(পূর্ব কথা) ‘ভয়াবহ ধূপগুড়ি হামলার রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে শেষ হল ২০০২ সাল৷ তবে ছড়িয়ে রইল আতঙ্কের রেশ৷ ভুটানের সীমান্ত পেরিয়ে আসছিল সূত্র মারফত আরো খবর৷ এতে উদ্বিগ্ন হতে থাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ সেই উদ্বেগ ছড়ায় দিল্লিতে৷ সমস্যা সমাধানের উপায় কূটনৈতিক আলোচনা৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে বন্ধু হিসেবে দেখেন ভুটান রাজ জিগমে সিংগে ওয়াংচুক৷ ড্রাগনরাজা নিজেও ভারতেরও বিশেষ বন্ধু৷ সেই সম্পর্কের রেশ ধরেই এগিয়ে চলল পরবর্তী পরিকল্পনা…’

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: ফেব্রুয়ারির শেষ৷ থিম্পুতে এখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা৷ তবে তুষারপাতের সময়টা পার হয়েছে৷ কয়েকদিন আগে বিখ্যাত চেলা-লা গিরিপথ পার হতে গিয়ে গাড়িটা বরফে আটকে গিয়েছিল৷ যাওয়ার কথা ছিল হা-উপত্যকায়৷ সেখানে যাওয়া যাবে না বুঝেই ঝুঁকি নিয়ে গাড়িটা ঘুরিয়েছিল প্রধান৷ অবশ্য তার আগে আমাকে সে নামিয়ে দেয়৷ বিশাল পাইন গাছের শিকড়ের উপর বসে দেখছিলাম তার গাড়ি ঘোরানোর কায়দা৷ বরফ জমে আছে অর্ধেক রাস্তায়৷ মিনিট দশেক কসরতের পর খাদের দিকে একফালি অংশ দিয়ে কোনরকমে গাড়িটা উল্টো পথে নিয়ে এল প্রধান৷ সেখানটা হেঁটে পার হওয়ার সময় দেখলাম বহু নিচে একটা শুকনো ঝোরা৷ বুঝতে পারি প্রধান কেন আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল৷ ফেরার সময় দেখি ভুটানি আর্মির তিনটে জিপ খুব আস্তে আস্তে চলছে৷ একটার সঙ্গে আর একটা চেন দিয়ে বাঁধা৷ বরফ পড়ে রাস্তা পিছল হয়ে রয়েছে৷ তাই দুর্ঘটনা এড়াতেই এই ব্যবস্থা৷ বিখ্যাত হা ভ্যালি দেখা হয়নি৷ তাই থিম্পুতে থাকার সময়টা বেড়ে গেল৷

বিকেল থাকতেই হু হু করে হিমেল হাওয়া বইছিল সেদিন৷ লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার সময়ে দেখি রাস্তায় তেমন লোকচলাচল নেই৷ প্রধান জানাল, ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে৷ জোরে গাড়িটা চালিয়ে হোটেলের কাছে পৌঁছে স্বস্তি পেল যেন৷ তারপর চলে গেল নিজেদের আড্ডায়৷ ততক্ষণে হাওয়ার গতি বেড়েছে৷ রুমে ঢুকে দেখি কাঁচের জানালায় লাগছে ঝাপটা৷ এমন কিছু রাত নয়, অথচ থিম্পুর রাজপথ প্রায় জনমানবহীন৷ ফায়ারপ্লেসের আগুনটা একটু উস্কে দিলাম৷

