ভ্রাম্যমান পদ্য-মুসাফির

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

Utpal-Kumar-Basu-pic-3

“মন মানে না বৃষ্টি হলো এত

সমস্ত রাত ডুবো নদীর পারে

আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল

স্পর্শ করি জলের অধিকারে

… চলে গেলেন বাংলা কবিতার চিররহস্যযুবক উৎপল কুমার বসু৷ ১৯৫৬-এ প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চৈত্রে রচিত কবিতা’ থেকেই উৎপল অনন্য, অনুনকরণীয়৷ তাঁর কবিতার ডিকশন, আলো-আঁধারী ভাষা তাঁকে জীবনানন্দ পরবর্তী আধুনিক বাঙলা কবিতার জগতে চিরস্মরণীয় করে রাখবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই৷ নিজের কবিতার ভাষাকে ক্রমাগত ভাঙচুর করতে করতে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন এমন এক ম্যাজিক-উপত্যকায়, যেখানে পৌঁছতে পিঠে এক ব্যাগ অতি-প্রাকৃতিক মন্তাজ ও মাথায় এক আকাশ নক্ষত্র প্রয়োজন৷ তবুও তাঁর কবিতাকে ‘দুর্বোধ্য’ বলা যাবে না, বরং বলা যায় উৎপল কুমারের কবিতা এক আশ্চর্য ছায়াময়তা, রহস্য-ইশারায় গভীরভাবে ছুঁয়ে এসেছে বাঙলা কবিতার পাঠককুলকে৷ ‘পুরী সিরিজ’ কিংবা ‘আবার পুরী সিরিজ’-এর বিখ্যাত ‘ট্র্যাভেল পোয়েট্রি’ বাঙলা কবিতার পাঠককে প্রথম পরিচয় করায় অদ্ভুত এক ‘পোস্টমডার্ন কনসাসনেস’-এর সঙ্গে, যেখানে ভ্রাম্যমান বোহেমিয়ানা গিয়ে মেশে সমুদ্রের সীমাহীনতায়, ঢেউ, সিগারেট, বালি, সিগাল-সব ছুঁয়ে যেখানে মহাজীবনের করিডোরে হেঁটে চলে আমাদের পুরনো হাসি, ভেসে যায় ছেঁড়া চিরকুটে লেখা কবেকার নাম৷ ভূতত্ববিদ উৎপল ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা পৃথিবীতে, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ইস্তফা দিয়েছেন কলেজে অধ্যাপনার চাকরিতে, ভাগ্যাণ্বেষণে চলে গিয়েছেন ইউরোপে, ইংল্যান্ডে গিয়ে নিজেকে জড়িয়েছেব সোশ্যালিস্ট মুভমেন্টের সঙ্গে৷ তাঁর কবিতায় আমরা তাই পাই এক ধরনের ব্যাপ্তি, যা সমাজ, কাঁটাতার, জাগতিক সবকিছু ছাড়িয়ে ছুঁয়ে নেয় প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সেই অনন্ত চলাচলের সেতুকে৷ যেখানে, সত্যি বলতে কী, খুব কম কবিই এ পর্যন্ত পা রাখতে সক্ষম হয়েছেন৷

‘‘….এবার বসন্তে আসছে সম্ভাবনাহীন পাহাড়ে জঙ্গলে এবার বসন্ত আসছে
  প্রতিশ্রুতিহীন নদীর খাঁড়ির ভিতরে নেমে দু’জন মানুষ তামা ও অভ্র খুঁজছে।
  তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি হারিয়েছ বাদামপাহাড়ে।
 আমার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা আমি হারিয়েছি বাদামপাহাড়ে।’’

(পুরী সিরিজ)

আমাদের বসন্তদিন হারায়, বাদামপাহাড়ে হারায় আমাদের চটি, চিঠি ও সম্পর্কের উষ্ণ আশ্রয়৷ আর যাযাবর কবি উৎপল কুমার বসু দূর থেকে অচেনা পাখির চোখ দিয়ে দেখেন এই অসহায়, অনিবার্য নশ্বরতা আখ্যান৷ এক দৈবিক ভাষায় আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যান, এক অদ্ভুত নৈর্ব্যক্তিকতায় বুনে চলেন এক দূরগামী বিষণ্ণতার কোলাজ৷

 উৎপল কুমার বসু বেঁচে থাকবেন তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে, যতদিন বাংলা কবিতা থাকবে, ততদিন রয়ে যাবে তাঁর নির্জন অমোঘ কবিতারা৷সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার পেলেন ২০১৪-তে৷ এত দেরী হল কেন? তাঁর মতো ব্যতিক্রমী , বলা যায় আইকনিক বাংলা ভাষার কবির অনেকদিন আগেই এ স্বীকৃতি পাওয়া উচিৎ ছিল৷ সমসাময়িক আরও কয়েকজন প্রধান কবির তুলনায় উৎপল কুমার যেন একটু আন্ডাররেটেড-তাঁর মতো মহা শক্তিশালী কবির যেন আরও আলো পাওয়া উচিৎ ছিল৷ অবশ্য তিনি তো সদাভ্রাম্যমান এক পদ্য-মুসাফির৷ জাগতিক আলো-অন্ধকার, পুরস্কার-তিরস্কার যাঁর কলারে ছাপ রাখে না৷ তাই তাঁর বা উৎপল অনুরাগীদের এতে বিশেষ কিছু এসেও যায়না৷

‘‘সেদিন সুরেন ব্যানার্জি রোডে নির্জনতার সঙ্গে দেখা হল।
তাকে বলি : এই তো তোমারই ঠিকানা-লেখা চিঠি, ডাকে দেব, তুমি
মন-পড়া জানো নাকি? এলে কোন ট্রেনে?…’’

দেখা হবেই৷ হঠাৎ কোনও এক মেঘলা বৈশাখ-বিকেলে সুরেন ব্যানার্জি রোডে হয়ত দেখব অনন্তবাউলের মতো হেঁটে আসছেন কবি উৎপল কুমার, পরনে সেই ঢোলা পায়জামা, মোটা কালো ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে এক জোড়া উজ্জ্বল, অন্তর্ভেদী, গভীর চোখ মেপে নিচ্ছে কংক্রিটের শহরের হালচাল৷ আমরা একটা আশ্চর্য নৌকা নিয়ে এসেছি ওঁকে পুরী বেড়াতে নিয়ে যাব বলে৷ সেদিন নিশ্চিতই আর একটা ‘পুরী সিরিজ’ লেখা হবে৷