পারিজাত

“চুপ করো বারাঙ্গারু! একদম চুপ! আমি যখন বলছি তুমি আমার দেওয়া ওই কামিজ পরবে, তখন দেখো, তার অন্যথা যেন না হয় কখনওই! শুধু তুমি না, বাদবাকি সবাইকেই এবার পশ্চিমী পোশাক পরতে হবে, আদপকায়দা, ভাষা শিখতে হবে— বুঝলে? সভ্যতার যে রূপ আমাদের দেশে বয়ে নিয়ে এসেছে সাহেবেরা, তার মানটুকু রাখাটাই এখন আমাদের কাজ। এই এত এত এওরা ভাই বোনেরা রোজ মারা যাচ্ছে আমাদের। না, ঈশ্বরের অভিশাপে নয়। এ সবেরও উপশম আছে জানো? সাহেবরা তাদের ওষুধ বানিয়েছে। প্রয়োজনে ওদের সেই ওষুধও খেতে হবে আজ আমাদের। ওদের জীবনযাপনে মানিয়ে নিতে হবে নিজেদের পথ চলার ধরণ। নাহলে আমরা থাকব না। সর্বশান্ত হব। ওরা এভাবে টিকতে দেবে না আমাদের!” বারাঙ্গারু উত্তর দেয় না চট করে। হয়তো মনে মনে গুছিয়ে নেয় আগে কথাগুলো। তারপর ধীরে ধীরে স্বামীর গালে হাত রাখে সে স্নেহ ভরে। সামান্য ঘনিষ্ঠ হয়ে কাঁধে মাথা রাখে তার। “এরকম করে সর্বস্ব ত্যাগ করে কি আদৌ বাঁচা যায়? হ্যাঁ একথা সত্যি, সব ছেড়ে দিয়ে টিকে হয়তো যাবো আমরা, তবু আমাদের সংস্কৃতি সভ্যতা— এসব নিয়ে বাঁচতে পারব তো আমরা? ওদের সভ্যতা আমাদের সভ্যতা আলাদা– একপথে এভাবে জোর করে কি চলা যায় সেখানে? তোমাদের জোর করে তুলে নিয়ে গেল যারা, তাদের আদপকায়দা আজ তোমার কাছে আপন? এভাবে ধূলিস্বাৎ হয়ে যাবে আমাদেরই সমাজ— তাই না? আমরা তো সাহেবদের থাকতে বাধা দিচ্ছি না— পারবও না। শুধু নিজেদের অধিকারে নিজেদের মাটি আঁকড়ে বাঁচতে চাই আমরা— এটুকুও কি অনেক চাওয়া? কেন বুঝতে পারছ না তুমি, এইসব ভয়ঙ্কর অসুখ ছিলই না এ দেশে আগে। এসবই তোমার সাহেবসুবোদের দেশ থেকে আসা। তার দায় আমরা কেন নেব বলোতো? ওরাই আসলে আমাদের অভিশাপ— এই পক্স, হাম, প্লেগ— এসব ওদের আনা রোগ— সভ্যতার পচন! আমরা যাই ওষুধ খাই— এদের থেকে রেহাই মিলবে না। আর তুমি যে নেশায় মেতেছো রোজ — যে বোতল তোমার নিত্যদিনের আজ সঙ্গী, আমি থাকি আর নাই থাকি, আমার এই কথাগুলো মিলিয়ে নিও– এ সর্বনাশ তোমায় শেষ না করে ছাড়বে না।”

হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় বেনালং। লালচে চোখে তখনও নেশার ছোঁয়া। “শেষবারের মতো জানতে চাইছি, তুমি আমার হাতে করে আনা কামিজ পরবে কি না! আমার ধৈর্য্যের এভাবে আর পরীক্ষা নিয়ো না!”

সরে দাঁড়িয়ে হাসে বারাঙ্গারু এবার। চোখে চিকচিক করে ওঠে জল। “আমার এতদিনের তোমার জন্য অপেক্ষা, ধৈর্য্যের তো তুমিই মান রাখলে না গো। বেশ, তবে জেনে রাখো, ওই কামিজ আমি কাল রাতেই চেলাকাঠে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছি। সাহেবদের অস্ত্রের সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তিশালী হয়তো আমরা নই, তবু প্রাণ থাকতে নিজেদের মানমর্যাদাকে অন্তত এভাবে মরতে দেব না! ফিরে যাও বেনালং! তোমায় আর এই গোষ্ঠীর নিয়মাধীন থাকতে হবে না! যাও বেনালং, অন্তত আমাদের সম্পর্কের এই পবিত্র বন্ধন থেকে আজ এককথায় এবার মুক্তি দিলাম তোমায়।”

এই কথোপকথন ঠিক এমন করেই হয়েছিল কিনা জানা নেই, তবে পরে শোনা যায়, এক ইংরেজ জাহাজ একবার একদিনে চল্লিশ হাজার মাছ শিকার করায় যখন না খেতে পেয়ে প্রধানত জেলে সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো মারা পরেছিল বিনা দোষে— আদিবাসী রমণী এই বারাঙ্গারুর তখন তার তীব্র প্রতিবাদ করে। তবে নিয়তিকে বশে না আনতে পেরে শেষমেশ এই সাহেবদের সামনেই মাথা নোয়াতে হয় এই বীরাঙ্গনাকেও। ‘সাহেবি অজানা রোগ’এর শিকার হয়ে সেও তার গোষ্ঠীর অনেকের সঙ্গে তার যৌবনেই অস্তমিত হয়।

বেনালংয়ের এসব জানার কথা নয় বোধহয়। ততদিনে যে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে তাকে সাহেবি কেতায় সাজিয়েগুজিয়ে ঘরে রেখে গভর্ণর আর্থার ফিলিপের সাথেই পাড়ি দিয়েছে ইংল্যাণ্ডে।