পল্লবী সেনগুপ্ত


সকালবেলা রোজকার মতোই তৈরি হচ্ছি কাজে বেরোবার জন্য। মনটার মধ্যে একটা অসম্ভব রকম তোলপাড় চলছে। চলবেই তো। আজই তো সেই দিন। ২৯ শে ফেব্রুয়ারি। আজই তো কিছু একটা খারাপ ঘটনা ঘটার কথা। আমার মাকে বহুবার বহু জ্যোতিষী বলেছেন তার ৫২ তম জন্মদিনটা নাকি তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি মা বারবার নিজের ৫২ তম জন্মদিনের কথা ভেবেই কেমন যেন শিউরে ওঠেন।

দেখতে দেখতে সত্যি আজ সেই দিনটা এসে পড়েছে আমাদের জীবনে। দুশ্চিন্তায় গত দুই রাত ঘুমাতে পারেননি মা। আর আমিও। আসলে আমি সব সময় সব কিছুতেই অনেকটা বেশি ভয় পেয়ে যাই আর যথারীতি এইবারও তার ব্যত্যয় হয়নি।
গাড়ি স্টার্ট দিতে যাচ্ছি, এমন সময় ডাকটা উড়ে এল
-“বাবু, একটু দাঁড়া। আমিও যাব। আমায় একটু মন্দিরে ছেড়ে দিবি”?
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। মা এগিয়ে এলেন। গাড়ির সামনের দরজা খুলে বসলেন আমার পাশে।
দেখলাম মা’র মুখটা থমথমে। এসি গাড়িতে ও মা ঘামছেন দরদর।
– “কি হয়েছে মা”? মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম আমি”
-“জানিস কাল রাতে হঠাৎ আধ ঘণ্টার জন্য চোখটা লেগে গিয়েছিল আর তখনি খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখলাম তোর দাদা আর বৌদিকে নিয়ে”….

-“কি স্বপ্ন মা”? কাঁপা গলায় বললাম। আমি টের পাচ্ছি আবার আমার বুকের কাছে পাক দিয়ে উঠছে সেই আতঙ্কটা।
-“দেখলাম যে বুবু অফিস যাচ্ছে আর ঠিক তখনি বড় একটা ট্রাকের সঙ্গে ওর গাড়ি …” না আর বলতে পারলেন না মা। আর আমিও অনুভব করলাম একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে।
আসলে আমি যে জানি এই বছরটা দাদার জন্য খুব খারাপ। ওর নাকি বড় দুর্যোগ আছে এই বছর।
-“ও। এই ব্যাপার। তুমি দাদাকে ফোন করে নাও না মা। দাদা তো অনেক সকালে বেরিয়েছে। এতক্ষণে পৌঁছে গেছে নিশ্চয় অফিস”। যথাসম্ভব নিজের উদ্বেগ চেপে রেখে বললাম আমি।

-“ফোন অনেকবার করেছি রে। কিন্তু ও ধরছে না”। দুশ্চিন্তায় কালো দেখাচ্ছে মায়ের মুখটা।
-“আরে মা, চিন্তা করো না। হয়তো ব্যস্ত আছে”। মাকে শান্ত করতে চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু নিজের মধ্যে যে আস্তে আস্তে মাথা চাড়া দিচ্ছে সেই ভয়টা তা টের পেলাম ভালোই।
-“আচ্ছা আমি করে দেখছি আর একবার ফোন”। একহাতে স্টিয়ারিং চেপে অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে দাদার নম্বর ডায়াল করলাম।
ক্রিং ক্রিং করে ফোন বাজছে। বাজতে বাজতে কেটেও গেল একসময়।
দাদা তো সচরাচর এমন করে না। কখনও ফোন ধরতে না পারলেও রিং ব্যাক করে অল্প ক্ষণের মধ্যেই। তাহলে আজ কি হল?

আমার ভিতরের তোলপাড়টা আরও জোরদার হল। তাহলে কি সত্যি দাদা…!
বুকের রক্ত চলকে উঠল আমার। ব্যস্ত হাতে আর একবার ডায়াল করলাম দাদার নম্বর।
এবারও এক ব্যাপার। ফোন ধরল না দাদা। মা দেখছি আতঙ্কে কুঁকড়ে যাচ্ছেন একটু একটু করে। আর সঙ্গে আমিও।
পাগলের মতো বার বার ডায়াল করতে লাগলাম দাদার নম্বর।
না আর মাথা কাজ করছে না আমার। আর মাথা কাজ করছিল না বলেই বোধহয় আমি বুঝতেও পারলাম না সামনে থেকে ধেয়ে আসা যমদূতের মত লরিটাকে পাশ কাটাতে হবে আমাকে।

