অনন্যা দাশ

কুশের টেক্সট মেসেজটা এল রাত এগারোটা নাগাদ। সেটা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নয়। সে তো আরো রাতেও করে। শ্রেয়া কতবার ওকে বলেছে, “এই অত রাতে আমাকে মেসেজ করবি না। আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় তারপর আর ঘুম আসতে চায় না তখন স্লিপিং পিল খেতে হয়। জানিস তো আমাকে সকাল সাতটায় কাজে যেতে হয় তাই আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি।”

কিন্তু কুশের সে সব কিছু মনে থাকে না। ঠিক মাঝরাতে কি আরো পরে টেক্সট করবে! আর ওই পিংটা শুনে শ্রেয়ারও ঘুম ভাঙ্গে আর দেখতে ইচ্ছে করে ভাইটা কী বলল। সে যে ভাল কিছু লেখে তাও না। কখনও কখনও একেবারেই উলটো পালটা কিছু লিখবে। যেমন কদিন আগে লিখেছিল, ‘ভাবছি অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশানটা করিয়ে নেবো। ডাক্তার বন্ধুগুলো কেমন যেন জুলজুল করে আমার দিকে তাকাচ্ছে!’ শ্রেয়া বেদম রেগে গিয়েছিল সেটা পড়ে। পরদিন ফোন করে খুব খানিক বকুনি দিয়েছিল, “তুই তোর ওই নিম্নস্তরের জোকগুলো আমাকে যদি ফের মাঝরাতে পাঠিয়েছিস তো আমি তোকে তেজ্য ভ্রাতা করব!”

কুশ হেসেছিল, “আহা দিদি অত চটছিস কেন? তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল?”

“বাজে বকিস না! কাল বেশি গিলেছিলি বুঝি? এতবার করে বলি ও সব বেশি খাস না, তা আমার কথা শুনবি কেন?”

কুশ তখন তার সব চেয়ে ভাল কিশোর কন্ঠে গেয়েছিল, “পিতে হ্যাঁয় তো জিন্দা হ্যাঁয়, না পিতে তো মর যাতে!”

“আবার বাজে কথা! তোর কী হয়েছে বল তো? আমি যাবো? আমার কয়েকদিন ছুটি পাওনা আছে…”

“এমনি আমার দরকার নেই তবে আমার জোক্স শোনার জন্যে তোর প্রাণ কাঁদলে আসতে পারিস!”

“আমার বয়েই গেছে চব্বিশ ঘন্টা তোর ওই জোকস শুনতে! তার মানে এখন গিয়ে কাজ নেই।”

“তুই না দিদি কোনদিন এক চিলতেও সেন্স অফ হিউমার ডেভেলাপ করতে পারলি না!”

“থাম তুই! মাঝে রাতে তোর ওই বিশ্রী জোকের জন্যে আমি সেন্স অফ হিউমার আর গজাতে পারলাম না, সরি!”

এই রকম কথা ওদের প্রায়ই হয়। আজকেও সেই রকম কিছু হাবিজাবিই আশা করেছিল শ্রেয়া কিন্তু ফোনের স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে ওর বুকটা ধ্বক করে উঠল। কুশ লিখেছে ‘ভাল থাকিস দিদিভাই’। এই রকম তো ও কখনও লেখে না! সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল ওকে শ্রেয়া কিন্তু ফোনটা মেসেজে গেল। সেটাও অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নয়। ইদানিং কুশ খুব বেশি ড্রিঙ্ক করছে সেটা আন্দাজ করতে পারছে শ্রেয়া। কুশের মধ্যে যে একটা ভয়ানক অন্ধকার দিক আছে সেটা শ্রেয়ার চেয়ে ভাল কেউ জানে না। কত বার ওকে বলেছে ‘তুই এক বার একটা ডাক্তার দেখা রে পাগল!’ কিন্তু কুশ কিছুতেই শুনবে না। বলে, ‘আমার ভিতরের অন্ধকারটা কোন ডাক্তার দূর করতে পারবে না। ওরা শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি ঘুমের ওষুধ দেবে তাতে আমার সারাদিন ঘুম পাবে, ক্লাসে কিছু পড়াতে পারব না।‘

