লর্ড ম্যাকুয়েরী সাহেব যখন নিউ সাউথ ওয়েল্সের ভারপ্রাপ্ত গভর্ণরের পদে আসীন হলেন, ততদিনে আরও এক বিরূপ পরিস্থিতির  সৃষ্টি হয়েছে সমগ্র কলোনি জুড়ে। একদিকে যেই সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের নিয়ে আসা হয়েছিল ইংল্যাণ্ড থেকে, ততদিনে, তাদের মধ্যে অনেকেরই সাজার মেয়াদ গেছে ফুরিয়ে। অথচ, আর্থিক রূপে অভাবের কারণে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার পথ একরকম বন্ধই হয়ে গেছে ততদিনে। ইংরেজ সরকারের অসহযোগিতার শিকার হয়ে এমন হাজার হাজার মানুষ ঘর বাঁধতে থাকে সিডনির পাড় বরাবর। কখনও তাদের স্ত্রী এবং সন্তানেরা ইংল্যাণ্ডের সমস্ত বসতি বেচে চলে আসেন অস্ট্রেলিয়া তাদের পরিবারের সাথে পূণর্মিলনের উদ্দেশ্য। আবার একসাথে কাজ করতে করতে কয়েদিদের মধ্যেও গড়ে ওঠে অনেক নতুন সম্পর্ক— যা ভাঙাচোরা জীবনগুলোকে জোড়া লাগাতে আবার উদ্বুদ্ধ করে এই অজানা অবাস্তব এক নতুন পরিধিতে।

ইতিমধ্যে ইংরেজ সরকার বোঝে, শুধুমাত্র কারাবন্দী আর মন্ত্রীসান্ত্রী দিয়ে গোটা একটা দেশ চালানো অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে লর্ড ম্যাকুয়েরী সাহেবের বিচক্ষণতার ফলেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সুদূর লণ্ডনে বসে থাকা তদানীন্তন সরকার। একটা দেশ গড়তে শুধু শ্রমিক নয়, লাগবে শিক্ষিত বুদ্ধিসম্পন্ন সম্প্রদায়, যাদের নিপুণ কারিগরি ক্ষমতা তৈরি করবে নতুন ইমারত – বাসযোগ্য করে তুলবে নতুন সমাজ সভ্যতার নিয়মাবলী মেনে। বলা চলে, লর্ড ম্যাকুয়েরীই প্রথম যিনি সাজা মকুব হয়ে যাওয়া অনেক কয়েদিদের মধ্যে থেকেই ততদিনে রত্ন খুঁজে বের করার সাধনা করে চলেছেন। প্রধান কারিগর, ডাক্তার বা প্রশাসনিক হিসাবেও যোগ্যদের স্বীকৃতি দিয়ে নতুন আর এক ইতিহাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু করেন ইংরেজ সরকারের একপ্রকার অবাধ্য হয়েই।

লণ্ডনে এরই মধ্যে তাই নড়েচড়ে বসে রাজনৈতিক আধিকারিকেরা।এইরকম অবহেলায় জর্জরিত হয়ে থাকলে অস্ট্রেলিয়াকে যে আর নিজেদের শাসনে রাখাই দুষ্কর হয়ে উঠবে অনতিদূরে – তা আন্দাজ করতে সময় লাগেনা তাঁদের। অনেক নতুন স্বপ্নের আস্তরণ বুনে তাই ইংল্যাণ্ডের মধ্য ও নিম্নবর্গের অনেককেই প্র্যোৎসাহন দেওয়া হয় নতুন দেশে নতুনভাবে আবার জীবন শুরু করার প্রস্তাব করে। সরকারের উপর অমোঘ আস্থায় ভর করে খোলামেলা অনেকটা জমির প্রতিশ্রুতি আর উন্নীত জীবনের আশায় কাতারে কাতারে মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকুও বেচে বদ্ধপরিকর হয়ে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। তখনও অবশ্য তাদের জানা নেই কতখানি দুর্গমতা অপেক্ষা করে রয়েছে তাদের জন্যে ওই সুদূরের অজানায়।