না আমি বুঝতে পারলাম না। শুধু শুনতে পেলাম কান ফাটানো তীব্র একটা শব্দ। অনুভব করলাম তীব্র একটা ঝাঁকুনি আর ঠিক তখনি চোখের সামনে নেমে এলো শুধু একরাশ ঘন কালো অন্ধকার।


চোখ খোলার পরই বুঝতে পারলাম আমি একটা অচেনা জায়গায় শুয়ে আছি। বোধয় কোনও নার্সিং হোম। তবে খুব ভাল কোনও নার্সিং হোম মনে হল না। একটু সস্তারই। কেমন যেন মলিন। মনে পড়ে গেল আমারই অসাবধনাতায় ঘটে যাওয়া ওই বিভৎস এক্সিডেন্ট টার কথা।
আর অমনি ভয়ে দমটা বন্ধ হয়ে এল আমার। মা কোথায়? মা-ও তো ছিলেন আমার সঙ্গে গাড়িতে। আর আমায় এখানে আনলই-বা কে? কিন্তু কাকে জিজ্ঞাসা করবো এসব? কাউকে তো আশেপাশে দেখতেই পাচ্ছি না।
-“কেউ আছেন? একবার একটু আসবেন দয়া করে”…. একটু গলা তুলেই ডাকতে চেষ্টা করলাম।

আমার গলা পেয়েই বোধহয় ঘরে এলেন একজন অচেনা মহিলা।
-“আমি মানে আমাকে এখানে কে আনল”? কোনও মতে প্রশ্নটা করলাম ওই মহিলাকে।
-“আপনার গাড়ি এক্সিডেন্টের পর আমরাই নিয়ে এসেছি আপনাকে”। অদ্ভুত ঘরঘরে স্বর মহিলার।
-“আর আমার মা? উনিও তো ছিলেন আমার সঙ্গে”…. প্রায় আঁতকে ওঠার মতো করে বললাম আমি।

এবার একটু কালো দেখাল ওনার মুখটা।
মাথা নিচু করে বললেন
-“ওনাকে আনিনি। কারণ ওনাকে এনে লাভ হত না। উনি তো আর আপনার মতো”….
-“কি বলছেন কি আপনি? না এটা হতে পারে না” তীব্র আর্তনাদ করে উঠলাম আমি।
-“আপনি প্লিজ শান্ত হন। দেখুন আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু পরপারের হাতছানি তো এড়াতে পারে না কেউই। চিরকাল কে আর মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে বলুন?

তবে আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনার বাকি বাড়ির লোকদের খবর দিয়েছি। তারা এসে যাবেন অল্প সময়ের মধ্যেই। ততক্ষণ আমি রয়েছি আপনার সঙ্গে। আমার নাম চিত্রা। আমি এখানকার কেয়ার টেকার”।

-“মা… মা…” ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি। আর ঠিক তখনি লক্ষ্য করলাম দরজার ওপার থেকে ঝট করে সরে গেল একটা ছায়া শরীর।
-“কে ওখানে”? বলেই দৌড় লাগলাম দরজার বাইরে। নিমেষে ভুলে গেলাম শরীরী সব ব্যথা।
বাইরে এসে দেখতে পেলাম মূর্তিটাকে। আমার খুব চেনা। খুব কাছের। আমার মা।
কি অদ্ভুত লাগছে মাকে। কি ভীষণ আলুথালু, বিষণ্ণ।
আমি দৌড়ে যেতে গেলাম মায়ের কাছে। কিন্তু পারলাম না। তীব্র একটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেলাম। বুঝতে পারলাম একটা অদৃশ্য অথচ শক্ত আর দুর্ভেদ্য স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে আমার আর মায়ের মাঝে।
তা তো হবেই। আমি আর মা যে এখন আলাদা জগতের বাসিন্দা।

“না… না… না…” যন্ত্রণা আর অসহায়তা মেশানো একটা বিকট চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা চিরে। হঠাৎ আমার মাথার ভিতর কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি হুট্ করে পাগলের মতো এলোপাথাড়ি একটা ছুট লাগলাম দানোয় পাওয়া শক্তির মতো।
শুনতে পেলাম থতমত খেয়ে চিৎকার করছে ওই চিত্রা নামের মহিলা।

-“কি হল? আরে! এভাবে দৌড়ে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছেন? আপনার লোকজনেরা এল বলে”…
চিত্রার কথায় কোনও দৃকপাত করলাম না আমি। আমাকে এক্ষুনি পৌঁছতেই হবে বাড়ি।
প্রায় ছুটতে ছুটতেই নার্সিং হোম চত্বর ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে পড়লাম।
ছুটছি এলোপাথাড়ি বাড়ির দিকে। আমাকে এক্ষুনি বাড়ি পৌঁছতে হবে। পৌঁছতেই হবে

