পারিজাত

গভর্ণর আর্থার ফিলিপের ইংল্যান্ড ফেরত যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে ততদিনে। ১৭৯২ সালের কথা। বেনালং সেইসময় সাহেবের বাড়িতেই নিজের আলাদা অংশে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেছে। এওরা সম্প্রদায়ের বাকি সকলের সঙ্গেই যোগাযোগ হয়তো রয়েছে তার তখনও, তবু সম্পর্কে মরচেও ধরেছে তার নিজের অলিখিত নিয়মেই। ফিলিপকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করে নিরীহ বেনালং, তাঁকে ছেড়ে তাই থাকার বা আবার নিজের ‘অশিক্ষিত’ গোষ্ঠীতে ফেরত যাওয়ার কথা ভাবতেও চোখে জল চলে আসে তার। আসলে কিছু সম্পর্ক এমনই আত্মিক হয়ে ওঠে সময়ে সময়ে, তার ভালবাসার দায় দু’পক্ষের কারওরই পক্ষে এড়ানো তখন আর সম্ভব হয় না। ফিলিপ বোঝেন সেই কথা। তিনি তাই কিছু না ভেবেই মাথায় স্নেহের হাত রাখেন বেনালংয়ের। “তুমি আমার পুত্রসম। আমার সঙ্গেই তুমিও লন্ডন চলো না বেনালং, রানীর সঙ্গে দেখাও হয়ে যাবে তাহলে তোমার, কেমন?”

দু’মুহূর্ত চিন্তা করে না বেনালং। ঠিক এই সুযোগটাই সেও যে তখন চাইছিল মনে মনে– নিজের মানুষদের কাছে বিলেত ফেরত তকমা লাগিয়ে গেলে হয়তো নতুন করে আবার মান্যিগণ্যি করবে তারাও, আপন করে নেবে তাকে নিশ্চিন্তে– এমনই কিছু ইচ্ছে থেকে থাকবে তারও বহুদিনের। পরিবারসন্ততি সমস্ত ফেলে সেও তাই চড়ে বসল একদিন জাহাজে। তার চেনাশোনা গণ্ডির বাইরের জগৎটাকে ধরার দুঃসাহসিক স্বপ্ন তখন যে বাসা বেঁধেছে তারও মননে!

মানুষের উপর হওয়া সমাজের অত্যাচার নিয়ে শিল্পীর কল্পনা

কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে যে এক যোজন ফারাক— তাকে কিভাবে মোছা যায়, সে হিসাব কখনও করেনি এই মাটির মানুষ। সাহেবদের মতো জামা পরলেই যে তাদের সমগোত্রীয় হয়ে ওঠা যায় না, দীর্ঘ ছয়মাসের যাত্রার সময়ই তা একটু একটু করে টের পেতে শুরু করে সে অচিরে। অবহেলা, লাঞ্ছনা, তার বর্ণ এবং জাতি তুলে হাসাহাসি— মুখ বুঁজে তবু সব সহ্য করে সে। ‘‘নতুন দেশে একবার পৌঁছে গেলে কেউ আর আমাকে ছোট করবে না। আমি স্বয়ং ফিলিপের পোষ্যপুত্র— সাহেবী আদবকায়দায় আমাকে তখন আর এড়ানো যাবে না! আর সাহেব তো বলেইছেন, অসুবিধা হলে পরের জাহাজেই আবার বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন আমায়। চিন্তা কি? নতুন দেশ নতুন মানুষ— এসব দেখার থেকে আমার অপমান কি বড় হতে পারে কখনও? না, কখনও না! আমি এওরা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি— সাহেব কথা দিয়েছেন, যথাযথ মর্যাদাই সেখানে দেওয়া হবে আমায়। আর আমি তো নিজে দেখেছি কেমন এককথার মানুষ তিনি। আমি বিশ্বাস করি তাই, তাঁর জবানের অন্যথা কখনওই হবে না।”

বয়ে যায় সময়গুলো সব মহাসমুদ্রের উথালপাথাল তোড়ে। অবশেষে একসময় জাহাজ গিয়ে ভেরে তার গন্তব্যস্থলে। অনেক উৎসাহী মুখ ভিড় করে আসে বন্দরে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সাদা চামড়ার জনতার এত মানুষ দেখে থতমত খেয়ে যায় বেনালং। পরক্ষণেই সামান্য শিহরিত ও হয় সে উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনায়। বারবার নিজের অনভ্যস্ত বো টাই ঠিক করতে করতে তার এই প্রথম কেমন অস্বস্তি বোধ হয়, “নাঃ, ঠিক হল না। কোথাও কোনও গরমিল রয়ে গেল অজানা। কে জানে কোনও অদেখা অঘটন অপেক্ষায় রয়েছে আমার এই অচিনপুরের দেশে!”

ক্যাসুলায় পাথরের উপর আদিবাসীদের স্মরণে সৃষ্ট কাজ

বহুদিন পর হঠাৎ বারাঙ্গারুর আর্দ্র মুখটা ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে অচিরে। তাহলে কি ওই ঠিক? দুই সভ্যতার মিলমিশ কিছুতেই হয় না কখনও এভাবে?

ওদিকে তখন জাহাজের সকলের অলক্ষে বন্দর জুরে চলছে জল্পনাকল্পনা, ফিসফিসানি।

-“পৃথিবীর অন্য পাড় থেকে শুনলাম কিম্ভূত কিমাকার এক জন্তু আসছে আজ স্যার আর্থার ফিলিপের সঙ্গে! মানুষের মতোই নাকি তারও হাত পা রয়েছে, শুধু আমাদের ভাষা বা ধরণধারণ সে জানে না?”

-“আমিও শুনলাম বন্ধু। শুধু তাই নয়, আমি তো এও জানতে পারলাম যে জীবনই আসলে মানুষ হলেও এতটাই নিম্ন শ্রেণীর যে জামাকাপড় কাকে বলে তাই নাকি ওরা জানে না! ভাবতে পারছ? ইশ, এমন একটা নমুনা আমি যদি পেতাম আমার ক্রীতদাস হিসাবে- দুদিনে বড়লোক হয়ে যেতাম!”

-“অত শখ সব ভুলে যাও বন্ধু! সাহেব ওকে কিছুতেই ছাড়বে না! তার উপর আবার শুনলাম ও নাকি সাহেবের বন্ধু! ওর সঙ্গে স্বয়ং রাণীর দেখা করাতে উনি ভীষণভাবে তৎপর!”

-“হুঃ! ওসব বলতে হয় বুঝলে? বলতে হয়। ইংল্যান্ডের এত বড় সাম্রাজ্যের অধিশ্বরী এসব ফালতু কাজে সময় অপচয় করেন না। অবশ্য যদি আগন্তুক বানরনাচ নাচতে পারে, তবে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে আমরাও যেতে পারি দেখতে, কি বলো!”

-“সেই! সভ্যদের সাথে অসভ্যের এর থেকে বেশি আর কিই বা সম্পর্ক সম্ভব? তাই না?”