মানকুন্ডু আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব

অর্ণব সাহা

পরবর্তী কবি বুলেট পঞ্চু । দু’হাতে রিভলবার চালাতে ওস্তাদ । আগে পাপ্পু তিওয়ারির গ্রুপে ছিল প্রায় তিন বছর । মাসছয়েক হল ডি.কে-র গ্যাং-এ জয়েন করেছে । এটা ২০৪৮ সাল । বাংলা কবিতা এখন আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে অসীম ক্ষমতাধর দুটো প্যারালাল কোম্পানির মধ্যে । শ্যামবাজার থেকে ডানলপ হয়ে প্রায় গোটা উত্তর ২৪ পরগনা কন্ট্রোল করছে পাপ্পু-র ছেলেমেয়েরা । আর, এদিকে শোভাবাজার থেকে পুরো সাউথ কলকাতা হয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন ডি.কে । বলাই বাহুল্য উত্তরে বনগাঁ বর্ডার থেকে দক্ষিণে সুদূর গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পুরোটাই এখন কলকাতার পিনকোড । ফলত, পুরোটাই এখন কলকাতা মহানগর । পাপ্পু মহাকবি হলেও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা আর এলিট বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কম । তুলনায় ডিকে হলেন বাংলা কবিতা তথা বাঙালি জাতির বিবেক । দুই কোম্পানির কোনোটাতেই ভিতরে এন্ট্রি পাওয়া খুব সহজ নয় । কমপক্ষে দু’তিন বছর প্রথমে ওয়াচম্যান, ওয়েটার, কুরিয়ার, মেসেঞ্জার হিসেবে ঘষটানোর পর হয়তো কেউ কেউ এন্ট্রি পায় বসের পার্সোনাল বডিগার্ডের লাইনে । এদিক থেকে বুলেট পঞ্চু একেবারেই ব্যতিক্রম । তিন তিনটে বছর পাপ্পু তিওয়ারি-র যাবতীয় বৈধ-অবৈধ কাজের মাস্টারমাইন্ড থাকার সুবাদে সে জানে ক্ষমতার সিঁড়িতে কীভাবে উপরে উঠতে হয় । তাই অতি দ্রুত বসের সবচেয়ে আস্থাভাজন হিসেবে সে ঢুকে পড়েছে, এমনকী বেডরুমেরও ভিতরেও । যে চারজনকে এই মুহূর্তে ডি.কে-র ‘চারমূর্তি’ বলা হয়, তাদের একজন সে । বাকি তিনজন জন হল আফতাব আলি, রকেট মন্ডল আর গ্ল্যামার-কুইন মিস নাতাশা । গোটা বাংলা-বাজার জানে, এই চারজনের হাতেই আগামী দিনে বাংলা কবিতার যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে চলেছে । এমনিতেই পাপ্পু এই মুহূর্তে অনেকটাই কোনঠাসা । পশ্চিমবঙ্গ সরকারি সাহিত্য সংসদ, প্রায় সবকটা প্রধান টেলিমিডিয়া, এফএম চ্যানেল, বিগ পেপারহাউজ, প্রায় পুরো অ্যাকাডেমিয়া এখন ডি.কে-র নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে । গত কয়েকবছরে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গ্যাং-ওয়ার যে মারাত্মক জায়গায় চলে গেছিল, তাতে আশঙ্কিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার সহিত্য সংসদকে দুটো আলাদা জোন-ভিত্তিক কমিটিতে ভেঙে দেন । উত্তরাঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয় পাপ্পু-কে । দক্ষিণাঞ্চলের কর্তৃত্ব আসে ডি.কে-র হাতে । ডি.কে সারাজীবন পেপারহাউজে চাকরি করেছেন । এখন স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে ওই পেপারহাউজেরই চিফ অ্যাডভাইসারি কমিটির শীর্ষপদে আছেন তিনি । তুলনায় পাপ্পু-র উঠে আসা-টা একটু আলাদা । তার অতীত পুরোটাই শাসকদলের গ্রাসরুট লেভেলের কর্মী থেকে একেবারে সাংস্কৃতিক মঞ্চের সর্বোচ্চ পদে ওঠার ইতিহাস । আসলে ২০৪১ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল হবার পর থেকে পাপ্পু-র দল বিরোধী আসনে । উলটোদিকে ডি.কে কোনোদিনই কোনো রাজনৈতিক দলে সরাসরি যোগ দেননি, কিন্তু প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের কাছেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে প্রতিদিন । যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইস্যুতে ডি.কে-র একটা বাইট পাবার জন্য মুখিয়ে থাকে মিডিয়া । বাইরে থেকে চূড়ান্ত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ডি.কে-র গায়ে বহু চেষ্টা করেও কাদার ছিটে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে পাপ্পু-র দলবল । এই অপরিসীম এলিট জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই গড়ে উঠেছে ডি.কে-র সাম্রাজ্য । এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের সাহিত্যমন্ত্রকের গোটা পূর্বাঞ্চলীয় শাখার দায়িত্ব ডি.কে-র কাঁধে । অনেক যত্ন করে, অনেক পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ে যে সাম্রাজ্য তিনি গড়ে তুলেছেন, তার উত্তরাধিকার নিয়ে যদিও ভিতরে ভিতরে খেয়োখেয়ি শুরু হয়েছে অনেক আগেই । এবং ডি.কে সবটাই জানেন । কিন্তু, গত দু’মাসে এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো তাঁর কোম্পানির পক্ষে অশনি-সংকেত বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল । ডি.কে-র প্রত্যেকটা গোপন মিটিঙের এজেন্ডা ও সিদ্ধান্ত ফাঁস হয়ে চলে যাচ্ছে পাপ্পু-র দরবারে । প্রত্যেকটা সিলেকশন কমিটির সিদ্ধান্ত, সরকার ও বিগহাউজের সঙ্গে ডি.কে-র যাবতীয় ডিল কে ফাঁস করে দিচ্ছে প্রতিপক্ষ কোম্পানিতে ? এখন আর এটা অজানা নয়, ডাবল-এজেন্ট হিসেবে এই কাজ করে চলেছে বুলেট পঞ্চু । এছাড়াও, প্রথম থেকেই তাকে নিয়ে, তার এই অস্বাভাবিক দ্রুত উত্থান নিয়ে, বাকি তিনজনের ইনসিকিওরিটি ছিল চূড়ান্ত জায়গায় । তারা সুযোগ খুঁজছিল । ছোবল মারার । শেষ চালটা দেবার । আর, কোম্পানিতে গদ্দারির একটাই শাস্তি । মৃত্যু । সেই মৃত্যুর মুখোমুখিই আজ দাঁড়িয়ে আছে বুলেট । মানকুন্ডু আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের মঞ্চেই খতম করা হবে তাকে । এটাই সিদ্ধান্ত । ডি.কে আর একটা সুযোগ দেবার পক্ষপাতী ছিলেন । কিন্তু আফতাব আর মিস নাতাশা-র জেদ তাঁকেও টলতে বাধ্য করল । এমনকী গত সপ্তাহে মধ্য-কলকাতার একটা হোটেলে পাপ্পু-র ডানহাত ল্যাংড়া-দিলীপের সঙ্গে পঞ্চু-র গোপন মিটিঙের ভিডিও ক্লিপিংস-ও ততোক্ষণে পেশ করা হয়ে গেছে ডি.কে-র সামনে । প্রমাণ হিসেবে । অতএব, একটাই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত—‘খালাস’ !

