বড় আজব কুদরতি.. সংসার যে কাকে সম্মান দিয়ে মাথায় তুলে রাখে, আর কাকে অনাহূতের দলে ঠেলে দেয় তার হিসেব নেই৷ যত বড় বীর হোন না কেন কর্ণ কিছুতেই অর্জুন হবেন না, যত নিষ্ঠাবানই হন না কেন একলব্য কিছুতেই অর্জুন হবেন না, আর যত প্রতিভাবানই হন কেন নাসিরুদ্দিন শাহ কিছুতেই অমিতাভ বচ্চন হবেন না৷ মহাকাব্য থেকে একেবারে সটান এই শতাব্দীতে নেমে আসতেই হল, কেননা আলোচনাটাই বড় তেলতেলে৷ এই বরিষণ মুখরিত দিনে, ঝরঝর বাদলের ধারা ঝরলে, তেলেভাজা ছাড়া কেন যে কিছুতে আড্ডা জমে না, তার জন্য কোনও গবেষণার দরকার নেই, স্রেফ চপ-বেগুনিতে একটা কামড় দেওয়াই যথেষ্ট৷ কিন্তু এই তেলে নিরন্তর ভাজা ভাজা হয়েও  কেউ কেউ থাকে, যাদের কপালে কিছুতেই তেলেভাজার সম্ভ্রম জোটে না৷ প্রতিদিনের পাতে তারা থাকে পাতপূরণের চাহিদা মেনে৷ প্রতিদিন তারা থাকে রসনাতৃপ্তির বাহন হয়ে৷ অথচ তেলেভাজা নিয়ে কথা বলতে বসলেই নস্ট্যালজিয়ার সব তেল গড়িয়ে যায় ওই বেগুনি, আলুর চপ, মোচার চপের দিকে৷ ডিমের চপও কৌলিন্যের জোরে না হোক, প্রোটিনের প্রাচুর্যে ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে ওঠা মধ্যবিত্তের জাতে ওঠার মতো তেলেভাজার দলে নাম লেখায়, কিন্তু আলু ভাজা, বেগুন ভাজারা চিরকালই ব্রাত্য৷ তাদের ব্যর্থ প্রাণের রুদ্ধসঙ্গীত তেল চুপচুপে হৃদয়ের কর্ণগোচর হয় না৷ ALU

আসলে এই নিয়তি, এইই নিয়ম৷ ট্রয়ের বীরগাথায় হেক্টর নন, আকিলিসের নামই থাকবে৷ বেতারের আবিষ্কর্তা হিসেবে ইতিহাস মার্কনি সাহেবেরই নাম করবে, আচার্য জগদীশ থেকে যাবেন আনসাং হিরো হয়ে৷ এমনকী মহাকবি যে বাল্মীকি, তাঁর সুবিশাল কাব্য সংসারেও থেকে গেছে অনাদৃতারা৷  ‘কাব্যসংসারে এমন দুটি-একটি রমণী আছে যাহারা কবিকর্তৃক সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াও অমরলোক হইতে ভ্রষ্ট হয় নাই। পক্ষপাতকৃপণ কাব্য তাহাদের জন্য স্থানসংকোচ করিয়াছে বলিয়াই পাঠকের হৃদয় অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে আসন দান করে।’- খেয়াল করেছেন আর এক মহাকবি৷ ঊর্মিলা, অনসূয়া, প্রিয়ংবদা, পত্রলেখাদের জন্য তাও রবি ঠাকুর ছিলেন৷ বেচারা আলু ভাজা, পটল ভাজা, বেগুন ভাজাদের কোনও সহৃদয় ঠাকুর নেই৷ যুগে য়গে পাচক ঠাকুরদের হাতে গরম তেলে তারা এ-পিঠ ও-পিঠ কড়া লাল করে ভাজাই হয়েছে যা, তেলেভাজার গৌরব টীকা তাদের কপালে জোটেনি৷

অতএব তফাৎ গড়ে দিচ্ছে এক ও অদ্বিতীয় বেসন৷ যার গায়ে পাতলা বেসনের ছোঁয়া, তেলেভাজার ইতিহাসে তার নাম সোনার জলে লেখা৷ বাকিরা উলুখাগড়ার দলে৷ অথচ অন্নপ্রাসন থেকে বিবাহ-পঞ্চব্যঞ্জন পূরম করতে ভাজাভুজির ভূমিকায় থাকে এরাই৷ কই ঘন সোনামুগের ডালের সঙ্গে ঝিরিজিরি আলুভাজার বিকল্প কেউ বের  করুর দিকি! কিংবা এই বর্ষায় সাপুর সুপুর খিচুড়ির সঙ্গে তেল চকচকে বেগুন ভাজার কোনও বিকল্প হয় নাকি! তেলেভাজা না হলেও ভাজাভুজি সমাজে এরা নিসন্দেহে কুলীন৷ তুলনায় পটলভাজা, কুমড়োভাজা  একধাপ নীচে৷ ওই দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর কাজ তাদের দিয়ে হয়৷ ঢালাও পাত পড়েছে, একটা কিছু ভাজা দিতে হয় তো, দে দুটো পটলভাজা৷ তাই বলে কী পটলকে কম তেলের তাপ সইতে হয়! তবু ওই যে কথায় বলে, অতিবড় সুন্দরী না পায় বর, অতিবড় ঘরণী না পায় ঘর, প্রয়োজনের ষোলকলা পূর্ণ করেও তাদের আর কিছুতেই তেলেভাজা হয়ে ওঠা হবে না৷