মনের ভিতরটা হুহু করছে আমার। এই ছিল তাহলে আমাদের অভিশপ্ত দিন, যার কথা ভেবে বহু বছর ধরে বারবার শিউরে উঠেছি আমরা সকলে বারবার।

তাহলে মায়ের বাহান্নতম জন্মদিনে মায়ের সাথেই এটা হবার ছিল! তাও কিনা আমারই হাতে!
আর দাদা! ও ঠিক আছে তো? ও সকালে কেন ফোন ধরছিল না? ও ফোন ধরছিল না বলেই তো…
আতঙ্ক, ভয়, উদ্বেগ, কষ্ট সব মিলিয়ে একটা অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি হচ্ছে আমার। উফফফ! আমি কি করে সহ্য করব এই কষ্ট?

একটা কোলাহলে একটু থমকে গেলাম আমি। ছুটতে ছুটতে কখন যেন বাড়ির কাছাকাছি চলেই এসেছি, সেটা খেয়ালই করিনি।
কোলাহলটা আমার বাড়ির দিক থেকেই আসছে। অনেক লোকজনের ভিড় আমার বাড়িটাকে ঘিরে।
বুঝতে পারছি সবাই শোক জ্ঞাপন করতেই এসেছেন বোধহয়।
বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে ভিড়ের ফাঁক ফোকর গলে বাড়ির ভিতর ঢুকলাম।
সামনেই রাখা রয়েছে সাদা চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা মৃতদেহটা।

আর ঠিক তার সামনেই বসে অঝোরে কাঁদছে দাদা। আর বৌদি সান্ত্বনা দিচ্ছে ওকে। যাক তাহলে দাদা অন্তত ঠিক আছে।
একটু দূরে চেয়ারে আচ্ছন্নের মত বসে রয়েছেন বাবা। দু’চোখ উপচে জল।
আমি এগিয়ে গিয়ে দাদার পাশে বসলাম। আলতো হাত রাখলাম ওর কাঁধে। এখন তো পরিবারের সকলকেই থাকতে হবে একে ওপরের পাশে।
না, দাদার যেন কোনও হুঁশ নেই। দেখতেই যেন পেলো না আমাকে। শুধু কেঁদেই চলেছে। সে তো স্বাভাবিক। আমি তো বুঝতে পারছি ওর বুকটাও দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে আমারই মতো।

-“মুখটা এভাবে ঢেকে রেখেছে কেন গো”? কে যেন বলল ভিড়ের মধ্যে থেকে।
-“আরে মুখ মাথা সব তো থেঁতলে গেছে শুনলাম। সত্যি ভাবাই যাচ্ছে না… ঘটনার দিন সকালেও তো দেখেছিলাম জলজ্যান্ত মানুষটাকে। ইস! একই গাড়িতে তে তো ছিল দু’জনে। একজন বাঁচল আর একজন… দু’দিনেই যেন সংসারটা শ্মশান হয়ে গেলো গো”…

পাড়ার রাখি কাকীর কথা শুনে চমকে উঠলাম আমি। দুর্ঘটনার পর দুটো দিন কেটে গেছে। আর আমি কিছু টেরই পাইনি! অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম নার্সিং হোম!

-“এবার তো বেরোতে হবে আমাদের। বিনয়দা আর যে দেরি করে লাভ নেই। কাঁচের গাড়ি ওয়েট করছে অনেকক্ষণ”। কথাগুলো বড় মামা বললেন বাবাকে। কিন্তু বাবা যেন পাথরের মূর্তি।
সবাই আস্তে আস্তে তুলছে দেহটা। আমিও হাত লাগলাম চোখ মুছতে মুছতে।

-“না.. না… নিয়ে যাবে না.. এটা হতে পারে না”… হঠাৎ বাজের মতো আছড়ে পড়ল আর্তনাদটা। আমি চমকে তাকালাম পিছন ফিরে।
মা এ দিকেই ছুটে আসছেন পাগলের মতো। মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ, চোখ-মুখ ফোলা। গলায় আঘাতের চিহ্ন।

আমার সারা শরীরে ভয়ের স্রোত খেলে গেল। এ কি দেখছি আমি?
মা কি করে আসতে পারেন এখানে? ও দুনিয়ার লোক এ দুনিয়ায় যে আসতে পারে না। আর কেউ যদি ও দুনিয়ায় চলে যাবার পর এখানে ফিরেও আসে তাকে যে কি বলে…

ভয়ে কেমন সব গুলিয়ে গেল আমার। বাইরে হঠাৎ কেমন যেন মেঘ করেছে বলে মনে হল

-“একবার.. শেষবারের মতো একটিবার দেখব আমি”…

মা প্রায় উন্মাদিনীর মতো ছুটে গেলেন লাশের দিকে। কেউ কিছু করার আগেই এক ঝটকায় সরান হল লাশের মুখের ঢাকা।

