পারিজাত ব্যানার্জী

সন্ধ্যা তো কত রকমেরই হয়। আলটপকা, অগোছালো, অনিয়মিত, অচেতন। তবু তারই মধ্যে কিছু সন্ধ্যা হয় ব্যতিক্রমী যার রেশ ছুঁয়ে কাটানো যায় আরও কিছু সন্ধ্যার অভ্যন্তরীণ। এমনই এক সন্ধ্যার সাক্ষী রয়ে গেল সিডনি গত শনিবার যখন এখানকার বাঙালিমহল ‘আনন্দধারা’ আয়োজিত এক আন্তরিক সান্ধ্য আড্ডায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও কাছে পেল আমাদের সকলের খুব অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় কবি সুবোধ সরকারকে।

এক সপ্তাহ আগে কবি নিজের ছেলের সঙ্গে পৌঁছেছিলেন অস্ট্রেলিয়া। সেখানে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকে চারদিন কাটিয়ে সফরের শেষকটা দিন থেকে গেলেন সিডনিতে। এরই মধ্যে ঘুরে এসেছেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের জন্মস্থান, বওরাল, নৈসর্গিক টানে ছুটে গিয়েছেন ওলংগং। শনিবার রাতেই যাওয়ার কথা সিডনির প্রাণকেন্দ্র, অপেরা হাউসেও। তারই মধ্যে সময় বার করে সব সাহিত্যপ্রেমীদের আবদারে এবং শ্রীমন্তদা, সঞ্জয়দা, গার্গীদি ও ঊর্মিদির পরিচালনায় তিনি মেতে উঠলেন এক অনাবিল আড্ডায়। শোনালেন তাঁর নিরঙ্কুশ স্পর্ধিত সব কবিতা একের পর এক। উত্তর দিলেন উপস্থিত সকলের যাবতীয় সব প্রশ্নের।

সুবোধ সরকার কেন লেখেন কবিতা? তিনি কে? তিনি কী? কতকিছুই তো করা যেত, তবু সব ছেড়ে টানা চল্লিশ বছর ধরে কেন শুধুমাত্র মজে থাকলেন দৃপ্ততার সঙ্গে শুধুমাত্র কবিতারই আঙিনায়-— এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উঠে এলো তাঁর মায়ের কথা। সেই মা, যিনি স্বামীর হাত ধরে ওপার বাংলার পাবনা জেলা থেকে একতাল স্মৃতি কেবল বুকের মধ্যে লুকিয়ে দেশভাগের পরপর পালিয়ে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে কোথায়, কি করবেন কিছু না ভেবে, না জেনেই। যিনি বর্ডারে প্রহরীদের প্রশ্নের প্রত্ত্যুত্তরে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন কেবলমাত্র তাঁর উৎকণ্ঠা, “বাবা, তোমরা এপারে তুলসীগাছ লাগাতে দেবে তো?” কবির কথাই তুলে ধরি বরং এখানে– “একথা যদি কবিতা না হয়, তবে আমার লেখা কোনোকিছুকেই কবিতা বলা যায় না।”

সত্যিই তো, কবিতা কি শুধুই অন্ত্যমিলে ভেসে-চলা শব্দবন্ধদের সমষ্টি? তা তো নয়! কবিতা আসলে মানুষের চেতনার ভাষা যা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলে তার নিজের জীবনের শক্ত ভিত এবং সারমর্ম। কবিতা লেখা তাই হয়তো কোনো জীবিকা নয়, কবিতা নিজেই আসলে জীবনের এক ঐকান্তিক অভিধান।

এমনই টুকরো টুকরো সব ছবি সেদিন নানা কথার মধ্য দিয়ে উঠে এলো বারবার। কবির জন্ম কৃষ্ণনগরে। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাড়িতে বা আশপাশে কবিতা ছিল না কখনোই। ছিল দারিদ্র, ক্ষুধা, নিপীড়ন। কবির যখন প্রায় আঠারো বছর বয়স, তখন একদিন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হঠাৎ তাঁর চোখে পরে এক ভবঘুরেকে যে ছুটন্ত ট্রেনের সামনে থেকে ছোঁ মেরে তুলে আনে একটুকরো বাসি রুটি তবু যার মুখে ভয়ের লেশমাত্র ছাপ ফোটে না, শুধুমাত্র ঠোঁটে খেলে যায় এক অপার্থিব হাসি। সেই রাতে প্রথম কবি তুলে নেন কলম একটা কবিতা লেখার তাড়নায়। সে কবিতা হয়তো হারিয়ে গেছে আজ অনেক কবিতার ভিড়ে— তবু সেই হাসির উৎস খুঁজতেই আজও তাঁর লেখারা বয়ে চলে অকল্পনীয় দৃঢ়তায়।