একটা হাই স্কুলে পড়ায় কুশ। চাকরিটা নাকি ওর বেশ ভাল লাগছে। কুশটা বরাবরই খুব সেন্সিটিভ। ছোটবেলা থেকেই কে কী বলল তাই নিয়ে মনখারাপ করত। ওর থেকে পাঁচ বছরের বড়ো শ্রেয়া মানসিক ভাবে অনেক শক্ত। তাও যদি মার ঘটনাটা না ঘটত তাহলে হয়তো কিছু হত না। শ্রেয়ার প্লাস টু পরীক্ষার কিছুদিন আগে ওদের মা হঠাৎ কোন এক কাকুর হাত ধরে কোথায় জানি চলে যান। এখন শ্রেয়া বুঝতে পারে যে বাবারও অনেক দোষ ছিল, উনি মাকে একদম সময় দিতেন না শুধু নিজের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু তখন বাবা এমন ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে শ্রেয়া আর কুশ মনে করেছিল সব দোষ মার, এবং ওদের মা একজন বাজে মহিলা। বাবা অবশ্য ওদের দিকেও আর তেমন তাকাতেন না। শ্রেয়া তখন কুশকে সামলাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। কুশ কেন জানি মার চলে যাওয়াটাকে ওর নিজের দোষ বলে ধরে নিয়ে গুমড়োতে থাকল। ওর রেজাল্ট খারাপ হতে লাগল আর মাঝে মাঝেই কালো অন্ধকারে ডুবে যেত। তবে পড়াশোনার ব্যাপারটা ক্রমে সামলে নিয়েছিল সে। শ্রেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার দুবছরের মধ্যে কুশও চলে আসে। এদেশে মানে মার্কিন দেশে এসে পি এইচ ডি করতে ঢুকেছিল কিন্তু গাইডের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল কুশ। তারপর হাই স্কুলে সাইন্স পড়াতে ঢুকেছে। কাজটা ওর ভাল লাগছে বটে কিন্তু তাও মনের কোনে জমাট বাঁধা অন্ধকারটা রয়েই গেছে।

আবার ওকে ফোন করল শ্রেয়া, নাহ এখনও তুলছে না। দিনেরবেলা হলে স্কুলের কাউকে ফোন করতে পারত এখন রাতের বেলা কী করবে সে? অনেক ভেবে ফোনে একটা নম্বর ডায়াল করল সে। রাত সাড়ে এগারোটা তাও দুটো রিঙ্গের পরই ধরল বিক্রম। ওই এক লোক বটে! শ্রেয়ার কাছ থেকে প্রচুর অবছেদ্দার পরও সে আশা ছাড়তে রাজি নয়। এক সময় একই জায়গায় কাজ করত ওরা সেই থেকে আলাপ। তারপর একবার শ্রেয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল বিক্রম। তবে শ্রেয়া বিয়ে করতে রাজি হয়নি। কুশের মতন নিরাশায় ডুবে না গেলেও বিয়ে নামক ব্যাপারটায় তেমন ভরসা নেই শ্রেয়ার। তাছাড়া নিজের ক্ষতবিক্ষত মনটাকে নিয়ে অন্য কারো জীবন নষ্ট করাটাও ঠিক নয় বলে মনে হয়েছিল তার। কিন্তু বিক্রম তাও আশা ছাড়েনি, বলেছিল, “হয়তো কোন একদিন তোমার আমাকে দরকার পড়বে। আমি সেই দিনটার জন্যে অপেক্ষা করব।“

আর কাউকে না পেয়ে অগত্যা বিক্রমকেই ফোন করল শ্রেয়া।

“শ্রেয়া! এত রাতে হঠাৎ কী মনে করে?”

“কুশ একটা অদ্ভুত টেক্সট করেছে আর তারপর থেকে আর ফোন তুলছে না! কী করব বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না।“

“ঠিক আছে তৈরি হয়ে নাও। ওর ওখানে যেতে পাঁচ ঘন্টা মতন লাগে তো? এখন রাস্তা ফাঁকা আমি সাড়ে চারে মেরে দেবো!”

“যাবে?”

“হ্যাঁ, আর উপায় কী? গিয়ে হয়তো দেখবে বাছাধন এক বোতল স্কচ টেনে উলটে পড়ে আছে। তখন গাড়ির তেলের টাকাটা তোমার কাছ থেকে নেবো!”

শ্রেয়া এক মিনিট ভাবল, “কাল শনিবার…ঠিক আছে চলো। কুশটাকে অনেকদিন দেখিনি। আমিও চালাতে পারি অবশ্য…“

“না, তোমার মনের অবস্থা ভাল নয় এখন তোমার না চালানই ভাল। ঠিক আছে, আমি আধ ঘন্টার মধ্যে আসছি। আর শ্রেয়া…”

“কী?”

“আমাকে ফোন করার জন্যে থ্যাংকস!”

