পারিজাত

বিকেল ফুরাতে আর খুব বেশি বাকি নেই। নীলাম্বর সূর্যদেবের অস্ত যাওয়ার ফরমান শুধোনোর তোরজোর আর ব্যস্ততার মাঝেই পাংশু বদনে অমানিশার কালো দ্যুতি প্রজ্জ্বলিত হওয়ার প্রতীক্ষায় অপেক্ষমান। মহাদেবী পার্বতীর দীর্ঘশ্বাসে বিকীর্ণ হয়ে ছত্রখান হয়ে গেল হাজার কোটি বছরের অভিশাপগ্রস্থ শক্ত জমাট হিমগিরির বরফ। ধীর লয়ে ক্রমশ এক পাষাণ বেদীর উপর সামান্য স্ফুলিঙ্গ হতে বিকশিত হয়ে মানবী রূপ ধারণ করে কৈলাশের এক কোনায় গিয়ে বসলেন তিনি শুষ্ক আবরণে। পরিধেয় বস্ত্রের অঞ্চল লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, মাঙ্গটীকা অসাবধানে খসে পড়ল তাঁর পাদপ্রান্তে– তবে তিনি বড় একটা ভ্রূক্ষেপ করলেন না– যেন তখনও কোনো ঘোর মাখা আবেশে তিনি তীব্র বিচলিত। আজ প্রত্যূষ থেকেই বড় উদাসী তাঁর মন। এতখানিই চঞ্চলা তিনি, যে কি জানি কোন গূঢ় চিন্তার ভাঁজে সাধনার স্থিতিশীলতা কামনায় সমাধিস্থ হয়েও তাতে কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। বান্ধবীদের রঙ্গতামাশা বাকবিতণ্ডা, নন্দী ভৃঙ্গীর হুল্লোড়, ভক্তের আরাধনা– কোনো নিবিড় নিয়তিস্থিত ছন্দপতনের ফলেই নিশ্চিত– দেবীর আজ হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে না।

এভাবেই থমকে রয়েছে যেন সময়ের নির্নিমেষ প্রহর বলয়। কত বছর, যুগ পার হয়ে গেছে দেখতে দেখতে অপ্রতিভতাকে সাক্ষী করে নিঃসংশয়ে। অতীতের পাতা সন্তর্পণে ওলটালে এখনো প্রেমের মদিরা আর আবেগে শিহরিত হন পার্বতী। পিতা হিমালয়ের লালনপালনে বেড়ে ওঠা নব্য যুবতী যে কবে মন দিয়ে বসেছিলেন পাহাড়িয়া এক জটাজুটোধারী সন্ত সাধুকে, টেরই পাননি প্রথমে! পরে যখন তাঁর ভালোবাসার পরিণতি রূপে বলিদান দিতে হয়েছে কামদেব আর রতির একনিষ্ঠ প্রণয়কে– ততদিনে তিনি মহাদেবের ছায়াসঙ্গী হওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ এক উন্মাদিনী।

শিবের জটায় আবদ্ধ গঙ্গার বুক দিয়ে নাজানি কতই না জল বয়ে গেছে এরপর। অপর্ণা পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে অবশেষে তাঁর দেহে লীন হয়ে স্থিতিলাভ করেই তাঁরা আজ ‘অর্ধনারীশ্বর’ নামে পূজিত ত্রিলোকে। মহাদেবের প্রসন্নতা পার্বতীর কম সমৃদ্ধ করেনি। নিজের সমস্ত শক্তিকে আজ তিনি উপলব্ধি করে স্বয়ং আজ হয়ে উঠেছেন মহামায়া, জগন্মাতা। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আদর্শ পরিবার সন্ততির রূপকও হয়ে উঠেছেন তাঁরা যথাকালে। স্বামী সন্তানাদি, ভক্তসমাগমে সুখেস্বাচ্ছন্দে কতদিন যে কেটে গেছে বিশ্বচরাচরের উপর দিয়ে, খেয়ালই রাখেননি শ্রীরূপা!

