ইন্দ্রনীল বক্সী

১.
বন্দনা সাধারণত হাল্কা রঙের সিনথেটিক শাড়িই পছন্দ করে এক্ষেত্রে, মাঝে মধ্যে সালোয়ার। বেশ
চলাফেরায় সুবিধে। তবে ওর সহকর্মী অন্যান্য দিদিমণিরা বেশিরভাগই সূতির শাড়ি, বিশেষ করে তাঁত পছন্দ
করে। বন্দনার সংগ্রহে তাঁত নেহাত কম নেই, তবে বড্ড খর খর করে আর মেইনটেইনের ঝক্কি কম? বাব্বা!
তাই একটু এড়িয়েই চলে।

ঝিমলিকে নিয়ে সাত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে মনে পড়লো যা: গ্যাস সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করতে ভুলেছে।
এখন উপায় নেই, ট্রেন গতি পেয়েছে, না পেলেও ফেরার প্রশ্ন ছিলও না। ট্রেনের সময়-– বাড়ি থেকে বেরনোর
সময়-– স্কুলের সময় সব একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে…তাই…। মেয়েকে নিজের স্কুলেই রেখেছে বন্দনা। নিজেই
সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করে।

ঝিমলি ক্লাস সেভেন, যাচ্ছেতাই মাথা চাড়া দিয়েছে, এখনই মায়ের কাঁধে। তুলনায় গায় তেমন মাটি লাগেনি।
ডিগডিগে একহারা লম্বা হচ্ছে মেয়ে, সেহোক, কিন্তু পাল্লা দিয়ে একটু গায় গতরে না লাগলে হয়! এ নিয়ে
বন্দনা কিঞ্চিৎ চিন্তায় নেই এমন নয়। নিয়ম মেনে একটাই সন্তান তার, যত্নের ত্রুটি নেই। চাকরি-–
সংসার বাদে তার যাবতীয় ফোকাসের কেন্দ্রে মেয়ে। দৈনিক পুষ্টির যোগানের অভাব নেই, ইদানীং অবশ্য
মেয়ের বাড়ের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া নিয়ে বাছ বিচার যে বাড়ছে-– এটা লক্ষ্য করেছে বন্দনা। বকাঝকাও চলছে
অল্পস্বল্প। অথচ ওরই বয়সী কত মেয়ে কেমন সুন্দর চেহারা হয়েছে যে ওর থেকে বড় দেখায়, বেশ পরিপুষ্ট
স্বাস্থ্য, নারীত্বের বাহ্যিক লক্ষ্মণগুলি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, যৌবনের চোরা স্রোত যেন তিরতির করে ঢুকে তার অহংকারের আলগা প্রলেপ মাখিয়ে দিচ্ছে। ছোট্ট মেয়েগুলোকে আস্তে আস্তে বড় হতে
দেখতে, তাদের শরীরে আগামী বসন্তের কচি-পাতার বাহার দেখতে যে বন্দনার বড় ভালো লাগে…
কারও কারও একটু বাড়াবাড়ি রকমের বাড় হয়েছে, চোখে লাগে। পথ চলতি ছেলে বুড়ো ঘাড় ঘুড়িয়ে দ্যাখে।
বন্দনার অস্বস্তি হয় তখন, আড় চোখে দেখে নেয় নিজের মেয়েকে, আরও মুঠো শক্ত করে ধরে ডান হাতে ধরে
থাকা মেয়ের হাত অজান্তেই। এরকম দরকার নেই বাবা! এসব ওই ফাস্টফুডের ফল, আজকাল আবার
মুড়িমুড়কির মতো যে থাইরয়েড!… তা হলেও একটু-তো হওয়া দরকার! বন্দনা জানে সময় হয়ে গেছে, সময়ের
হিসেবে ঝিমলি আর বালিকা নয়, ওর নিজের-তো মেয়ের বয়সের একবছর আগেই শুরু হয়েছিল-– ঝিমলি এখন
১৩ প্লাস, না: এখনও কোনও খবর নেই।

২.
মেয়েকে অভ্যস্ত করেছিল সেই ছোট থেকেই স্কুলে সারাদিন কি হল মাকে এসে না বললে পেট ফুলতো মেয়ের। সেই ক্লাস ফাইভে পড়তে মেয়ে একদিন প্রশ্ন করেছিল
“মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“হুম, কি?”
“মা পিরিয়ড কি? খুব বড় শরীর খারাপ?”