###

সত্যি সত্যি আধঘন্টার মধ্যে এসে হাজির হল বিক্রম। ততক্ষণে আরো দুবার কুশের ফোনে ফোন করেছে শ্রেয়া এই ভেবে যে কুশ তুললে আর ওদের এত রাতে অতখানি পথ ঠেঙ্গিয়ে যেতে হবে না। কিন্তু কুশ ফোন ধরল না। একটা সুটকেসে হুড়হুড়ি করে কয়েকটা জামা ঢুকিয়ে নিয়ে শ্রেয়া চলল বিক্রমের সঙ্গে। অন্ধকার ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলল সাঁ সাঁ করে। ভাগ্যিস বিক্রম অ্যালকহল ছোঁয় না, নাহলে কুশের মতন অভ্যাস হলে মোটেই গাড়ি চালাবার মতন দশায় থাকত না।

বিক্রম ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “পারলে একটু ঘুমিয়ে নাও।“

কিন্তু এই অবস্থায় কী ঘুম আসে? শ্রেয়া জেগে বসে রইল। ওর নিজের যাতে ঘুম না আসে সেই জন্যে একটা অল নাইট খোলা ডাঙ্কিন ডোনাটে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কড়া কফি কিনল বিক্রম।

ওরা যখন লরেল পাইন্সে পৌঁছল তখন পুবের আকাশ সোনালি হচ্ছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। জি পি এসে কুশের বাড়ির ঠিকানা ভরা ছিল তাই ওর বাড়ির সামনেই গিয়ে দাঁড়াল বিক্রম। ছোট একফালি বাগানে ঘেরা একটা একতলা বাড়ি। শ্রেয়া জানে একজন লোক আসে ঘাস কেটে দিতে। কুশের কম্মো নয় ও সব। গাড়ি থেকে নেমে হাত পা ছুঁড়ে আড়মোড়া ভাঙ্গল। শ্রেয়া নেমে গিয়ে দরজার বেল টিপল। উফফ পাগুলো ধরে গেছে এতক্ষণ ঠায় বসে থেকে।

বেশ কয়েকবার বেল টিপেও কোন উত্তর নেই। বাড়িটার চারিদিকে এক ঘুরে এল ওরা দুজন। পিছনের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করল। কিছু দেখতে পেল না কোন ঘরেই। ভিতরটা অন্ধকার।

“পুলিশের ফোন করব?” বিক্রম জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, চাবি তো নেই ভিতরে ঢোকা যাবে না এমনিতেও।”

চারিদিক তখন ফর্সা হতে শুরু করেছে। পুলিশকে ফোন করে কুশের নাম ঠিকানা বলতে ওরা আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বলল আসছে।

কিছুক্ষণ পরেই দুজন পুলিশ এসে হাজির। ওদের মুখ থমথমে। সেটা দেখেই শ্রেয়ার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। বিক্রমই এগিয়ে গিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলল। ওরা বলল লরেল নদী থেকে একটা মৃতদেহ নাকি উদ্ধার হয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা একজনকে ঝাঁপ দিতে দেখে পুলিশে ফোন করে। সেই মৃতদেহ কুশের কিনা সনাক্ত করতে যেতে হবে ওদের।

###

তিন দিন হয়ে গেছে কুশ নেই। তিন দিন হয়ে গেছে লরেল পাইন্সে এসে ওর বাড়িতে রয়েছে শ্রেয়া। বিক্রমই সব সামলাচ্ছে। পুলিশ বলেছে প্রায় গোটা এক বোতল স্কচ খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে কুশ। কিন্তু কেন? স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলেছে বিক্রম আর শ্রেয়া। উনি খুব একটা ভাল ব্যবহার করেননি। উলটে বলেছেন, “আপনার ভাই আত্মহত্যা করে বেঁচে গেল নাহলে আমরা ওকে সাসপেন্ড করতে বাধ্য হতাম! কমিটি তাদের রায় দিয়ে দিয়েছিল। এখন আমরা ব্যাপারটাকে যথাসম্ভব চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের স্কুলের তো একটা সুনাম আছে! মৃতের নামে খারাপ কিছু রটুক সেটাও আমরা চাই না। আমাকে মাফ করবেন। এর চেয়ে বেশি আর কিছু আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আপনারা এখান থেকে চলে গেলেই ভাল হবে।”

ওনার ঘর থেকে বেরিয়ে বিক্রম বলল, “বড় অদ্ভুত লোক! কী করেছিল কুশ সেটা ছাড়া আর যা বলার তো বলেই দিলেন! ওই সাসপেনশানের দুঃখেই কী…? কে জানে। আচ্ছা শোনো আমার অফিস থেকে ফোন এসেছিল। আমাকে একবার যেতে হবে। তুমি যাবে না এখানে একা থাকবে সেটা বলো।”

শ্রেয়া যেতে চায়নি। কয়েকটা দিন ওর বাড়িতে থেকে কুশকে বুঝতে চায় সে। এখনও বালিশে কুশের মাথার ছাপ। আলমারিতে রাখা জামাগুলোতে কুশের শরীরের গন্ধ। অথচ যার সঙ্গেই কথা বলছে তারই মুখেই কুলুপ আঁটা, কেউ কিছু বলতে রাজি নয়!

