ট্রেনটা তখন ঝমঝম শব্দে ব্রিজ ক্রশ করছিল। সারা ট্রেন অন্ধকার। সকলেই আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাইরের ঝমঝম শব্দটা অরণ্যর ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আর একটা একটা করে চাপা পড়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো স্তর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছিল। অহেতুক। ট্রেনে অরণ্যর কোনোকালেই ঘুম আসে না। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে চাদরটা গায়ে টেনে নিল অরণ্য। অরণ্যর মনে পড়ছিল আইটিআই মোড়ের সেই চায়ের দোকান, লেবু চা, চা-কাকুর বাড়ির মনসা পুজো, নাটকের স্ক্রিপ্ট, রিহার্সাল, সন্ধেবেলার পথভোলা অন্ধকার, একটা চপের দোকান, একটা জেরক্সের। কতদিন, কতদিন হয়ে গেল! পুরনো বন্ধুরা পুরনো হয়ে যায়।

কেউ কাউকে মনে রাখে না। যে যার নিজস্ব স্রোতে মিশে যায় নিজের মতো। আজ কত কথা মনে পড়ছে অরণ্যর। রাতভর প্রুফ দেখা। বাসব দার প্রেস। বইমেলা। মান-অভিমান। খিস্তি। কিন্তু এটাও মনে হচ্ছে অরণ্যর সেও তো একটা স্রোতেই নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে। শুধু অন্যদের দোষ দিয়ে কী হবে! ব্রিজ পেরিয়ে গেছিল। এখন ট্রেন চলছে দ্রুত। শুধু হুইসেলের আওয়াজটা কানে আসছে। ঘড়ি দেখছে অরণ্য। ১২টা ২১। ভোর পাঁচটায় ট্রেন পৌঁছানোর কথা। এমনিতেই পনেরো মিনিট লেটে ছেড়েছে সিগন্যালের সমস্যায়। মানে এখনও অনেক দেরী। সে গোটা ট্রেনটার নিঃস্তব্ধতা অনুভব করছে। অনুভব করছে ভেতরের অস্থিরতাও। আজ কেন এত মনে পড়ছে সবকিছু!

না এবার একটু ঘুমানো দরকার। আগামীকাল এত বড় একটি সাহিত্যসভার বিশেষ অতিথি অরণ্য। কবিতাও পড়তে হবে বলে বারবার অনুরোধ করেছে উদ্যোক্তারা। যদিও এমন সাহিত্যসভায় অরণ্যকে প্রায়ই যেতে হয় তবু এখনো অরণ্যর মনে হয় প্রতিটি মঞ্চ আলাদা। প্রতিটি অনুষ্ঠান ভিন্ন। সম্ভবত সে কারণেই এই সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখকদের মধ্যে অরণ্যর উপস্থিতিই এত বেশি প্রাণবন্ত। কিন্তু ঘুম আজ আসছে না কিছুতেই। রাত্রি ক্রমশ দীর্ঘ হয়ে উঠছে অরণ্যর কাছে।


সকালে স্টেশনের ব্যস্ততার মধ্যে তিনজন এসেছে অরণ্যকে রিসিভ করতে। স্টেশনে চার কাপ চা খেয়ে ঠক ঠক শব্দে ভাঁড়গুলো বালতিতে ফেলে পয়সা মিটিয়ে স্টেশন থেকে বড় রাস্তায় নেমে গাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করতে যাচ্ছিল ওরা। অরণ্যই বারণ করল। হেঁটেই যেতে চায় ও। অচেনা শহর দেখতে দেখতে হাঁটবে সে। ওরা তিনজন বাজারের মধ্যে দিয়ে ভিড় সরাতে সরাতে “স্যার আসুন, স্যার আসুন” বলতে বলতে নিয়ে গেছে। “স্যার” শব্দটার অতিব্যবহারে কিছুটা অতিষ্ট হয়েই অরণ্য স্যারটা বাদ দিতে বলেছে ওদের।

আস্তে আস্তে সহজ হয়েছে ওরাও। অরণ্য এখানে তিনদিন থাকবে। অসীমের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ওর। দু’দিন অনুষ্ঠান। একদিন বেশি থাকতে হচ্ছে ওকে কারণ ফেরার টিকিট পাওয়া যায়নি। অরণ্যর মতো নামী লেখকদের একদিন কেন দু’দিন বেশি পেলেও কেউ আপত্তি করবে না। ওরা এখন অসীমের বাড়ির সামনে। প্রথমে ঢুকেই অরণ্য কিছুটা চমকে গেল। বিরাট এলাকা জুড়ে একটা বাড়ি। মূল দরজা দিয়ে ঢুকে এখন যে রাস্তাটা বাড়ি অবধি গেছে তার দু’ধারে ঠিক বাগান বলা চলে না, বিবিধ গাছ, ঝরা পাতার স্তূপ। দেখেই বোঝা যায় কোনো জমিদার আমলের বাড়ি। মূল বাড়িতে ঢুকেও অরণ্য কিছুটা বিস্মিতই হল। এমন বাড়ির কথা ও শুধু বইয়ে পড়েছে।

