অ্যালবার্ট অশোক

সাংস্কৃতিক জগতের এক ঋষিতুল্য ভীষ্ম তারক গড়াই। তিনি রাজা হতে পারতেন, হননি। নিজের ইচ্ছা ও সংযমের কাছে বন্দি। ১৯৪৪ সালে জন্ম, শান্তিনিকেতন কলাভবনে পড়াশুনা করেছেন। ভারতের নামী ও দামি গ্যালারিতে অনেক একক প্রদর্শনী করেছেন। ১৯৭০ সালে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের ও ১৯৮৮ সালে আইফ্যাকস পুরস্কার পান।

তিনি শিল্পের নানা বিভাগ নিয়ে এত ওয়াকিবহাল আর ৫টা গ্রাম্যছেলের মতোই জানতেন না। ছবি আঁকা শিখবেন বলে শান্তি নিকেতনের কলাভবনে পড়াশুনা শুরু করেছিলেন। ক্রমে কিংবদন্তি শিল্পী রামকিংকর বেইজ (তখন এত সুনামী ছিলেন না, কেবলই একজন কলাভবনের মাস্টার মশাই হিসাবে) এর ছায়ায় ভাস্কর্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর নিজেরও মনে হয়েছিল তিনি পেইন্টিং থেকে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যতা সাবলীলতা ভাস্কর্যে অনুভব করেন।

তারক গড়াইয়ের আবেগ ও ভালবাসা নারীর ‘মা’ চরিত্রের উপর। শৈশব ও জন্মস্থল বীরভূমের অজয় নদীর পাড়ে ঘিদহ গ্রামে। সেখানে নানা সম্প্রদায় ও জাতির বাস। আদিবাসী মূলত সাঁওতাল অধ্যুষিত ঘেরা এলাকা। তিনি দেখেছেন, মায়েরা কত পরিশ্রমী হয়। গ্রাম্য জীবন, চাষবাসের জীবন। তবু মায়েরা তার সন্তানদের কাছ ছাড়া করেন না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাচ্চার যত্ন আত্তি করেন।

তারক গড়াই যখন বড় হন তখন কলেজ জীবনের পর শর্বরী রায় চৌধুরীর সুপারিশ নিয়ে কমল মজুমদার এর নেক্সাস নামক এক ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। কলকাতায় তরুণ শিল্পী তারক গড়াই, শান্তি নিকেতন থেকে তল্পীতল্পা, গুটিয়ে একেবারে চলে আসেন। তাঁর কিন্তু থাকার কোনও পূর্ব কল্পিত কোনও ব্যবস্থা ছিল না। নেক্সাসে উঠেই ভেবেছিলেন ওখানে একটা থাকার জায়গা জুটিয়ে নেবেন।

কিন্তু সেখানে তেমন কোন জায়গা ছিল না। নেক্সাসের একজন সিনিয়র শিল্পী সুধীর ধর, তিনি নতুন শিল্পীর থাকার ব্যবস্থা করে দেন। নেক্সাস অফিসের কাছেই ছিল ল্যান্সডাউন মনোহর পুকুর রোডে ‘ক্যানভাস আর্টিস্টস সার্কেল’ এর অফিস কাম থাকার ব্যবস্থা। সুধীর ধর ‘ক্যানভাস আর্টিস্ট সার্কেলের’ ঘরেই তারক গড়াইয়ের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ওই ঘরে আরও ৩জন থাকার ব্যবস্থা ছিল। তারক গড়াই প্রায় মাস ছয়েক সেখানে থাকেন।

সৃজনশীল কাজ করে তখন কোনও শিল্পী জীবিকা হিসাবে ছবি বা ভাস্কর্যকে নির্ভর করে বাঁচা খুব কঠিন ছিল। ‘ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন’ এই পরিভাষাটির সংজ্ঞা তখন একটু অন্যরকম ছিল। মূলত কালার স্কিম, তাঁর সঙ্গে ফার্নিচার ও স্বাচ্ছন্দ্যতা-সহ বাসস্থান বা অফিসকে মনোরম করে তোলাই ছিল ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনের কাজ। পরে ছবি ও নানা ভাস্কর্য যোগ হল।

