পর্ব ২

পারিজাত

পিছনো বড্ড কঠিন। বিশেষ করে চল্লিশ হাজার বছর আগের ধোঁয়াশা কাটিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের পথে পাড়ি দেওয়া আজ প্রায় এক কথায় অসম্ভব। তবু পিছনে না হেঁটে সামনের দিকে যে এগনোও বড্ডই বেমানান! অতীতের শক্ত ভিত না গড়লে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ যে পূর্ণতা পায় না কিছুতেই।

বলা হয়, আজকের মানুষ অর্থাৎ হোমো সেপিয়ানদের প্রথম সৃষ্টি হয় আফ্রিকায়। প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকেই একদল মানুষ পায়ে হেঁটে পাড়ি জমায় এশিয়ার দিকে, অন্য আরও এক দল এর কিছু পর থেকে শুরু করে দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে নিরন্তর যাত্রা। কত মানুষ পথের মধ্যেই মারা যায়। আবার কেউ কেউ মাঝপথেই কোথাও কোথাও বসতি স্থাপন করে রয়ে যায় কোনও উর্বর জমি দখল করে। তবে রোমাঞ্চই হোক বা নিয়তি, কে জানে কোন সে অসীম শক্তি, যা অন্তত একদল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে দুর্গম জঙ্গল ভেদ করে শক্ত ভেলা বানিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনন্ত জলরাশি পার করে পৌঁছে যাওয়ার জন্য তৎকালীন অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে।

হিমযুগ শেষ হয় একসময়। সমুদ্র ব্যবধান বাড়িয়ে তোলে দুই গোলার্ধের মধ্যে। ধীরে ধীরে সভ্যতার প্রসার যত বিস্তৃত হয়, উত্তর গোলার্ধের বাকি বিশ্বও তত তাড়াতাড়ি এক যোগসূত্রে গাঁথা পড়তে থাকে। অনেক যুদ্ধ অধিকারদখলের পর, সাম্রাজ্য ওঠাপড়ার শেষে মানুষ এসে দাঁড়ায় এক নতুন ধাপে— মাথা তুলে এগিয়ে চলে সে আধুনিকতার বিজয়রথকে সঙ্গী করে।

কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের এই বিপুল প্রাকৃতিক খনিজে সমৃদ্ধ খণ্ড এই অস্ট্রেলিয়ার কথা তখনও জানাজানি হয়নি কোনও ভাবেই। ভাগ্যিস, তাই আরও কিছু বছর অন্তত এই আদিম মানুষের দল ওখানে প্রায় নিশ্চিন্তে থাকার সুযোগ পায় পূর্বতন সময়কালকে আঁকড়ে ধরে।

১৬০০ কি ১৭০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ একদল ডাচ প্রথম এসে থমকান আনুমানিক এখন যেই অঞ্চলে পার্থ শহরটি অবস্থিত, সেইদিকে। সেই প্রথম সভ্য জগতের মানুষ পা রাখে এসে এ দেশের বন্দরে। গায়ে নানান রঙের উল্কি আঁকা উলঙ্গ মানুষগুলো অবাক বিস্ময় চেয়ে থাকে এই সাদা চামড়ার কোট হ্যাট পরা সভ্য সমাজের অধিবাসীদের দিকে। কেউ কেউ শঙ্কিত হলেও বেশিরভাগ সরল সাধাসিধে মানুষগুলো আপনই করে নেয় এই ভিনদেশীদের। ভাষাগত ব্যবধান থাকলেও অকপটে গড়ে ওঠে এক অমলিন হৃদ্যতাও। আসলে আদিতে তো জটিলতা ছিল না কোনও। প্রয়োজনমতো মাছ মাংস শিকার করা হত, খড়ের চালের মাটির কুটিরে বসবাস করত আর সমগ্র পৃথিবীর মধ্যেই খুঁজে নিতে জানত ঈশ্বর। স্থির বিশ্বাস ছিল তাদের, এই জমি ঈশ্বরের— তাঁর হাতেই বাঁধা তাদের জীবনের ডোর। ভিনদেশীরা সেই শক্ত সমর্থ বিশ্বাসের বেড়া ভাঙতে পারবে না কিছুতেই।

বিশ্বাসের প্রথম চিড় ধরিয়ে একসময় ডাচেরা পশ্চিমদিকের বেশ কিছুটা অংশ দখল করে ফিরে গেল তাদের দেশে। তবে সুদূর ইউরোপ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ অসুবিধাজনক হয়ে যাওয়ায় ক্রমেই শিথিল হয়ে আসে সেই শাসন ব্যবস্থা। তবে হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো তাদের অনেক কথা, গল্প, মিথ থেকেই সেই প্রথম পৃথিবী জানল অস্ট্রেলিয়ার এই বিশাল ভূখণ্ডের অবস্থানের কথা।