চমকে উঠে বন্দনা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে ছিল মেয়ের মুখের দিকে …
“কেন? …কে…কে বললো?”
“আঃ বলোনা!”
“না …শরীর খারাপ হতে যাবে কেন! …ওটা সব মেয়েরই হয় একটা বয়সে।”
“মানে! সব্বার? আমারও …তোমারও হয়েছে? …তুমিও তো মেয়ে…!”
আবার একচোট চমকে গিয়ে নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নেয় বন্দনা…
“হ্যাঁ সব্বার, আমারও …তোমারও হবে ঠিক একদিন …না হলেই বরং শরীর খারাপ …”
“তাহলে ভাস্বতীর বাবা যে বললেন ভাস্বতী কদিন স্কুল আসবে না…ওর শরীর খারাপ হয়েছে, পিরিয়ড হয়েছে
…?”
“ওঃ, জানে না তাই বলেছে … জানিস না বাবারা কিচ্ছু জানে না …” বলেই একচোট হাসিতে গড়িয়ে পড়ে মা-– মেয়ে
দুজনেই, সেই থেকে দুই বান্ধবী, মা-মেয়ের দৈনিক স্কুল, টিউশানি ক্লাস, রাতের টিভিতে বিজ্ঞাপনে
মেয়েদের ‘বিশেষ’ দিনের জন্য নানান বিজ্ঞাপনের মাঝে অপেক্ষা চলছে …কবে সেই অমোঘ দিন আসবে, না:
মেয়েকে ওই সময়ের প্রাথমিক কষ্ট-যন্ত্রণার কথা বলেনি বন্দনা, শুধু মাঝে মধ্যে অন্য নানা কারণে মাথা
ভার লাগলে পেটে ব্যথা করছে শুনলেই অকারণেই বাড়তি সতর্ক হয়েছে, আস্তে আস্তে বুঝিয়েছে পেটে ব্যথার
সঙ্গে সঙ্গে কি কি অনিবার্য ঘটনাগুলি ঘটবে তা, শুনতে শুনতে মেয়ের মুখ কখনও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে
অনভিজ্ঞতার সেই যন্ত্রণার কথা ভেবে, অনিবার্য রক্তপাতের কল্পিত দৃশ্যে। বন্দনা মনে করতে পারে তার
প্রথম দিনের কথা, স্কুলে ক্ষরণ শুরু হওয়ায় খুব বিপদে পড়েছিল, এক আশ্চর্য অজানা আতঙ্কে স্তম্ভিত
হয়ে গেছিল, শেষে দিদিমণিরাই কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিলো দ্রুত, এবং ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলো দারোয়ানের
সঙ্গে। দিদিমণিরা বলে দিয়েছিলেন কদিন যেন সে স্কুলে না আসে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি
ফিরেছিল বন্দনা। মায়ের উপর হয়েছিলো প্রচণ্ড ক্ষোভ …না: তার মা তাকে আগে থেকে কোনও আভাস
দেয়নি এই অনিবার্য যন্ত্রণার, এই রক্তপাতের। বন্দনার আজও মনে পড়ে, সেদিন যত না যন্ত্রণায়, তার
থেকে অনেক বেশি ভয় ও লজ্জায় অপ্রস্তুত-বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। পাঁচদিন পর যখন স্কুলে গেল,
সেদিনের বন্ধুরা যারা বন্দনাকে কাঁদতে দেখে কেঁদে ফেলেছিল তারাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিলো, বন্দনাও
কুঁকড়ে গেছিলো না জানি কি লজ্জার কাণ্ড ঘটল! মাও বারণ করেছিল কাউকে কিছু বলতে, বিশেষ করে
বাপিকে, দাদাকে….। বন্ধুদের হাসির সঙ্গে ছিল অজস্র কৌতূহল-– অসংখ্য প্রশ্ন, বন্দনা তার কোনোটার
তেমন উত্তর দিতে পারেনি শুধু তার যন্ত্রণা ও রক্তপাতের বিবরণ ছাড়া। তবু কি অদ্ভুত! কিছু যন্ত্রণাকে
চিরকাল মানুষ কামনা করে…

