দীপঙ্কর দেবনাথ

এখানে ভাগাড়, মেট্রোর খবরে আসে না। ঝড় বৃষ্টি নামার আগে বিদ্যুৎ যায়। তিন দিন পরেও আসে।রোদের হলকা আবার তুলা মেঘ ডিহাইড্রেশন বা কালিদাস কাউকে বোঝে না। খিদে লাগলে মুড়ি খায়।চেষ্টা পেলে জল। তিন বেলা পেট পুড়ে খাওয়া কি জিনিস জানে না।বাঙালীর হেঁশেল কিংবা সিংহদুয়ার কিছুই নেই।চটের বস্তা, পাটকাঠি,খড়, মাটি- ২০৬টা হাড়ের কাজ করে। রাজনীতি বোঝে না। সকালে একদলের মিছিলে পা মেলায়।

বিকালে অন্যদল এসে আবার বুঝিয়ে নিয়ে যায়।সকলেই কথা দেয়। দেয় চাল,ক্ষুদ, পচা ভাত, হারিয়া। কোনও শ্রীর সম বণ্টন নেই। মধ্যসত্ত্বভোগী এখানেও আছে।ম্যানেজার থেকে টিনেজার সবাই কে তাক করে। ভোলাভালা আপন স্বভাবের সবাই। অথচ সারাদিন খেটে যায় ১৫০ টাকার জন্য।সদ্য খুলেছে বাগান। আবার কবে বন্ধ হবে কে জানে! ছোটো ছোটো মাথা দেখা যায় কেমন যেন লুকিয়ে লুকিয়ে থাকে। অথচ জায়গাটা এদেরই। অধিকার এদেরই সবচেয়ে বেশি। সমস্ত সুযোগ সুবিধা অন্যরা নিয়ে যায়।বলার নেই কেউ। যার যখন কিছু পাবার ইচ্ছে চলে আসে। এদের নিয়ে ব্যবসা করে লাভ বুঝে চলে যায়।

যেমন করে নদীর পারে ঘুরতে গিয়ে কারো গামছা সাবানে স্নান সেরে চলে আসি তেমনি। এরা মালিকের জন্য জীবন নিয়ে দিতে পারে। শোনা গল্প একটা- একবার এক ম্যানেজার সাহেব পাশের গ্রামে আসলে অনেক মানুষ জমা হয়। দূর থেকে দেখতে পেয়ে সমস্ত চা বাগানের শ্রমিকেরা দৌড়ে চলে আসে। ভাবে ম্যানেজার সাহেব কে আটকেছে বোধহয়!ধর্ম সংস্কৃতি ঠাকুর দেবতা আছে। নিজস্ব সৃষ্টি কিভাবে বেঁচে আছে অনেকেই জানে না।

তাদের বোধের জায়গায় ম্যানেজার, মালিক অর্থাৎ রোজগার। একটা বন্ধ বাগান খুললে আমাদের শারদোৎসব এর চেয়েও বেশী আনন্দ ওরা করে। নতুন জামা কেনে, সাইকেল কেনে।আবার বন্ধ হয়ে গেলে টুকরো টুকরো সম্পত্তি গুলোই সমতলের এই আমরা খুব কম দামে কিনে নেই।খুব কম টাকায় হাজিরা খাটাই।অপেক্ষা করি বাগান থেকে কবে লেবার আসবে। আমরাই করি। দারুণ সুযোগ পেয়েছি। এটা আমাদের অন্যরকম উপনিবেশ।

ফেরিওয়ালাও আসে অনেক রকম। কেউ চুড়ি মালা ফেরি করে। কেউ নারী মাংস। গাছগাছালি, বাগানের নরম মাটিগুলো যৌন শোষণে পাথুরে হয়ে গেছে। বালু পাথরের ব্যবসাও তেমনি। প্রতি বছর পলি পড়ে আবার জমা হয়।এমন অনেককে দেখেছি ১০ বিঘে জমি আছে অথচ সারাদিন নদী বনে বনে ঘুরে মাছ ধরে পাখি মারে।

সন্ধে হলে কলাপাতায় ভাগা করে নিয়ে বসে। এই আমরাই প্রতি সন্ধ্যায় তাদের জন্যে অপেক্ষা করি। কি করে ২০ টাকা পোয়া বলে হাফ কিলো ৩০ টাকায় নিয়ে নেই।মাপার পাল্লাটাও যে নেই! কি মজা! আমরা বাবু মানুষ যা বলব তা কি আর মিথ্যা হবে! অসম্ভব বিশ্বাস করে আমাদের। আমরাও বিশ্বাসের মর্যাদা রাখি ঠিক এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে।