ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

indira-profileসময়টা ছিল কবিপক্ষেই। তাই শহর ছেড়েই শেষের কবিতার শিলং স্মৃতি বয়ে চলেছিলাম। মন তখন আঁকুপাকু। উদ্ধত শাখার শিখরে রডোডেনড্রণ দেখতে পাবে কিনা সেই চিন্তায়!  গুয়াহাটি পৌঁছেই আমাদের যাত্রা দেশের সবচেয়ে সুন্দর রাজ্যে, যেখানে প্রাণ আর প্রাণীর সৌন্দর্য্য অফুরাণ বৈচিত্র্যময়তায় ভরা। সেই ল্যান্ড অফ দ্যা রাইজিং সান বা অরুণাচলের পথে।

গৌহাটি থেকে ভালুকপং যেতে যেতে  আলোচনা হচ্ছিল বোডো ড্রাইভারটির সাথে। বোডোরা প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যায় ওদের ল্যান্ডটিকে রক্ষা করতে। খুব ডাকাবুকো ওরা।   NH-37ধরে ছুটে চলেছি আমরা। সাথে আপাতনী, মিশমী, ন্যিশি, ট্যুটসা, আদি, টাংসা, আকা, মিজি, মংপা, শেরদুকপেন, বগুন প্রভৃতি উপজাতির পাহাড়ী জীবনযাপনের গল্প।   ।

কিছুটা গিয়েই ডানদিকে মেঘালয় আর বাঁদিকে অসমের রাস্তা। মেঘালয়ের পাহাড়কে পেছনে ফেলে রেখে চললাম অসমের পথ ধরে। আর্মি মিসাইল বেস কালিয়াবড় থেকে বাঁদিকে তেজপুরের দিকে ঘোরা হল। নামেরি ন্যাশানাল পার্ক, ফিশিং লেক দেখতে দেখতে ব্রহ্মপুত্র চোখে এল। কালীভোমরা ব্রিজ, শোণিতপুর এলিফ্যান্ট রিসার্ভ ফেলে NH-52ধরলাম । কিছুটা চলেই NH 52 ডানদিকে ঘুরে গেল ও আমরা ধরলাম NH 13। সেখান থেকে  মাত্র ৬০ কিমি দূরে ভালুকপং, প্রথমদিন পিটস্টপ তথা রাত্রিবাস ভালুকপংয়ে।  অসম ও অরুণাচলের সীমানায়। সেখানে কামেং নদী । অসমে যার নাম জিয়াভরলি। দিনের আলো নিবে  সুয্যি ডুবে গেল সত্যি সত্যি বিকেল সাড়ে চারটের মধ্যে। এবার মেঘের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলাম আলো আঁধারিতে । সাথে চলল বিস্তীর্ণ কামেং নদী। ইনার লাইন পারমিট নিয়ে আবার চলা। পৌঁছলাম ভালুকপং । ভালুকপং থেকে দিরাং যাব পরের দিন।

রাত্রিবাস অসম ট্যুরিজমের প্রশান্তি লজে। নদীর ধারে পাহাড়ের কোলে অপূর্ব এই কটেজে পৌঁছে সত্যি সত্যি প্রশান্তি হল যেন । ভালুকপংয়ের  প্রশান্তি কটেজের নজরমিনারে হেলান দিয়ে এবার কামেং নদীর  অবিরত নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে কলকল করে বয়ে চলা । ওপারে ঘন জঙ্গল। হাতী নাকি দেখা যায় যখন তখন। জল খেতে আসে তারা নদীতে। আর নদী ভরা মাছ রয়েছে। লোকাল মানুষেরা অনবরত নদীতে নামছে আর মাছ ধরে আনছে। ধূমায়িত চা এসে হাজির হল সামনে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সন্ধ্যে নামা দেখতে লাগলাম কামেং পাড়ে । পাখী ডাকছিল দু একটা । অরুণাচলে খুব লোডশেডিংয়ের দাপট। তবে ঝুপসি অন্ধকারে বসে রবীন্দ্র চয়ন মন্দ লাগছিলনা সেই অবকাশে।