মাইক্রোফোনের সামনে এগিয়ে গেল বুলেট পঞ্চু । তার পেডিগ্রি কিন্তু একেবারেই হেলাফেলার মতো নয় । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসকম কমপ্লিট করে সে ট্রেনি জার্নালিস্ট হিসেবে ঢুকেছিল ‘বিশ্ব জনরব’ সংবাদপত্রে । তাকে মারার সুপারি পেল হুব্বা গণেশ । তার হাতের টিপ অব্যর্থ । হুব্বা এখন পিএইচডি করছে পাটুলির সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সে । যে ওপেন এয়ার মঞ্চে কবিতা পাঠ, তার ঠিক উল্টোদিকে, একটা তিনতলা বাড়ির ছাদে লং-রেঞ্জ মাইক্রোস্কোপিক রাইফেল নিয়ে নিশানা তাক করছে সে । মঞ্চে অন্য কবিরা ছাড়াও এলাকার বিশিষ্ট এম.এল.এ, ব্যবসায়ী, গোটা জুটমিল এলাকার ‘ডন’ ভিখু মাত্রে হাজির সেই মুহূর্তে । বাংলা কবিতার বিবর্তন ঘটতে ঘটতে আজ এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে যে আজ প্রাতিষ্ঠানিক মহলে সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায় কবিতার উৎকর্ষ । তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি কবির হায়ারার্কি-তে অবস্থান, তার ক্ষমতাবানের সঙ্গে যোগাযোগ, পাইয়ে-দেবার ক্ষমতা, বিগহাউজ থেকে তার কটা বই বেরিয়েছে, সেই হিসেব । সেদিক থেকেও বুলেট পঞ্চু অনেককেই দশ গোল দেবে । একটা গেরুয়া বারমুডা আর ব্যাকপ্যাক কাঁধে কবিতা পড়তে শুরু করল সে । প্রথম কবিতাটি পড়ার পরেই আকস্মিক একটা শব্দে লুটিয়ে পড়ল পঞ্চু । নিখুঁত নিশানা । একেবারে দুই ভ্রূ-র মধ্যিখানে শুট করেছে হুব্বা । অত্যন্ত যত্নে রাইফেলের পার্টসগুলো খাপে ঢোকাতে ঢোকাতে হুব্বা একবার তার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকাল । ইনবক্সে গিয়ে আরেকবার দেখে নিল আফতাব-দার শেষ মেসেজ—‘ঠোক দে’ । ধীর পায়ে হেঁটে নেমে এল সে । বাইরে একটা কালো গাড়ি ওয়েট করছিল তার জন্য । সে উঠে পড়ল সেটায় ।

মঞ্চে ততোক্ষণে হুলস্থুল পড়ে গেছে । উদ্যোক্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বুলেটকে সঙ্গে সঙ্গে কাছের হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেও অদ্ভুত নিরাসক্ত ছিল উপস্থিত কবিদের একাংশ । এমনকী, মঞ্চে তাজা রক্তের দাগ দেখেও তাদের মধ্যে দু’জন কবিতা পড়েছে । একজন মহিলা কবি তো তখনও নেলপালিশ রিমুভার দিয়ে নখের রঙ তুলছিল । পনেরো মিনিটের মধ্যে মেজর সবকটা চ্যানেলের ওবি ভ্যান হাজির ঘটনাস্থলে । বাংলা কবিতায় এই অস্বাভাবিক হিংস্র পরিস্থিতিকে যেকোনো মূল্যে মোকাবিলা করার ডাক দিয়েছেন ডি.কে । তার বাইট ইতিমধ্যেই অন-লাইন টেলিকাস্ট হচ্ছিল । সেইসঙ্গে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়া বুলেটের সিসিটিভি-ফুটেজ । তৎসহ, বুলেট খুন হয়ে যাবার পরেও কবিদের কবিতা-পাঠের দৃশ্য । পাপ্পু-র বাইট এল আরও পরে । তিনিও তীব্র ভাষায় সরকার ও বাংলা কবিতার একাংশকে দায়ী করলেন এই হিংসার জন্য । বস্তুত, তাঁর বক্তব্য ছিল অনেক বেশি রাজনৈতিক আক্রমণে ভরপুর । ক্যামেরা কভার করল প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, স্কটিশ-সহ একাধিক মফস্‌সল কলেজ-ক্যাম্পাসের উঠতি কবিদের । তাদের কেউ কেউ বুলেট-দার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সখ্য বোঝাতে গিয়ে কেঁদেও ফেলল । অনেক বছর আগে রামগোপাল ভার্মা নামের এক বলিউড পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিল—‘কোম্পানি’ । সে ছবি এখন ক্লাসিকের চেহারা পেয়েছে । একটা টেভিশন চ্যানেল তাদের সন্ধেবেলার এক ঘন্টার টক-শোর নাম দিল—‘বাংলা কবিতায় গ্যাং-ওয়ার’, সেইসঙ্গে ‘কোম্পানি’ সিনেমাটির ক্লিপিংস । নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিনের কবিরাও সেই সন্ধ্যায় এক বিরাট প্রতিবাদ-সভার আয়োজন করে । সেই সভাও লাইভ কভার করল আর একটা চ্যানেল । ঘটনার পরমুহূর্ত থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও যাবতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিন্দা, ঘৃণা ও প্রতিহিংসামূলক পোস্ট পরতে শুরু করে । সেখানে নাম করে এবং না করে হত্যাকান্ডের নেপথ্যনায়কদের চিহ্নিত করা হয় । সর্বস্তরে বয়কটের ডাক দেওয়া হয় । পরদিন সকালে সবকটা খবরকাগজেই ফ্রন্টনিউজ ছিল এটাই । শুধু কোথাও ছাপা হয়নি সেই রাতে ডি.কে-র পার্সোনাল চেম্বারে কী কী ঘটেছিল । কে কে সেখানে ছিল । কীরকম ছিল সেই কোর কমিটির মিটিঙের ছবি ।

