অঙ্কন ঘোড়ই


“যত্র নার্যস্তু পুজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ।
যত্রৈতাস্তু ন পুজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।”

নারী পূজিতা হলে তবেই স্বর্গ নেমে আসে। সত্যি! কিন্তু আমাদের যে চমকে যেতে হয়। যখন দেখি ব্রাহ্মণ্যবাদের জনক স্বয়ং মনু এই স্তুতি করেন। ভুতের মুখে রামনাম। ঠিক যেমন চমকে যেতে হয় মুখে পর্ন ব্যানে উদ্যোগী কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রীই রেপ কেসের আসামী। অথচ সে নেতা মন্ত্রীরা হয়তো বড় বড় ভাষণে বলে থাকেন পর্নোগ্রাফি দেখেই ছেলেরা গোল্লায় গেছে।

অন্যদিকে লজ্জায় ঘেন্নায় মাথা হেঁট হয়ে আসে যখন এক্স ভিডিওস ডট কমে সার্চ হিস্টরিতে ভেসে ওঠে নির্ভয়া বা প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি কিংবা আসিফা। না, এটা ডিসটোপিয়া নিয়ে রচিত কোনও সিনেমার স্ক্রিপ্ট নয়। আমাদের নিজেদেরই গল্প। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির গল্প। ফেসবুকের গল্প। হঠাৎ এইভাবে আমাদের জেনারেশনের সংকট যে এত ক্রমবর্ধমান হয়ে উঠছে, আমরা ভাবতেই পারছি না।

যৌনতা হিংসার স্বরূপ ধারণ করছে। অপ্রাপ্তি, অভাব, অপমান সঞ্চিত হতে হতে হিংসার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি হয়ে চলেছে সমাজের যৌবন মনে। ঠিক এই জায়গাতেই থাবা বসাতে প্রস্তুত পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি। আর সেক্সুয়ালিটি নিয়ে আমাদের ভ্রান্ত ধারণা এই ইন্ডাস্ট্রির মূল হাতিয়ার।

পর্নোগ্রাফি আদতে একটি আধুনিক ইন্ডাস্ট্রি। ক্যাপিটালিস্ট সোসাইটির অত্যাধুনিক ব্যবসা। ১৭৫২ সালে খননকার্য করে পম্পেই থেকে একটি শ্বেত পাথরের মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। দেখা যায় রোমান দেবতা প্যান একটি মেয়ে-ছাগলকে বলপূর্বক সেক্স করছে। পর্নোগ্রাফির ইতিহাসে এই স্থাপত্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘পর্নোগ্রাফি’ ধারণাটিই উনিশ শতকীয় ইউরোপীয় উদ্ভাবন বলা যেতে পারে।

১৮৫৭ সালে গ্রিক মেডিক্যাল ডিকশনারিতে সর্বপ্রথম শব্দটি দেখা যায়। কিন্তু আমরা বর্তমানে যে অর্থে ‘পর্নোগ্রাফি’কে বুঝি এখানে সেটি নেই, রয়েছে ‘প্রসট্রিটিউশন’ সম্বন্ধীয়। আরও পাঁচ বছর পর ওয়েবস্টার ডিকশনারিতে দেখা গেল ‘পর্নোগ্রাফি’র অর্থ- ‘Licentious painting or literature’। এই সময় ভিক্টোরিয়ান কালচারে হস্তমৈথুনের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেল। রোমে ‘সেক্সুয়ালিটি’ মানুষের পাবলিক লাইফে ব্যবহৃত হত, কিন্তু ‘পর্নোগ্রাফি’ জায়গা বাঁধা ছিল প্রাইভেট লাইফে। ‘বলপূর্বক’ শব্দটিই পর্নোগ্রাফির ক্ষেত্রে মূল্যবান হয়ে ওঠে যেন। মানুষের মধ্যেকার ধর্ষকাম বৃত্তিই উৎসুক হয়ে ওঠে পর্নের আদলে।


পত্রপত্রিকার জগতে দিল্লি থেকে কলকাতা পর্নো-পত্রিকাগুলির দপ্তর আজ ক্রমবর্ধমান। এই লাইনে অন্যতম FANTASY, DEBONAIR অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে বত্রা সিনেমার নিকটে ডাঃ মুখার্জী নগর (দিল্লি) থেকে প্রকাশিত ‘মধুর কথাএঁ’, কিংবা আগ্রা থেকে প্রকাশিত ‘আধি রাত’। এমনকি কলকাতায় এর বাজার একটুকুও কম নয়। ‘প্যাশন’ হোক বা ‘বিসর্গ প্যাশন’, ‘যৌবন’ কিংবা ‘হট মিরর’ বিক্রি বাটার কমতি নেই একেবারে। সর্বত্রই নারীকে পণ্য বানিয়ে বাজার গরম। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মন থাবা বসাতে চায় সেখানেই।

তবে নৈতিক নজরদারি বাদ দিয়ে সমাজ-মনস্তত্ত্ব অনুসন্ধানে বেরলে দেখা যাবে, এই পত্রিকাগুলির গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। না, পত্রিকাগুলি বাবুসোনাকে হাত বুলিয়ে ঠাণ্ডা করার কাজে লাগে না। অন্তত ৮০-র দশকের আগের পর্নো মনোভাবাপন্ন পত্রিকাগুলিতে সমাজের একেবারে ‘র মেটিরিয়েল’ খুঁজে পাওয়া যাবে। যৌনতা ও হিংসার স্বরূপ বোঝার জন্য দ্বারস্থ হতেই হয় এই পত্রিকার পাতায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ, যৌনতা, স্বাস্থ্য নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা রয়েছে এগুলিতে।