###

বিক্রম দুদিনের জন্যে ফিরে গেছে। সে আবার কাল সকালে আসবে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল শ্রেয়ার। কিসের একটা শব্দ হচ্ছে। ভূতে বিশ্বাস করে না শ্রেয়া আর এবাড়িতে তো চুরি করার মতন কিছু নেই! তাহলে কে এল? বিক্রম কী কাজ সেরে তাড়াতাড়ি ফিরে এল? বিছানা ছেড়ে উঠে বেডরুমের দরজাটা খুলে খাবার ঘরের আলোটা জ্বালাল শ্রেয়া। প্রথমে কিছুই চোখে পড়েনি তারপর হঠাৎ দেখতে পেল – ফ্রিজ আর কাঠের আলমারিটার মাঝখানের জায়গাটাতে একটা মেয়ে বসে রয়েছে মাটিতে! কালো অবিনস্ত চুল, ফ্যাকাসে সাদা মেক-আপহীন মুখ, বয়স কুড়ির বেশি হবে না।

“কে তুমি? এখানে এসেছ কেন? ভিতরে ঢুকলে কী করে?”

“আমি এমিলি” মেয়েটা শুধু বলল।

“এমিলি? কে এমিলি? তুমি ঢুকলে কী করে ভিতরে?”

“আমি তোমার ভাইয়ের ক্লাসে ছিলাম। এখানে প্রায়েই আসতাম আমি বলে আমার কাছে চাবি আছে!” মেয়েটা আস্তে আস্তে বলল।

শ্রেয়া চমকে উঠল। তাহলে প্রিন্সিপাল কী এই ব্যাপারটারই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন? কুশের ক্লাসের ছাত্রী মানে বয়স ষোলো কি সতেরো হবে!

মেয়েটা বলে চলেছে, “তোমার ভাইয়ের মনের মধ্যে যে অন্ধকারটা ছিল সেটা আর কেউ দেখতে পেত না কিন্তু আমি দেখতে পেতাম। আমার বাবা ইরাকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে গেছেন বেশ কিছুদিন হল। মা বোতলের তরলে ডুবে থাকেন সারাদিন। ইলেক্ট্রিক কম্পানি যে কতবার আমাদের লাইন কেটে দিয়েছে তার ঠিক নেই! আমি এর ওর তার হয়ে ওয়েবসাইট ডিজাইন করে, ব্লগ লিখে, বেবিসিটিং করে কিছু রোজগার করি। বিজ্ঞানে আমার উৎসাহ আছে। আপনার ভাই পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে থেমে যেতেন। অন্য কোন এক জগতে চলে যেতেন। সেই জগত বাস্তব জগতের চেয়ে বহু দূরে। অন্য কেউ বুঝত না কিন্তু আমি বুঝতাম । বাবাও ওই রকম হয়ে গিয়েছিলেন যুদ্ধ থেকে ফেরার পর। আমি তাই একদিন আপনার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম উনিও যুদ্ধে গিয়েছিলেন কিনা। উনি বলেছিলেন, ‘এ এক অন্য যুদ্ধ, তুমি বুঝবে না’। আমি তখন ওনাকে আমার বাবার ব্যাপারটা বলেছিলাম। মার ব্যাপারটাও। কাউকে ওসব বলি না আমি, বলতে চাই না কিন্তু ওনাকে বলেছিলাম। তারপর থেকে আমি রোজ স্কুলের পর এখানে আসতাম। সাবধানেই আসতাম যাতে কেউ দেখতে না পায়। কিন্তু একদিন একজন প্রতিবেশী দেখে ফেলল। এটা ছোট জায়গা। এখানে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। আপনার ভাইই বরং এখানে ভিনদেশী। সেই প্রতিবেশী লোকটা স্কুলে কমপ্লেন করে দিল। স্কুল বোর্ডের মিটিং বসল। তারা আপনার ভাইকে ডেকে পাঠাল সেখানে। ওনাকে বলা হল হয় স্কুল থেকে ইস্তফা দিয়ে লরেল পাইন্স ছেড়ে চলে যেতে হবে নয়তো আমাদের দুজনকেই সাস্পেন্ড করা হবে। আর কেসটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আমাকেও ওরা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল , আমি মুখ খুলিনি কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। আপনার ভাইকে আমি বলেছিলাম যে আমিও ওনার সঙ্গে লরেল পাইন্স ছেড়ে চলে যেতে রাজি আছি কিন্তু উনি শুনলেন না। বললেন আমার নাকি একটা ভবিষ্যৎ আছে। আমি যেন কালো অন্ধকারকে আমাকে গ্রাস করতে না দিই। সেটা বলার দুদিন পরই রাতে…”

শ্রেয়ার দুগাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে। কী বলবে সে?