তবে আজ এমন কি হল তাঁর, যে তিনি একাকী নিঃসঙ্গ নিঃশেষিত হয়ে এভাবে বসে রয়েছেন সাঁঝবেলায় এক নিভৃত পাহাড়ের খাঁজে সবার অগোচরে? স্বামীর থেকে আড়াল হওয়ার কথা যেই স্ত্রী ভাবতেই পারেননি কোনওদিন, আজ সেই স্বয়ম্ভূর থেকেও লুকোনোর এ বৃথা চেষ্টা কেন করছেন তিনি তবে?

বৃথাই বলব— কারণ যোগবলে মহাদেবের আসন টলে উঠল কৈলাস শৃঙ্গে অচিরেই। সবই টের পেলেন তিনি। তিনি যে ত্রিকালদর্শী! তাঁর নজর এড়িয়ে জগত সংসারের কোথাও যে কখনও পলায়ন কখনই সম্ভব নয়!

যোগের শক্তিতেই ভোলানাথ চক্ষু মুদ্রিত করলেন। তাঁর পরিচর্যায় সদা নিয়োজিত নন্দী ভৃঙ্গীর কানে-কানে বলে উঠল, “ওই, এবার তবে বাবা ঘুমোলেন। চল্ আমরাও তবে ওঁকে একলা ছেড়ে দিই বরং কিছুক্ষণ। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার সাজিয়ে ফেলতে হবে আসন্ন সন্ধ্যা আহ্নিকের সব আয়োজন!”

ভৃঙ্গী হাসে, “তা চলো ভায়া। তবে বাবার এসবই তো জানো, কেবল ভ্রম- যোগনিদ্রা। তাঁর মতো চক্ষুষ্মান আর কে আছেন বলোতো এই বিপুল ধরাধামে? তিনি ঘুমোলে যে অনিবার্য বিপর্যয় নেমে আসবে সমগ্র উপজাতির উপর– ধ্বংস হবে সৃষ্টি স্থিতি লয়, তা কিন্তু বাবা বিলক্ষণ জানেন।”

*******
পার্বতীর চিত্ত হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল কোনো যথাযথ কারণের অবর্তমানেই। মননে স্পষ্ট এক অনন্য ভাবের জন্ম হল তাঁর। ধীরেসুস্থে অন্তরতম এক গভীর চিত্তে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল অবশেষে তাঁর পরম আরাধ্য সদাশিবের প্রেমপূর্ণ কণ্ঠস্বর।

“প্রিয়ে, মন শান্ত করো আগে। স্থির হও। স্বরণে রেখো, তুমি ঈশ্বরী, এই আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপৃত জগত সংসারের একমাত্র জননী। এহেন তুমিই যদি এত অল্পেই উতলা হও সঙ্গিনী, কেমন করে পালন করব বলতো আমরা নিরবচ্ছিন্ন এই কার্যক্রমের দায়ভার যথাযথ রূপে?”

এতক্ষণ ধরে জমা হতে থাকা হৃদয়ের সকল বোঝা একটুখানি প্রেমের পরশের সামান্য প্রতিশ্রুতি মেখেই আর্দ্র হয়ে যেন ভেসে গেল গঙ্গাবক্ষে। নিজের সমস্ত শক্তিকে আবার এক স্ফুলিঙ্গে জড়ো করে পার্বতীও ধ্যানে বসলেন। স্থিরবৎ।

“স্বামী, আপনি অন্তর্যামী! আপনার থেকে কিছু লোকাবো, এমন দূরাশাও যে কি ভেবে করেছিলাম, কে জানে? এ কথা সত্যিই অনুধাবন করেছেন আপনি, আজ সকাল থেকেই বড় আনমনা রয়েছি আমি। কিছুতেই যেন শান্তি পাচ্ছি না কোনোভাবেই— কোথাও!”

মহেশ্বর মৃদু হাসেন যোগনিদ্রার গভীর অভ্যন্তরে হয়ে চলা এই বাক্যালাপের এমন আয়োজনে। “কি হয়েছে দেবী, প্রকাশ করো। দেখবে, ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করতে পারলেই বেশ খানিকটা ভার লাঘব হয়ে যাবে মননের। কথায় কথা হয়তো বাড়বে, তবু কথনই তো সৃষ্টির আদিশক্তি, তাইনা? বলো প্রিয়ে, প্রাণ খুলে বলো যা বলতে চাও। চোখ মেলে দেখো, আমি তোমার সামনেই উপস্থিত, তোমারই একনিষ্ঠ সেবায়!”