সুন্দরী ওগো শুকতারা রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ

স্বপ্নে যে বাণী হল সারা জাগরণে করো তারে পূর্ণ।

পুরো জায়গাটায় একটা অদ্ভূত প্রশান্তি আর হালকা ঠান্ডার রেশে যেন এক স্বপ্নিল আবেশের সৃষ্টি হল। রাতে সেই কাঠের ওয়াচ টাওয়ারে বসেই ডিনার সেরে নিলাম গরম স্যুপ আর নুডলস দিয়ে।

পরদিন ঘুম ভাঙল বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে । ভোর রাত থেকে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে। প্রশান্তি কটেজের আশপাশ আরো যেন সবুজ হয়ে উঠেছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়। গরম আলু পরোটা আর চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি।DSC02987 আসার সময় গৌহাটি এয়ারপোর্টে অরুণাচল প্রদেশের একটি ট্যুর গাইড সংগ্রহ করেছিলাম। সেখানে চোখ বুলিয়ে জানতে পারলাম ভালুকরাজার ফোর্টের কথা। সেই ধ্বংসাবশেষ দেখতে ছুটলাম। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দায়িত্ত্বে থাকা সেই ঐতিহাসিক স্থানে বর্তমানে লোকাল নেতার বাড়ি রমরমিয়ে উঠেছে জেনে যারপরনেই হতাশ হলাম।

বিফল মনোরথ হয়ে গাড়িতে উঠে এবার টিপি অর্কিড রিসার্চ সেন্টারে । সেখানেও চরম ব্যর্থতা। কারণ মে মাসে অর্কিডের দেখা নেই। শুধু হোটেলে একটি প্রজাতির অর্কিড ফুটে আছে দেখেছিলাম পাইনগাছের মাথায় ।  পাহাড়ের গায়ে ছোট বড় ঝোরার কলকলানি মন ভরিয়ে দিল। দুধসাদা ফেনিল জলরাশির অবাধ পতন সেই উঁচু পাহাড় থেকে। অরুণাচলে এমন ঝোরায় ঝোরায় ছয়লাপ প্রকৃতি।

কুয়াশাছন্ন ভ্যালি আর পাহাড়ের গা থেকে ঝুলন্ত মেঘ। ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক আবারো চলা। পথে পথে বন্দুকধারী স্থলসেনার ছাউনি। সেখানে তারা ট্যুরিষ্টের জন্য দোকান খুলে রেখেছে চা-স্ন্যাক্সের। দুর্গামন্দির রয়েছে একপাশে। আঁকাবাঁকা  পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে চলা। পাহাড়ের চড়াইতে পড়ল নাগমন্দির। বর্ডার রোডস একবার রাস্তা তৈরী করতে গিয়ে মেরে ফেলে এক নাগকে। তার নাগিনীটি আর রাস্তা বানাতে দেয়নি। যেনতেনপ্রকারেণ বাধা দিয়েই চলেছিল । মানুষেকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিল। এরপর নাগের মন্দির বানিয়ে তবে শান্ত হল সেই নাগিনী। সেখানে পেন্নাম ঠুকে আজো পথ চলতে হয়। সেসা ওয়াটার ফলস আর রহস্যময় মেঘমিনারে চোখ রেখে পৌঁছলাম টেংগা ভ্যালি। টেঙ্গা ভ্যালিতে আর্মি  ও  বর্ডার রোডস-য়ের গুছিয়ে সংসার। বর্ডার রোডস টাস্কফোর্স ফর্টিনের এখানে ডাকনাম   “ফিকার নট ফর্টিন”  ; তাই চারিদিকে ফিকার নট ফর্টিনের মজার মজার মন্তব্য ও চিহ্ন দেখিয়ে আগন্তুককে তারা বুঝিয়ে দেয় “ফিকার মাত করো”  ; পরিচ্ছন্ন টাউনশিপ। ক্যাফেটেরিয়া থেকে মন্দির, দোকানবাজার থেকে টেনিসকোর্ট, আমোদপ্রমোদের জন্য “মস্তি ডট কম” সবকিছুই ঝাঁ চকচকে।   ফুলের বাগান, ভুট্টার চাষও চলছে ফাঁকে ফাঁকে। আমারা তখনো কখনো মেঘ, কখনো রোদের সাথে লুকোচুরি খেলছি।DSC03066 এবার খতরনক রাস্তার কবলে পড়লাম। মনে মনে দুর্গানাম জপে চলেছি। বীভৎস খাড়াই পথ। উল্টো দিক থেকে ট্রাক এসে গেলে সবচেয়ে মুশকিল। আর  গাড়ির স্পীড কমে গেছে তার মধ্যে। বর্ডার রোডস রাস্তা চওড়ার কাজে লেগেছে। রুক্ষ পাহাড়ি প্রকৃতি। ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে আসে সেখানে। সামনে মাইলের পর মাইল পাথর খন্ড আর দূরে ঘন সবুজ পাহাড়। গভীর খাদ একদিকে। গাড়ি চলেছে অনবরত সেইভাবে। তাই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় পৌঁছতে হবে সেদিন… আমাদের নেক্সট ডেসটিনেশন দিরাং শহর।