ওই সময় ইউরোপীয় মাস্টার আর্টিস্টদের পেইন্টিং কপি করার একটা বিজ্ঞাপন দেখে তারক গড়াই কপি পেইন্টিঙে উৎসাহী হন। নেক্সাসের মালিক কমল মজুমদার তার কপি পেইন্টিং এর দক্ষতা দেখে তার ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনে পেইন্টিং যোগ করেন। তার ভাস্কর্য নির্মাণ কিছুদিন বন্ধ রাখেন। শুধু ব্যস্ত হয়ে পড়েন কপি পেইন্টিং নিয়ে। দুই বছর কাজ করে, নেক্সাসের কাজ ইস্তফা দেন। ও ফ্রিল্যান্স কাজ শুরু করেন।

শুচিব্রত দেবের পরামর্শে তিনি শাড়িতে ব্লক প্রিন্টিঙের কাজের কারখানা খোলেন। নানা ডিজাইন বানানো ও তা শাড়ীর উপর মুদ্রণের কাজ। তার সাথে সাথে ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনের কনসালট্যান্ট , নকশা বা লে-আউট বানানো, মাস্টার আর্টিস্টদের ছবি কপি করা, মিনিয়েচার বানিয়ে ফ্রেম করে বিক্রি করা ইত্যাদি একসাথে করতে লাগলেন। নেক্সাসে থাকাকালীন নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল। সেইসব অভিজ্ঞতা সম্বল করে তিনি নিজেই ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের/ ডিজাইনের ব্যবসা শুরু করেন। এবং ব্লক প্রিন্টিং বন্ধ করে দেন।

মাত্র তিনজন ছুতার মিস্ত্রী নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান অয়েলের কিছু কাজ বাজার মূল্য থেকে কম দর দিয়ে কাজ শুরু করেন। নিজের ব্যবসা স্বাধীন ব্যবসা, তখন প্রচুর ইউরোপীয় মাস্টার পেইন্টারদের ছবি চাহিদা মত রাত জেগে কপি করতেন। একসাথে ছয়/সাতটি কাজ শুরু করতেন। তেলরঙের কাজ, শুকোতে সময় লাগে, তাই একটা যতক্ষণ শুকচ্ছে ততক্ষণ অন্য একটাতে রঙ চাপাতেন। অনেক বড় বড় কোম্পানির কাজ করতেন যেমন ক্যালোরেক্স ইন্ডিয়া, পিয়ারলেস কনসালটেন্সি সার্ভিস ইত্যাদির। প্রত্যেকটার সিলিং, ফার্নিচার, কালার স্কিম ইত্যাদি সব করতে হত।

আমাদের উৎসবে পার্বণে ঠাকুর দেবতার মাটির পুতুল পাওয়া যায়। যখন তারক গড়াই শিশু তখন এরকম একটা পুতুলের বায়না করেছিলেন। তার বাবা মাটি দিয়ে তেমন একটা পুতুল বানিয়ে দিয়েছিলেন। এই স্মৃতি তারক গড়াই কখনো ভুলতে পারেননা, সেই ছোটবেলা থেকেই তিনি মাটি দিয়ে পুতুল বানানো শুরু করেন। স্কুল জীবনে প্রথম ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা পান, তিনি যখন নবম শ্রেণিতে পড়তেন, হেডমাস্টার নলিনীমোহন দাশ তাকে একটা ব্রাশের সেট পুরস্কার দিয়েছিলেন।

এত রকম যে ব্রাশ হয় তা তিনি জানতেন না, আগে তিনি একটা তুলি দিয়েই সরু মোটা সব কিছুর রঙ ভরতেন। এবং হেড মাস্টার তাকে সন্ধান দেন যে আঁকার জন্য ভাস্কর্যের জন্য আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া যায়। আরও দক্ষ হওয়া যায়। তারক গড়াই এসব শুনে পুলকিত হত ও মনে মনে ভাবেন তিনি আর্ট কলেজে পড়বেন ছবি আঁকা শিখবেন। স্কুল জীবনে দেওয়াল পত্রিকায় তিনি ছিলেন একমাত্র অলঙ্করণ শিল্পী। শিক্ষকরা তাকে এই কারণে ভালবাসতেন।

