পারিজাত

বারাঙ্গারুর কথা আগের দিন বলতে শুরু করেছিলাম। তবে এই সামান্য কথায় কি আর এত বড় এক অধ্যায়কে আঁকড়ে ধরে লিখে ফেলা যায়? সম্ভব? আসলে বারাঙ্গারু তো কোনও একজন রমণী নয় শুধু, সে ওই আদিম সমাজের প্রতিনিধি— যে কোনও কিছুর বিনিময় নিজের শিক্ষা সংস্কৃতিকে ছাড়তে অভ্যস্ত নয়। যাদের জীবনের ইতিহাস চল্লিশ হাজার বছর ধরে লেখা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বুকে, তাদের নিয়ে কোনও বই বা পুঁথিই কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে কি?

হয়নি। তার অন্যতম কারণ বোধহয়, আর্থার ফিলিপের মতো মানবিক গভর্ণর খুব কমই হয়তো পেয়েছে সেসময় অস্ট্রেলিয়া। যার ফলে সাদা চামড়ার গুমোর নিয়ে অনেকেই এই কালো মানুষদের ‘জংলী পশু’দের অবাধ্যতা ছাড়া আলাদা করে আর কিছুই ভাবতে পারেননি। যথেচ্ছভাবে জলাধার থেকে মাছ, জঙ্গল থেকে ক্যাঙ্গারু মেরে খাওয়ার পাশাপাশি শোনা যায়, এই কালো মানুষদের ‘শিকার’-এও অনেক সাহেবেরই মিলত পরিতৃপ্তি। তার উপর পশ্চিমীভূত সব রোগভোগে কাহিল হয়ে আদিবাসীদের গোষ্ঠীর পর গোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করেছে ততদিনে।

অনেকেরই ধারণা, এই অনার্যজাতিরা কোনোভাবে ইংরেজদের প্রতিহত করার চেষ্টা করেনি এদেশে। ভুল। প্রথমে আপন করে নিলেও পরে ইংরেজদের যথেচ্ছাচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে হকসবারি নদীর ধারের কিছু গোষ্ঠী আঁতাত করে বিদ্রোহও ঘোষণা করেছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ফল হয়েছিল নির্মম, মর্মঘাতী। সেই প্রতিবাদী গোষ্ঠীর ‘বর্বরতা’ রুখতে তাদের অস্তিত্বই শোনা যায় মর্মান্তিক ভাবে মুছে ফেলা হয়– তাদের ইতিহাসটুকুকেও কবর দিতে হাত কাঁপে না এইসব ‘শিক্ষিত’ সমাজধর্মীদের।

ইংরেজদের সঙ্গে অ্যাবরিজিনালসদের চিন্তাধারার বিভেদ ছিল তাদের মধ্যের ব্যবধানের প্রধান কারণ। পশ্চিমীসভ্যতা জমি লেনদেন আর দরদস্তুরে বিশ্বাসী এবং অভ্যস্ত।তাদের কাছে তা নিতান্তই সম্পত্তি। তাই সবকিছু নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করায় এবং সাম্রাজ্য বিস্তারে তাদের এত উৎসাহ চিরকাল। অন্যদিকে এই ‘কালো’ মানুষদের কাছে তাদের জমি ঈশ্বর। মা। মায়ের যেমন কোনও মূল্য হয় না, জমিরও মান তাই একইভাবে কখনও বিচার করতে নেই। তার রক্ষণাবেক্ষণে প্রাণপণ চেষ্টা করাই কেবল তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। হ্যাঁ, তারাও শিকার করেই জীবনধারণ করে। তবে প্রতিটি গাছ কাটলে তার বদলে গাছ রোপন করতে হয় তা তারা জানে। মাছ বরশিতে বেঁধার আগে মাছের চাষ করে নদীকে সমৃদ্ধ করতে তারা থাকে বদ্ধপরিকর।

এমনই জেলে বংশের রক্ত বইছিল আমাদের বারাঙ্গারুর গায়েও। স্বামী চলে যাওয়ায় সে বেদনাহত হয়েছিল ঠিকই, কিন্ত যখন কোলবি ফেরত এসে জানালো, বেনালং সাহেবসুবোদের মতাদর্শে দীক্ষা নিয়েছে ইতিমধ্যেই, তখন বারাঙ্গারু শোকস্তব্ধ হয়েই প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়– মন থেকে একেবারে মুছে ফেলতে হবে বেনালংকেই।