বমডিলা ডিস্ট্রিকটের গেট এল।  খুব বাতাসিয়া জায়গাটি। নর্থ কামেং জেলার হেড কোয়ার্টার হল  বমডিলা । দূরে কিউয়ি ফলের অরচার্ড । শীতের সময় বমডিলা থেকে দেখা যায় এ অঞ্চলে হিমালয়ের দুই সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাংটো এবং গোরিচেনের তুষারাবৃত রূপ। বমডিলা হল অসম বা অরুণাচলের মানুষদের এক পরিচিত শৈল শহর। গ্রীষ্মছুটির অবকাশের জন্য আদর্শ যার এলপাইন জলবায়ু। ফেরার পথে আমার থাকব বমডিলাতে।তাই অযথা সময় নষ্ট না করে আবারো চলা দিরাংয়ের পথে। পাহাড়ের গায়ে হোটেলটি ছিমছাম।  আপেল আর কিউয়ি ফলের অরচার্ড আর নানা পাখীর সমারোহ দিরাং জুড়ে। দিরাং আর তাওয়াংয়ের মাঝামাঝি একটা জায়গায় আছে ইয়াক রিসার্চ সেন্টার । দিরাং থেকে মাত্র ৭কিমি দূরে আছে সাংতি ভ্যালি যেখানে প্রতিবছর শীতের সময় আসে অগণিত সাইবেরিয়ান পরিযায়ী পাখী পরিবার। তারা আবার ফিরে যায় কাচ্চাবাচ্ছা নিয়ে গরম পড়ার শুরুতেই।

কিছুপরেই দিরাং।  পাহাড়ের গায়ে ছিমছাম হোটেল।  সুজ্জ্যিডোবার মূহুর্তে ধূসর আকাশের গায়ে যেন জ্বলজ্বলে তারা ফুটিফুটি। হয়ত বা শুকতারা। আবারো মনে করালো রবিকবিকে…

 আঁকাবাঁকা  সরু রাস্তা, ডানদিকে জঙ্গলে ঢাকা খদ। এ রাস্তার শেষেই বুঝি শেষের কবিতার অমিতর বাসা ছিল? না, পরক্ষণেই মনকে বললাম, না, না সে তো শিলং। এ তো দিরাং। বোডো ড্রাইভারটি বলে উঠল, কি বলতেসেন আপনে? কোথায় শিলং আর কোথায় দিরাং! আমি বললাম, এক‌ই তো হল। সেই এক হিমালয়, এক নর্থ-ইষ্টের কোলে দুই শহর। রবিঠাকুরকে চেনো?  তিনি তোমাদের এখানে এসে রচনা করেছিলেন “শেষের কবিতা” বলেই শুরু করে দিলাম ব‌ই খুলে আবৃত্তি করতেঃ