৩০ ফুট বিস্তৃত এক দেওয়াল পত্রিকা তাকে ছবি ও নকশা কেটে লেখার ফাঁকগুলি ভরে দিতে হত। তার বাবা একজন শিক্ষক ছিলেন, তাই আশা করেছিলেন ছেলেও বড় হয়ে প্রফেসর জাতীয় কিছু হবে। কারণ আর্থিক নিরাপত্তা ছবি থেকে আসেনা তিনি এটা বুঝেছিলেন। তাই ছবি আঁকা পছন্দ করতেন না। তারক গড়াই বাড়ির গুরুজনদের শাসন অনুশাসন ভাঙতেন না। গ্রাম গঞ্জের এখনো এই মূল্য বোধ দেখতে পাওয়া যায়, শহরের ছেলে মেয়েরা পিতা মাতার অনুশাসন একদমই মানে না, এটা ঘটনা।

ফলে ছবি আঁকা যেহেতু পিতার অপছন্দ তাই তাকে পিতা যেন না জানে সেইভাবে লিকিয়ে রাত জেগে হ্যারিকেনের আলোতে ছবি আঁকতে হত। তাঁর এক সম্পর্কিত দাদার উকালতিতে তিনি ছবি নিয়ে শান্তিনিকেতনে ভর্তির বাবার অনুমতি ও সুযোগ পান। শর্ত ছিল তার পিতার, যে, তিনি কলেজের পড়া শেষ করে আর কোন বাড়ির সাহায্য পাবেন না। তারক গড়াই তবু ছবি নিয়ে পড়াশুনার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তার ডিপ্লোমা শেষ হয়ে গেলে, শান্তি নিকেতনের পাঠ চুকিয়ে সোজা কলকাতায় বিছানাপত্র গাঁটরা বেঁধে চলে আসেন।

তারক গড়াইও বুঝেছিলেন ছবি এঁকে রোজগার খুব কঠিন। বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতক হওয়ার পর তাঁর পকেটে ৩০০ টাকা নিয়ে কলকাতায় আসেন। কোথায় উঠবেন, থাকবেন খাবেন তার কোন ঠিকানা নেই। ক্যানভাস আর্টিস্ট সার্কেল এ তার থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেলে ক্যানভাস আর্টিস্ট সার্কেলের সদস্যদের সহায়তায় একটি ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ পান এই কলকাতায়। চাকরি জীবন অল্প দিনের হলেও তিনি অনেক পরিণত শিল্পী হয়ে উঠেন অল্প সময়ের মধ্যেই ও তার স্যালারি সিনিয়র শিল্পীদের মতন হয়ে উঠেছিল।

তারক গড়াই মাটি দিয়ে, টেরাকোটা বা কাঠ খোদাই করে, ধাতু গালিয়ে নানা মাধ্যমেই চৌখস ও দক্ষ তার মধ্যে ব্রোঞ্জের কাজ করতে অধিক ভালবাসতেন। তারক গড়াই শান্তি নিকেতনে ৩য় বর্ষে একটি সাত ফুট মাটির মূর্তি বানানোর ব্যর্থতার সূত্র ধরে রামকিংকর বেইজের নকরে এসেছিলেন। রামকিংকর বেইজ তাকে আর্মেচার বাঁধা থেকে সব কিছু- মাটি লাগানো, একদিন দুদিন তিনদিন করে আস্তে আস্তে মূর্তিকে দাড় করানো মোল্ড করা ইত্যাদি শেখান।