বসন্ত রায় রোড, ডিকে-র অ্যান্টিচেম্বার
হুব্বাই প্রথম নীরবতা ভাঙল । ডি.কে তখনও আসেননি । রাউন্ড টেবিলের চারপাশে ছড়িয়ে বসে আছে রকেট মন্ডল, আফতাব, মিস নাতাশা আর এই কোর গ্রুপে নতুন এন্ট্রি হুব্বা । বলল—“আমার নতুন কবিতাটা শোনো তো একবার রকেটদা”। “দে দেখি, কী লিখেছিস”—রকেট হাত বাড়িয়ে হুব্বার মোবাইলটা নেয় । নোটপ্যাডে কয়েকটা টুকরো কবিতার গুচ্ছ । “দলবৃত্ত উইথ পোস্টমডার্ন দর্শনের পান্‌চ”—হুব্বা একথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই রেগে ওঠে রকেট । “ওসব পোস্টমডার্নিজম এখন পুরোনো, বাসি
হয়ে গেছে বস । এটা পাওয়ার-পোয়েট্রির যুগ”…
–সেটা কী রকেট-দা ?
–মনে করে দেখ, বস সেদিন কী বলেছিল । সমস্ত মানবিক বৃত্তির মূলেই রয়েছে ক্ষমতার এষণা । সেই আকাঙ্ক্ষাকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে ।
–হ্যাঁ । মনে আছে । আমি তোমাদের খাবার সার্ভ করছিলাম সেইদিন ।
–কালকের ঘটনার রিয়্যাকশন লিটল ম্যাগাজিন-লবিতে কীরকম হয়েছে হুব্বা ?
–খুব খারাপ প্রতিক্রিয়া দাদা । সবাই বুঝতে পারছে এটার পিছনে কার হাত রয়েছে…
–সেটা আমিও আন্দাজ করেছি আগেই । আচ্ছা ওই ছেলেটার নামটা যেন কী ?
–কোন ছেলেটা দাদা ?
–আরে ওই ধনেখালি-র ছেলেটা । যাকে ‘লিটল ম্যাগের প্রিন্স’ বলে ডাকছে এখন সবাই ।
–কণিষ্ক মজুমদার ।
–রাইট । তার অ্যাক্টিভিটি ডিটেইল পেয়েছিস কিছু ?
–রকেট-দা, গোটা লিটল ম্যাগ লবিতে আমাদের এজেন্ট ছড়ানো রয়েছে । কণিষ্ক-র প্রত্যেকটা স্টেপ আমার নজরে আছে । বহুত বাড়াবারি করে ফেলছে ও । ফেসবুকে ওর ফলোয়ার কতো জানো এখন ?
–ফলোয়ার ? কতো ?
–প্রায় সওয়া দুই লাখ…আর তারা ওর পোস্ট পড়ামাত্রই শেয়ার করে…সেটাও কম এফেক্টিভ নয় !
–নিশ্চয়ই । তুই ওর ফেসবুক পেজের লেটেস্ট পোস্টগুলোর স্ক্রিনশট পাঠাস তো আমায় । আর কালকের ঘটনা নিয়ে কিছু লিখেছে নাকী ও ?
–হ্যাঁ । আধ ঘন্টার মধ্যে । পোস্টের শিরোনাম ‘মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলো’ !
–বলিস কী ! বসকে নিয়ে লিখেছে কিছু ?
–ছত্রে ছত্রে বস আর তোমাদের তিনজনকে আক্রমণ !
–দাঁড়া । বসকে জানাতেই হচ্ছে এটা । বসের আবার মাঝে মাঝে দয়াধর্ম উথলে ওঠে ! মাথা গরম হয়ে যায় আমার…

