খানিকটা ব্রিটিশ সরকারের অবহেলায় জর্জরিত হয়ে, আর বাদবাকিটা নিজের চেষ্টায় এক নতুন দেশ গড়ার উত্তেজনায় অস্ট্রেলিয়ার আইনশৃঙ্খলা মজবুত করতে এবার তৎপর হয়ে উঠলেন স্বয়ং লর্ড ম্যাকুয়েরী সাহেব। এক সন্ধ্যায় তাই কয়েদিদের কিছু প্রধান নেতাদের সঙ্গে তাঁর নিজের ভবনে বসলেন জোর আলোচনায়। তাঁর মাথায় তখন একসাথে চলছে দুটো সিদ্ধান্তের পরিকল্পনা — যে করেই হোক, কয়েদিদের কলোনীর তকমা মুছে অস্ট্রেলিয়াকে এক অনন্য দেশ হিসাবে পৌছে দিতে হবে বিশ্ব দরবারের আঙিনায় যেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন এসে পাড়ি জমাবে নির্দ্বিধায়। তার জন্য যা গঠনমূলক কাজের প্রয়োজন, সাজাপ্রাপ্ত এইসব মানুষের মধ্যে থেকেই খুঁজে নিতে হবে তার কাণ্ডারী। আর দুই,আইনশৃঙ্খলার লাগাম মজবুত করতে এতদিন যেই বন্দীরা নিজেদের মনে ঘুরে বেড়াতে পারত সমস্ত শহর জুরে, তাদের পায়ে যথোচিত বেড়ি পরানোয় তাদের নিজেদেরই সম্মতি আদায় করে নেওয়া।

মানুষ কাজ করে কেন? নিঃসন্দেহে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় করার তাড়নায়। অথচ নিজেদের মুলুক, পরিবার পরিজন ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর মধ্যে ততদিনে নিবিড়ভাবে বাসা বেঁধে ফেলেছে অসহায়তা। প্যাণ্ডোরার বাক্সে পরে থাকা শেষ ‘আশা’ নামক পাখিটিরও ডানা জুরে যখন জমাট বাঁধে অস্থিরতা — তারপর আর আলস্য এবং উচ্ছৃঙ্খল লাগামহীন জীবনযাপন  ছাড়া অন্য কোনোকিছুই যেন ঠিক কোথাও কোথাও গিয়ে আর বাকি থাকে না।

তেমনই বিষাদে জর্জরিত এইসব নিরুৎসাহিত প্রাণদের আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করানোর মতো দৃঢ়তা বজায় রাখাও আর একটি কঠিন কাজ বইকি! বিশেষ করে যখন ইংল্যাণ্ড নিজেই আর তেমন গা করছেনা সুদূরে পরে থাকা এই সুবিশাল দেশোন্নয়নের ভার বহন করায়।

তবে ওই যে কথায় বলে না, চেষ্টা ও বুদ্ধিমত্তার সুকৌশলে কি না হয়! লর্ড ম্যাকুয়েরী সাহেব কিন্তু সত্যিই পারলেন এই অসম্ভবকেও কিছুটা হলেও সম্ভব করতে।ভবিষ্যতে তাঁর সব পদক্ষেপ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা হবে জেনেও তিনি হয়তো আসলে কোথাও গিয়ে বুঝেছিলেন কড়া হাতে লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তা। তাঁর ধমনী জুড়ে যে কখনোই হার মেনে নেওয়ার বীজ বপন হয়নি, তা বোঝানোর অদম্য জেদ ও হয়তো এক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করে থাকবে তাঁকে। উপার্জনের বিনিময় কাজ করার জন্য রাজি করাতে তাই অবশেষে তিনি ‘রাম’ (এই দেশের তখনকার সহজলভ্য এক ধরণের বিপুলরূপে প্রস্তুত মদিরা) এর শরণাপন্ন হলেন।

তখনও অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব তেমন কোনো একক মুদ্রার প্রচলন হয়নি। কেউ দেশীয় পাউন্ডের বিনিময়ে কেনাকাটা করে তো অন্য অনেকেই আবার বার্টার প্রথাতেই নিজের তৈরি জিনিস বিক্রি করে অন্য জিনিসের বিনিময়ে। ম্যাকুয়েরী সাহেব কাজের বিনিময় মুদ্রা হিসাবে ব্যবহার করলেন রামকে। এর ফলে যেমন একদিকে নেশায় জর্জরিত হয়ে নিজেদেরই নেশা জোগানের উৎসাহে সবাই রাজি হয়ে গেল প্রতিদিনকার তাদের নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করায় ; তেমনই অন্যদিকে, সারাদিনব্যাপী এইসব বিভিন্ন কায়িক পরিশ্রমের পর মাথাগোঁজার সামান্যতম আশ্রয়ের আশায় তারা নিজেরাই তৎপর হয়ে তৈরি করে ফেলল সাহেবসুবোদের এলাকা, হাইড পার্কের একদম মধ্যিখানে বন্দীদের নিজেদের হাতে সৃষ্ট প্রথম জেল ব্যারাক।

বন্দরে যখনই নতুন কোনো কয়েদিদের জাহাজ এসে থামত, তাদের প্রথম ঠিকানা হত এই হাইড পার্ক ব্যারাক। সেখান থেকেই তাদের কোন কাজে নিয়োগ করা যায় তা নির্দিষ্ট করার পর তাদের প্রাথমিক থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করা হত ওই ব্যারাকেই। ১৮১৯ সালে তৈরি ওই তিনতলা চত্বরে একসাথে মোট ছশোজন থাকার ব্যবস্থা করা হয় সেইসময়। তবে বন্দীদের সংখ্যা বরাবরই প্রায় ছাড়িয়ে যেত চোদ্দোশোর বেড়াজাল। দড়ির উপর কাপড় বেঁধে অনেকটা দোলনার মতো দেখতে অস্থায়ী ‘হ্যামক’ বানিয়ে গাদাগাদি করে তবেই জুটত শোওয়ার জায়গা। খাবারদাবারেরও বলাই বাহুল্য, কোনো তরিবৎ বা জুতের রকমারি কিছু জুটতো না। প্রাপ্তির ঝুলিতে তখন বলতে গেলে শুধু একটাই সরঞ্জাম — রাম।

এ বিষয়ে বলে রাখা ভালো, শহরের প্রথম যেই সুবৃহৎ হাসপাতাল তৈরি হয় ১৮১৬ সালে কন্ভিক্টদের উৎসাহে, যার একটি শাখা আজও মিণ্ট রেস্তোরাঁ হিসাবে প্রচলিত এবং বাকিটি এখনও সিডনির প্রধান  হাসপাতাল হিসাবে জনসাধারণের সেবা শুশ্রুষা করে, ‘রাম’ মুদ্রাব্যবস্থায় নির্মিত এই ঐতিহাসিক বাড়িটির. ১৮৪৮ সাল অবধি নাম ছিল ‘রাম হসপিটাল’! সত্যিই,

“এ শহর সব দেয় শুধু বিনিময় রাম!”*

 

(*‘এ তুমি কেমন তুমি’ ছবির একটি গান থেকে ধার নিলাম উক্ত কথাকটি)

(চলবে)