-“আআআ”… একটা বিভৎস চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা চিরে।

উফফফ! কি ভয়ানক কদর্য ওই লাশের থেঁতলে যাওয়া মুখটা। কিন্তু ওটা তো মা নয়। ওটা তো অন্য কেউ। তবে একেও চিনি আমি। অনেকবার দেখেছি আমি। দেখেছি আমার আয়নার ওপারে। হ্যাঁ, এই লাশটা তো আমারই। চিনে নিতে ভুল হয়নি একটুও।

ভয়, আতঙ্ক সব মিশিয়ে একটা পাগলের মতো অনুভূতি হচ্ছে আমার।

আরে! এটা কি করে হতে পারে? আমি তো এখানে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে। তাহলে কি করে এটা আমার লাশ হতে পারে?

-“আমি মরিনি বেঁচে আছি এই তো দেখো তোমরা”। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলাম কিন্তু কেউ শুনলই না।

আমায় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লাশ নিয়ে এগিয়ে গেল সবাই।

আমি পাগলের মতো ছুটে গেলাম। দাদার কনুই ধরে এক টান মারলাম।

-“দাদা… দাদা শোন”… না শুনলো না দাদা। বুঝতেই পারল না কিছু।

পাগলের মতো সবার সামনে গিয়ে চিৎকার করতে শুরু করলাম

-“আমি বেঁচে আছি। বিশ্বাস কর।”

-“দাদুভাই…” হঠাৎ চমকে উঠলাম পিঠে চেনা হাতের স্পর্শে।
পিছন ফিরে তাকাতেই যেন হাই ভোল্টেজ শক খেলাম।

ঠাম্মি এসে দাঁড়িয়েছে। হাসছে মিটিমিটি। আর ঠিক পাশেই দাদু।

কিন্তু… কিন্তু এটা কি করে হতে পারে? ঠাম্মি তো তিন বছর আগে মারা গিয়েছিল আর পাঁচ বছর আগে দাদু

-“তোমরা? তোমরা তো”… বিস্ময়ে মুখ থেকে কথা সরছে না আমার।

-“আমরা যে তোকে নিতে এলুম রে… চিত্রার খবর পেয়ে”…

-“আমায় নিতে এলে মানে? চিত্রাকে”?

ফোকলা দাঁতে হাসছে এবার ঠাম্মি।

-“ওরে চিত্রাকে ভুলে গেলি এর মধ্যে? তোর সঙ্গে আলাপ হল যে… চিত্রাই তো ওপারের পৃথিবীর দরজার কেয়ার টেকার”।

-“এসব কি বলছ আজেবাজে”… চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।

-“তবে শোন, তোর মায়ের বাহান্নতম জন্মদিনে অভিশাপ মুক্তি ঘটেছে তোর মৃত্যু দিয়েই। সে দিনের সেই এক্সিডেন্টটায় তোর মা বেঁচে গেলেও তুই মারা গিয়েছিলি তখনই। সেই জন্যই তো চিত্রার লোকরা তোকে নিয়ে গিয়েছিল ওই দুনিয়ার দরজায়।
কিন্তু তুই আবার পালিয়ে এসেছিস। অবশ্য প্রথম প্রথম এমন হয়। আমাদের হত। এত দিনের সংসার আর জগতের মায়া কাটান কি আর সহজ রে…! কিন্তু এবার যে ফিরতে হবে দাদুভাই”।

হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ঠাম্মি আমার দিকে। সেই ছোটবেলার মতো। আমিও আস্তে আস্তে বাড়িয়ে দিলাম নিজের হাত।

আমি ঠাম্মি আর দাদু এগোচ্ছি একটু একটু করে। শুনতে পাচ্ছি এখনও আকুল কান্না কাঁদছেন মা। ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে মায়ের কান্না আমার এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে।
আমার সামনে দিয়েই হুশ করে চলে গেল শববাহী গাড়িটা আমার লাশ নিয়ে।
আমি এগিয়ে চলেছি অজানা ঠিকানার দিকে, মরণের পরের জীবনটার দিকে।

পিছনে পড়ে রইলো আমার বাড়িঘর, পরিবার, স্বপ্ন আরও কত কিছু।

-“কিরে ভয় করছে নাকি”? বলল দাদু।

-“না”। ছোট করে বললাম আমি। জানি সত্যি ভয় পেয়ে লাভ নেই। অনিবার্য এই ঠিকানায় যে একদিন পাড়ি লাগাতে হবে সবাইকেই।
মাত্র কয়েকটা দিনেরই তো অতিথি আমরা সবাই ওই পৃথিবী নামক জায়গাটার। তবু তারই মধ্যে কেন যে এত খেয়োখেয়ি, হিংসাদ্বেষ কে জানে!