শাশ্বত কর

দাড়িতে পাক ধরেছে! টাক পড়েনি ভাগ্যিস! ওইটে হলেই একেবারে আগমার্কা পাকা ট্যাংরার মতো দেখাত! চ্যাংড়া বয়সে চিবুকে কেতা করার কথা সকলেরই এট্টু আধটু মনে টুকি দেয়। খুকি দেখলেই তো তখন মনে লাড্ডু- টুকুর টুকুর উঁকি ঝুঁকি! সরু তিরতিরে গোঁফের রেখায় রাজকুমারের পার্সোনালিটি। মানাক না মানাক কী এসে যায়! সুড়সুড়িতে গুনগুনালেই বঙ্গচ্যাংড়ার সংবিধান মেনে চিবুকে দাড়ি আর আঙুলে বিড়ি! কাকচর্মে ময়ূরপুচ্ছ উচ্চে উঠে টুঙটুঙিয়ে নাচছে! হাইট অ্যান্ড ডিস্ট্যান্সের আঁক কষা মন বলছে, ঠিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি উন্নতি কোণে মরমিয়া ব্যালকনি আকাশ! ফিল্ড নোট আর অবজার্ভেশান বলছে, সকাল নটা সাঁইত্রিশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ডে সেখানে সুয্যি উঠবে।

..তিন…দুই…এক…ওই লাল ওড়নায় অঙ্গ মুড়ে সুয্যি উঠছে! হাওয়ায় উড়ছে গুঁড়ো চুল! উড়ো চিঠি উড়ে যাচ্ছে বৈকুন্ঠ পানে,আর ত্রিভঙ্গ মোহিত কানাই সাইকেল ঠেসে ঠায় দন্ডায়মান! রাই যদি একবার এইধারে চায়, যদি হাসে সেই আশে…! মিষ্টি অপেক্ষার লজেন্সি মোড়কে ফাটাফাটি উত্তেজনা!

উদিত সূর্যের সেই রক্তরাগ, পূর্বরাগ ঘুরে ঘনীভূত পিরিতির পিঁড়ি চেপে আপাতত বাঘা রাগ! সেদিনের সেই উদিত সূর্য আজ মধ্যগগনে। গনগনে তাত! তাতে প্রাণ ঝলসে ঝুড়িভাজা! সেই রিনিঝিনি কন্ঠ এখন ঝনঝনিয়ে ওঠে! ‘দিল হুমহুম করে, ঘাবড়ায়!’ কথা আউলে যায়, পেটে বায়ুর প্রাবল্য বাড়ে। অবিশ্যি ঠেকে ঠেকে খানিক শিখেছি, ঠেকে আড্ডায় শুনে দেখেচি, এ দশা সব সাংসারিক নরেরই! যত দিন যায় শুষ্ক নর ক্রমশঃ আরও খড়খড়ে হয়ে ওঠে, যেন জাগ দেওয়া পাটের ডাল! আঁশ গুলো ছাড়িয়ে নিলেই কাঠি! আঁশও ভালো, কাঠিও ভালো- বেশ কাজে কম্মে দেয়। কোনও বিচক্ষণ মিসেস মিস করেন না এ সব! পুরুষ মানেই তো কুরুশের কাঁটার মতন এ ঘর ও ঘরে ফোঁড় তুলবে! স্বভাবী শাখামৃগ! লাফাতে দিতে নেই বেশি! ধমকে ধামকে তো এট্টু রাখতেই হয়। নইলে চলে কী করে!

যাক গে! কী বলতে কী বলছি! সতেরো বছর মাস্টারি করার সুফল হয়েছে এই। এক কথার ন্যাজ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন অন্য কথায় চলে যাই। সেখানে খানিক পায়চারি করার পর খেয়াল হয়, আরে অনেক দূর তো পেরিয়ে এসেচি! তখন আবার ফেরো! কিন্তু ফিরব বললেই ফেরা যায় নাকি! কত্ত ঝক্কি!