তখন শান্তি নিকেতনে রামকিংকর বেইজ ও জানতেন না ব্রোঞ্জকাস্টিঙের পদ্ধতি। সেখানে ক্লে মডেল, উড কার্বিং, স্টোন কার্বিং ইত্যাদি শেখানো হত। শান্তিনিকেতনের কাছেই ছিল দরিয়াপুর, সেখানে অনেক ডোকরা শিল্পী কাজ করতেন পিতল গালিয়ে লোকশিল্পের মূর্তি বানানো ছিল তাদের কাজ ও জীবিকা। কিংকরদার সহায়ক ছিলেন হারুদা, হারুদা দরিয়াপুর থেকে ডোকরা কারিগর ধরে এনে মেটাল কাস্টিঙের প্রচলন করেন। পিতল গলে ৭০০ সেন্টিগ্রেডে, আর ব্রোঞ্জ লিকুইড ফর্মে আসে ১৩০০সেন্টিগ্রেডেতে। কাস্টিঙের আছে নানা পদ্ধতি।

প্রথমে একটি মডেল বানিয়ে তার মোল্ড বা ছাঁচ বানাতে হয়। রাবার, ফাইবার, প্লাস্টার, ক্লে ইত্যাদি দিয়ে। তখনি পরিকল্পনা হয় ছোট হলে ২ টো আর বড় হলে দুইয়ের অধিক টুকরো ছাঁচ। যেভাবে কাস্টিং হবে সেভাবে মেটাল ঢালার পরিকল্পনা করতে হয়। অনেক খুঁটিনাটি জিনিস জড়িয়ে থাকে। সব ঠিকঠাক একের পর এক করা দরকার।

এই কাস্টিং পদ্ধতিতে তারক গড়াই এক উদ্ভাবনী কৌশল আবিষ্কার করেন, সেটি অনেক সহজ করে দেয় কাস্টিং পদ্ধতি। এই পদ্ধতি নিয়ে তিনি নানা ওয়ার্কশপ করে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিল্পীদের মধ্যে। ধাতু গলিয়ে কাজ করা খুব শক্ত। ভারত সরকার এর কালচারাল ডিপার্টমেন্ট সেইজন্য তাকে দু’বার সিনিয়র ফেলোশিপ দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন।

তারক গড়াইয়ের জন্ম এক স্বচ্ছল পরিবারের সংরক্ষণশীল মূল্যবোধের আবর্তে বড় হন। তাদের অনেক ধরণের ব্যবসা ছিল সবগুলি এক জায়গায় আনলে একটি আজকের দিনে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বলতে পারবেন। সেখানে লৌহার জিনিস থেকে দৈনিন্দিন ব্যবহার্য অনেক কিছুই সেই ব্যবসায় ছিল। তারক গড়াই সহজ জীবনের সেই স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে কলকাতার টালিগঞ্জের কাছে হরিপদ দত্ত লেন এ বাসা ভাড়া করে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। তখন কলকাতায় শিল্পীদের ভাল অবস্থা ছিলনা, যে শিল্প কর্ম করে অনেক টাকা উপায় করা যেত।

সময়টা ধরুন ৭০ দশকের শেষ ও আশীর শুরু। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন, মাস্টার আর্টিস্টদের কপি পেইন্টিং।ইত্যাদি সহ বাংলার শিল্পীদের মৌলিক কাজ। একটা শুদ্ধতার যুগ। শিল্পে এত বেনোজল ছিলনা, রাজনৈতিক মানুষদের মধ্যে এত দুর্বৃত্তায়ন ছিলনা। সমাজে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা ছিল। চট জলদি কিছু করে বাঁচতে হবে, ছবি এঁকে বাঁচতে হবে তাই তারক গড়াই চাকরি ছেড়ে প্রথমে বড় বড় শিল্পপতিদের কাছে বিশাল বড় বড় মাস্টার পেইন্টারদের ছবি কপি করে তার হাতের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। প্রায় শ তিনেক কপি পেইন্টিং করেন।

নিজের সৃজনের জায়গা কিন্তু ভাস্কর্য, ইচ্ছার বিরুদ্ধে, ফরমায়েশি কাজ করা একজন শিল্পীই জানেন কি গভীর বেদনা দায়ক। কিন্তু অর্থ উপার্জন করতে হবে, পেট বাঁচাতে হবে, সংসার বাঁচাতে হবে, তাই কষ্ট হলেও বিকল্প রাস্তা নেই। তারক গড়াই এই রেনেসাঁ শিল্পীদের ছবি যেমন রুবেন্স এর পেইন্টিং ইত্যাদি সহ ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন করে জীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এসব কাজে আর ফিরেও যাননি।