৩.
“ঝিমলি হাত চালা…এত নিটির পিটির করে খেলে আজ নির্ঘাত ট্রেন মিস…”
ঝড়ের বেগে কথাগুলো ডাইনিং টেবলে বসে থাকা মেয়েকে বলে ওদের বেডরুমে ঢোকে বন্দনা, হাতঘড়িটা খুঁজে
পাচ্ছেনা সকাল থেকে। দ্রুত পায়ে এঘর ও ঘর করতে করতেই কাজের মেয়েকে ব্রিফিং দিতে থাকে কি কি করে
যেতে হবে আগামী কয়েক ঘণ্টা। ওদিকে ঝিমলি আয়নার সামনে নিজেকে একটু এদিক ওদিক করে দেখছে।
স্কুলে যাওয়ার সময়েও নিজেকে এত দেখার কি আছে বাপু বন্দনা ভেবে পায় না। বিরক্তির ভ্রূকুটি নিয়ে মেয়েকে

জিজ্ঞেস করে “আপনার হয়েছে দেখা? এবার চলুন…” বন্দনা ভুলে গেছে একটা বয়সে নিজেকে নিজেরই দেখতে
কি যে ভালো লাগে! অকারণেই…
প্যাঁক প্যাঁক করে রিক্সা ভেঁপু বাজিয়ে অক্ষম চেষ্টা করে সামনের ঠেলাওয়ালাকে সরাবার, কিন্তু ঠেলাওয়ালা,
সাইকেল-ওয়ালা, বাইক-ওয়ালা তখনই সরবে যখন তার মর্জি হবে-– এটা রিকশাওয়ালাও জানে কারণ সেও যে
একই রকমভাবে অভ্যস্ত। এদিকে ঘড়ির কাঁটা অস্বস্তিকর দাগের কাছে এগোচ্ছে, বন্দনা গলা চড়ায় সামনের
বাইক-ওয়ালার উদ্দেশ্যে “ও ভাই! সাইড দেওয়া যাচ্ছে না? এভাবে স্কুল-টাইমে… ওঃ কি জ্বালা…” বন্দনা
এখন রিক্সা-পন্থী, প্রতিপক্ষ এখন বাইক-ঠেলা-সাইকেল–সাধারণ পথচারী। বাইকে বসলে রিক্সাগুলোকে
বড্ড অসহ্য লাগে তখন বন্দনা ‘বাইক-পন্থী’ বাকিরা প্রতিপক্ষ… এটাই আমাদের সুবিধা-মতো নমনীয়তা, বন্দনারও।
ট্রেন ছুটছে, আর তিনটে স্টেশনের পর ওরা মা-মেয়ে নামবে। হঠাৎ বকুলদিকে দেখতে পেলো বন্দনা, জানতো
এদিকেই কোথাও বিয়ে হয়েছে বকুলদির, কিন্তু কি আশ্চর্য! এতদিনে একবারও দেখা হয়নি। ওকে দেখতে
পেয়েই ঝকঝকে একটা হাসি নিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো বকুলদি
“কি রে এ এ …ক্যামন আছিসসস…বাব্বা কেমন গিন্নিবান্নি হয়েছিস রে!”…বকুলদি বদলায়নি একদম, বেশ
জোরেই বলা কথার চোটে দু-একজন ঘাড় ঘুরিয়ে চমকে তাকালো। বকুলদি একহাত জিভ কেটে এবার ফিস ফিস
করে বলল।
“ইস শ শ …দেখলি কেমন চেঁচিয়ে ফেললাম!!…আসলে তোকে কত্তদিন পর দেখলাম বল!”
এবার বকুলদির চেঁচিয়ে বলা কথার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বন্দনা বলে ওঠে
“তুমিও তো একেবারে পাটরানী-– মা ঠাকরুন মার্কা হয়েছ দেখছি… একদম সিরিয়ালের গিন্নি-মা…” বলেই
দু’জনেই বেশ একচোট হাসাহাসি করলো।
“এটা কে রে! কন্যা?”
“হ্যাঁ …ওই একটিই”
“ওমা …তাই !…তা মেয়েকে কিছু খাওয়াসনা নাকি? সব নিজেই সাবড়ে দিস! এরকম ফিনফিনে কেন?” বলে
ঝিমলির থুতনিতে হাত দিয়ে নিজের মুখে ঠেকিয়ে ‘চুক’ করে আদরসূচক আওয়াজ করলো বকুলদি। এসব ঝিমলির
যে বিশেষ ভাল লাগছে না তা যেকেউ ঝিমলির মুখ দেখলেই বুঝতে পারবে।
“জিজ্ঞেস করো… কিছুর অভাব আছে নাকি! …সবেতে নাক সিঁটকোলে আমি আর কি করি …”
“হুম তা বটে …এখনকার এই টিন এজ ছুঁড়িগুলো…”
পাড়াতুতো দুই দিদি-বোনের গল্প এগোতে থাকে। নামার সময় হয়ে এসেছে, একটা স্টেশন পড়েই বন্দনা মেয়েকে
নিয়ে নামবে। ইতিমধ্যে বকুলদি মেয়ের স্বাস্থ্য ফেরাবার জন্য শিমুলতলার ঠাকুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছে
বন্দনাকে, খুব জাগ্রত নাকি। বন্দনা এসবে বিশেষ উৎসাহী নাহলেও বকুলদির মুখের ওপর ‘যাব না’ও বলতে
পারেনি, মেয়েকে নিয়ে ওর দুশ্চিন্তাও কম নয়, আরও সবাই এসব বলে ওকে আরও অস্থির করে তুলছে যেন।
মনে মনে বন্দনা ঠিক করে একদিন যাবে মেয়েকে নিয়ে শিমুলতলা ঠাকুরবাড়ি …লাভ হোক না হোক ক্ষতিতো নেই!