এই যে দেখুন না, দাড়িতে পাক ধরেছে বলে শুরু করলাম, আর হাঁটছি কোন গপ্পে! উনির তো আর দাড়ি নেই যে দাড়ির গপ্পে তাকে আসতেই হবে! তবুও চলে এলেন! আসলে মনের ভিতরে এমন একটা গব্বরী বাতাবরণ তৈরি করে দিয়েছেন না, যে ঠিক সেই কুমিরের রচনার মতো কুমিরের খোঁচা খোঁচা গা- ইত্যাদি ইত্যাদিতে রিটার্ন ব্যাক বলুন, হল্ট বলুন করবেই। শাশ্বত হল্ট! কাজেই আমার ফল্ট তেমন কিছু নেই! থাকার কথাও তো নয়! আমি তো বাবা ব্যাকরণ মেনেই চিরকালীন উত্তম পুরুষ! একে কুমার, তায় উত্তম! মহানায়ক! গুরু সোনায় সোহাগা!

ওই দেখ ফের ট্র্যাক থেকে বাইরে হন্টন! হাতে লন্ঠ্ন ঠনঠনাবেই যদি না এইবেলাও শুধরাই। কিন্তু শুধরানো কি আর যাবে! সে সব কেবল কঞ্চি দশাতেই সম্ভব, বাঁশ হয়ে গেলে আর বাঁকবে না! ঠাস ঠাস করবে। আর বাঁশ বলে তো বাঁশ, একেবারে পাকা হলদে বাঁশ!

বাঁশের কথায় ওই দেখ ঠিক ভাবনা ট্র্যাকে ফিরেচে! ফিরতে তো হবেই! বাঁশ মানেই বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের মোহন সুর! না ফিরে যাবে কোথায়? তাছাড়া ছানাপোষা গৃহীর সব কিছুই আদতে সাইক্লিক প্রসেস! ঘুরে ফিরে ঠিক আবার স্টার্টিং পয়েন্টে ব্যাক করবেই! পাকা বাঁশের কথায় যেমন কি না, ঠিক মনে পড়ে গেল যে, গোড়াতে কথাখানা শুরু করেছিলাম দাড়িতে পাক ধরা নিয়ে!

আজ্ঞে হ্যাঁ! দাড়িতে পাক ধরেছে! দাড়ি অতি বিষম বস্তু! পাকও অতি বিষম বিষ! পাকা ছোঁড়া বললে ছোঁড়াবেলায় যতটা না গায়ে লাগে, পাকা দাড়ি দেখলে মরমে লাগে তার থেকে ঢের বেশি! নিজের দাড়ি আয়না থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে গা জ্বালিয়ে যেন বলে, ‘হুঁ হুঁ বাওয়া! এসে পড়েছ মাঝ গগনে! যা ঝলমলানোর এই বেলা ঝলকে নাও! তারপর তো ঢলার পালা!’

মন ভারি হয়ে যায় নিজের দাড়ির কথা শুনে! আহারে দাড়ি! সাধের দাড়ি! ছেলেবেলায় শুনেছিলাম দাড়ি না কি চার প্রকার! শা দাড়ি, সাবাস দাড়ি, শা বুলবুল আর রসুনচোকা!

সেই শুনে তো ভিতরে শিহরণ! কবে দাড়ি গজায় চিবুকে! গজালো যখন তখন ঘরে ভ্রমর এলো! গুনগুন গুনগুন! দাড়ি তো আর স্বার্থপর পড়শি নয়! মাসিমা মালপো খামু বলে একা আসে না! চিবুকে নিজে আসার সাথে সাথে দেহকান্ডে আরও অনেককেই সাথে আনে। দুষ্টু ছেলেরা সে সব নিয়ে আড়াল খুঁজে রসের গপ্প করে। হস্টেল মেসে যারা থাকে, তাদের তো আর কথাই নেই! সিনিয়র দাড়িবান পাটি পেতে বসে যান দুষ্টু কথার ক্লাস নিতে! নতুন দাড়ি যত ফড়ফড়িয়ে বাড়ে, মনের কোণে প্রেমের পতাকা ততই পতপতিয়ে ওড়ে! প্রথম নিজে হাতে দাড়ি কাটা তো প্রথম চুমুর মতনই স্মরণীয়! আবেগের আতিশয্য বাড়লেই দুয়ের ক্ষেত্রেই কিঞ্চিত আহ্লাদি রক্তপাতের চান্স থেকে যায়!

