পারিজাত ব্যানার্জী

বন্যতা সুন্দর, নৈসর্গিক; অপ্রতিরোধ্য তার টান। তার পাতার গহিনে জন্ম আমাদের, উথলে-ওঠা প্রথম নিশ্বাস!

জঙ্গলের সঙ্গে আমাদের এই নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্কও কিন্তু আজকের নয়, এর বুকে মুখ ডুবিয়েই এই পৃথিবীর বুকে শুরু আমাদের ইতিহাস! কয়েক হাজার বছর আগে এই বনাঞ্চলেই যে থাকতাম আমরা, এই নৈসর্গিক ঘেরাটোপের মাঝেই ছিল আমাদের বাস। গুহার পাথরের খাঁজে খাঁজে ফুটে উঠেছিল আমাদের প্রাচীন শৈলীর আঁচড়; রেখে গিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা মনুষ্যত্বের আদিম জিয়নরেখা আভাস। আর পাঁচটা জন্তুদের মতোই ধরণী ঠিক টের পেতে আমাদের অস্তিত্ব ও পরিচয় আমাদেরই কোনও নিজস্ব প্রাকৃতিক বুনো গন্ধে, যার ঘ্রাণেই হয়তো বা অন্য জন্তুরা হত সতর্কিত; মায়েরা তাদের শাবকছানাদের কোলে টেনে নিয়ে বলত, “ওরা পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালায়; সাবধান, কাছে যাস না বাছা ওদের!”

তবু প্রকৃতির অত্যাশ্চর্য নিয়মেই সরে কি থাকা যায় কখনও এভাবে? সম্ভব? রক্ষা করা যায় অন্যান্য ভেষজ ও প্রাণিজ কূলেদের? মানুষের যে নিঃশ্বাসেও আগুন; তার ভয়াল লেলিহান শিখা থেকে যে বাঁচতে পারে না কেউই। ছারখার হয়ে যায় আমাজন থেকে অস্ট্রেলিয়া, হিমালয়– পরে থাকে শুধু সার সার সবুজে বেড়ে ওঠা শবেদের জলপ্রপাত!

এর মধ্যেই যদিও আজও ভারতবর্ষের বুকেই পড়ে আছে বনাঞ্চল অবশিষ্ট দু-চার আনা। প্রাচীন সভ্যতার বুক থেকে উঠে এসে তারাই আজ বয়ে নিয়ে চলেছে অভিসম্পাতে স্বর্গচ্যূত জর্জড়িত প্রকৃতি তাঁর কূট সন্তানদের নিরন্তর এই দায়ভার। শাল সেগুনের বন তাই আজও আশ্রয় উজাড় করে দেয় পশুপাখিদের। সৃষ্টি হয় অভয়ারণ্য। বেঁচে থাকে বনানী।

কলকাতার দমবন্ধ করা ইঁট কাঠ কংক্রিটের জঙ্গলের অনতিদূরেই কিন্তু রয়েছে এমনি এক সবুজ বাসস্থান, বেথুয়াডহরী। কৃষ্ণনগর ছাড়িয়ে বেশ কিছুদূর গেলেই হাইওয়ের পাশে চোখে পড়ে এই জঙ্গল। সারি সারি গাছ জোট বেঁধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে যেখানে প্রাচীনত্বের অগাধ ভালোবাসায়। নাম না জানা পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখরিত চারধার। প্রাচীরের বাইরেই যদিও হইহই করে লাউড স্পিকার এ বেজে চলে সারাক্ষণ উঠতি যত মুচমুচে হিন্দি গান। কারও কোনও হেলদোল নেই। থাকার কথাও তো নয়, তাই না? সেইতো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা শিখেছি শুধু নিতে; বিনিময়ে দেওয়াদেওয়ির যে অঙ্গীকার, তার সামান্য ছটাক ও ফিরিয়ে দিতে বাধ সাধে আমাদের চেতনা। আমাদের প্রজন্মই বা ব্যতিক্রম হয় কি করে, তাই না? উশৃঙ্খলতায় তোলপাড় হয়ে যায় বন্য জীবন- ভালোই তো; আমরা না হয় মেতে থাকি শুধু নিজেদের নিয়ে, প্রকৃতির অভিশাপে জর্জরিত ‘শেষের সেদিনের’ অপেক্ষায়!

তবু মানতেই হবে, আমাদের খুব কাছে বেড়ে ওঠা এই বেথুয়াডহরী কিন্তু চমকে দিতে জানে। সেখানে সকল প্রতিকূলতাকে অবহেলা করে হার মানেননি আজও বনদেবী। জঙ্গলে ঢুকতেই তাই তাঁর নরম পরশ বুলিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানান তিনি তাঁর দর্শনার্থীদের অবলীলায়। এই অরণ্যের অভ্যন্তরে সূর্যদেবেরও প্রবেশ আওতা আজও বেশ ক্ষীণ। একে ওকে টেক্কা দিয়ে গাছেরা সব লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে অহরহ। তাদের শেকড়বাকড় জুরে ছড়িয়ে পড়ে শিরা উপশিরা। একলা আরও গভীর হারিয়ে যেতে যেতে টের পাই, অজানা কোনো জাদুমন্ত্রে কখন যেন মিলিয়ে গেছে হাইওয়ের দোকান থেকে ভেসে আসা সেই কুরুচিকর অশালীন মনুষ্যত্বের পরিভাষায় অমার্জিত ‘জংলী’ গান। সুর কিন্তু এত সহজে তার জমি ছাড়ে না। লেগে থাকে সে ঝরাপাতার খসখসানিতে; পাখিদের কলকাকলি ও দ্যোতনায়! হাওয়ায় মেখে থাকে বুনো হরিণের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস। রোমাঞ্চ জাগে। শিহরিত হয়ে পড়ি অচেনা এই ‘বহু চেনা’র গমগমে রাশভারী চেতনায়।