৪.
ঝিমলির পরীক্ষা শেষ। এখন কিছুদিন ছুটি, শীতের মরশুমের মাঝামাঝি এখন নানা জলসা, মেলা, বিয়ের
নেমন্তন্ন লেগেই রয়েছে। ছুটির সময় ঝিমলিকে নিয়ে কদিন বাপের বাড়ি ঘুরে এল বন্দনা। কেমন করে জানি
একথা সেকথার পর মায়েরও, মানে ঝিমলির দিদারও একই উব্দেগ প্রকাশ। সবাই ধরেই নিয়েছে মেয়ে রোগা
বলে দেরী হচ্ছে নইলে কি এতদিনে…। এখানে আসার আগে বন্দনা যাব যাব করেও সময় করে উঠতে পারেনি
বকুলদির বলা শিমূলতলার সেই ঠাকুরবাড়ি যাওয়ার। ফিরে গিয়ে যাবে একদিন ভেবে রেখেছে। কদিন ঝিমলিরও
বেশ মজায় কাটলো মামাতো দিদি, ওর থেকে বছর দুয়েকের বর মিমিদির সঙ্গে। সারাদিন দু’জনের গুজগুজ
ফুসফুস আর মধ্যে মধ্যে হাসির ফোয়ারা, কি যে ওদের এত সিক্রেট আলোচনা কে জানে! মা কি মামী এলেই
দু’জনাই চুপ। মিমিদির একটা ‘স্পেশাল’ বয়ফ্রেন্ড আছে এই খবরটা মিমিদি ওর সঙ্গে এতদিনে শেয়ার করল
অন কন্ডিশন ঝিমলি যেন তার মাকে না বলে, যা পেট পাতলা মেয়ে! কিচ্ছু বিশ্বাস নেই।
ঝিমলিদের বাড়ির সামনের বেশ কিছু গাছপালা এই মরশুমে কেমন খালি হয়ে থাকে, কৃষ্ণচূড়া, অশ্বত্থ, বট
…পাতাঝড়ার মরশুমে সব পাতা ঝরে গেছে। ন্যাড়া ডালপালার মাঝে পাখিদের ফেলে যাওয়া বাসা, আটকে থাকা
ছিঁড়ে যাওয়া ঘুড়ি। ঝিমলি আপনমনে ওর পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, অঙ্ক খাতার রাফ
করার জায়গায় আনমনে এঁকে ফেলে একটা প্রজাপতি…
বন্দনা ঘর গুছোতে গুছোতে ঝিমলির ঘরের সামনে দিয়ে যেতে আসতে এক নজর দেখে দেখে নেয় অভ্যাসে।
আনমনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা মেয়েকে দেখে আপনা থেকেই একটা হাল্কা হাসির রেখা খেলে যায় বন্দনার
মুখে। ঝিমলির নিজস্ব মুহূর্তের কয়েক পলক ওকেও কেমন যেন আনন্দ দেয়। “এই! না পড়ে হাঁ করে জানালা
দিয়ে কি দেখছিস?” বলে ডাক দিয়ে ঝিমলির মগ্নতাকে ভেঙে না দিয়ে বসার ঘরে ফিরে এসে একটা পত্রিকা তুলে
নিয়ে মনোনিবেশ করে।