বাংলা কবিতা । এখানে মাফিয়া আছে । সুপারি কিলার আছে । আছে ফড়ে, দালাল, কমিশনখোর । আছে আইটেম গার্ল, চিয়ারলিডারের দল । আছে দু-এক পিস স্টারলেট । এদের সকলকে এক মঞ্চে নিয়ে চলা চাট্টিখানি কথা নয় । অনেক ত্যাগ, কৌশল, দূরদর্শিতা, নিজের অহং-কে নত করা, সুযোগ পাওয়ামাত্রই প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিকেশ করার জটিল খেলায় পারদর্শিতা দেখিয়ে তবে এই সিংহাসন দখল করেছেন ডি.কে । নিজের এই উত্থানের কাহিনি তিনি সবিস্তারে লিখেওছেন আত্মজীবনীতে । ‘সিঁড়ির পরের ধাপ’ । বইটির নাম । গতবছর বইমেলাতেই বেরিয়েছে । আর প্রকাশমাত্রই সুপার-ডুপার হিট । রাত এখন প্রায় দশটা । মানকুন্ডু থেকে বুলেটের মৃতদেহ কলেজস্ট্রিট ঘুরে নন্দন চত্বরে শোয়ানো হয়েছিল আজ । ডি.কে গিয়েছিলেন । মালা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি । বলেন—“বাংলা কবিতার শহিদ বুলেট পঞ্চু নেই আমি ভাবতেই পারছি না । এ আমার আত্মীয়বিয়োগ”। টিভিতে দেখেছিল রকেট, আফতাব, মিস নাতাশা । নাতাশা আর আফতাবের ঘনিষ্ঠতার কথা এখন সার্কিটে ‘ওপেন সিক্রেট’ । রকেট আড়চোখে লক্ষ করছিল থেকে থেকেই আফতাবের হাত চলে যাচ্ছে নাতাশার কাঁধে । একেক সময় মনে হয় এই দুটোকেই উড়িয়ে দিই । তারপর বসকেও খতম করে পুরো কোম্পানির মাথায় গিয়ে বসি । সন্দেশখালি থেকে দক্ষিণ কলকাতার এই ডেনে ঢুকতে তাকেও দিতে হয়েছে দশটা বছর । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে সে সদ্য জয়েন করেছে কলকাতার একটা কলেজে, অধ্যাপক হিসেবে । লোকে আড়ালে বলে, তার এই হোম-পোস্টিং-এর পিছনে রয়েছে ডি.কে-র হাত । কেবল রকেট নিজেই জানে কী অমানুষিক পরিশ্রম সে করেছে এই ধাপগুলো পেরিয়ে আসতে গিয়ে । বসের ছোটোবেলা-র লিটল ম্যাগ ‘বাল্মিকীর চোখ’ এখনও বেরোয় । এম.এ ফাইনাল পেপারের আগের রাতেও সে ওই কাগজের প্রুফ দেখে প্রেসে মেইল করে দিয়েছে, তারপর পড়তে বসেছে । সারারাত পড়ার পর না-ঘুমোনো চোখে পরীক্ষাহলে ঢুকে লিখেছে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর । প্রথম তিনজন টপারের একজন ছিল সে । আজ গোটা ছবিটা জলের মতো পরিষ্কার তার সামনে । বসের এখন সত্তর । ছেলে-মেয়েরা বিদেশে সেটলড । স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে কয়েকবছর আগেই । তারপর থেকেই কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছেন তিনি । ক্ষমতা, প্রতিপত্তি-র যতো চূড়ায় উঠছেন, ততোই যেন নির্লিপ্তি কাজ করছে লোকটার ভিতরে । আর এই নির্লিপ্ত ভাবটা দেখলেই গা জ্বলে যায় রকেটের । বুলেটকে মারার অনুমতি আদায় করতে লেগেছিল প্রায় এক সপ্তাহ । মানুষটা কী শেষ অব্দি সাধু-সন্ত হয়ে যাবে নাকী ? বোঝা দায় ! তবে যতো দ্রুত সম্ভব আফতাব-নাতাশার এই জুটিকে শেষ করতেই হবে তাকে । নইলে বসের সিংহাসনের নিরঙ্কুশ উত্তরাধিকার হাতে আসবে না তার । বিদ্যুতের গতিতে মাথা কাজ করে রকেটের । কাকে আগে মারবে সে ? বস ? নাকী এই হিংস্র জুটি ? জোজো নামের একটা মেয়ে কোম্পানিতে এসেছে আজ বছরখানেক । পিওর আইটেম । কিন্তু ভিতরে পার্টস আছে । তার কাছে নিজেকে নিবেদন করেছে মেয়েটি । রকেটও আশ্বাস দিয়েছে তাকে । স্বপ্ন দেখিয়েছে নাতাশার জায়গায় তাকে বসাবেই একদিন সে । একটু লো-প্রোফাইল হলেও মেয়েটার মাথা একেবারে শেয়ার-মার্কেট স্পেকুলেশনের মতো কাজ করে । এখন অবশ্য যারাই কোম্পানিতে ঢুকছে সকলেই চূড়ান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও স্কিম্যাটিক । কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয় । বস বোধহয় নিজেও জানে না, ইতিমধ্যেই কোম্পানির ভিতর নিজের বিরাট লবি বানিয়ে ফেলেছে রকেট মন্ডল । যারা চায়, সে সিংহাসনে বসুক । পরমুহূর্ত থেকে তারাই জয়ধ্বনি দেবে রকেটের নামে । একটা যুগ শেষ হবে বাংলা কবিতার । শুরু হবে নয়া-যুগ । রকেট-যুগ ।

ডিকে ঢুকলেন ঘরে । রাতে বসের সঙ্গে ডিনার সারত এতোদিন ওরা চারজন । তার ভিতর একজন তো আজ দুপুরেই খতম হয়ে গেছে । তার মানে আজ থেকে তারা তিনজন আর বস । ডি.কে-র চোখে আজ উদাস দৃষ্টি । আফতাব জিগেস করল :
–কিছু হয়েছে নাকী স্যার ?
–মনটা আজ ভালো নেই আফতাব । খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন ডি.কে ।
–বুলেটের ব্যাপারটা ভাবছেন ?
–কাজটা ঠিক হল না নাতাশা…

