷ দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেল দুটো খচ্চর৷  রাজকীয় ভুটানি দূত পাড়ি দিচ্ছে অনেক দূরের পথ৷ তারা যাবে সিকিম৷ সেখানকার ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার হরিশ্বর দয়ালের কাছে চিনকে নিয়ে চিন্তার কারণ সবিস্তারে তুলে ধরতে চায় ভুটান৷

চিন্তার কারণ ছিল বৈকি৷ ইতিহাস ঘেঁটে পাচ্ছি, ধর্মীয় শাসনে চলা তিব্বত সরকারের অস্তিত্ব মানতে নারাজ কমিউনিস্ট চিন৷ রাষ্ট্রনায়ক মাও সে তুং চাইছিলেন বিশাল এই ভূখণ্ড সরাসরি চিনের অধীনে চলে আসুক৷ কিন্তু লাসা রাজি নয়৷ দু পক্ষের দীর্ঘ আলোচনার পরেও মেলেনি সমাধান সূত্র৷

১৯৫০ সালে তিব্বতের জিনশা নদীর তীর পেরিয়ে পজিশন নেয় চিনের সেনা৷ তাদের  অল্প আক্রমণেই তিব্বতি বাহিনী দিশেহারা হয়ে যায়৷ গুরুত্বপূর্ণ শহর চামদো-তে প্রবেশ করে চিনাফৌজ৷ লাসার ধর্মীয় শাসকবর্গ বুঝতে পারলেন চিনা ড্রাগনের শক্তি৷ হাজার বছরের প্রাচীন যে তিব্বতি মন্ত্রশক্তি, তন্ত্র দিয়ে শাসনের জোর যে আর খাটবে না সেটা পরিষ্কার হতে শুরু করল৷  বিপদ বুঝতে পেরে লাসার সর্বময় শাসক চতুর্দশ দলাই লামা সন্ধিতে সায় দেন৷ সতের দফার সেই চুক্তির ফলে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে মে তিব্বত স্বাধীন রাষ্ট্রের তকমা হারিয়ে চিনের অধীনে একটি স্বশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়৷

Seventeen Point Agreement for the Peaceful Liberation of Tibet (1951)

সন্ধির খবরে পরিস্থিতি জটিল হল ভুটানে৷ কারণ পুনাখার শাসকরা শত শত বর্ষ সম্পর্ক রেখেছিলেন লাসার সঙ্গে৷ সেই সম্পর্কে চিনা ড্রাগনের গরম নিঃশ্বাস পড়তে শুরু করেছে৷ অগত্যা ভারতকে আরও পাশে পেতে মরিয়া হয়ে উঠল ভুটান৷ সময় পার হচ্ছিল তার নিজের গতিতে৷ তুষারে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে জমাট আকার নিচ্ছিল জটিল কূটনৈতিক মেঘ৷

…………………

ফুন্টশোলিং শহরের অভিবাসন দফতর থেকে বেরিয়ে এলাম৷ আমার কাছে তখন ভুটানে প্রবেশ করার সচিত্র অনুমতিপত্র৷ শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ি রাস্তা উঠে গিয়েছে৷ যত উপরে উঠবে, ততই বাড়বে তিব্বত থেকে ছুটে আসা শুকনো হাওয়ার দাপট৷ রাস্তার দুপাশ দিয়ে পাইন গাছের ঘন বন হুমড়ি খেয়ে নেমে আসবে৷ নিঝুম অরণ্য৷ যার অন্দরে অন্দরে জমাট বেধে আছে কালচে ঠাণ্ডা৷ এই সেই ভুটান৷ ড্রাগনভূমি৷

এখানেই থমকে যাক ঘড়ির কাঁটা৷ মাত্র একশো বছর পিছিয়ে যাও, দেখবে এই বনভূমি থেকে বেরিয়ে এসেছে ওরা৷ তাদের হাতে ছোট্ট শক্ত তলোয়ার৷ এই দিয়েই তারা হিংস্র বাঘের পিছনে তাড়া করছে৷ কুয়াশা মাখা অরণ্যের অন্দরে আলোছায়া পরিবেশ৷ আচমকা বাঘটা লাফ মেরে পাইন জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল৷

থমকে গেল ওরা৷ ঠাণ্ডার মধ্যেও তাদের চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম৷ শিকারি তুষার চিতার মতো তাদের চলাফেরা৷ একে অপরের মধ্যে বন্য ইশারা৷ সামনে একটা ঘাসের ঢালু জমি৷ সেখানেই ঝিলিক দিচ্ছে ভয়ঙ্কর শিকারের লেজ৷ চোখ চকচক করে ওঠে ওদের৷ এবার গুঁড়ি মেরে বন্য ভুটানির দল আধখানা চাঁদের মতো ছড়িয়ে পড়ল তারা৷

হু ই ই ই ই …

শিরদাঁড়া ঠাণ্ডা হয়ে যায় এমন শব্দে একসঙ্গে সবাই ছুটে গেল সেই খাদের দিকে৷ তারা লাফিয়ে পড়ল বন্য ঘাস জমির উপরে৷ একযোগে চলল তলোয়ারের কোপ৷ পরাজিত বনের আতঙ্ক বাঘ৷ তার গরম রক্তে ভিজে গিয়েছে বিজয়ীদের হাত৷

মাত্র একশ বছর আগে ভুটানের পরিস্থিতি এমনই৷ সে নিজেকে নিয়েই মত্ত৷ কঠিন জীবন সেই দেশে৷ তিব্বত থেকে পসরা এলে ভুটান আন্দোলিত হয়৷ ভারতের জন্য দ্বার রুদ্ধ৷ ফলে ১৯৫১ সালে তিব্বতের মাটিতে চিনা ড্রাগনের শক্তি দেখে বজ্র ড্রাগনের দেশ যে চিন্তিত হবে তা তো বলাই বাহুল্য৷

….চমক ভাঙল৷ দেখি সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির চালক৷ জন্মসূত্রে নেপালি তাই পদবী তার- প্রধান৷ ভুটানে সেই আমার গাইড৷ হাসি হাসি মুখে স্পষ্ট বাংলায় বলল, চলুন দাদা…ফুন্টশোলিং শহর পার করে হু হু করে উপরে ওঠার পালা৷ যাচ্ছি পারো৷

চলবে