এক দেড় ঘণ্টার আসরে উঠে এলো তাঁর পাড়ার নকশাল করা প্রাণবন্ত ছেলে গোরাদার কথাও। একুশ বাইশ বছরের যেই ছেলেটির ব্যাগে থাকত গীতবিতান এবং দেশ বিদেশের অন্যান্য সব কবিতার বই। যে একদিন সকালে ছুটে এসেছিল কবির বাড়ি একখানা রুটির আশায়।অভাবের পরিহাসে কবি তার হাতে তুলে দিতে পারেননি সে দিন সে রুটি। লজ্জায় অনুশোচনায় ভর করে কোনোমতে শুধু বলেছিলেন, “আমাকে একটা কবিতা শোনাবে?” — সেইদিনই দুপুরে ছেলেটির ব্যাগে কবিতার বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গ্রেনেড ফেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ওই যুবকের শরীর। এ যন্ত্রণা প্রতিরোধের জন্য সত্যিই বোধহয় কবিতা ছাড়া আর কিছুতেই উপশম মেলে না।

হয়তো এভাবেই হারিয়ে যেতেন কবি নিজেও কোনো অন্ধকূপের নিস্ফল জটলায়। পারেননি, কারণ, দিদির হারমোনিয়ামের উপর রাখা হলুদ হয়ে যাওয়া আর একখানি গীতবিতান জিইয়ে রেখেছিল তাঁর মধ্যে তীব্র বেঁচে থাকার আশা। তাঁর শিক্ষার পথের প্রথম পরিচায়ক সেদিক থেকে বলতে গেলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করে যে সামান্য কিছু আয় হয়েছিল তাঁর, তাই দিয়েই চালিয়ে গেছেন তিনি তাঁর উচ্চশিক্ষা। বিকশিত হয়েছে তাঁর গলিপথের নিভৃত মনন। স্বেচ্ছায় কবি ছেড়ে এসেছেন রাগ রস রূপে মোহিমাণ্বিত উজ্জ্বল রাজপথ— অভাব,অনটন, অনাচার,অসম সব অভিসন্ধিদের মুখোশ খুলে দেওয়ার তাড়নায় টানা চল্লিশ বছরে একবারের জন্যও থামাননি তাঁর জ্বলন্ত সময়ের দলিল সব সার সার কবিতা— আজও যা দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে অবিরাম– অবিচল।

কবিতাপাঠ ছাড়া কবিকে কিছুতেই যেন একান্তভাবে নিজের কাছে পাওয়া যায় না কখনও। তাঁর রচিত ‘ঘুষ’, ‘রজনীগন্ধা কফিন’, ‘কলকাতার হেলেন’, ‘ফুটবল’ এবং আরও বেশ কয়েকটি কবিতায় মুখরিত হয়ে উঠল তাই বাকি সন্ধ্যা। কখন যে দক্ষিণ ভূখণ্ডের শরতকালের আকাশ বেয়ে সূর্য ঢলে পরেছে অস্তাচলে, সে খেয়াল রাখাই হয়ে উঠল কঠিন। কবিতা শেষেও তাই ছাড় পেলেন না কবি।

গার্গীদি ও ঊর্মিদির তত্ত্বাবধানে গরম গরম বেগুনী, ফুলুড়ি, ঘুগনী, ঝালমুড়ি আর চায়ের ফাঁকেই চলতে লাগল তাই নানাবিধ গল্প, তর্ক, বিভাজন। কথাপ্রসঙ্গে উঠে এলো তাঁর প্রয়াত স্ত্রী মল্লিকা সেনগুপ্তের কথা, ছেলে রোরোর কথাও। ‘বাংলাভাষা কি আদৌ হারিয়ে যাচ্ছে’– এ বিষয়েও চলল নানা দিশার হদিশ ও পর্যালোচনা। উঠে এলো তাঁর প্রিয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীদের কথা-— বাদ গেলেন না সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশেরাও।

মেলবোর্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের কুড়ি বছর ধরে চলা বাংলা বিভাগটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় হতাশ দেখালো কবিকে। কত বিদেশি এই বিভাগের সূত্র ধরে বাংলাকে চিনতে শিখেছে, আত্মস্থ করেছে হৃদয়ে— কোনোভাবে আবার যেন তা চালু এবং সক্রিয় করা হয়, এই নিয়ে বারবার অনুরোধ রাখলেন কবি। আসলে মাতৃভাষার প্রতি এই ভালোবাসা না থাকলে বোধহয় এতদিন ধরে এত প্রবলভাবে সাহিত্যচর্চা করা যায় না।

শেষ বিকেলের আলো মেখে তাঁর কবিতার বইয়ে যখন তাঁর সাক্ষর নিতে এগিয়ে গেলাম, হাসিমুখে বললেন কবি, ‘ভালো থেকো। আবার দেখা হবে কলকাতায়!’ এর থেকে বড় প্রাপ্তি সত্যি বলছি, বাদবাকি সব নিত্যদিনের সন্ধ্যায় তেমন কিছুই হয় না।