পারিজাত

কোনও সামান্য ছায়াছবি দেখব, এমন দুরাশা রাখিনি, তবে সত্যি বলতে নন্দিতা দাশ পরিচালিত মান্টো যে এভাবে মনের অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে, এমন ভাবনাও ছিল কল্পনাতীত। ছোটবেলায় দেখা অনেক সিনেমার গল্পই মনে গেঁথে গেছে হয়তো আজকের মতো এত ছবি সে সময় দেখার সুযোগ ঘটেনি বলে। বড় হওয়ার পর যখন থেকে নিজের পছন্দ মত ‘ভালো’ কিছু দেখা শুরু করেছি। তবে এভাবে অন্তত শেষ এক বছরের মধ্যে কোনও বিশেষ একটি চলচ্চিত্রের নাম করা সম্ভব নয় যা দেশ কালের সীমা পেরিয়ে একদম মোক্ষম জায়গায় গেঁথেছে তার তীর।

বেশ কিছুদিন আগে এক কবিসভায় যোগ দিতে গিয়ে উঠে আসে এক তর্ক যার প্রধান বিষয় ছিল উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সমস্যায় দেশভাগের সময় থেকে জর্জরিত হয়েও আমাদের দেশে এই নিয়ে এখনও তেমন কোনও বিশেষ চর্চা করা হয় না কেন! অনেক ছবিতেই হয়তো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার করা হয় এই সময়কাল, তবে তা কি আর আজকের দর্শক প্রকৃত রূপে অনুধাবন করতে পারে? নাকি তা সত্যিই আদৌ সম্ভব? মান্টো ছবিটি সেই হিসাবে নিঃসন্দেহে এক মাইলফলক। ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা আর গল্পকে নিপুণ শৈলীতে জুড়ে এক অনবদ্য জীবনের দলিল এঁকেছেন নির্দেশক– যা দেখলে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না কিছুতেই। একটা ছোট্ট উদাহরণ ধরা যাক। এক হিন্দু আর এক মুসলিম অভিন্নহৃদয় বাঁধা পড়ে থাকা শিল্পমনষ্ক বন্ধুর উপর দাঙ্গা আর দেশভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রথমেই কিন্তু পড়ে না। একসঙ্গে তারা স্বাধীন ভারতের জয়গান গায়, উদযাপন করে নতুন ভবিষ্যতের প্রারম্ভ। তবে হিন্দু বন্ধুর দূর সম্পর্কের পরিবারের উপর করা মুসলিমদের অত্যাচার তাকে এমন ব্যথিত করে তোলে যে বেসামাল হয়ে সে বলেই বসে শেষমেশ, “কোনো মুসলিমকে ছাড়ব না বন্ধু, প্রয়োজনে তোমাকেও না।” মুসলিম বন্ধুটি পরদিনই বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। না, ভয় পেয়ে নয়, তার নিজের কথায়, “আমি চাইনি আমিও বেগতিকে পড়লে কোনোদিন আমার ওই বন্ধুর মতো ভেবে বসি। সেই ভয়ে নিজের জমি, নিজের দেশ, কবরে শুয়ে থাকা বাবা, মা আর ছেলেকে ফেলেই তাই চললাম আমিও শেষ পর্যন্ত সেই পরেরই মুলুক।” এই মানুষটিই মান্টো– বিখ্যাত ঊর্দু ছোটগল্পকার সাদাত হাসান মান্টো।

মানুষের জীবনভর জমতে থাকে গল্প। আর সেই সব গল্প যেন ইশারায় অক্লেশে ডেকে চলে তার লেখককে, উদ্বুদ্ধ করে তাকে কলম তুলে নিতে সবসময়। সত্যির প্রতিটি পাতার সঙ্গেই থাকে তার যোগসূত্র, তবু চলতে থাকে দুটি স্রোত সমান্তরালে– কেন কে জানে একে অপরের থেকে সামান্য কিছুটা ব্যবধানে।

তাই মান্টোর জীবনে অনায়াসে গেঁথে ফেলা যায় এক ক্লান্ত বেশ্যার গল্প যে ঘুমোতে চায়। এক আদুরে কিশোরীর গল্প যাকে তার বাবা মা প্রতিদিন সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়ে দেয় বাবুদের কাছে। এক যুবতী যার দাড়ি গোঁফ গজায় সারা মুখে। উদ্বাস্তু ক্যাম্পে খুঁজে বেড়ানো এক বাবা যার ধর্ষণ কবলিত মেয়ে ‘খোলো’ শুনলেই আলগা করে তার পায়জামা। স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হতে না পারা এক সর্দার যে কিছুদিন আগে দাঙ্গার সময় এক গ্রামে সবাইকে খুন করে এক মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর বোঝে মেয়েটি মৃতা– তার সমস্ত শরীর ঠাণ্ডা। এক উন্মাদ বৃদ্ধ যে পাগলাগারদের বন্দিদের দেশভাগের পর এক দেশ থেকে অন্য দেশে চালান করার পথে মৃত্যুবরণ করার পর খুঁজে পায় তার দেশ ‘টোবা টেক সিং’ দুই দেশের সীমান্ত বরাবর।

এরই মধ্যে মান্টোর প্রকৃত জীবনে ঘটে চলেছে একের পর এক দুর্ঘটনা– জাঁকিয়ে বসছে অভাব অনটন, অশ্লীল লেখার দায়ে মামলা মোকদ্দমা, বন্ধু পরিবার পরিজন বিয়োগ আরও কত কি! তবু বেয়াল্লিশ বছরের সীমিত পরিসরে তাঁর কলম কিন্তু কখনও এসবের তোয়াক্কা করে থেমে থাকেনি। লেখকের জীবনই তো তাই। যেখানে সে তাঁর গল্প লিখে চলতে চলতে বারবার জিগ্যেস করে ঈশ্বরকে– কে বড় রচয়িতা? আমি না, এও মান্টোর কবরের ফলকে বাঁধানো তাঁরই রচিত শেষ জবানবন্দি।

মান্টোর ভূমিকায় নওয়াজুদ্দীন সিদ্দিকী আর তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় রসিকা দুগল ছাড়া এই চরিত্রদুটি যেন যথার্থ ভাবে ফুটিয়ে তোলা অন্য কারও পক্ষেই অসম্ভব ছিল। সিডনির ঐতিহ্যবাহী স্টেট থিয়েটারের ভিক্টোরিয়ান সাজসজ্জা ছবিটির ১৯৪০-এর সময়কালের সঙ্গেও যেন মিশে গিয়ে হয়ে উঠেছিল ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। বিদেশী ফিল্ম ফেস্টিভালে নিজের দেশের চলচ্চিত্র কানায় কানায় ভর্তি প্রেক্ষাগৃহে দেখার অভিজ্ঞতাও সত্যিই তাই বিরল, স্বপ্নাতীত! আর শেষে নির্দেশক নিজে যেভাবে হাসিমুখে দর্শকের সব প্রশ্ন সামলালেন তাতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাও বেড়ে গেল আজ বহুগুণ।

এই নতুন রূপে ধরা দেওয়া মান্টোকে বুকে নিয়েই তাই আবার শুরু করলাম আমার এ সাধারণ লিখিয়ে জীবনের বাকি রয়ে যাওয়া যাত্রাপথ।

আর হ্যাঁ, এই ছায়াছবিকে কোনও নম্বরের বেড়াজালে বাঁধা সত্যিই আমার সাধ্যাতীত– তাই সেই অকর্ম করার হাত থেকে বরং বিরতই রাখলাম নিজেকে।