সেই দাড়িতে পাক! পাক মানেই ব্যস! সটান কাকুর দলে! রাস্তায় ঘাটে কেশকালা শোভিত পাব্লিকও এবার কাকু কাকু আঙ্কেল আঙ্কেল করবে! আক্কেল দেখ! আরে নিজের দিকে তো একবার তাকা! চামড়া কুঁচকে নাকে কোলে গুটলি পেকেছে! সেও কাউ বলবে! ভাবা যায়! বেশ, নিজের পানে আপনভোলা যদিও বা তুই নাই তাকালি, ছেলেবেলার শিক্ষাটুকুও তো মনে করা যায়! ‘কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া কখনও বলিও না!’- মনে পড়েনা রে আহাম্মক?

পাক ধরলে খানিক সান্ত্বনা সলিউশান- ডাই! নামেই দেখ কেমন মৃত্যুর ছোঁয়াছানি! আর ওতে করে কী হয়! নিজের মুখ, সাধের দাড়ি- আয়না দেখলেই কেমন অন্যের অন্যের মনে হয়! দু চার ড্রপ ডাই আবার গোঁফের পাশ থেকে গালের চামড়ায় জেদ করে লেগে থেকে দিব্য ভ্যাঙচায়! ও সব ব্যঙ্গ রঙ্গ থেকে ত্যাগ ভালো! ত্যাগই একমাত্র পথ! তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা!

অর্থাৎ কি না পাক ধরলে দুটো পথ খোলা! আইদার ওই ডাই ডাইনের খপ্পরে পড়ে দু পয়সার পরস্মৈপদী বাবুয়ানি চমকাও, নতুবা ত্যাগের পথে মোক্ষ লাভ করো! দাঁতে হাসি মুখে গানঃ আমার যেমন দাড়ি কামিয়ে নেব, ডাই লাগাবো না! নিয়মিত দাড়ি কামাও, সফেদি হঠাও, প্যানপ্যানানি ভাগাও, ল্যাঠা চোকাও! এই দুই পথ আসলে গৃহীর!

গৃহীর উপরে যিনি আসন পেতেছেন, তাঁর কিছুতেই কিছু আসে যায় না! সময়ের নিয়ম মেনে চিবুক থেকে সফেদি কি চমকাই গোটা গালে ছেয়ে যায়! শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রু নিয়ে শান্ত সমাহিত রূপে উদ্ভাসিত হন তিনি। সাগরের হাওয়ায় প্রজাপতি ব্রহ্মার মতন তার সাদা দাড়ি হাওয়ার সাথে কথা কয়। বিকেলের পড়ন্ত রোদ দাড়িতে সূর্য আঁকে! চাঁদের চূর্ণ আলো মিহি প্রেমের মত ছুঁয়ে থাকে দাঁড়ি। যেমন আলোকিত মন, তেমন আলোকিত রূপ! ছোটো ছেলেপুলেরাও সে দাড়ি কত্ত ভালোবাসে! তবে এ সব কি না বড় মানুষদের দাড়ির কথা! দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার কত কিছুর ওপারে! তোমাকে কি ছোঁয়া যায়! কাজেই দাদা, দাড়ি নিয়ে সারা জীবন যতই দরাদরি করুন, সে বেরাদরিতে যাওয়া কিন্তু সহজ কম্ম নয়। সান্টাক্লজ অথবা রবীন্দ্রনাথ আর ক’জন হতে পারেন!