নাতাশা এইসব ক্ষেত্রে কখনোই কোনো উত্তর দেয় না । চুপ করে থাকে । আজও তার ব্যতিক্রম হল না । বসের চোখে কেমন একটা উদাস দার্শনিক দৃষ্টি । আজ বসের গায়ে ধবধবে সাদা চাদর । পরণে সাদা পায়জামা । পায়ে হরিণের চামড়ার জুতো । এই দার্শনিকতা দেখলেই পিত্তি জ্বলে যায় রকেটের । লোকটা মারাত্মক ভালো মুখোশের কারবার করতে পারে, ভাবে সে । সেদিন এই ঘরে, এই টেবিলে বসেই তো সিদ্ধান্ত হয়েছিল বুলেটকে মারার । আর, তার পিছনে যথেষ্ট স্ট্রং কারণও ছিল । আজ এইসব ভ্যানতাড়ার কোনো কারণ আছে নাকী ? আজব লাগছে ব্যাপারটা । বস যেন কোন আশ্চর্য জাদুবলে টের পেয়ে যান তার মনের ভিতরটা । খুব শান্ত, ধীর স্বরে জিগেস করেন :
–তুমি ভাবছ, আমি কেন আজ এতোটা স্থির হয়ে আছি, তাই না রকেট ?
–না, মানে ঠিক তা নয় স্যার !
–তবে ? আমি আজ উল্লাস করলে তোমার স্বাভাবিক লাগত ?
–আমরাই বুলেটের সুপারি দিয়েছিলাম হুব্বাকে, স্যার !
–বোকা ! মারতে হয় রকেট । ডানা ছেঁটে ফেলতে হয় । গুমখুন করাতে হয় । রাতের অন্ধকারে লাশপাচার করাতে হয় । সবই করতে হয় । কিন্তু, ইনভলভড হতে নেই কোনো কিছুর সঙ্গে । বুঝেছ ?
–না । বুঝিনি স্যার । আপনার এই আচরণ আমার অদ্ভুত দ্বিচারিতা বলে মনে হয় !
–দূর পাগল ! দ্বিচারিতা নয় । নেমেসিস বলে একটা জিনিস আছে । গ্রিক ট্র্যাজেডি পড়োনি তুমি ?
–পড়েছি স্যার । তবে কোম্পানির ভালোর জন্যই নিষ্ঠুর হওয়া দরকার মাঝেমধ্যে, এটাই আমার মত…
–সে তো বটেই । তবে মনের ভেতর কোনো মালিন্য, কোনো ক্লেদ রাখবে না রকেট । মন থাকবে অনাঘ্রাত পদ্মের পাঁপড়ির মতো স্বচ্ছ, পবিত্র ।
–যাই বলুন স্যার, আমার মনে হয় বয়সের সাথে সাথে আপনার শার্পনেস কমে আসছে । আপনার উচিত আরো বেশি দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া…
–তুমি খুব ছটফট করছ ভেতরে ভেতরে, তাই না রকেট ?
–কীসের জন্য স্যার ?
–ক্ষমতার জন্য । উচ্চাশার জন্য । অ্যাকশনে নামার জন্য । খুব দ্রুত সবকিছু অ্যাচিভ করার জন্য ।
–সেটা কী অন্যায় স্যার ?
–না অন্যায় নয় । কিন্তু জীবনের অনন্ত সৌন্দর্যকে আগে অনুভব করতে শেখো রকেট । গীতা পড়ো মন দিয়ে । আর, নির্লিপ্ত হয়ে যাও ভেতরে ভেতরে…
–কিছু মনে করবেন না স্যার । আপনার এই কথাগুলোকে আপনার সঙ্গে ঠিক মেলাতে পারি না আমি ।
–পাগল ! হেসে উঠলেন ডি.কে । তারপর হুব্বার দিকে তাকিয়ে বললেন—“আমাদের ডিনার দাও হুব্বা । আর শোনো, আজ থেকে তুমিও বসবে আমাদের সঙ্গে একই টেবিলে…কেমন?”

অভিভূত হুব্বা এমনভাবে চেয়ে রইল, যেন, এক মহাপুরুষের মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী শুনছে সে ।

খাওয়া শুরু হলে, আফতাবের দিকে তাকিয়ে জিগেস করলেন ডি.কে—“সার্কিটের আর সব খবর কী বলো তো ? লিটল ম্যাগ থেকে নাকী জোরদার আন্দোলন শুরু হয়েছে ?”
–স্যার, ওই কণিষ্ক ছেলেটা বহুত বাড়াবাড়ি শুরু করেছে…আপনার বিরুদ্ধে লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করবে ওরা কাল থেকে কলেজস্ট্রিট আর নন্দন চত্বরে…
–করতে দাও । আর কী কী শুনলে বলো…
–অলরেডি ফেসবুকে ট্রোলিং শুরু হয়ে গেছে…যে পরিমাণ কুৎসা আর অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে চলছে তাতে আমাদের এখনই কিছু একটা করা দরকার স্যার । আমি তো শিওর, এই পুরো নেটওয়ার্কটার পিছনে পাপ্পু-স্যারের মদত আছে…
–পাপ্পু-কে আমি বুঝে নেব । কিন্তু কণিষ্ককে নিয়ে কী করা যায় বলো তো ?
–তুলে নিয়ে এসে উড়িয়ে দেব স্যার ?
–তুমি আর নাতাশা দুজনেই ম্যানেজমেন্টে মাস্টারডিগ্রি করেছিলে, তাই না ?
–হ্যাঁ স্যার ।
–তারপরেও অন্য কিছু ভাবতে পারছ না ?
–ওটাই বেস্ট সলিউশন স্যার । এবার রকেট বলে ওঠে ।
–না । আর কোনো রক্তপাত এখুনি চাই না আমি । মাথাটা একটু খাটাতে শেখো তোমরা…
–আপনি অন্য কিছু ভাবছেন স্যার ?
–এবার ‘বিহারী বটব্যাল স্মৃতি পুরস্কারের’ নমিনেশন কার কার নামে আছে আফতাব ?
–আমাদের লবি-র দুজন । পাপ্পু স্যারের লবির দুজন । আমাদের কোটা তো ফিক্সড স্যার । দুটো লবি থেকে দুজনকে যৌথ পুরস্কার দেওয়া হবে । আমাদের জোজো আর ওদের শেখ সুলেমান…
–আরও একটা নাম ঢুকবে রকেট । আর শোনো, পুরস্কার এবার যৌথ হবে না । একজনই পাবে ।
–কে সে স্যার ?
–কণিষ্ক মজুমদার…
–আপনি পাগল হয়ে গেছেন স্যার ? এই কণিষ্ক নিজের গ্যাং নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । ঘোষিত প্রতিষ্ঠানবিরোধী । সরকারি পুরস্কার-বিরোধী । ও আমায় বা আফতাবকে একলা পেলে যেকোনো দিন টপকে দেবে…
–না । দেবে না । সবাইকে কি একইভাবে মারতে আছে রকেট ? একেকজনকে মারার তরিকা একেক রকম
হয় । সব অস্ত্র সবার উপর প্রয়োগ করতে যেয়ো না । অনেক সময় ঘুরপথে কাজ হয় অনেক বেশি । মাথাটা খাটাও রকেট । তাড়াহুড়ো কোরো না এতো…
–তাই বলে বাংলার সর্বোচ্চ মূল্যের তরুণ কবির সরকারি পুরস্কার আমরা ওই ছেলেটাকে দেব স্যার ? যে কিনা আমাদের বিরুদ্ধে লাগাতার জনমত গড়ে তুলছে ? আর, ও যদি পুরস্কার প্রত্যাখান করে ?
–সেটা তোমরা আমার উপর ছেড়ে দাও । আমি জানি কীভাবে কাকে অ্যাপ্রোচ করতে হয়…