প্রায় ছয়মাসের যাত্রাপথে এক আস্ত গোলার্ধ পেরিয়ে সব জাহাজই এই সব উচ্চাকাঙ্খি মানুষগুলোকে যে পৌছে দিতে পেরেছিল তাদের গন্তব্যস্থলে, তা কিন্তু নয়। অতলান্তিক আর প্রশান্ত সাগরের বুকেই অনেক জাহাজ ঢলে পরেছিল মাঝপথেই তাদের অভ্যন্তরে আসীন সমস্ত বোঝা নিয়েই। কখনও উপায়ন্তর না থাকায় অন্য জাহাজে তুলে দেওয়া কোনো এক সন্তান পৌছে যায় একলা এই বিস্তৃত নতুন প্রদেশে, কোথাও বা স্বামীকে হারিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে জড়িয়ে ধরে আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে বদ্ধপরিকর হন অনেক মহিলা পথিমধ্যে আলাপ হওয়া অন্য কোনো অভিযাত্রীর সঙ্গেই।

এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে অসামরিক জাহাজ গুলো যেদিন এসে ভেরে অবশেষে সিডনির বন্দরে, প্রথম ধাক্কাটা নিশ্চয়ই লেগে থাকবে বিদ্ধস্থ মননে তখনই। সভ্যতার শিখরে থেকে অভ্যস্ত এই প্রথম বিশ্বের মানুষগুলো হঠাৎই বড় অসহায় হয়ে পড়েন ভাগ্যের অযাচিত ভ্রূকুটিতে। ইংল্যাণ্ডের ঠাণ্ডা স্যাঁৎসেতে আবহাওয়ার বদলে গ্রীষ্মপ্রধান সামুদ্রিক অঞ্চলে পদার্পণ করেই থমকে যান তাঁরা। শুধু তাই নয়,হঠাৎই আবিষ্কার করেন তাঁরা, ভূগোলের নিয়ম মেনে দক্ষিণ এই গোলার্ধর পুরো সময়ের কাঁটার হিসাবই চলে অন্য ঘড়ি মেনে। এখানে জুনে শুরু হয় শীতকাল আর খটখটে গ্রীষ্মকালে আসে ক্রিসমাস। তাও বা যা একরকম মানিয়ে নেওয়া যায়, তবু বাধাবিপত্তির যেন অন্ত মেলেনা কিছুতেই।


ইংরেজরা অবশ্য কথা রেখেছিল। সব্বাইকে এক এক খণ্ড জমি তারা হিসাব মতোই দিয়েছিল। কিন্তু বাকি সমস্ত শহুরে সুযোগ সুবিধাই এই বেনিয়মের দেশে তখন অপ্রতুল। রোজকার খাওয়ার পাঁউরুটি বা মাখন বা ওষুধপত্র যতদিনে পৌঁছতো এসে সিডনিতে, ততদিনে তার বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। ওই পচা খাবারের দখল পাওয়ার জন্যও বিত্তশালীরা হামলে পড়ত সাধারণ মানুষদের মতোন এক সারি বেঁধে। উন্মুক্ত ঘুরে বেড়ানো কয়েদিদের লুটপাটে এবং লাঞ্ছনায় বিপর্যস্ত মানুষগুলো অনেকবারই ভেবেছে, দেশে ফিরে যাবে— কিন্তু ততদিনে ইংল্যাণ্ড যাওয়ার মতো বিপুল খরচ বহন করার বা দুর্বিষহ ওই যাত্রাপথে আবার পাড়ি জমানোর আর কোনো উপায় রয়ে যায়নি ভেঙে পড়া হেরে যাওয়া মানুষগুলোর বুকে। অনেকেই ততদিনে ঠেকে শিখেছে – সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের কখনোই কোনো আলাদা দামের আশা করতে নেই। তাতে ঠকার সম্ভাবনা সমূহ।

(চলবে)