অন্যদিকে বিষাক্ত-পৌরুষের (Toxic Masculinity) প্রতি রয়েছে সপাটে এক থাপ্পড়। অথচ এতদিন বাঙালির নৈতিক নজরদারির জন্যই আলোচনার জগতে একেবারে বাইরে পত্রিকাগুলি। দেশ স্বাধীনের পূর্ব থেকেই পত্রিকাগুলি বাজার মাত করে রেখেছে। যেমন ১৯৩৮ থেকে প্রকাশিত সুকান্ত কুমার হালদারের ‘নর-নারী’ পত্রিকা কিংবা ১৯৪৪ সাল থেকে প্রকাশিত সুনীলকুমার ধরের ‘নতুন জীবন’। পত্রিকাগুলির গোত্র বিচার করে বলা হত ‘রূপ, স্বাস্থ্য, যৌন ও মনস্তত্ত্বমূলক মাসিক পত্রিকা’।

পত্রিকাগুলিকে খাঁটি ‘পর্নো-পত্রিকা’ বললে হয়তো একটু ভুল হবে। তবে পর্নগ্রাফিক উপাদান ও আদি সূত্র এখানে খুঁজলে, সহজেই পাওয়া যায়। ১৯৫০ সালের (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ) ‘নতুন জীবন’ পত্রিকায় রাখাল ভট্টাচার্য (‘এ দেশে নারী ধর্ষিতা হয় কেন?’ প্রবন্ধে) দীর্ঘদিন ধরে ‘ভদ্রলোক পুরুষ বাঙালি’ দ্বারা নির্মিত ‘শান্ত’, ‘লক্ষ্মী’, ‘লজ্জাবতী’ বাঙালির নারীর দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি বলেন—

“কিন্তু গুণ্ডার সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে যদি ব্লাউজের বোতাম খুলে যায় বা খুলে যায় শাড়ীর ফাঁস, গুণ্ডার মুষ্টি নিবদ্ধ হয় সেই নারীর স্তনে, তাতেই সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে আমাদের নারীকূল। এতেই সতীত্ব হারানো ও বে-ইজ্জতের চরম হয়ে গেছে—সমাজের স্ত্রী পুরুষ এই দৃঢ় ধারণা করে বসে আছে।”

কারণ—

“নারী হল সমাজ ও সংসারের অলংকার। নারীর শালীন ও শোভন ব্যবহার, সংস্কৃত রুচি আর নির্জলা সতীত্ব (স্পর্শ সর্বস্ব) যে কোনও পরিবারের সবচেয়ে গর্বের জিনিষ। আর কিছু না থাকলেও তার সতীত্বের বড়াই নিয়েই আমাদের পরম পরিতৃপ্তি।”

এখানে একটু থেমে রাখালবাবু পাঠককে জিজ্ঞাসা করেন—

“অথচ হাত ধরে টান মারলে যে সমাজে নারীর সতীত্বহানী হয় সে দেশের নারী সতীত্ব রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এমন কাহিনী বহু বহু থাকলেও প্রাণপণ প্রতিরোধে পুরুষের সঙ্গে কামড়া কামড়ি ধ্বস্তাধ্বস্তি করে আক্রমণকারীকে ব্যর্থ করেছে, করেছে আত্মরক্ষা, এমন কাহিনী আপনারা কটা শুনেছেন?”

আসলে— “আততায়ীর বিরুদ্ধে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে, পথে অশ্লীলাচারীকে তিরস্কার করছে, কোনও মেয়ে সম্বন্ধে একথা শুনলেও আমাদের শালীনতাবোধ আহত হয়, আমরা তাদের ষেঁড়ো বা গেছো মেয়ে বা গুণ্ডা মেয়ে বলে গাল দিয়ে থাকি”।


সবশেষে সুবিমল মিশ্রের কথায় আসা যাক। ‘মনুষ্যত্ব’ শব্দটিও আজকাল দূষিত হয়ে গেছে—

“‘মনুষ্যত্ব’, শব্দটির সংগে, দেখা যায়, পুরুষত্ব শব্দটি জড়িয়ে গেছে, অংগাংগি হয়ে রয়েছে যেন। শব্দ দুটিতেই আদর্শ মানুষ বলতে আদর্শ ‘পুরুষ’ সূচিত হচ্ছে, অন্তত শারীরিকভাবে পুরুষ। আবার ‘মেয়েমানুষ’ আর ‘মেয়েছেলে’ শব্দদুটি পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয় ‘মানুষ’ আর ‘ছেলে’ শব্দাংশ দুটি পরস্পর পরিবর্তনীয়। তাই, মানুষ যদি ঘটনাচক্রে ‘মেয়ে’ হয়, তবে তাকে স্বতন্ত্র করে চিহ্নিত হতে হয়, যেন মনুষ্যেতর কোনও প্রাণী, পুরুষেতর।”

অতএব আজ ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে বিশুদ্ধ, পবিত্র, সূচীবায়ুগ্রস্থ সমাজের শালীনতাবোধকে, খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে নারীর ওপর আধিপত্যকামী সামাজিক শৃঙ্খলাকে, আর কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো উচিত সকল আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মন ও ধর্ষকামী মানসিকতাকে।

ঋণ
১. গাঙচিল পত্রিকা : পর্নোগ্রাফি সংখ্যা। অতিথি সম্পাদক- বিজলীরাজ পাত্র। এপ্রিল ২০১৮।
২. চেটে চুষে চিবিয়ে গিলে। সুবিমল মিশ্র।