কখনও নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়নি। এখন যে ঘরে ওরা বসে আছে সেটা বিরাট একটা ঘর তিনদিকেই বিরাট বিরাট দরজা। মাঝখানে সোফা, টি-টেবিল। চকচকে কালো মেঝে। অসীমের স্ত্রী রূপকথা চায়ের ট্রে নিয়ে এল। টেবিলে রেখে ভিতরে চলে গেল দুপুরের খাবার জোগাড় করতে। যাওয়ার আগে চোখের ইশারায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী যেন সব কথা হয়ে গেল। দুপরের খাবার টেবিলে সে বিস্তর আয়োজন। বিকেল হয়ে এল প্রায়। আর একটু পরেই যেতে হবে অনুষ্ঠানে। গাড়ি আসবে…


তখন রাত্রি ১২টা হবে। যে ঘরে অরণ্যর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে সেখানে সাদা বেডকভারে ঢাকা একটা প্রাচীন খাট। আর কিছু আসবাব রয়েছে। বোঝাই যায় ঘরটা অতিথিদের জন্যই তোলা থাকে। ঘরের পাশেই লম্বা বারান্দা। রেলিং দেওয়া। একটা আলো জ্বলছে। রেলিংয়ের ওপারের গাছগুলোর ছায়া পড়ে বারান্দাটা অদ্ভুত মায়াময় চেহারা নিয়েছে। দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরাল অরণ্য। ওই বারান্দারই ওদিকটায় অসীমদের ঘর। একটা কবিতার লাইন মাথায় আসছে অরণ্যর। লিখতে পারছে না।

কারণ যতবারই লিখবে ভাবছে বা কবিতাটা এগোতে যাচ্ছে রূপকথার মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কী সাবলীল! কী সহজ একজন মানুষ! তার চেয়েও বড় কথা অরণ্যর কত কবিতার লাইন ও বলে যাচ্ছে। কত গল্পের প্লট ও মনে রেখেছে যেগুলো অরণ্য নিজেই ভুলে গেছিল। এমন একজন পাঠকের আতিথেয়তায় সে এখন আছে। রাঁধছে, খাওয়াচ্ছে আবার সাবলীল গল্পও করছে। দুপুরের দিকে যখন অসীম ছিল না অনুষ্ঠানের কাজে ওখানেই ছিল রূপকথা এসেছিল অরণ্যর ঘরে। বলেছিল “আপনি যে আসবেন তা আমি বা অসীম কেউই ভাবতে পারিনি।”

অরণ্যও জানিয়েছিল ওর ভাললাগার কথা। বিশেষত বাড়িটা কী সুন্দর! শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা শান্ত নীড় এক। অরণ্য রূপকথার রান্নারও প্রশংসা করেছে। তারপর লেখালিখি নিয়ে কথা তো হয়েছেই। কবিতা শুনতে চেয়েছে রূপকথা। এমন একজন পাঠিকার অনুরোধ ফেলতে পারেনি অরণ্য। কবিতার কথায় কথায় সন্ধে হয়ে গেছে প্রায়। রেলিংয়ের বাইরে পাখির কিচিরমিচির এত বেড়ে গেছে যে অরণ্যর মাথায় আসছিল “সব পাখি ঘরে ফেরে…”

সিগারেট শেষ করে ঘরে গেল অরণ্য। একটু উশখুশ করল লেখাটা লিখে ফেলার চেষ্টায়। হল না। একটু পর আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল অরণ্য…


এভাবেই তিনটে দিন কেটে গেছে অনুষ্ঠানে। কবিতায়। গল্পে। হাসিতে। রূপকথা বারবার জানিয়েছে কীভাবে অরণ্যর কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। বারবার অরণ্যর মনে হয়েছে এমন পাঠক সত্যিই স্বপ্নের মতো। এমন একজন পাঠকের জন্যই তো এ লেখকজন্ম। কোনো পুরস্কার, কোনো সম্মান এই প্রাপ্তির মতো নয়। এ যেন মহার্ঘ্য। আবার কিছুটা লজ্জাও পেয়েছে সে।

