বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা কিছু প্রশ্ন রেখেছিলাম মানবাধিকারকর্মী রঞ্জিত শূরের কাছে। তিনি আমাদের জানিয়েছেন তাঁর বক্তব্য। সেইসব উত্তর রইল রোব-e-বারের পাঠকদের জন্য।

প্রশ্ন: ৭৩ বছরের স্বাধীনতা, ৭০ বছরের প্রজাতন্ত্রে কতটা আমাদের কাছে এখন ‘আচ্ছে দিন’?
রঞ্জিত শূর: ৭৩ বছরের স্বাধীনতা আর ৭০ বছরের প্রজাতন্ত্রে সাধারণ মানুষ আদতে অধীনস্থ প্রজাই রয়ে গেছে। নাগরিক হয়ে উঠতে পারেননি। আজ তো আক্ষরিক অর্থেই নাগরিকত্বও প্রশ্নের মুখে। আপনার ভোটে ক্ষমতার আসনে বসে আপনাকে প্রশ্ন করছে– আপনি কে, কোথা থেকে এলেন। নিজদেশে উদ্বাস্তু! এ বড় কঠিন সময়! ১ শতাংশ লোকের হাতে ৭০ শতাংশ সম্পদ। তবু আরও চাই। রাষ্ট্র তাঁদের সহায়। বিবাদমান পক্ষগুলির মধ্যে নিরপেক্ষ ভাবে বিবাদ মিমাংসার বদলে সম্পত্তিবান শ্রেণীর হয়ে বিত্তহীনদের ঠান্ডা করাই রাষ্ট্রর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবিধান, আইনকানুন সবই তুচ্ছ তার কাছে। রাষ্ট্র স্বার্থ আর কর্পোরেট স্বার্থ অভিন্ন এখন। রাষ্ট্রনীতির অভিধানে এটাকেই ফ্যাসিবাদী শাসন বলে। যা ক্রমশই সর্বগ্রাসী হয়ে জীবনের সমস্ত কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। বড় উদ্বেগে আছে মানুষ।

প্রশ্ন: গণতন্ত্রের দিক থেকে কতটা সুখে রয়েছি এখন?
রঞ্জিত শূর: গণতন্ত্র দেখছেন কোথায়? যে দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্যের সরকার সমাজ বিরোধী বলে শত শত মানুষকে ভুয়ো সংর্ঘষে হত্যা করে আর রাস্ট্রের বাকি সব উপাঙ্গ নীরব থেকে তাকে সমর্থন জানায় সে দেশকে গণতন্ত্র বলবেন! যে দেশে ধষর্ক সন্দেহে এনকাউন্টারের নামে ভুয়ো সংর্ঘষে হত্যা করা যায় তাকে গণতন্ত্র বলবেন? গণতন্ত্র মানে তো শুধু ভোট দেওয়া নয়। ভোটই-বা কত শতাংশ লোক ঠিকঠাক দিতে পারে কে জানে! গত পঞ্চায়েত ভোট নিশ্চয়ই মনে আছে। কত লাশ পড়ে প্রতি ভোটে। এরই মধ্যে আবার ইভিএম কেলেঙ্কারি। সব বিরোধী দলেরই ইভিএম নিয়ে অভিযোগ। কত কত ইভিএমের আবার হদিশ নেই। সেই মামলাও সুপ্রীমকোর্টে বিচারাধীন।

গণতন্ত্র কোথায়! এত এত কালা আইন মাথার উপর নিয়ে গণতন্ত্র হয়? আফস্পা, উপদ্রুত এলাকা আইন, ইউএপিএ, সিডিশন, এনএসএ, এসমা, ৩৫৬ ধারা, ১৪৪ ধারা– কত বলব। কথায় কথায় ইন্টারনেট বন্ধ, সাইবার ক্রাইমে মামলা দায়ের, ভাবাবেগে আঘাত– অজস্র।