BEGUNপত্রলেখার অনাদরে একালের মহাকবি তো রীতিমতো খেদ করে বলেছেন, ‘আমরা বলি, কবি অন্ধ। কাদম্বরী এবং মহাশ্বেতার দিকেই ক্রমাগত একদৃষ্টে চাহিয়া তাঁহার চক্ষু ঝলসিয়া গেছে, এই ক্ষুদ্র বন্দিনীটিকে তিনি দেখিতে পান নাই। ইহার মধ্যে যে প্রণয়তৃষার্ত চিরবঞ্চিত একটি নারীহৃদয় রহিয়া গেছে সে কথা তিনি একেবারে বিস্মৃত হইয়াছেন। বাণভট্টের কল্পনা মুক্তহস্ত—অস্থানে অপাত্রেও তিনি অজস্র বর্ষণ করিয়া চলিয়াছেন। কেবল তাঁহার সমস্ত কৃপণতা এই বিগতনাথা রাজদুহিতার প্রতি। ’ বাঙালিও প্রথম পাতের মুখরোচক আয়াসে এই সমস্ত ভাজাভুজির ভিতর থাকা প্রণয়তৃষার্ত চিরবঞ্চিত তেলেভাজার হৃদয়টিকে খুঁজে দেখতে চায়নি৷

অথচ  কী আশ্চর্য, আলুর চপে তো সেই আলুই থাকে, কিংবা বেগুনিতে বেগুন, পটলিতে পটল৷ তবু জগতের এমনই নিয়ম যে, নেপথ্যের কারিগর হয়েই এদের থেকে যেতে হবে, কিছুতেই লাইমলাইট এরা কাড়তে  পারবে না৷ বক্তৃতার আগাগোড়া তৈরি করে দেওয়া অফিসার যেমন কিছুতেই মন্ত্রীর মর্যাদা পেতে পারেন না৷মর্যাদা আদায় একটা প্রক্রিয়া৷ সফেদ পোশাক-আশাক, বাইটে-কোটেশনে  যেমন জনমানসে উদার, ধর্মনিরপেক্ষ,  মানবিক ইমেজ তুলে ধরার মতো সোজা আঙুলে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ইষৎ ভীতিপ্রদর্শনে আঙুল বেঁকিয়ে মর্যাদার ঘি তুলে আনতে পারেন জনসেবকরা, তেলেভাজা প্রকল্পে সেটাই করে দেখায় বেসন৷ কালাজিরের কেমিষ্ট্রি আর মশালার মাসকায় যে মর্যাদা তেলেভাজা আদায় করে, তা সাদামাটা আলু, বেগুন ভাজাদের আয়ত্তাধীন নয়৷ সুতরাং কোয়ালিটিটে ফার্স্ট বয় হলেও ক্লাসের মনিটর হওয়া তাঁদের নিয়তিতে নেই৷ স্রেফ ভাজা থেকে তেলেভাজায় উত্তরণের পথে আছে এই বিশেষ রসায়ন৷ এরপরেও কোন আহাম্মক বলে যে তেলেভাজা শিল্প নয়৷ সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ যদি কবি হয়, এবং কবিতা যদি শিল্প হয়, তবে সকলেই তেলেভাজা নয়, কেউ কেউ তেলেভাজা- এই নিয়তি শিরোধার্য করে তেলেভাজাই বা শিল্প হয়ে উঠবে না কেন?

হয়েওছে তাই৷ বাঙালির রসনায় তো বটেই, আড্ডায়-সাহিত্য-নস্টালজিয়ায় গ্যাঁট হয়ে নিজের আসনে বসে আছে তেলেভাজারা৷ বিরোধি রাজনীতির মতোই তারও গায়ে এঁটুলি পোকার মতো লেপটে আছে কোলেস্টেরলের চক্রান্ত, আনহাইজেনিক ইত্যাদি সাজানো ঘটনা৷ তবু সে সব ছাপিয়েও, মানুষের ভালোবাসার জোরে তেলেভাজা আজও শহরে-গ্রামে আশীর্বাদধন্য৷ সেই বিপুল আশীর্বাদের মঙ্গলশঙ্খ নিনাদে চিরকালই চাপা পড়ে আছে তেলে ভাজা ভাজাদের অনুচ্চারিত ব্যাথার কাহিনি৷ সমস্ত সৎ-আদর্শের কণ্ঠ যেভাবে চাপা পড়ে যায় চিরকাল৷

 ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পে কাদম্বিনীকে মরিয়া প্রমাণ করতে হয়েছিল যে সে মরে নাই, কে জানে, ভাজাভুজিদের আর কত গরম তেলে ভাজাভাজা হয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তারাও তেলে ভাজা ছাড়া অন্য কিছু নয়৷  কে জানে আদৌ তা সম্ভব কি না!

সরোজ দরবার