রকেট, আফতাব, নাতাশা—তিনজনেই বিস্ময়ে চুপ হয়ে যায় । তারা বোঝে, তাদের চেয়ে আজও ঢের বেশি এগিয়ে ডি.কে । হুব্বা খাওয়া থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে ডি.কে-র দিকে । টের পায়, আজ ডি.কে-র মুখ থেকে একধরনের অদৃশ্য নিক্তি বেরোচ্ছে । এক অপার্থিব দার্শনিক প্রত্যয় তাঁর চোখে-মুখে…

রকেট’স ডেন, নারকেলডাঙা মেইন রোড
রকেটের রোমশ বুকে নিজেকে মিশিয়ে দিতে দিতে ফুঁপিয়ে ওঠে মিস জোজো । তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় রকেট । এটা একরকম নির্ধারিতই ছিল দশ লক্ষ টাকা মূল্যের এই সরকারি পুরস্কার এইবার জোজোই পাবে । গোটা সার্কিটে এটা একরকম রটেই গিয়েছিল । আর রকেটের কাছে এটা ছিল চ্যালেঞ্জ । তার প্রেমিকার জন্য । এক ধাক্কায় আফতাব-নাতাশা জুটিকে টলিয়ে দেবার জন্য । রকেট জানে তাদের লবিরই আর একটি ছেলে, নরেন কিস্কু, ছিল ওদের ক্যান্ডিডেট । সে নিশ্চিত ছিল, আফতাবদের ছেলেটাকে টপকে সেই পারবে তার জোজোর জন্য মুকুট ছিনিয়ে আনতে । বিশেষত, তাকে অন্ধের মতো ভরসা করেন ডি.কে । এটা সে বহুবার লক্ষ করেছে । কিন্তু কোনো কিছুই হল না । লোকটা শেষ মুহূর্তে সবকিছু গুবলেট করে দিল । আরো আশ্চর্য, সে ভেবেছিল শেষ অব্দি কণিষ্ক পুরস্কারটা নেবে না । রিফিউজ করবে । এটাও সে বুঝতে পারছে না, কোন মন্ত্রবলে কণিষ্ককে রাজি করানো গেল । তবে, একদিক থেকে সুবিধেই হল । এরপর রকেটের এজেন্টরা জোরদার প্রচার চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে—“নকল প্রতিষ্ঠানবিরোধী কণিষ্ক মজুমদার দূর হটো”। ডি.কে-র গ্যাং-এর ভিতরে যেরকম তার নিজের শক্তিশালী লবি আছে, লিটল ম্যাগের সার্কিটেও সেরকমই একটা অত্যন্ত স্ট্রং লবি আছে রকেটের । এগুলোই সে তৈরি করেছে বছরের পর বছর ধরে । নিজেকে ডি.কে-র একমাত্র সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে তুলেছে সে । তা সত্বেও আজ সব কেমন ভন্ডুল হয়ে গেছে । হতাশ লাগছে । ফাঁকা লাগছে । সবচেয়ে বেশি যেটা হচ্ছে, সেটা হল ভয় । সে এখনও পুরোটা বুঝে উঠতে পারে না ডি.কে-কে । যখনই সে ভাবে লোকটার ভাবনার গতিপথ ধরতে পেরেছে, ঠিক তখনই ডি.কে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে পাড়ি দেন । যে পথের হদিশ টেরও পায় না রকেট ।

–ভেবো না । নেক্সট বছর এই পুরস্কার তুমিই পাবে । আমি যে করেই হোক, আদায় করব এটা ।
–পারবে না তুমি । জানি আমি । চোখের জল মুছতে মুছতে বলে জোজো । যতোদিন ডি.কে বেঁচে আছে, তোমার কোনো উত্থান হবে না রকেট । মিলিয়ে নিও ।

