পর্ব সাত

পারিজাত

এ দেশে আসার পর যে ক’টি বন্ধু জুটেছে আমার (প্রসঙ্গত, অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ মানুষই ভীষণভাবে উদারমনষ্ক এবং বন্ধুবৎসল)— তাদের মধ্যে আইসে এবং মিশেল ইতিমধ্যেই কিন্তু বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দু’জনেই এখানকার এক প্রখ্যাত লাইব্রেরির কর্মচারী এবং তাদের ভবঘুরে অনুসন্ধিৎসু মননের কারণে এখানকার অনেক ইতিহাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। এদের মধ্যে আইসে মধ্যবয়সী তুর্কী রমণী হলেও তার জন্ম কর্ম সবই অস্ট্রেলিয়ায়। বিয়েথা করেনি সে। রোজগারের সব টাকা জমিয়ে প্রতিবছর সে বেরিয়ে পড়ে নতুন দেশ দেখার নেশায়। এমন হুজুগে বাউণ্ডুলে জীবনে ভর দিয়ে দৃপ্ত চিত্তে তাই তারই হয়তো বলা মানায়– ‘পৃথিবী একটাই দেশ!’ অবশ্য শুধু আইসের নয়, বোধহয় সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার রক্তে আর শিরায় শিরায় বইছে এই অনাবিল উন্মাদনা।

সদাহাস্যময়ী ষাটের কোঠায় থাকা মিশেল কিন্তু খাঁটি সাহেবিকেতা সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়। পাকিস্তানি স্বামীর তর্জমায় ভর করে ভারতবর্ষ এবং তার দেশভাগের করুণ ইতিহাসকেও খুব নিবিড়ভাবেই তার চেনা অবশ্য। সুরের প্লাবনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাই পনেরোই অগস্ট সে আমাদের মতো করেই আজও গেয়ে ওঠে সকরুণ ভঙ্গিমায় – “এয়ে মেরে ‘ওয়টন’ কে লোগো!”

আরও বেশকিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে যদিও এক বছরে — যেমন একই লাইব্রেরির কর্ণধার মধ্যপ্রাচ্যের লায়লা যার স্বামী ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয় ব্যবসায়ী, কেরালা থেকে ভাগ্যের সন্ধানে সপরিবারে চলে আসা বাস চালক অ্যাণ্ডার্সন রাজু, ব্রিটিশ কয়ার গায়িকা এবং অভিনেত্রী লিজি ভল্সবার্গ যে বর্তমানে লাইব্রেরিরই শিশু বিভাগের আঁকার শিক্ষিকা, শ্রীলংকায় বেড়ে ওঠা বৌদ্ধ রমণী রাধা, কলকাতায় আমার সঙ্গেই গ্রাজুয়েশন সম্পূর্ণ করে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দেওয়া দেবাশিস ও তার স্ত্রী দেবলীনা, চিনা আন্ত্রেপ্রেণর — চ্যাম ও তার অস্ট্রেলিয় সঙ্গী বেঞ্জামিন, ইউ এস এ থেকে ডক্টরেট করা অস্ট্রেলিয়ায় বিবাহসূত্রে বসবাসকারী প্রখ্যাত নন-ফিকশন লেখিকা সারাহ্ ম্যাকে, ভারতে চার বছর ধরে সাংবাদিকতা করা বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক বেন ডোহার্টি যার নাগাল্যাণ্ড নিয়ে লেখা বই ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে চারদিকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতিমনষ্ক এবং এদেশে বাংলাভাষার মুখ্য প্রচারক আকাশ আনোয়ার— এই অল্প সময়ের পরিধিতে এতজনের সান্নিধ্যে আসতে পারাও আমার কাছে এককথায় ‘বিশ্বভ্রমণ’! এতদিন যে নির্দিষ্ট আঙ্গিকে ভর দিয়ে দেখতাম পৃথিবীকে, অনন্য এই মহাদেশ সেই একই ধরণীকে তুলে ধরল অপার্থিব এক প্রচারের নির্নিমেষ আলোয়।

