পারিজাত

মাহেন্দ্রক্ষণ ঠিক কখন এসে দাঁড়ায় দোরগোড়ায়, তা কি আর কেউ জানতে পারে কখনও? কালের নিয়মেই যে সময় মুঘলযুগ শেষ হয়ে ব্রিটেনের ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ইংরেজরা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত ভারতের প্রধান সব উপকূলে, তারই কিছু সময়ের ব্যবধানে নিয়তি স্থির দৃষ্টি মেলে অপেক্ষা করতে থাকে দক্ষিণ গোলার্ধে, আর একটি ভবিতব্যের সূত্রপাতের প্রতীক্ষায় নিস্তব্ধ অচেতনে।

১৬০০ সাল নাগাদ যখন ডাচেরা প্রথম অধিগ্রহণ করে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম প্রান্তের কিছুটা অংশ, তাদের মুখে মুখেই এই অঞ্চলের প্রথম নামকরণ হয়, ‘টেরা অস্ট্রালিস ইনকগনিটা’ অর্থাৎ, ‘দক্ষিণী নামহীন প্রদেশ’। তারপর বহু ইউরোপীয় জাহাজের আনাগোনা হতে থাকে এই বিশাল ভুখণ্ডের বিভিন্ন উপকূলে। সবার লগবুক জুরেই খণ্ড খণ্ড চিত্র নথিভুক্ত হতে থাকে ঠিকই, তবে সত্যি কথা বলতে গেলে এক সুবৃহৎ মহাদেশ হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার মানচিত্র প্রথম উপলব্ধি করেন ব্রিটেনের রয়্যাল নেভির বিখ্যাত ভুপর্যটক— ক্যাপটেন জেমস কুক।

১৭৭০ সালের কথা। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলে আজকের সিডনি হারবারে এসে নোঙর করে ক্যাপটেন কুকের জাহাজ। সেসময় কী ছিল এই অঞ্চলে? নিবিড় অরণ্য, ক্যাঙ্গারু, কোয়ালার মতো আজব সব অদেখা প্রাণীকূল আর জঙ্গলে বসবাসকারি একদল প্রাচীন মানুষ। ক্যাপটেন কুক একদর্শনেই বুঝলেন, এই বিস্তৃত অঞ্চল বিনা যুদ্ধেই দিব্যি হস্তগত করতে পারবে ইংরেজ সরকার। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সামান্য বুদ্ধির। ডাচেদের মতো অধিগ্রহণ করেও পুরো দল নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়া অসমীচীন। তার চেয়ে ওই বন্দরেই প্রথম কলোনি গড়ে তাকে সাহেবসুবোদের বসবাসযোগ্য করে তুললে তবেই যেমন সভ্যতার আলো পড়বে এইখানে, তেমনই বিনা পণ্ডশ্রমে এক ধাক্কায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বৃহত্তম দেশ হিসাবে সম্মান কুড়োবে ব্রিটিশ সরকার। তাঁরই তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হল নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য— ইতিহাসের পাতায় প্রথম উঠে এলো ‘সিডনি’ শহরের নাম। তাঁরই দেখানো পথনির্দেশ ধরে ১৭৮৮ সাল নাগাদ আর্থার ফিলিপ এর তত্ত্বাবধানে এগারোটি ইউরোপীয় জাহাজ এসে ভিড়ল বোটানি বে বা আজকের সিডনি হারবারে।

ক্যাপটেন কুক শুধু যে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের দরবারে, তা কিন্তু নয়। তাঁর তথাকথিত আবিষ্কারের মধ্যে ছিল নিউজিল্যাণ্ড এবং হাওয়াই-দ্বীপের মতো ছোট ছোট বেশ কটি দেশও। তবে অস্ট্রেলিয়া নিঃসন্দেহে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য। যদিও বিভিন্ন নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে অঞ্চলটিকে ‘টেরা নালিয়াস’ বা ‘অবসবাসকারী জমি’ বলে চিহ্নিত, প্রকৃতপক্ষে সেই সময় আনুমানিক আড়াইশোরও বেশি ভাষাভাষীর প্রায় সাতলাখ, পঞ্চাশ হাজার আদিবাসী বাস করতেন এই অঞ্চলে। তা সত্ত্বেও কেন কোনওরকম বাধানিষেধ ব্যাতিরেকেই একরকম নির্বিঘ্নেই হস্তান্তরিত হয়েছিল এই এলাকার সত্ত্ব, তার যথাযথ একটাই যুক্তি দাঁড়ায় আজকের দিনে এসে। আসলে, এই দেশে বসবাসকারী উপজাতিরা কিছু আঁচ করার আগেই হয়ে গিয়েছিল সব সইসাবুদ। এই আদিম মানুষেরা তাঁদের সারল্যে ভর করে জানতেই পারেননি, যে মাটির বুকে জমা রয়েছে তাঁদের এত সাবেকী এক অধ্যায়, সেইখানেই তাদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে নতুন করে লেখা হতে শুরু করেছে তৎকালীন সভ্যতার এক সাদা চামড়ায় মোড়া নতুন ‘ইতিহাস’ নামক কাহিনী।