টক টক…টক টক
ভেজানো দরজা খুলে হাসিমুখে এসে দাঁড়ায় রুম সার্ভিস৷ হাতে চায়ের কেটলি৷ কিছু বলার আগেই চা ঢেলে দিয়ে নমস্কার জানিয়ে চলে গেল৷ সকাল-বিকেল এরা আমাকে চা দিয়ে যায় বেশ কয়েকবার৷ তবে কথা তেমন বলে না৷ ডাইনিংয়ের টেবিলে বসে নোটবুকের লেখায় কাটাকুটি করার মাঝে একদিন তো উঁকি মেরে এসে দেখেই গেল৷ মনে হয় এদের কৌতূহলটা খুবই বেড়েছে৷ চা খেতে খেতে নোটবুক আর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বিবরণে থাকা ভুটানি সেনাবাহিনী সংক্রান্ত বিষয়ে চোখ রাখি৷ রয়্যাল ভুটান আর্মির ইতিহাসটা আমাকে বেশ টানছে৷ তাতেই ঢুকে পড়লাম৷ নিস্তব্ধ থিম্পু নগরী জুড়ে তখন দামাল হাওয়ার দাপাদাপি৷

রাজা উগয়েন ওয়াংচুক

ভুটানি সেনার অতীতটা মোঙ্গল, তিব্বতি, সিকিমি, কোচ ও ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে লড়াইয়ে কেটেছে৷ সরাসরি সংঘর্ষে জয় পরাজয় দুরকমের স্বাদই পেয়েছে তারা৷ ১৬৩৪ সাল থেকে শুরুটা ধরলে, গত সাড়ে তিনশ বছরের মধ্যে ভুটানিরা সবথেকে বেশি মার খেয়েছিল ডুয়ার্স যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে৷ শেষ পর্যন্ত হার মেনে সন্ধি (সিনচুলা চুক্তি, ১৮৬৫) করতে হয় ড্রাগন দেশকে ৷ উনিশ শতকের সেই বিখ্যাত চুক্তির পর ভুটানকে আরো একবার ঝুঁকতে হয়েছিল৷ সেটা ১৯১০ সালের ঘটনা৷ ভুটানের রাজা উগুয়েন ওয়াংচুক ( বর্তমান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা) ও ব্রিটিশদের মধ্যে হয় পুনাখা চুক্তি৷ এর ফলে পূর্ববর্তী সিনচুলা চুক্তিকে নতুন করে ঝালিয়ে নেয় ব্রিটিশরা৷ ভুটানের বৈদেশিক সম্পর্কেরও নিয়ন্ত্রণ নেয়৷ বদলে ড্রাগন রাজা পেলেন স্যার উপাধি৷ শক্তিশালী চেহারার রাজামশাই বুঝেছিলেন শুধু দৈহিক ক্ষমতাই সব নয়, বরং দেশকে শান্তিতে রাখতে গেলে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়েই চলতে হবে৷ উগুয়েন ওয়াংচুকের আমলে কল্যাণমূলক কাজ শুরু হয়৷ সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীর উন্নতিতে নজর দেন তিনি৷পরবর্তী শাসকদের আমলে সবথেকে উল্লেখযোগ্য সময়টি হল ১৯৬২ সালের ভারত-চিন সংঘর্ষ৷ ভুটানের তৎকালীন রাজা জিগমে দোরজি ওয়াংচুক দেখলেন তাঁর দেশের সীমানায় বিশাল চিনা গণফৌজের দাপাদাপি৷ বুঝলে বিপদটা আসছে উত্তরের তিব্বতের মাটি থেকেই৷তিনি ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েন৷ ১৯৪৯ সালের বিখ্যাত বন্ধুত্বের চুক্তি বলে ভারতের তরফে ভুটানি সেনার উন্নয়নে নেমে পড়ল ভারত৷

দেশটার উত্তর পশ্চিমে চিন(তিব্বত) এবং দক্ষিণ পশ্চিমে সিকিমের প্রান্ত ছুঁয়ে আছে হা উপত্যকা৷ এখানেই ভুটানের অন্যতম সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র৷ ত্রিদেশীয় আন্তর্জাতিক সীমান্ত এক বিন্দুতে মিলে গিয়েছে যে স্থানে, সেখান থেকে সোজা উত্তরে তাকালে পড়বে চুম্বি উপত্যকা৷ এরই লাগোয়া ভুটানি জেলা ‘হা’৷ স্থানীয় নদীর নামেই উপত্যকার পরিচিতি৷ দক্ষিণ পশ্চিমে দুটি বিখ্যাত গিরিপথ নাথু লা ও জেলাপ লা ভারত-চিনকে সংযুক্ত করেছে৷ সেই কারণে অন্যতম সামরিক কৌশলগত স্থান হিসেবে বিবেচিত হয় ভুটানের হা ও চিনের চুম্বি উপত্যকা৷ সেই কারণে হা নদীর তীরে রয়্যাল ভুটান আর্মির সঙ্গে যৌথভাবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালায় ভারতীয় সেনা৷