ঘেরাটোপে বন্দি ঘড়িয়াল, ময়ূর, খরগোশ, নীলগাই দেখে মন ভরানোর চেষ্টা যদিও এই আদিম পরিবেশে মনে হল বেশ বেমানান। জঙ্গলের স্বাধীনতার স্বাদই যে লেগে নেই ওদের গায়ে– এ কেমন যাতনার ঘটা? গাছের ফাঁকে ফাঁকে গেয়ে নেচে বেড়ানো ঘুঘু, দোয়েল, বুলবুলি, ব্যাবলার-এর দল অবশ্য এরই মধ্যে জানান দেয়; আছে, সবই আছে। শহুরে অরণ্যের সুখী মানুষ আমরা। পঞ্চেন্দ্রিয়র ক্ষয় হয়েছে বহুদিন; পারিপার্শের ফিসফিসানির করাঘাত সে এমনিতেই আর বুঝতে পারে না। হতাশা থেকে ক্ষোভ বিরক্তি চাগাড় দেয় ঠিকই। তবু অধরাই থাকে ময়াল অজগর চিতল হরিণের আদি বিপুল সেই সমাহার।

বেলা পড়ে আসে। নিস্তেজ দুপুরে ছোট্ট একটুকরো ঝিলের বোঝে প্যাডেল করতে করতে মন বলে ওঠে কে জানে কাকে উদ্দেশ্য করে হঠাৎই, “এই জঙ্গলই চেয়েছিলে তো? মন ভরল?”

অস্ফুটে জবাব ভেসে আসে দূর দিগন্তরেখার জোছনা হারানো মন্ত্রণার, “কই, না তো! নাহ!”

হাসে মন; “ফিরে যাও তবে নিজেদের গড়ে পিটে নেওয়া সেই মিথ্যে আলোয় ভরা জঙ্গলে। প্রকৃতি থাক বরং আরও গহিনে মুখফিরিয়ে তার সন্তানদের নিয়ে। একদিন যাকে হেলায় ছেড়ে উঠে গিয়েছিলে সভ্যতার প্রতিটি সিঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে, আজ কিসের খোঁজে ফিরেছে বলো তো তার এই নিবিড় মোহনায়?”

-“ফিরতে যে হয়। নাহলে বাঁচব কি নিয়ে? যান্ত্রিক যন্ত্রনায় যে ক্ষতবিক্ষত শূন্যতা আমার!কি হল বলো, আর নাতো কিই বা বাকি থাকে উপায়?”

সাড়া আর ফিরে আসে না। ঘুমিয়ে পড়ার সময় যে হল মননের, আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় জর্জরিত অবহেলায়।

ফেরার পথে গেটের দিকে পা এগোতে চায় না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে তারা কিসের যেন অপেক্ষায়। কিসের যে ঠিক, জানিনা যদিও। বিকেলের আলো মেখে কমতে থাকে লোকজনের চিৎকার আর হট্টগোল ধীরে ধীরে এই পাড়াগাঁয়। হঠাৎ দেখি আমাদের ঠিক সামনে এসে সামান্য কয়েক হাত দূরে এসে দাঁড়িয়েছে মায়াবী হরিণ আর তার এক ছানা। ক্যামেরার খোঁজে হাত চলে যায় ব্যাগের ভিতর। তবু, এ জিনিস কি ধরা যায় কোনও বোতাম টেপা সাধারণ যন্ত্রে? টের পাই, মন নড়েচড়ে বসেছে আমার শরীরের অন্দরে। শিশুর মতো হইহই করে ওঠে সে অনাবিল স্বাধীনতার উন্মত্ততায়। থাক ছাড়া সব; নাই বা দিল ধরা সবুজ, তবু হাতের কাছে পাওয়া রুক্ষ এক কাণ্ডেই হাত বোলাতে থাকি আনমনে। তরঙ্গদের ঘটে আদানপ্রদান। থাকবে তো প্রকৃতি আমাদের পাশে, হরিণ শাবকের মতো আমাদেরকেও জড়াজড়ি করে? হলামই না-হয় বেহায়া, লাগামছাড়ার দল আমরা! প্রকৃতির তো মা, তিতিবিরক্ত হয়ে দেওয়া অভিশাপ তাঁর আদেশেও তাই ফলতে পারে না!

ঝুপ করে সন্ধে নামব নামব করে এবার। অভয়ারণ্যের ধুলো পড়া মিউজিয়ামে গোটা কৃষ্ণনগরকে একবার বুড়িছোঁয়া ছুঁয়ে ফেলি সামান্যমাত্র দু’টাকায়। প্রবেশমূল্য, ফ্যামিলি বোটিং আর মিউজিয়াম মিলিয়ে ৫ জনের খরচ বাবদ সর্বসাকূল্যে পড়ে যায় আনুমানিক ৯০ টাকা। সারাদিন থাকা খাবার জন্য বিপরীতেই রয়েছে বেশ সমৃদ্ধ এক হোটেলও। শহরকে ছেড়ে একদিনের জন্যে তাই এখানে কিন্তু দিব্বি পালিয়ে আসা যায়।

শুধু কথা দিতে হবে ভালোবাসার। মাকে, সবুজকে, প্রাণকে, প্রকৃতিকে।

তাহলেই হবে। ‘বেথুয়াডহরী’রা আজও যে বসে থাকে কেবলমাত্র আমাদেরই অপেক্ষায়!