পার্বতী চোখ খুললেন। “একি স্বামী আপনি? এখানে? স্বশরীরে? সবকাজ ফেলে এমন অবেলায় কেবলমাত্র আবির্ভূত হয়েছেন আমার প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন বলে? এ যে আমার পরম সৌভাগ্য! আপনি আমার সেবায় উপস্থিত– দোহাই আপনার– শুধু অমন কথা কখনও মুখেও আনবেন না। আপনি যে আমার পূজনীয়– কেমন করে আপনি ভুলে যান বলুনতো একথাও মাঝেমাঝে?”

আয়েস করে বসেন মহাদেব নিজ সৃষ্ট বরফের বেদীর কেন্দ্রস্থলে। স্ত্রীকে এভাবে চটিয়ে যেন বড়ই উৎফুল্ল তিনি। “আহা– সেবা বুঝি শুধু একতরফাই হয়? স্বামীর কোনো দায় থাকে না স্ত্রীদের যত্ন করবার? আর তাছাড়া আমার অর্ধাঙ্গিনীর প্রশ্ন নিরসন করাই কি আমার প্রকৃত কার্য নয়? তুমি যে আমার হৃৎস্পন্দন তাও কি জানো না একেবারেই? যাগ্গে, ওসব কথায় এখন কাজ নেই বরং এখন। তার চেয়ে বলো দেখি তুমি ঠিক কি জানতে চাও!” ঈশ্বরীয় ভাবাবেশে দেবাদিদেবের অর্ধ নিমীলিত নেত্রে ছড়িয়ে পড়ে এক অপত্য স্নেহময়তা।

পার্বতী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আগে সাজিয়ে নেন সমস্ত কথন। তারপর চোখ বন্ধ করে দৃঢ় প্রত্যয়ে শুরু করেন তাঁর বচন। “ অনেকদিন ধরেই দেখছি, বৈকূণ্ঠলোকের সঙ্গে কৈলাসের যোগাযোগ কমতে কমতে আজ প্রায় তা বলতে গেলে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। শ্রীবিষ্ণু বা নারদমুনি আর ভুল করেও যেন পদার্পণ করেন না আমাদের এই তুষারাবৃত ক্ষেত্রভূমীতে। কোথাও গিয়ে আপনাদের এই দুই দেবের মধ্যেকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং দূরত্ব যেন মর্তভূমিতেও আজ চাক্ষুষরূপে স্থান পাচ্ছে ভক্তদের অন্তরে। শ্রী বিষ্ণু বা তাঁর অবতারেরা যেভাবে পুজিত, আপনার চরিত্রাঙ্কন সেখানেই ভূলভাবে উপস্থাপিত। আপনার চরিত্রায়ণে সমূহ কার্পণ্যতা করতে গিয়ে আজ আপনি ‘মৃত্যুর দেবতা’, ‘ধ্বংসের ঈশ্বর’, ‘শ্মশানবাসী ছাইভস্ম মাখা এক গাঁজাসেবনে রত সাধু’ বই আর কিছু নন প্রভু সাধারণের মনমন্দিরে! হ্যাঁ আপনার পূজার্চনায় হয়তো আজও তারা সকলেই নিয়োজিত, তবে তা নিতান্তই প্রাণের দায়ে-ভয়ে। পাছে তাদের কোনও ক্ষতিসাধন হয়ে যায় আপনাকে অবহেলা করার ফলে, তাই। সকল কালিমাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এই যে আমি কালী রূপ ধারণ করলাম আপামর সন্তানদের মঙ্গল কামনায় তারও ভয়াবহ সব অর্থ বার করে শ্মশানবাসিনি বলে মানুষ দেখি খালি শিহরিত হয়। অথচ ওদিকে শ্রী লক্ষ্মীর জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা। তাঁকে আদর করে ঘরে ঠাঁই দেওয়া হয় নির্দ্বিধায়। আমার এই সম্মানহানি আমি যদিও বা সহ্য করে নিতাম মাতৃস্নেহে, আপনার এই অমর্যাদা সত্যিই বড় পীড়া দেয় আমায়। আমি যে আর এসব শ্রবণ করতে পারি না!”

