পারিজাত

বেনালংয়ের বিলেতসফরের পুঙ্খানুপুঙ্খ খুব একটা বিবরণ সাদা চামড়ার সব সাহেবসুবোরা রাখেনি। বোধহয় মানবজাতির জন্মোক্ষণ থেকেই বৈষম্য আমাদের নিত্যবৃত্তি। ঐতিহাসিক স্তরে এইসব ‘অসামাজিক জীব’দের নথিভুক্তির তাই হয়তো প্রয়োজনই পরে না। বাকি যেটুকু ভেসে বেড়ায় হাওয়ার হাত ধরে, তা ক্ষাণিকটা আন্দাজ করে নিতে হয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে, নয়তো বা মেনে নিতে হয় নেহাতই গল্পগাছার মোড়কে। এমন সব টুকরো টুকরো তথ্য থেকেই আমি শুধু খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছি সেই হারিয়ে যাওয়া আদিবাসী দলের প্রতিনিধিকে, যাদের গল্প নিয়তির অলিখিত বিধানে আগামী দুশো বছর অন্তত আর কেউ মনে রাখবে না – কোনোভাবেই।

সেসময় লণ্ডনের অধীশ্বর সম্রাট তৃতীয় জর্জ। বেনালংয়ের পরম শ্রদ্ধেয় ‘উলাওয়ারি’ বা আর্থার ফিলিপের প্রচেষ্টায় কথিত আছে যে তাঁর সাথে বেনালংয়ের দেখা হয়েছিল লণ্ডনেই, তবে সে সাক্ষাৎ নিয়ে বিশেষ উৎসাহ বা ধারণা ছিল বলে মনে হয় না আর কারো। এমনকি রাজ অতিথির যথাযথ সম্মান ও বেনালং পেয়েছিল কিনা সন্দেহ। কালো চামড়ার উপর ঔদাসীন্য যে বড় প্রাচীন রীতি রাজারাজড়াদের!

সব দিক থেকে হেরে যাওয়ার পর, সকলের বিদ্রূপ আর বিদ্বেষী সহ্য করার পর আদৌ কি আর ভালো ছিল বেনালং? শোনা যায়, যেভাবে সুরাপান গ্রাস করেছিল তার অন্তরাত্মা ততদিনে, তার দৌলতে বাস্তবের রূঢ়তার জীর্ণ মুখোশখানা বুঝে নেওয়া বোধহয় খুব একটা কষ্টসাধ্য নয়।

১৭৯৪ সাল নাগাদ ফিরতি জাহাজে চড়ে দেশে ফেরার কথা ছিল বেনালংয়ের। কিন্তু ক্রমশ পিছোতে শুরু করে সেই সফর বিভিন্ন কারণে। বন্ধুবান্ধব বিবর্জিত ভিন্ন প্রদেশে থাকা একলা অসহায় সেই মানুষটা তখন খুব ধীরে টের পেতে শুরু করেছে সম্ভ্রান্ত সাদা চামড়ার মোড়কে লুকিয়ে থাকা ‘ভিনদেশী’দের প্রকৃত রূপ। যত সে ফিলিপের মতো কাছে টেনে নিতে চেয়েছে বাদবাকিদের, তত পরিষ্কার হয়েছে তার কাছে ক্রমাগত— বারাঙ্গারুর বলা শেষ কখানি অভিমানরিদ্ধ কথার সত্যতা। যেখানে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক শুধু শাসন আর শোষনের, সেখানে আর যাই হোক, আত্মীয়তা হয়না এই লোক দেখানো সৌজন্যে।