তবে, ভারতবর্ষকে ফেলে আসা সত্যিই কি সম্ভব এত সহজে? প্রথম যেদিন রাত্রে সিডনির মাটিতে পা রাখি, সেদিনই আলাপ হয়েছিল এক কাবুলী ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গেও। আমরা প্যারাম্যাটায় থাকব শুনে তিনি বলেছিলেন “হা হা, ওই অঞ্চল তো ‘লিটল ইন্ডিয়া’ আছে দিদি। বাজারহাট, রেস্তোরাঁ বোলচাল- সব এক্কেবারে দেশি! ওখানে দেখবেন, আপনাদের মনেই হবে না দেখে যে বিদেশে আছেন!”

স্কোয়ি মাউন্টেন্সের সফরযাত্রী

সত্যিই তাই। কলকাতার প্রাণোচ্ছল ধমনী এই এলাকার বুক দিয়ে না বয়ে গেলেও উত্তর ভারতের বা অন্তত বৃহত্তর বৃত্তে বলা চলে, দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার যে কোনও শহরের সঙ্গেই বোধহয় এর তুলনা তা অত্যুক্তি হবে না কিছুতেই। গণেশ পুজো থেকে দুর্গা পুজো, পয়লা বৈশাখ, রাখি, স্বাধীনতা দিবস, ঈদ, যেমন হইহই করে জমাট বেঁধেছে ধমনী জুড়ে, তেমনই আবার হ্যালোয়িন, ক্রিসমাস, ইস্টার, জাপানী চেরি ব্লসম, চাইনিজ নতুন বছরে ড্রাগননাচ, ভ্যালেন্টাইনস ডে— সবার আবেদনই একসঙ্গে মিলেমিশে বেশ একাকার হয়েছে এদেশের আবহাওয়ার পরশে।

আবার, ঠিক যেমন হাওড়া ব্রিজ পার হলেই অন্য আরেকটা জগত রূপ নেয় ওপাড়ের ওলিতেগলিতে, ঠিক তেমনই ঐতিহাসিক সিডনি হারবার ব্রিজ পেরোলেই খাঁটি ইংরেজদের সাবেকী বেশ কিছু পাড়ার রচনাশৈলীও নজরে আসে আপন গতিতেই। এদিকটায় আবার ইউরোপ আর আমেরিকার মিশ্রণে এক অনন্য অস্ট্রেলিয়ার রূপ ফুটে ওঠে যা পশ্চিম সিডনির থেকে বর্ণে গন্ধে বেশ খানিকটা আলাদা – অন্যরকম। সত্যিকথা বলতে, অস্ট্রেলিয়া যেন কোনও আলাদা মহাদেশ নয়— এক সম্পূর্ণ ছোটখাট পৃথিবীই বলতে গেলে ঠাঁই নিয়েছে তার কেন্দ্রস্থলে। যেখানে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন অস্ট্রেলিয়ই জন্মগ্রহণ করেছে আজ অন্য কোথা অন্য কোনো দেশে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছি তাই, ধর্ম বর্ণের বিভেদ মুছে দিয়ে প্রকৃত মানুষ হওয়ার লড়াই চলছে শুধু প্রতিনিয়ত এর শিরায় উপশিরায়— সদলবলে।

বাঁ দিক থেকে লেখিকা, আইসে, মিশেল, লিজি

এই বিভিন্ন মতাদর্শভিত্তিক রকমফেরি মানুষজনের ভিড়ের মধ্যেই কিন্তু আবার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে রেডফার্ণের মতো কিছু অনন্য অঞ্চলও। জাফরির কাজ করা পুরোনো দোতলা বাড়িগুলো সেখানে যেন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকে নিরন্তর তাদের বৈষম্যের আর অবহেলার গল্প শোনানোর তাড়নায়– উপায় নেই যে, কিছুটা স্বীকৃতি জুটলেও আজও যে আঁধাররজনী শেষ হয়নি এ দেশের আদিপুরুষ ও প্রতিমার ললাটে।

(চলবে)