দেবীর আরক্ত মুখখানি তুলে ধরে তাঁর রূপলেহন করতে করতে মাথায় হাত রাখেন নীলকণ্ঠ। “এইকথা! আচ্ছা, বুকে হাত রেখে বলো দেখি কিছু কি আদৌ ভুল বলে মর্ত্যবাসী? তুমি যা যা বললে, তা তো সর্বৈব সত্য, তাই না। আমি তো সত্যিই প্রলয় নির্ধারক– সকলের অন্তিম সময়কাল লিখন হেতুই আমার প্রয়োজন। এতে অন্যায় কোথায় দেখলে বলোতো প্রিয়তমা?”

“কি বলছেন স্বামী? হ্যাঁ, এসব কথা সত্য, তবে পূর্ণাঙ্গ নয়। আপনার প্রকৃত রূপ আকার এসব আর অপপ্রচারের বাড়াবাড়িতে উদ্ভাসিত হচ্ছে কই? আপনি যে ভোলা মহেশ্বর, সর্বদা ভক্তের হিতে রত, সেকথা তো কোথাও কাউকে আজকাল আর বলতে শুনি না? হ্যাঁ একথা ঠিক, ধ্বংস করেন আপনি— তবে তা তো নেহাতই অন্যায়, অরাজকতা, ছলনা, তাই না! মৃত্যু মানুষের এক চরমতম নিয়তি– তাকে আগামীর পরিকল্পনায় কখনোই এড়ানো সম্ভব নয়– তার দায়ভার আপনি কেন একাকী বয়ে চলবেন বলুন তো চিরকাল? অথচ মৃত্যুপথযাত্রীকে সব শোক দুঃখ থেকে মুক্ত করিয়ে আপনি যে তাদের পাপস্খলন ঘটান– এ কথা কেন মুছে যাবে ইতিহাসের নির্মম অমোঘ পাতায়? আপনি অল্পেই তুষ্ট, তার সুযোগ বহুবার অসুরকূল নিয়েছে, মানছি, তবে একথাও তো সত্য, দেবতাগণও সেই সুযোগের অনুসন্ধানেই কেবল ব্যবহৃত করেছে আপনাকে! যখনই স্বর্গলোকে ঘনিয়ে এসেছে বিপদ, আপনাদের ত্রিদেবকেই স্মরণ করেছে তো তারাও একনিষ্ঠ হাহাকারে! কই, তখন তো কারও মনে হয়নি আপনি পরিত্যাজ্য– কারণ অনার্যরাও আপনার পূজারী? কৌলীন্যকে ভুলে সবাইকে আপন করতে পারেন যিনি তিনিই তো প্রকৃত মহেশ্বর!” ক্রোধে জ্বলে ওঠে পার্বতীর দৃপ্ত তেজস্বী মুখাবয়ব।

“প্রিয়ে, শান্ত হও। ক্রোধ সংবরণ করো। এসবই তোমার ভ্রান্ত ধারণা ব্যতীত আর কিছুই নয়! আমরা আজও একইভাবে সম্মানিত সর্বক্ষেত্রে। এখন শুধু রূপ বদলে গেছে পূজার। জানোই তো দেবী, এখন প্রচারের যুগ। যে যত প্রচারিত, সে তত জনপ্রিয়। এই প্রচার ব্যাপারটি কিন্তু আবার বেশ মজার। সত্যাসত্যের বিচার সেখানে কেউ করেনা। এই ধরোনা, তোমার প্রসঙ্গেই বলি, ভাবছো দূর্গা রূপে বঙ্গে তুমি বহুল পূজনীয়া, তার মানেই তুমি স্বীকৃত অন্তত দশভূজা রূপে, তা কিন্তু আদপেও সত্যি নয়! তোমার প্রচারে সেখানে ব্যবসায়ীদের গোপন কোটর ভর্তি হয়; রাজনৈতিক দলেরা উৎসাহিত হয়ে যায় সব প্রকৃত কঠোর বাস্তবকে জাঁকজমকে ধামাচাপা দিতে অবলীলায়; চারদিন কাজকর্ম ভূলে হইহই করতে পারে সবাই, কে বড় পুজো,কার ‘থিম’ বেশি ঈর্ষণীয়, তাই নিয়ে দেখনদারির রেষারেষি মাততে পারে উদ্যোক্তাদের সবাই — তাই ‘মা মা’ করে তোমায়। অথচ নিজেদের মা রা পড়ে থাকে অবহেলায় – সে খবর তখন তাদের উন্মত্ততার মুখোশ ভেদ করে আর সত্যি কথা বলতে গেলে তাদের কিন্তু ছুঁতেও পারে না। যেদিন তুমি আর লাভের মুখ দেখাতে পারবেনা ওদের, সেদিন দেখবে ওরা তোমার অপপ্রচার করতেও একমুহূর্ত বিলম্ব করবে না। ”

