অ্যালবার্ট অশোক

একজন মানুষ সারাজীবন পড়াশুনা করে, তার অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তোলেন, তার ছবিতে। সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারে না, ছবি আঁকতে রীতিমতো ইঞ্জিনীয়ার বা বিজ্ঞানীদের মতো পড়াশুনা বা গবেষণা করতে হয়। আমাদের এই শিক্ষার অভাব আমাদের মূর্খ বানিয়ে রেখেছে। ফলে, আমাদের উন্নতি নেই। সাধারণ মানুষ, এটাই দেখেছেন, রবিঠাকুর কত সহজে কত ছবি এঁকেছেন! আসলে আমাদের ভেতরে সেই জ্ঞান জন্মায়নি যে, আমরা কিছু দেখে তার গভীরতা অনুধাবন করতে পারি।

১৯৩০ সাল নাগাদ– আগে পরে, তিনি অনেক ছবি এঁকেছিলেন। সেই ছবিগুলি সম্পর্কে আমাদের রবি-বোদ্ধারাও উদাসীন। শুধু তার গান আর কবিতা চর্চা করে তাকে জানা মুশকিল। কোম্পানী আমলে, বেঙ্গলস্কুল ঘরানার জন্মলগ্নে কালি কলম ও কিছু রংযের ব্যবহার দিয়ে ছোট ছোট হলেও উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তার মনন চিন্তন সেই ছবিকে ভারতীয় বা এশিয়ার সংস্কৃতিতে পথপ্রদর্শক হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

বেঙ্গল স্কুলের ভাবনা ছিল পাশ্চ্যাত্তের বিপরীতে নিজেদের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরা। আমরা, সাধারণ মানুষেরা, সে ছবি সম্পর্কে অন্ধকারে কেন আছি? শিল্পী মহলের কাছে কোনও ব্যাখ্যা আছে? রবিঠাকুর তখন আজ থেকে ৯০ বছর আগে দেখিয়ে গেছেন। ছবিগুলি অনেকেই দেখেননি। দেখুন।

রবিঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। এই সময়টুকু তার জীবনে, সাহিত্য সংস্কৃতি ও দর্শনে তিনি এক অননুকরণীয় পন্ডিত হয়ে উঠেছিলেন ছবি যখন আঁকা শুরু করেন। তিনি রীতিমত ভিস্যুয়াল আর্টের নানা দিক মাথায় নিয়েই শুরু করেছিলেন। তার অনেক উডকাট প্রিন্ট সেই কথাই বলে। সাধারণ শিল্পীরাও অনেক রঙ এড়িয়ে যান ব্যবহার করার অক্ষমতা থেকে।

রবিঠাকুর তার ৬৭তম বছরের কাছে এসে এত এনার্জী নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন, আমরা হতবাক হয়ে যাই। বিশেষ করে ভিক্টোরিয়া এন্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে যে ৫০ টি ছবি প্রদর্শিত হয়েছিল, ১৯৩০ সাল নাগাদ, তাতে তার আঁকার নিজস্বতা থেকে রঙের ব্যবহার সবই অনেক নতুনত্ব ছিল। বেগুনী, নীল, হলুদ, গোলাপী ইত্যাদি রং ব্যবহারে তার মানসিক স্তর ও তার কল্পনা শক্তি অনুধাবন করা যায়।

পোস্ট-ইম্প্রেশনিশটদের মতো নতুন রং ও উজ্জ্বল রং বা ঊনিশ শতকের তুলির স্ট্রোক দিয়ে ছবি আঁকা, ইত্যাদি তার ছবিতে খুঁজে পাওয়াযায়। তিনি মানুষ সম্পৃক্ত কৌতূহলি ছিলেন। গল্পে যেমন চরিত্র সৃজন করেছেন, ছবিতে সেই সব মানুষকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাকে নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে আধিক্যতা ও বাড়াবাড়ি অনেক হলেও তার ছবি ও রঙ নিয়ে কথা বলার লোক খুব কম।

প্রায় হাজার খানেক ছবি তিনি আঁকেন। অধিকাংশই বিমূর্ত ও ছন্দিল রীতির। ডুডুল বা রেখার বার বার ব্যবহারের ফুটে ওঠা ছবি। ধরা যেতে পারে ১৯২৮, তখন তার বয়েস ৬৭। তার ছবিতে, ল্যান্ডস্কেপ, পাখি, জন্তু জানোয়ার ও মানুষের মুখ দেখাযায়। কিছু সেলফ পোর্ট্রেট ও আছে। সেগুলি দেখলে মনে হয় অনেক যন্ত্রণা মনের ভিতর। আবার কিছু ছবিতে তাকে নবী নবী মনে হয়। অনেক মানুষের ছবি এঁকেছেন সেগুলিকে অনেক নাটকীয়তাও দিয়েছেন।

তিনি যে স্টাইলে ছবি এঁকেছেন, বাংলা তথা ভারতে আগে দেখা যায়নি। ইন্ডিয়া ও মডার্ন আর্ট লিখতে গিয়ে ১৯৫৫ সালে WG Archer, India Served and Observed, আর্চার একথা স্বীকার করেন। in fact unconsciously contained some essential Indian elements – strong, bold outline, glowing colour, aggressive shapes. He has been, in other words, ‘naturally Indian’ … It was this freedom from previous styles, both Indian and non-Indian, this bold originality, this willingness to create forms in ways which were naturally Indian yet robustly modern which made him the first modern Indian artist; and looking back over the last fifty years, I cannot think of any other Indian artist whose influence has been so profound.”

দক্ষিণ আমেরিকায় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে দেখা করার সময় তিনি পূরবী কাব্যগ্রন্থ লিখেন, তখন দেখা যায় তার পান্ডুলিপিতে পাখির মতো কিছু আকৃতি ডুডুল (doodles) করা। ১৯৩০ সালে প্যারিসে তার প্রথম প্রদর্শনী হয় ওকাম্পোর সাহায্যে। তার ছবি আঁকার ঢং, আদিম চিত্রকলার মতো strong, bold outline, glowing colour, aggressive shapes.

রবিঠাকুরের প্রথম প্রদর্শনী হয় ফ্রান্সে, ১৯৩০ সালের মে মাসে, আর রবিঠাকুর প্রথম ভারতীয় যার ছবি ইউরোপ, রাশিয়া ও আমেরিকাতে (France, U. K., Germany, Denmark, Switzerland, U. S. S. R. and U. S. A.) প্রথম প্রদর্শিত হয়। কলকাতায় তার অনেক পর। ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাউনহল ও পরে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে হয়েছিল। তিনি ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সাল, তার মৃত্যুর আগে অবধি ছবির সঙ্গে সম্পর্ক দেখতে পাই। তিনি মনে হয় প্রথম ভারতীয়, যার ছবি প্রথম ভারতের বাইরের নানা জায়গায় ইউরোপ, রাশিয়া ও আমেরিকায় প্রদর্শিত হয়েছিল।