ঠিক লজ্জা কি! জানে না অরণ্য। আজ ফিরে যাবে সে। রাত্রি ১১টা ২০তে ট্রেন। রাত্রির খাওয়া হয়ে গেছে। একটু পরেই বিশু, সুবিমল এসে যাবে। ওরা এলেই অসীম আর অরণ্য বেরিয়ে পড়বে। ওরা তিনজন অরণ্যকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবে। শেষ মুহূর্তের ধন্যবাদজ্ঞাপন, কৃতজ্ঞতা স্বীকার চলছিল। এত বড় একজন সাহিত্যিক তাদের অনুষ্ঠানে এসেছে তার জন্য আতিথেয়তার কোনও খামতি রাখেনি ওরা। এখন অসীম ও অরণ্য বাইরের ঘরটিতে সোফায় বসে আছে। রূপকথাও এসেছে। বসেছে অসীমের পাশেই।

–আর কখনও এরকম সুযোগ হবে না হয়তো আপনাকে এত কাছ থেকে পাওয়ার।

–না না সে নিশ্চয় হবে। আচ্ছা অসীমবাবু আমি একদম ভুলে গেছিলাম আমার এই ওষুধটা একটু আনিয়ে দিতে পারেন? এটা রাত্রে দরকার হতে পারে।
একটা চিরকুট পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দিল অসীমের দিকে।
— ও আপনি আগে বলেননি! দিন দিন আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি। কাছেই দোকান।

–প্লিজ—

অসীম হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। রূপকথা উঠে অরণ্যর একটা বই আনতে যাচ্ছিল সই করাবে বলে।

–দাঁড়াও।

হঠাৎ তুমিতে রূপকথা চমকে পিছনে তাকাল। অরণ্য উঠে দাঁড়িয়েছে। ওরা দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেরই চোখ স্থির। ওদের মাথার উপর ঝাড়বাতিটা উদাসীনভাবে জ্বলছে। ঘরের মেঝেতে দক্ষিণের দরজা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে।

— তোমাকে যে এখানে এভাবে পাব ভাবতে পারিনি। রূপকথা অসীম ভালবেসে ডাকে? কী দারুণ ডাকনামটা!

— আমিই অসীমকে বারবার বলেছিলাম তোমার কথা। কিন্তু তুমি যে চলে আসবে তা আমিও ভাবতে পারিনি। তোমার এখন যা স্ট্যাটাস! আমি ইচ্ছে করেই অসীমকে বুঝতে দিইনি তোমার সাথে আমার পূর্বপরিচিতির কথা। আর তুমিও যে যথেষ্ট বুদ্ধিমান মানুষ তা আমি বরাবরই জানি। ফলে ভয় করিনি—

–দু’জনেই তিনদিন ধরে দারুণ অভিনয় করেছি। একবার কি চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসা যায়—

–ওই তো অসীমরা এসে গেছে—

চলুন চলুন অরণ্যবাবু ট্রেনের দেরী হয়ে যাবে।

–এই বিশু স্যারের ব্যাগটা নে–

–না না আমিই নিচ্ছি।

সকলে বেরিয়ে গেল। পিছনে পিছনে হাঁটছে অরণ্য। মৃদুস্বরে রূপকথাকে বলল ” আজকের সারাদিনটা আমার জন্যই শেষ হয়ে গেল। মনে আছে আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি? ভাল থেকো।” অরণ্য বেরিয়ে লম্বা বারান্দাটার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। জ্যোৎস্না ভেঙে যাচ্ছে খন্ড খন্ড হয়ে ওর বুটের শব্দে। দরজা ধরে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে রূপকথা। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওদিকে। হঠাৎ বারান্দাটা শূন্য হয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওদের নেমে যাওয়ার শব্দ হচ্ছে। রূপকথা মনে মনে বলছে “ও ফিরে গিয়ে রবিবাসরীয়তে ভ্যালেনটাইনস্ ডে নিয়ে কিছু একটা লিখবেই। তাতে কি আমাদের কথা থাকবে!”

রেলিং দিয়ে রূপকথা দেখতে পেল ওরা তিনজন সামনে সামনে হাঁটছে। পিছনে পিছনে অরণ্য একবার সে ঘুরে দেখল রেলিংয়ের দিকে। সে নিশ্চয় রূপকথাকে দেখতে পেল না কারণ সে ততক্ষণে থামের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। ও দেখল শুকনো পাতাদের উপর দিয়ে খসখস শব্দে অরণ্য অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।

সমস্ত পোশাক যেন সে আবার পরতে শুরু করেছে। অসীম ফিরে এলেই পরবর্তী অভিনয় শুরু হবে…