মেয়েমানুষের কথায় একেক সময় নেশা ধরে যায় । মনে হয়, নিজের চেয়েও ঢের বেশি সত্যি উচ্চারণ করে তারা । প্রবল এক অক্ষম আক্রোশে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে রকেটের । সে এই শেষ সাত-আট বছর কী-ই না করেছে ডি.কে-র জন্য । একা হাতে দলের ভিতরের যাবতীয় অসন্তোষ আর বিক্ষোভ মিটিয়েছে । সুকৌশলে সরিয়ে দিয়েছে পাপ্পু তিওয়ারি-র গ্রুপের একের পর এক ছেলেমেয়েকে । তাদের অধিকাংশ আজ ডি.কে-র গ্রুপে জয়েন করেছে । বাকিরা লেখা ছেড়ে দিয়েছে । গালকাটা নিমাইয়ের কথা মনে পড়ে । সে ছিল প্রেসিডেন্সি-র নামী স্কলার । আদাজল খেয়ে নেমেছিল ডি.কে-র বিরুদ্ধে । এক মাঝরাতে তাকে তার মেস থেকে তুলে নিয়ে আসে রকেট আর তার বাহিনী । মেরে হাঁটুর মালাইচাকি খুলে নেওয়া হয় তার । দোমড়ানো-মোচড়ানো শরীরটা কুঁকড়ে পড়েছিল ফেভারিট কেবিনের সামনের রাস্তায় । আশিস উপাধ্যায় নামের সেই হালিশহর থেকে আসা ছেলেটাও ডি.কে-র বিরুদ্ধে লিখেছিল ইস্তেহার । তার বিরুদ্ধে পাপ্পু-র দলেরই একটা মেয়েকে দিয়ে মিথ্যে শ্লীলতাহানির কেস ঠুকে দেয় সে । ফেসবুক তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল ছেলেটার ইনবক্স মেসেজের স্ক্রিনশটের ছবি পোস্ট হবার পর । যখন যা দরকার পড়েছে, বিনা দ্বিধায়, বিনা বাক্যব্যয়ে করে গেছে রকেট । আজ, এই তার প্রতিদান ?

–আচ্ছা, তোমার আফতাব-নাতাশার উপর সন্দেহ হয় না ? রকেটের গলা জড়িয়ে ধরে বলে জোজো ।
–হয় । আমি নিশ্চিত ওরা গত দু-বছর ধরে আমায় টার্গেট করেছে ।
–তারপরেও তুমি কোনো অ্যাকশন নাওনি ?
–আমার হাতে যথেষ্ট প্রমাণ নেই এখনও জোজো । তবে আমি নিশ্চিত, নাতাশা ডি.কে-কে বশ করে ফেলেছে । আমায় একটু ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করতে দাও । আগে ডি.কে-র ব্যবস্থা করতে হবে আমায় । তারপর বাকিটা এমনিতেই হাতে চলে আসবে । ডি.কে-কে শেষ করে দিতে পারলে ওদের ডানা এমনিতেই ভেঙে যাবে সোনা । আমায় একটু সময় দাও…
–তুমি একটা ডরপোক । আমার টের পেতে বাকি নেই তোমার দ্বারা কী কী হতে পারে…
–এভাবে বোলো না । আজ রাতের মধ্যে আমায় পুরোটা গোছাতে হবে ।

কী করবে ততোক্ষণে ভেবে নিয়েছে রকেট । খতম । একটাই রাস্তা । ডি.কে-কে সরিয়ে দিতে হবে । আর কোনো রাস্তা নেই । ইতিহাস কোনো যুগেই বদলায় না । মধ্যযুগে রাজাকে হত্যা করেই সিংহাসন দখল করা হত । আজও তার ব্যত্যয় হবে না । ডি.কে-র মৃত্যুতেই অবশ্য তার পুরো সাম্রাজ্য হাতে আসবে না রকেটের । কারন ডিকে এই আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করেছেন তিল তিল করে, সমাজের সর্বস্তরে নিজের প্রভাব অর্জনের
মধ্য দিয়ে । সেদিক থেকে, রকেট এখনও শত যোজন দূরে অবস্থান করছে ডিকে-র । বরং উলটোও হতে পারে । এই অ্যাকশন তাকে একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে । তার যেটুকু গ্রহণযোগ্যতা আজ তৈরি হয়েছে, সে তো ডি.কে-র দৌলতেই । ডি.কে-কে বাদ দিলে সে আজও অচল আধুলির বেশি কিছুই নয় । আজ সে সম্যক টের পাচ্ছে, কেন ডি.কে তার তূণের সব অস্ত্র দলের ছেলেমেয়েদের কাউকেই দেখান না । কেন তিনি কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার তৈরি করেন নি । সম্ভবত, করবেনও না । তবু, সুযোগ বারবার আসে না । আর, যে হাত অজস্রবার রক্ত মেখেছে, তার শরীরে সামান্য রক্তের ছিটে লাগলে কী-ই বা ক্ষতি ? ডি.কে-ও এভাবেই উঠেছিলেন । তাঁর মেন্টর-কে হত্যা করে । সেই পুরো চ্যাপ্টার সে জানে । মুখস্থ তার ।

এই মুহূর্তে তার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী হুব্বা । সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে ফোন করে হুব্বাকে । আগামীকাল বিকেলে দমদম রবীন্দ্রমঞ্চে ডি.কে-র বিশেষ সম্বর্ধনা । ডি.কে-র গাড়ির চালক থাকবে হুব্বা । একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে থাকবে রকেট মন্ডল । হ্যাঁ, বুলেট পঞ্চুর মতোই রকেটও একজন দক্ষ শার্প শুটার । সেও দু-হাতে অনায়াসেই নির্ভুল লক্ষ্যে গুলি ছুঁড়তে পারে । ডি.কে-র যেকোনো যাত্রাপথের রুটম্যাপ তৈরির দায়িত্ব আজও রকেটের উপরেই দেওয়া আছে ।