দুনিয়ার ক্ষুদ্রতম সেনাবাহিনীর তালিকায় থাকা দেশগুলির একটি হল ভুটান৷ এই দেশের সেনা শক্তির ইতিহাসে বরাবরের জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে অপারেশন অল ক্লিয়ার (অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট) ৷ নামমাত্র শক্তি নিয়েই রাজকীয় ভুটানি সেনা (আরবিএ) ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির জঙ্গি ঘাঁটিতে৷ সেই ঘটনার বিবরণ দিতে গেলে আমাকে ফিরে তাকাতে হবে আবারও উত্তর বাংলার দিকে৷ ২০০২ সালের সেই ভয়াবহ ধূপগুড়ি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশন বুঝিয়ে দিয়েছিল তাদের শক্তি৷ ভুটানের জঙ্গল পাহাড়ি ডেরায় তাদের পরবর্তী হামলার প্রস্তুতি চলছে৷ একাধিক সোর্স থেকে সেই সব তথ্য যাচাই করে চমকে যাচ্ছিলেন গোয়েন্দা অফিসাররা৷ সন্ত্রাস রুখতে কেন্দ্রের উপর ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছিল অসম ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ অতএব করণীয় কী ?

নয়াদিল্লি, ২০০৩
টানা আলোচনার শেষ৷ অবশেষে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা নরম হলেন ভুটানি প্রতিনিধিরা৷ যেন বিরাট একটা বোঝা নেমে গেল সেনাপ্রধান জেনারেল এন সি ভিজের মাথা থেকে৷ বৈঠকে স্থির হয়েছে জঙ্গি শিবির অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলিকে কিছু সময় দেবে ভুটান৷ এরপর পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ এখন থিম্পুর তরফে সর্বশেষ কি প্রচেষ্টা হয় সে দিকে তাকানো ছাড়া উপায় নেই৷ ভুটানি প্রতিনিধিরা ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, কেএলও, এনডিএফবি ও আলফার মতো তিনটি প্রথম সারির ভারতীয় জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেই যাচ্ছেন রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুক৷ জঙ্গিদের অবস্থান নির্ণয় করার কাজ চলছে৷ তাদের সঙ্গে আলোচনাও চালানো হচ্ছে৷ পরিস্থিতি অনুকূলে নাও থাকতে পারে৷ তার জন্য তৈরি হচ্ছে সেনা৷ শুধুমাত্র রাজার নির্দেশেই তারা অভিযান চালাবে৷ সেদিনের মতো আলোচনা শেষ হল৷ কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেল, জঙ্গি দমনে ভুটানের অবস্থান কবে পরিষ্কার হবে ?

এদিকে গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসছিল, কেএলও জঙ্গিরা ইতিমধ্যেই হাত মিলিয়েছে ভুটান টাইগার ফোর্সের (বিটিএফ) সঙ্গে৷ উগ্র বামপন্থী এই সংগঠন অত্যন্ত গোপনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাদের সংগঠন বাড়িয়ে নিতে শুরু করছে৷ তাদের লক্ষ্য, সশস্ত্র পথে রাজার পতন ঘটানো৷ ভুটানের বিতর্কিত লোতশাম্পা শরণার্থী ইস্যু ঘিরে গরম পরিস্থিতির মধ্যে নকশালপন্থী ও নেপালের মাওবাদী মতাদর্শে সশস্ত্র পথে বিদ্রোহের পথ নিয়েছিলেন কয়েকজন৷ তাদেরই নেতৃত্বে তৈরি হয় ভুটান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট-মাওয়েস্ট) ৷ সংগঠনটিকে স্বীকৃতি দেয় নেপালের মাওবাদীরা৷ রাজতন্ত্র বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন চালাতে গিয়ে বিসিপি(এমএলএম) এর সশস্ত্র শাখা বিটিএফ অচিরেই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে তোলে৷ এই সুযোগে তাদের সঙ্গে কেএলও প্রধান জীবন সিংহের যোগাযোগ হয়৷ পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হচ্ছিল৷ জঙ্গিদের রুখতে নিজের সেনা শক্তি যাচাই করার নির্দেশ দিলেন রাজা জিগমে সিংগে৷ তৈরি হয় বিশেষ মিলিশিয়া বাহিনী৷