জাহাজেরই এক নাবিকের জীবনচরিত থেকে জানা যায়, বিলেতে থাকাকালীনই সুস্থসবল বেনালংয়ের শরীরে বাসা বাঁধে একসাথে বিভিন্ন রোগজারি। সেই নাবিকের কথার সূত্র ধরেই এও জানা যায়, চিরকাল মাটির কাছাকাছি বাস করা বেনালংয়ের প্রধান অসুখটা নিশ্চিত ভাবে ছিল মানসিক। “সবার মাঝে থেকেও বেনালং আসলে চরমতম একলা এদেশে। নিজের দেশে আর্থার ফিলিপ যতখানি সময় বা ভালোবাসা দিয়েছিলেন ওকে, এখানে তা সম্ভব হয়নি বিভিন্ন কারণে। তার উপর রয়েছে এদেশের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা, আর মদের সর্বনাশা নেশা — কিকরে যে সুস্থ ভাবে মানুষটা তার নিজের দেশে পৌঁছবে, আদৌ তা কতখানি সম্ভব, সত্যিই তা এখন এভাবে বসে ভেবে উঠতে পারছি না। দেখা যাক, যদি ঈশ্বর সহায় হন, তবে হয়তো —”

ঈশ্বরের সাহায্য বেনালং পেয়েছিল কিনা জানা নেই, তবে আরও অনেক কিছু দেখার তখনও বাকি ছিল তার তখনও।তাই দৃঢ়তা আর মনোবল ভর করে পরের বছর আবার হাণ্টার জাহাজে চেপে পাড়ি জমিয়ে দিয়েছিল সে তার নিজের দেশের উদ্দেশ্যে।

সিডনি, প্যারামাটা ততদিনে পুরোদস্তুর সাহেবদের কলোনি হয়ে উঠেছে। সিডনির বন্দরে পরে যেই অংশে বেনালং পয়েন্ট গজিয়ে উঠবে আর বিংশ শতকে যেই পাড়েই গজিয়ে উঠবে বিশ্ববিখ্যাত ‘অপেরা হাউজ’, সেইখানেই আর্থার ফিলিপ তাঁর পোষ্যপুত্রর জন্য বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তার মনের মতো কুটীর। সাহেব এবং বেনালংয়ের অবর্তমানে পরবর্তী গভর্ণর ও তাঁর দলবল ততদিনে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সে আস্তানা। বারাঙ্গারুর জঠোরে জন্ম নিয়েছিল যে কন্যাসন্তান, মায়ের মতোই তারও ততদিনে ঘটেছে সলিল সমাধি বিদেশী রোগব্যাধিতে। বেনালংয়ের দ্বিতীয় বিবাহিত স্ত্রীও স্বামীর পরবাসে বিদীর্ণ ও ক্ষুণ্ণ হয়ে ততদিনে অন্যের ঘরণী হয়ে খুঁজে নিয়েছে জীবনকাঠির সুখ। নিজের জাতির কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার তকমা এসে সেঁটেছে তার সাহেবী পোষাক পরা গায়ে। আর অন্যদিকে সাহেবরাও তার ‘মাতলামি’ এবং তার ফলে হওয়া ‘গুণ্ডামি’সহ্য না করতে পেরে করেছে তাকে বর্জন। এতসবের পরও কি বাঁচার কথা মনে আসে? যেই ‘নিজের দেশ, মাটি’র সুখে সব ছেড়ে ফেরত এসেছিল বেনালং স্বজন খোঁজার তাগিদে, সেখানে তখন শুধু নিভু নিভু করে টিকে রয়েছে সাজানো মৃতবৎ স্তব্ধতা।

তবুও আরও কিছু বছর টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল বেনালং। নিজের দলীয় মানুষদের যে পরিণতি ভেসে উঠেছিল তার চোখের সামনে, তার বিরূদ্ধে লড়াই করা কতটা বাস্তবিক, সেই বিষয় রাতের পর রাত কেটে থাকবে তার মদের ঠেকে বা তার পাশের নিস্তেজ সরু অন্ধবৎ গলিতে — তবে এসবের হাত ধরে তো আর শান্তি মেলেনা! সকলের অজান্তেই তাই ১৮১৩ সাল নাগাদ নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে সে — আর সবাই জানি আমরা, হেরে যাওয়া মানুষের গল্পের খবর পরবর্তী প্রজন্ম কখনই শোনেনা।