খানিক জিরিয়ে নিয়ে আবার বলে চলেন মহাদেব, “ঠাকুর মাত্রেই এখন শুধু পুতুল পুতুল খেলা। আমার কোনো ক্ষোভ নেই তাতে। যদি খেলার ছলেই মিলেমিশে থাকে সবাই, সব ধর্ম, তাতেই আমাদের কার্যসিদ্ধি। ঈশ্বর তো কেবল একজনই। তিনিই সর্বক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপে কেবল পুজিত। কখনও তিনিই ব্রহ্মা, কখনও তিনিই বিষ্ণু, আবার কখনও সেই তিনিই আমি, স্বয়ম্ভূ। তেমনই আল্লাহ , গড— এঁদের মধ্যেও কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো ফারাক নেই। যখন যে যার মাহাত্ম্য কীর্তন করেছে, তাকেই জগত্ব্যাপী ‘সর্বোত্তম’ আখ্যা দিয়েছে। বাকিদের মান খানিক কমাতে হয়েছে বইকি তাতে!প্রচারের এই তো আদিম নিয়ম, তাই না! বুঝলে দেবী, মানুষ আসলে নেহাতই অবুঝ, তার বোধ বুদ্ধির পরিসর একথা আত্মস্থই করতে পারে না যে কাউকে বড় করতে গেলে অন্যকে ছোট করার ছলনা আদ্যন্ত নিষ্প্রয়োজন । শুধু নিজের সত্তাটুকুকে জাগ্রত করতে হয়।বাকি প্রচারের এই দৈনন্দিন প্রবহমানতার আবেগে ভেসে গিয়ে কোনোভাবেই নিজেকে ভাঙা গড়া বেমানান। আর আমাদের ঈশ্বরীয় এই একক বৃত্তের প্রচারের প্রাচুর্য উলঙ্ঘন করাই তো একান্ত নিজস্ব নিয়ম।তাই আমাদের – আমার কাজ আদ্যাশক্তি প্রিয়জন!

লক্ষ্মীটি, অন্তত তুমি তো আর অবুঝ হোওনা ওই কিছু স্বার্থাণ্বেষী মানুষের মতো , যাদের অপপ্রচারে দানা বাঁধে ভয়, সংশয়, ধর্মভীরুতা, আক্রোশ। ধর্মের নামে, ধর্মগুরুদের নাম নিয়ে শুরু করে যারা রাহাজানি, হানাহানি, দাঙ্গা! আসলে, মানুষ তো নিজের মননে আজকাল আর শান দেয়না কখনও। দিলে বুঝত, তার অন্তরেই কেবল ঈশ্বরের বাস। কোনো ধর্মগ্রন্থে, আচার আচরণে হিংসায় তাকে পাওয়া যায়না আজও আগের মতোই – কখনও!”

চোখের সামনেই সদাশিব অনন্তশয্যায় আসীন শ্রী বিষ্ণু রূপে ধরা দেন পার্বতীর সম্মুখে। অবশ্য, একী! তুষারাবৃতা হিমালয় তনয়া পার্বতীই বা তখন আর কোথায়? তাঁর জায়গায় যে সেসময় মঙ্গলকলস হাতে আদি অনন্তকালব্যাপী স্থির ধ্যানমগ্না স্বালঙ্কারা শ্রীমতী লক্ষ্মী।

দিনরাতের এই মাহেন্দ্রক্ষণে কৈলাস পর্বতও তাই ততক্ষণে দুধসাগরের উদ্ভাসিত মায়ার বলয়ে বিলীন!