কিলিং ফিল্ড, পাতিপুকুর রেলইয়ার্ড
বুলেটপ্রুফ গাড়িটা এসে থামল শ্যাওলাধরা একটা দেয়ালের কিনার ঘেঁষে । পুরো নিখুঁত চিত্রনাট্য সাজিয়েছে রকেট । এমনিতেই শত্রুপক্ষের চোরাগোপ্তা হানাদারি থেকে বাঁচতে বসের রুটম্যাপ ঘন ঘন চেঞ্জ হয় । আর এই বদলের দায়িত্বে থাকে রকেট । আজও সেরকমভাবেই সে খুব কৌশলে ডি.কে-র গাড়িটাকে নিয়ে এসেছে এই প্রায়-জনশূন্য ন্যাড়া মাঠে । সন্ধে পেরিয়ে গেছে । লোকজন নেই চারপাশে । সাইলেন্সর-লাগানো রিভলবারটা ডি.কে-র কোমরে ঠেকিয়ে তাঁকে গাড়ি থেকে নামাল রকেট । স্টিয়ারিং-য়ে থাকা হুব্বা গণেশ এখন রকেটের ডানহাত । সে তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশে নজর রাখছিল আর কভার দিচ্ছিল এই দুজনকে । বহু-ঘাটের জল-খাওয়া পোক্ত মানুষ ডি.কে । একেবারে শেষ মুহূর্তেও তিনি খেলা পুরো উলটোদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন । তাই এই শেষ সুযোগ একটুর জন্যও হাতছাড়া করতে চায় না রকেট । এবং সে জানে, আজ ব্যর্থ হলে তারই কবর খোঁড়া হবে এই প্রান্তরে । খরগোশের ক্ষিপ্রতায় সে আরও একবার মেপে নেয় সবটা । খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে :
–সময় নেবেন না । নামুন স্যার…
–তুমি এটা অন্যায় করছ রকেট । করতে পারো না তুমি এটা আমার সঙ্গে । ততোধিক ঠান্ডা ডি.কে-র গলা ।
–কোনটা অন্যায় স্যার ? আপনিই তো শিখিয়েছিলেন ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই—পুরোটাই আপেক্ষিক । নিট্‌শের ‘সুপারম্যানের’ কনসেপ্ট আপনিই পড়িয়েছিলেন । আজ এইসব বললে আমি শুনব কেন ?
–আমি তোমায় হাতে ধরে এই জায়গায় তুলেছি রকেট ।
–আপনাকেও কেউ একইভাবে তুলেছিল স্যার । আপনিও তাকে একইভাবে মেরেছিলেন ।
–আমি কাউকে হত্যা করিনি । অনেক লড়াই আর মেহনতের বিনিময়ে আজ এই চূড়ায় পৌঁছেছি আমি ।
–হত্যা করেননি । হয়তো গুমখুন করেছেন বা আস্তে আস্তে ইন্যাক্টিভ করে দিয়েছিলেন তাঁকে । নামুন স্যার । ওই শেডের দিকটায় চলুন । এটাই আপনার নেমেসিস । আমি না হলে আর কেউ করত এটা ।

ডি.কে সামনে । পিছনে রকেট আর হুব্বা এগিয়ে যায় । পাশাপাশি । দুজনেরই হাতে রিভলবার ।

হঠাৎ, একটা হালকা ধাতব আওয়াজ শোনে রকেট । প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে সে দেখতে পায় একটা বুলেট এসে বিঁধেছে হুব্বার বুকে । মুহূর্তের আর্তনাদ । কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হুব্বা । আতঙ্কে শিঁরদাড়া দিয়ে শীতল ঘাম নেমে আসে রকেটের । সে নির্ভুল টের পায় গোটা ব্যাপারটা তার হাতের বাইরে চলে গেছে । কিন্তু, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, এতো নিখুঁতভাবে সাজানো তার এই প্ল্যান কীভাবে ভেস্তে দিলেন ডি.কে । আর কাউকে সে ঘুণাক্ষরে টেরও পেতে দেয়নি এই পরিকল্পনা । তা সত্বেও কীভাবে ? কীভাবে, কোন গুপ্ত মন্ত্রবলে পাকা ঘুঁটি নষ্ট করে দিল বস ? কে আছে এর পিছনে ? তার নিজের শেষ পরিণতি ঘনিয়ে আসছে নিশ্চিত । মুহূর্তের অন্যমনস্কতার ভিতরেও সে চমকে উঠে টের পায় কতোখানি নির্বোধ আর কাঁচা সে । আর একটা গুলি ছুটে এসে তার ডান হাতে লাগে । খসে পড়ে রিভলবার । অসহ্য যন্ত্রণায় হাত চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ে রকেট মন্ডল ।

শেডের আড়াল থেকে উদ্যত পিস্তল উঁচিয়ে যে এগিয়ে আসে, তাকে দেখে আরও চমকে যায় রকেট । স্লো মোশনে, থ্রিলার ছবির শেষ দৃশ্যের মতোই ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে কণিষ্ক মজুমদার । লিটল ম্যাগের প্রিন্স । যে এই সেদিন অব্দি ডি.কে-র নামে খারাপ কথা বলেছে অনর্গল । তার পিছনে একে একে এসে দাঁড়ায় আফতাব, নাতাশা, হাতকাটা বিনোদ এবং, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না সে । ধীর পায়ে হেঁটে এসে উদ্যত পিস্তল হাতে কণিষ্কের পাশে এসে দাঁড়ায় জোজো । তারা দুজনে মিলে কর্ডন করে রাখে ডি.কে-কে ।

–তোমার প্রত্যেকটা প্ল্যান আমি জানতাম রকেট । শুধু তুমি জানতে না কণিষ্ক এর মধ্যেই আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করেছে । জোজোও আর তোমার পাশে নেই । আজ ওরা এখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল । ভালো থেকো ।

ডি.কে-র চোখে-মুখে এক আশ্চর্য নির্লিপ্তি আর উদাসীনতা । জোজো এগিয়ে আসে । সরাসরি রকেটের দুই ভ্রূ-র মাঝখানে গুলি চালায় । নিথর রকেটের দেহটা কয়েকবার কেঁপে উঠে অবশেষে স্থির হয়ে যায় । এবার কণিষ্ক এগিয়ে এসে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে দেয় ডি.কে-কে । তার পাশে বসে সে । স্টিয়ারিং হুইলে গিয়ে বসে জোজো । পিছনের গাড়িতে এগোতে থাকে বাকিরা । এবার রকেটের জায়গায় থাকবে
কণিষ্ক । আগামী দিনগুলোতে কোম্পানির যাবতীয় ভালোমন্দের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে সে । স্বভাবতই জোজো এখন তারই অঙ্কলগ্না । ডি.কে নিজেই এই গুরুদায়িত্ব সঁপেছেন তাকে ।

রকেটের লাশ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে । দুটো গাড়িই ধুলো উড়িয়ে মিশে যায় দিগন্তে…

*এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল নেই এদের।