একজন সৎ সক্রিয় সমাজকর্মীকে সারাদিন দড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হয়। গণতন্ত্র মানে তো ভিন্ন মতের অধিকার। রাইট টু ডিসেন্ট। সংবিধানে আছে সভা-সমাবেশ, মত প্রকাশের অধিকারের কথা। মানছে কে? এত এত সংগঠন নিষিদ্ধ কেন? প্রতিদিন বেড়েই চলেছে সেই তালিকা। কেন সভা করার জন্য অনুমতি চেয়ে পুলিশের পেছন পেছন ঘুরতে হবে? আসলে এ দেশে গণতন্ত্র মানে শাসকের গণতন্ত্র। শাসকের বেঁধে দেওয়া গন্ডির মধ্যেই ঘোরাফেরা। তাই প্রতিবাদী আদিবাসী মানে মাওবাদী, সোচ্চার মুসলমান মানে সন্ত্রাসবাদী, ভিন্ন মতের অধিকারি মানে শহুরে নকশাল ইত্যাদি। কুকুরকে মারার আগে একটা নাম দাও। গণতন্ত্রের আবরণে দমনতন্ত্র চালিয়ে যাও।

প্রশ্ন: আর্থিক দিক থেকে কতটা ভালো অবস্থায় রয়েছি বলে আপনি মনে করেন?
রঞ্জিত শূর: যে দেশে বেকারত্বের হার শতাংশের হিসাবে ৭০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আর্থিক দিক দিয়ে সেখানে কিভাবে মানুষ ভালো থাকতে পারে! একদিকে চরম বেকারত্ব, অন্যদিকে সমস্ত চালু প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র ছিল অর্থনীতির ভিত। সে ভিতের ফাটল এখন এত চওড়া যে অর্থনীতিটাই ডুবন্ত।
ব্যাংকের সুদের হার এমন জায়গায় যে সুদ নির্ভর প্রবীণ নাগরিকদের বেঁচে থাকাটাই অভিশাপ হয়ে উঠছে। নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বস্তুর দাম আকাশছোঁয়া। মজুরি বৃদ্ধি নগন্য। ফলত টিঁকে থাকার অর্থনীতি চলছে। কোনও রকমে দিন গুজরান করে টিঁকে থাকাটাই লক্ষ্য। যদি কোনও দিন সুদিন আসে!

প্রশ্ন: সব শেষ কি বলবেন এখনও আমাদের কি আদৌ ‘আচ্ছে দিন’?

রঞ্জিত শূর: একটা বিষয় খুব পরিষ্কার। এই সংবিধান দিয়ে শাসকেরা আর শাসন চালাতে পারছে না। জনসাধারণও আর এই সংবিধানে শাসিত হতে রাজি নয়। তাই শাসকেরা যেমন পদে পদে সংবিধান লঙ্ঘন করে সাধারণ মানুষও প্রতিদিন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। তাই সময় হয়ে গেছে প্রকৃত আচ্ছে দিনের জন্য নতুন সংবিধান সভা ডাকার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন পক্ষ ডাকবে? জনসাধারণের পক্ষ নাকি শাসক তথা মালিকপক্ষ? লড়াইটা এখন সেই লক্ষেই। সম্ভাবনা প্রবল সেই লড়াইয়ে অধিকাংশ সংসদীয় দলই মালিকপক্ষে থাকার। সিএএ, এনপিআর, এনআরসি বিরোবিরোধী চলতি লড়াইগুলিও একটা দিকনির্দেশক। কোন প্রতিষ্ঠিত দলই কিন্তু সেই লড়াইয়ের নাগাল পাচ্ছে না। এটাই বড় আশার কথা। ছাত্র-যুব, মহিলা বিশেষ করে মুসলমান মহিলাদের বিরাটভাবে রাস্তায় নামা নতুন ভারত গড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমি আশাবাদী। এই লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন কাজ।