পারিজাত

আধিপত্য বিস্তার করা মুখে বলা যত সহজ, কার্যকারণ ক্ষেত্রে তা বহু ক্ষেত্রেই কিন্তু বাস্তবায়িত করা ততটাই কঠিন। অনেক আলোচনাই প্রকৃত সময় তাই কার্যকরী হয়ে ওঠে না। আবার নতুন করে শুরু করতে হয় পরিকল্পনা। একযুগেও বোধহয় সব ঠিকমতো করা তাই আসলে কোনও অলীক কল্পনাই। অনেক মানুষের একনিষ্ঠ মেহনত, রক্তপাত, ঘাম, হাহাকার ও কান্নার উপর প্রস্তর স্থাপন করে তবেই গড়ে ওঠে কাঙ্ক্ষিত এক সমাজ। স্থাপন করতে হয় জনবসতি, তবে তারও আগে বোধহয় নিঃসন্দেহে প্রয়োজন— সভ্য সমাজের পরিকাঠামো স্থাপন করা।

১৭৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম গভর্ণর, আর্থার ফিলিপের নেতৃত্বে সিডনির বুকে প্রথম পা রাখে বেশ কিছু অসামরিক জাহাজ। স্থাপিত হয় এই মহাদেশের বুকে ইউরোপের প্রথম কলোনী— নিউ সাউথ ওয়েল্স।

তবে এ ইতিহাস যেমন সুখের নয় এখানকার আদিবসতি জনসমূহের কাছে, তেমনই তা যন্ত্রণার কলোনীর প্রথম বাসিন্দাদের জন্যেও। সেসময় ইউরোপের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে স্থির করা হয়, তাদের দেশের সব কারাবন্দিদেরই প্রথমে পাঠানো হবে অস্ট্রেলিয়ায় সেখানের পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলার তাগিদে। গবাদি পশুদের যেভাবে জবাই করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, তেমনই গাদাগাদি করে কয়েকশো বন্দিকে একসঙ্গে ঘুপচি ছোট্ট জাহাজের কোটরে পুরে চালান করে দেওয়া হতে থাকে পরপর। এ এমনই এক অদ্ভুত দ্বীপান্তরের সাজা, যেখানে কখনওই কোনও পিছুটান রেখে আসা আর সম্ভব নয় কোনও ভাবেই। সংসার পরিজন ছেড়ে চিরবিদায়ের সুর মনের খাঁজে লুকিয়ে প্রায় ছমাসের সেই নিরন্তর যাত্রা যখন একসময় শেষ হয়, জাহাজ এসে নোঙর করে তৎকালীন সিডনির বন্দরে, ততদিনে চোখের জলটুকুও যেন ফলা হয়ে বিঁধে গেছে অর্ধমৃত মানুষগুলোর বুকে। সবাই যে বড় বড় কোনও অপরাধ যেমন খুন ডাকাতি বা রাজনৈতিক কারণেই সাজাপ্রাপ্ত, তা কিন্তু নয়। সামান্য ছোটখাটো কটা টাকা চুরি, ছিনতাই বা নেহাৎই পেটের দায়ে একখণ্ড রুটি কোঁচরে লুকোনোর শাস্তিও তখন অবধারিত ভাবে অবলীলায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বীপান্তর। নতুন দেশের বাতাবরণ পর্যবেক্ষণ করতে, তা কতখানি ইউরোপীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই তা দেখতে, কি কি অজানা বিপদ লুকিয়ে আছে এ দেশে তা বুঝতে, আদিবাসীদের সঙ্গে কিভাবে সংস্কৃতির আদান-প্রদান সম্ভব সেটা উপলব্ধি করতে, বা বলা চলে, এক প্রকৃত ইউরোপীয় ধাঁচের কাঠামো গড়তে যে সেইমুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয় বর্গ যে শ্রমিকেরাই— তা বেশ ভালো ভাবেই আঁচ করা গিয়েছিল। এইসব অবস্থায় কয়েদিদের থেকে ভালো বিনা বা কিছু ক্ষেত্রে অল্প পারিশ্রমিকে মজুর আর কিভাবেই বা পাওয়া সম্ভব, তাই না!

শুধু পুরুষ নয়,সেই একই বছর থেকে দ্বিপান্তরিত হতে শুরু করল সাজাপ্রাপ্ত মহিলারাও।বন্দরের ধারে রকস্ এলাকায় গড়ে উঠল তাদের সকলকে নিয়ে প্রথম বসতি। সেই সময়ে আলাদা করে কোনো কারাগার তৈরি করার কথা আদৌ ভাবা হয়নি। একদিকে দুর্গম জঙ্গলে তীব্র বিশাক্ত অজানা সব সাপ, পোকামাকড়ের ভয়, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের বুক জুড়ে বাস করা শার্কের তীক্ষ্ণ দাঁতে ছিঁড়ে খাওয়ার প্রতিশ্রুতি— কোনও দিকে পালানোর কোথাও যে এতটুকুও পথ নেই! তাই একপ্রকার নিশ্চিন্ত হয়েই নেওয়া হয়ে থাকবে এই ব্যবস্থা, এতে আর বিচিত্র কি!

কিন্তু ক্রমে অবস্থার অবনতি হতে শুরু করল। খুন, লুটপাট, ধর্ষণ, রাহাজানিতে ভরে উঠল একটা গোটা প্রদেশ। আইন শৃঙ্খলার অবস্থার এতটাই অবনতি হল যে সভ্য সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যই কিভাবে যেন হয়ে এলো ক্ষীণ। প্রজারাও এমন এক সব হাল ছেড়ে দেওয়া আয়েসে মেতে উঠল ধীরে ধীরে, যে কেউই আর কোনও কায়িক পরিশ্রমে বিশেষ আগ্রহ দেখালো না।

তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত গভর্ণর লর্ড ম্যাকুয়েরী সাহেব বুঝলেন, এভাবে অন্তত আর যাই হোক, দেশ চালানো সম্ভব নয়। কিছু একটা করতে হবে, এবং তাও খুব শীঘ্রই।