থিম্পু,
১৩ ডিসেম্বর, ২০০৩
জাতীয় আইনসভায় পিনড্রপ সাইলেন্স৷কিছু আগেই প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে জানিয়েছেন, ভারতীয় জঙ্গিদের সঙ্গে নরম মনোভাব নিয়ে আলোচনা ভেস্তে গিয়েছে৷ সবাই ভাবছিলেন এরপর রাজার তরফে কী ঘোষণা হতে চলেছে৷ থমথমে মুখ রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের৷ অবশেষে তিনি নীরবতা ভাঙলেন৷ ঐতিহাসিক এক নির্দেশ জারি হল ড্রাগন রাজার তরফে-সর্বশক্তি নিয়ে ভেঙে দেওয়া হোক ভারত বিরোধী জঙ্গি শিবিরগুলো৷ চাপা পরিবেশটা একটু হালকা হল যেন৷ কতদিন পর আবারও ভুটানি সেনা নামছে সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে৷ রাজ নির্দেশ দ্রুত জানিয়ে দেওয়া হল ভারতের বিদেশমন্ত্রকে৷ দিনটা আধুনিক ভুটানের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ৷বন্ধু ভারতের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিল ভুটান৷

নির্দেশ আসতেই সাজো সাজো রব ভুটানের সেনাবাহিনীতে৷ ততক্ষণে নয়াদিল্লি ও থিম্পুর মধ্যে ঘনঘন বার্তা আদান প্রদান শুরু হয়েছে৷ শুরু হয়েছে অপরাশেন অল ক্লিয়ার (ফ্ল্যাশ আউট) চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্ব৷ একদিকে ভারত সরকার ও ভুটান৷ আর তাদের মুখোমুখি আলফা,এনডিএফবি, কেএলও, এটিটিএফ, এনএসসিএন এবং বোড়ো লিবারেশন টাইগার ফোর্সের মতো ৬টি ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন৷ জঙ্গি দমন অভিযান নিয়ে ভুটানের রাজা জিগমে সিংগে ও সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ আলোচনা করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী৷ দু তরফের সেনা কর্তাদের বৈঠকে অভিযানের প্রতিটি পর্ব খতিয়ে দেখা শুরু হয়ে গেল৷এরই মাঝে ভুটানির সেনা বিশেষ অবস্থান নিয়ে ফেলে সীমান্তবর্তী এলাকায়৷ জঙ্গি দমন অভিযান ঘিরে তপ্ত হতে শুরু করেছে বছর শেষের শীতল মাস৷

টক টক…টক টক..
তাকালাম দরজার দিকে৷ হোটেল থেকে খাবার দিয়ে গেল৷ পড়তে পড়তে খেয়াল ছিলনা কখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছে৷ জানালাটা একটু খুলতেই দেখি বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে থিম্পু৷ ঠাণ্ডা হাওয়ায় আঙুলগুলো অসাড় হয়ে যাচ্ছে৷ পাহাড়ে বৃষ্টি সুখকর নয়৷ আবার একটা ব্যাপারে স্বস্তি, রাতভর বৃষ্টি হলে ভোরের দিকে আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা বেশি৷ তাতে দিগন্ত ছোঁয়া তুষারে মোড়া শিখরের দল স্পষ্ট দেখা যাবে৷
চলবে