পারিজাত

বেনালং আর্থার ফিলিপকে নিজের বাবার মতোই শ্রদ্ধা করত। তাঁর সংস্পর্শে সে নিজেও পুরোদস্তুর সাহেব হয়ে উঠতে চেয়েছিল। ভেদাভেদ মুছে নতুন সকালে অস্ট্রেলিয়ার সব জাতি একই সূর্যের আলোয় হোক বিকশিত– এই ছিল হয়তো তার সামান্য স্বপ্ন! কিন্তু মনে মনে কি সে ভুলতে পেরেছিল তার নিজের সভ্যতার উৎস? ভোলা কি আদৌ যায় তার সরল সাধাসিধে স্ত্রী বারাঙ্গারুর অমলিন ভালোবাসা?

তাই একসময় সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শোনা যায় বেনালং ফিরে গিয়েছিল তার গ্রামে। ফিলিপ অবশ্য এ যাত্রায় তেমন আটকাননি আর তাকে, কারণ তিনি বুঝেছিলেন, যদি হয় কখনও, তো বেনালংয়ের হাত ধরেই সম্ভব হতে পারে সাহেবসুবো আর আদি উপজাতি– এই দুই দলের মধ্যে কিছুটা হলেও অন্তত পারস্পরিক সখ্যতা জন্মানো। একসঙ্গে না চলতে পারলে কালো হয়ে যায় বহু পথ– তার সেই কালিমা পরবর্তী বহু প্রজন্ম ধরেও মেটাতে পারে না আর কোনও মতেই। ফিলিপ চানওনি সে দায়ের ভাগীদার করতে আগামীকে।

এক ধূসর বিকেলে বাড়ি ফিরে এলো বেনালং। ধোপদুরুস্ত পোষাক আষাক, মুখে মদের ঝাঁঝালো গন্ধ, বিদেশী আদপকায়দা এভাবে আমূল বদলে দিতে পারে কোনও মানুষকে তা আদি মন্ত্রে দীক্ষিত বারাঙ্গারুর ধারণা পর্যন্ত ছিল না। গ্রামে ফিরে থমকে গেল বেনালংও। স্ত্রীয়ের অনাবৃত ‘অসভ্য’ শরীর দেখে ভ্রূ কোঁচকালো তার সভ্যতার গন্ধমাখা উপরি বেশভূষা। নাঃ,ভালোবাসা থাকুক তার নিজের পথের সীমান্তে– তবু এই রমণীর সঙ্গে এভাবে তো আর ঘর করা যায় না এভাবে!

অ্যাবরিজিনালসদের সুনিবিড় শিল্পকলার ধরণ

সাহেবের পোশাক যে সেলাই করে, তাঁর কাছ থেকেই হয়তো স্ত্রীয়ের জন্য কামিজ এনেছিল বেনালং তার নিজের হাতে করে। বারাঙ্গারুর হাতে সেই জামাখানা দিয়ে তাই পড়তে এবার রীতিমত আদেশ করল বেনালং। অপমানে বারাঙ্গারুর চোখে অভিমানী জলেরা কি ভিড় করেছিল সেদিন? দুর্ভাগ্য আমাদের, ইতিহাস বা গল্পকথাও কখনও নারীদের এসব ‘অযথা অহেতুক’ আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না!

তবে বারাঙ্গারু আর পাঁচজনের মতো সাধারণ নারী কোনোদিনই হয়তো ছিল না মোটেই। তাই কাপড়খানা হাতে নিয়ে সে হাসে শুধু— মুখে কিছু বলে না। এত সহজে বারাঙ্গারু যে মেনে নেবে তাকে, বেনালং নিজেও বোধহয় এতটা ভাবনাদের আশকারা দেয়নি কখনও। আবেগতাড়িত হয়ে আরেক বোতল রাম গলাদ্ধকরণ করে সে ঘুমিয়ে পড়ল তাই সেই রাত্রের মতো নির্দ্ধিধায়।

আদিবাসীদের স্মরণে তৈরি স্মৃতিসৌধ

পরদিন বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙল বেনালংয়ের। ততক্ষণে তাদের গোষ্ঠীর সবাই যেযার নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাছ ধরতে বারাঙ্গারুও তাদের ছোট্ট ‘নাওয়ি’ বা ডিঙি বার করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। বেনালং আড়মোরা ভেঙে ছাউনির বাইরে এসে দাঁড়ালো। হাই তুলতে তুলতেই বেশ খোশমেজাজে বলল, “আজ বিকেলে সাহেবের কাছে নিয়ে যাবো তোমায়। তৈরি হয়ে নিও।”

বারাঙ্গারু তার স্বামীর দিকে তাকায় পর্যন্ত না। বরশিতে ধার দিতে দিতেই নিজের মনে উত্তর দেয় সে, “তৈরি আবার কি হব? আমরা ‘এওরা’রা যেমন করে থাকি, তেমন করেই নিয়ে যেতে চাইলে, নিশ্চয়ই যাবো! এতে আর বলার কি আছে?”

ভ্রূ কুঁচকায় বেনালং। “মানে? এরকম অসভ্যের মতো খালি গায়ে ওইসব সাদা চামড়ার লোকের বাড়ি যাবে নাকি? উনি কত বড়লোক, সমৃদ্ধশালী— এসবের কোনও ধারণা আছে তোমার?”

বারাঙ্গারু এবার স্পষ্ট ভাবে তাকায় তার পুরুষ সঙ্গীর দিকে। “না, আমার ধারণা নেই। কারণ ওই সাহেবদের আর আজ তোমার চোখেও আমি ‘অসভ্য’! কিন্তু কি জানো তো, এই অসভ্যতাই আমার চল্লিশ হাজার বছরের পরিচয়। এই ‘অসভ্য’ সমাজই শিখিয়েছে আমায়, নারী পুরুষ, বড় ছোট, গরিব বড়লোক, সাদা কালো— এভাবে কখনও ভাগাভাগি সম্ভব নয়। সবার পরিচয় তার কাজে যা এই পৃথিবীর ভারসম্যকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ওই সাহেবদের মতো সভ্য আমি হতে চাই না, যারা একদিনে আমাদের নদীর সব মাছ খেয়ে নেয় — নিশ্চিহ্ন করে দেয় আমাদের গ্রামের পর গ্রাম!”

(চলবে)