“ঝিমলি! এই ঝিমলি! কি হল?” ভোররাতে ঝিমলি ছটফট করছে দেখে বন্দনা ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বিছানায়।
মা –মেয়ে একই ঘরে শোয় সেই প্রথম থেকেই।
“উফ …মাগো …ব্যথা …পেটে …তল পেটে …” ঝিমলিও উঠে বসেছে, কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায় …
উঠে বাথরুমের দিকে যায় ঝিমলি। কয়েক মুহূর্ত পড়েই বাথরুম থেকে ঝিমলির গলা শুনতে পায় বন্দনা

“মা মা !…” বন্দনা দেখে বাথরুমের দরজা খুলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঝিমলি… শূন্য–বিস্ফারিত দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছে ওর দিকে । বন্দনা লক্ষ্য করে ঝিমলির ফ্রকের নিচে দৃশ্যমান পায়ের অংশ বেয়ে নেমে আসছে
ক্ষীণ রক্তের ধারা…
বন্দনা মেয়েকে ওখানেই দাঁড়াতে বলে উঠে গিয়ে দ্রুত হাতে আলমারি খোলে। ফিরে আসে মেয়ের কাছে, কি
করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে মেয়েকে আশ্বস্ত করে ফিরে এসে বসে বিছানায়। ঝিমলি বাথরুমের দরজা বন্ধ করে।
বিছানায় বসে বসে কেমন অস্থির ভাবে পা দোলাতে থাকে বন্দনা, এই উত্তেজনা কিসের জন্য! এই যন্ত্রণা-
রক্তপাতের জন্য? …অথচ এরই তো প্রতীক্ষায় ছিলো বন্দনা …!
———————————
সকালের খাবারটা ওরা একসঙ্গেই খায়। ব্রেকফাস্ট টেবলের তিনদিকে তিনজন না বসলে ওদের দিন শুরু হয় না,
ওরা মানে বন্দনা-– ঝিমলি ও ঝিমলির বাবা অরিত্র। আজও নিয়মের অন্যথা হয়নি। অরিত্রর প্লেটে পরোটা
দিতে দিতে বন্দনা অরিত্রকে বলে ওঠে–

“আজ অফিসের তাড়া যখন নেই একটু বাজার যেও, পাঁচশো খাসির মাংস এনো আর…আর…কিছুটা গলদাও
এনো, একটা নারকেল… মালাইকারি করবো, ঝিমলির ফেভারিট। আর হ্যাঁ আসার সময়ে ‘অনন্ত’ থেকে লাল
মিষ্টি দই এনো মনে করে …”
অরিত্র অবাক হয়ে তাকায় বন্দনার দিকে। বলে ওঠে
“বাব্বা এত্ত! আজ আবার কিসের স্পেশাল সেলিব্রেশান?”
মুচকি হেসে রহস্য করে বন্দনা বলে ওঠে মেয়ের চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথার হাত বোলাতে বোলাতে …
“আছে আছে মশাই …শুধু এই নয় বিকেলে আমি আর ঝিমলি যাবো ‘ট্রেন্ডজে’ , ওর জন্য লেটেস্ট একটা টপ আর
কালার জিন্স কিনতে…তোমার মেয়ে বড় হয়ে গেছে, আজ তারই …”
ঝিমলির চোখ আনন্দে চিকচিক করে ওঠে…অরিত্র অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মা-মেয়ের দিকে …
অরিত্র বাজার বেরিয়ে গেছে। রান্নাঘরের সিঙ্কে প্লেটগুলোয় জল বুলোতে বুলোতে জানালা দিয়ে বন্দনার দৃষ্টি
চলে যায় বাইরের গাছগুলোর দিকে…গাছগুলোয় কচি কচি লাল পাতা গজিয়েছে এরই মধ্যে, গাছে গাছে যেন আগুন
লেগেছে … বসন্ত এসে গেছে কখন চুপিসাড়ে..!