“আমার জীবন দুর্বিশহ হয়ে গেছে এখানে। কেউ আমাকে বেবিসিটিং বা অন্য কোন কাজ দিচ্ছে না। আমি তাই এখান থেকে চলে যাচ্ছি। বস্টনে আমার এক মাসি থাকে তার ওখানে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করব। একটা কলেজ থেকে স্কলারশিপ পাচ্ছি। আপনার ভাই এই ট্যাবলেটটা আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেটা ফেরত দিতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে ঢুকে মনটা খারাপ হয়ে গেল,” বলে কাঁদতে লাগল মেয়েটা।

“ওটা তুমিই রাখো। আমার ওটা দরকার নেই। কুশ যখন তোমাকে ওটা দিয়েছিল তার মানে ও চাইত যে তুমি ওটা ব্যবহার করো। তুমি কলেজে যাবে, ওটা তোমার কাজে লাগবে।“

মেয়েটা চলে যাওয়া পর পাথরের মূর্তির মতন বসে রইল শ্রেয়া। এত কিছু ঘটে গেছে অথচ দিদিকে কিছুই বলেনি কুশ। নিজেকে কেমন যেন অপর্যাপ্ত মনে হচ্ছিল শ্রেয়ার।

হঠাৎ ফোনটা পিং করে উঠল। কোন টেক্সট মেসেজ বা ইমেল এল মনে হয়। নিজের অজান্তেই শ্রেয়ার চোখটা স্ক্রিনের দিকে চলে গেল। একী! একটা ইমেল – বলছে ইউ হ্যাভ রিসিভড এ বার্থডে কার্ড ফ্রম কুশ! ভীষণ চমকে উঠেছিল শ্রেয়া প্রথমে। তারপ মনে পড়ল এই সব কার্ডগুলোতে আগে থেকেই পৌঁছনোর তারিখ সময় বেঁধে দেওয়া যায়। কুশ সেটাই করেছিল। শ্রেয়া ভুলেই গিয়েছিল যে কাল ওর জন্মদিন, নাহ কাল না বারোটা কখন বেজে গেছে, আজই তো!

কার্ডটা খুলতেই কিছু স্প্যানিশ টুপি পরা লোকজন গিটার নিয়ে বিচিত্র উচ্চারণে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গাইল। তারর কুশের লেখা চিঠিটা দেখা গেল।

ডিয়ার দিদিভাই,

এই চিঠিটা যখন তুই পাবি তখন আমি মনে হয় থাকব না। অন্ধকারটা ক্রমাগত আমাকে ছেঁকে ধরছে রে দিদি – আলো কমে কমে যাচ্ছে। আলোগুলোকে আর ধরে রাখতে পারছি না। এতক্ষণে তুই নিশ্চয়ই সব জেনেছিস। আমাদের কোন দোষ ছিল নারে দিদি। দুই আহত প্রাণী নিজেদের ক্ষত লুকিয়ে লুকিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে পরস্পরকে একটু সান্ত্বনা দিচ্ছিল মাত্র। যাক, লোকের সহ্য হল না। রিজাইন করে শহর ছেড়ে গেলে কোন লাভ হত না। আর কোথাও চাকরি পেতাম না আমি। তাই আর কোন পথ দেখতে পেলাম না। তুই আমার জন্যে দুঃখ করিস না প্লীজ। দুঃখ হলে কান্না পেলে আমার পাঠানো বোকা বোকা জোক্সগুলো দেখিস। দেখবি অন্ধকারে ঠিক জ্বলজ্বল করবে জোনাকির ঝিকিমিকি আলো। আর বিক্রম ছেলেটা ভাল রে, ওকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখিস। ভাল থাকিস রে দিদি। একটাই দুঃখ রয়ে গেল যে যে তোকে বড়ো কষ্ট দিয়ে গেলাম – তোর এই ভাইটাকে ক্ষমা করে দিস দিদিভাই।“

বাইরে ভোরের রাঙা আলো আকাশের কালো মুছে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল। বিক্রম এল মনে হয়।