মন্দচরণে চলি পারে

যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।

সুর থেমে আসে বারেবারে,

ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।

রাতে গরম ভাত, মুসুরডাল আর ডিমের কারি জুটেও গেল সেখানে। এবার পরদিনের তোড়জোড়। DSC03203 ভোর ভোর উঠে দেখি দিরাং ভেসে যাচ্ছে সোনাঝরা রোদ্দুরে। স্নান সেরে নিয়ে কোনো এক মিষ্টি আপাতনি কিম্বা মিশমি  মেয়ের হাতে বানানো পুরীভাজি আর চা জুটে গেল দিব্যি।

পাখপাখালির স্বর্গরাজ্য দিরাং।  অনামিকা অর্কিডের মাদারল্যান্ডে আর উচ্ছল ঝর্ণার দেশ। অরুণাচলে এমন ঝোরায় ঝোরায় ছয়লাপ প্রকৃতি।

ভালুকপং থেকে  প্রায় দেড়শো কিমি দূরে দিরাং শহর ।  দিরাংয়ে এসে মানুষ বেস ক্যাম্প করে ছুটি কাটায় কাছেই মান্ডলায় ট্রেকিং আর বার্ড ওয়াচিং করে। এখানে আছে ১৮৩১ সালে স্থাপিত এক প্রাচীন দিরাং জং, স্থানীয় মানুষ যাকে বলে দিরাং ফোর্ট। দিরাং আর তাওয়াংয়ের মাঝামাঝি একটা জায়গায় আছে ইয়াক রিসার্চ সেন্টার । দিরাং থেকে মাত্র ৭কিমি দূরে আছে সাংতি ভ্যালি যেখানে প্রতিবছর শীতের সময় আসে অগণিত সাইবেরিয়ান পরিযায়ী পাখী পরিবার। তারা আবার ফিরে যায় কাচ্চাবাচ্ছা নিয়ে গরম পড়ার শুরুতেই।

সর্বাগ্রে বলেছিলাম রবিপক্ষে বাড়ির বাইরে পা রাখার কথা ।  পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা নির্ঝরিণীর দেখা মিলতেই মনে পড়ে যেত তাঁকে। স্মরণ করে ফেলতাম শেষের কবিতা খুলে।

ঝর্ণা, তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা,

তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে সূর্যতারা।

…..  আর সেই মূহুর্তে আমি যেন হলেম আত্মহারা।

 একটু যাওয়া, একটু হাঁফিয়ে মরা, আবারো চলা। শুধুই প্রকৃতির টানে, পাহাড়ের থানে, আনমনে, ঝোরার গানে। ভয় মেশানো নিস্তব্ধতা, স্থলসেনার ছাউনি, সীমা সড়ক বাহিনীর আতিথ্য… সব মিলিয়ে ভালোলাগা। হোটেলে রাত্রিবাস, পরদিন আবারো চলা, কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টির পথ ধরে, রডোডেনড্রণের হাসি নিয়ে একে একে ভালুকপং, বমডিলা, দিরাং, তাওয়াং….চীন-তিব্বতের সীমানার কাছাকাছি যেখানে চমরী গাইয়েরা আপনমনে DSC02978খেয়ে চলেছে এলপাইন ঘাসের কচি ডগ….তাদের গলায় কোন্‌ দেশের পাসপোর্ট তা আমার অজানা।

আচ্ছা প্রেম কেমন হত সেখানে? মানে দিরাংয়ে এলে কি অমিত চিরদিনের মত তার লাবণ্যকে পেত ?  শিলং বুঝি অপয়া। দিরাং বুঝি স্থান মাহাত্ম্যে উতরে যেতেও পারত! শেষের কবিতা না হয়ে রবিঠাকুর নাম দিতেন শুরুর কবিতা।  ভরপুর দিরাংয়ের বাতাসীয়া লুপ। ভরপুর সে তখন বুনোফুলের যৌবনগন্ধে, পাখ-পাখালির কনসার্টে । আর আমার মাথায় তোলপাড় তখন শেষের না কি শুরুর কবিতা?

তুমি আবার ফিরে এসো কবি এই দিরাংয়ে। আবার লেখ নতুন করে শুরুর কবিতা।

(ব্যবহৃত ছবি লেখিকার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে নেওয়া)