তারক গড়াইয়ের ভাস্কর্য নানা বিষয়ের উপর হলেও মায়ের স্নেহের একটি ছবি বারবার তার কাজে ঘুরে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ তিনি মায়ের সাথে সন্তানের বাৎসল্যের দৃশ্য অনেক বেশি বানান। ব্রোঞ্জে রূপ দেন। এর পিছনে তারক গড়াইয়ের নির্মল মনের একটি পরিচয় উঠে আসে। কর্ম সূত্রে তারক গড়াই কিছু ধনী পরিবারের সাথে পরিচিত হন। মূলত কপি পেইন্টিং বা ছবির কাজ করতে গিয়ে। সেই ধনী বধূরা তাদের বাচ্চাকে আয়ার ছায়াতেই বড় করে তুলতে অভ্যস্ত। নিজের বাচ্চাকে নিজে যত্ন নেন না। মনে হয় বাচ্চার সাথে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক রাখছেন। মায়ের স্তন পান থেকে আদর– সবগুলি বাচ্চা পাচ্ছে না।

বধূরা নানা অফিসের কাজে ব্যস্ত। জীবনের এই বৈচিত্র্যটা তারক গড়াইয়ের মনে প্রভাব বিস্তার করে। একটা বাচ্চার কাছে তার মায়ের দাবি, একটা বাচ্চা শুধু তার মাকে ই চায়, মা ছাড়া সে অসহায় এই বিশ্বে, একজন মা ও তার জীবনে তার সন্তান বড় প্রাথমিক বিষয়, তাকে বড় করে তোলা, নিজেকে ব্যস্ত রাখার একমাত্র বিষয়। এ এক মানবিকতার চূড়ান্ত ছবি মা ও সন্তান।

গ্রাম ও প্রাকৃতিক নির্মল পরিবেশে জন্ম ও বেড়ে উঠা তারক গড়াইয়ের মনে এই ছবি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, এবং সেটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সারাজীবনের ছবি ও ভাস্কর্যের বেশিরভাগ বিষয় মা ও সন্তান। আদিবাসী মায়েদের বাৎসল্য স্নেহ। মা ঘোড়ার মত পিঠে বাচ্চাকে তুলে আনন্দ দিচ্ছেন। বাচ্চা মায়ের চুল ধরে টানছে। মায়ের কাছে পশু বা মানুষের ভেদ নেই তাই হরিণের বাচ্চাকেও মা স্তন দিচ্ছেন ইত্যাদি।

তারক গড়াই প্রকৃতিতে একরোখা। তিনি যা বলবেন বা ভাববেন তা নড়চড় হবে না। কারুর তোয়াক্কার ধার ধারেন না। ছবি আঁকতে ও ভাস্কর্য নির্মাণ করতে ও দিনের বেশির ভাগ সময়ে নিজেকে কর্ম ব্যস্ত রাখতে আনন্দ পান। তিনি কোটি টাকার কাজও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে শিল্প পতিরা মীনাক্ষী দির (তাঁর স্ত্রীর) কাছে এসে অভিযোগ করতে পারেন তার মাথাখারাপ হয়েছে। তিনি কোন কিছুই নিজের কাজের চেয়ে বড় করে দেখেন না।

পত্রপত্রিকা মাধ্যমকে পছন্দ করেন না। সাদা সিধে জীবন ও সামাজিক জীবন, সততার জীবন পছন্দ করেন। ফলে তার চরিত্রে এক ঋষি সুলভ চেহারা ফুটে উঠেছে। তার পরে এই বাংলার বুকে আর কেউ নেই ভাস্কর হিসাবে। যারা সম্প্রতি তার একক প্রদর্শনী – গত ভাস্কর্য নির্মাণের ৫০ বছর উপলক্ষে ফিরে দেখা– অগুনতি ভাস্কর্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের তিনটে গ্যালারি জুড়ে দেখেছেন তারাই-– সেই কয়েক হাজার মানুষ সাক্ষী রইলেন।