শাশ্বত কর

পিঠে গামলা নিয়ে কখনও কচ্ছপ হয়ে দেখেছ? মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে পা দুটোকে পেটের ভিতর ঢুকিয়ে হাত আর পায়ের পাতা চারটেকে চার কোণে ছড়িয়ে পিঠের উপর নীল গামলাটাকে বসিয়ে এই মুহূর্তে আমি কূর্ম অবতার।

কাল রাতেই ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতারের কথা মায়ের কাছে শুনেছি। শোনা ইস্তক মাথায় প্ল্যানের পর প্ল্যান ঘুরপাক খাচ্ছে। প্ল্যান যতক্ষণ না একজিকিউট হচ্ছে চিত্তে শান্তি নাই! মাঝে মাঝেই বোধ হয় মুখে উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছে, কারণ বেশ কয়েকবার মা সন্দেহের গলায় ‘বাবু কী ভাবছিস রে?’ বলে চেঁচিয়ে গেছে! মা তো মা, রাবেয়াদিও ‘সোনাবাবা কী ভাব গো?’ বলে মাথায় ঠোনা মেরে গেছে। কাজেই সাবধান হওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এরা সবাই আসলে আমার প্রতিপক্ষ। ভালোমানুষের মত সবটা প্ল্যান জেনে যাবে, আর যেই না জেনে গেল অমনি সে সব ভেস্তে দেওয়ার সমস্ত রকম ছক করে দেবে। হুঁ হুঁ বাওয়া! ওতে আর আমি ভুলছি না!

ভেবে দেখলাম, অবতারের ক্রনোলোজি মেইন্টেন করা বেশ চাপের, কাজেই যেটা আগেভাগে সম্ভব, সেটাই টুক করে সেরে ফেলব। এই তো খানিক আগেও আমি ছিলাম বরাহ অবতার। ঘোঁত ঘোঁত করছিলাম। রাবেয়াদি আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে বলল, ‘কী গো সোনাবাবা! ঠান্ডা লাগাইলা না কি?’ রাবেয়াদি আর কী বুঝবে এই ঘোঁতঘোঁতানির মাহাত্ম্য! মনে আছে, বাবার সাথে সাইকেল চেপে এক দিন গেছিলাম ডাম্পিং ইয়ার্ড দেখতে। ওরেব্বাস! সে এই পাহাড় তো উই পাহাড়! প্লাস্টিকে, ময়লায় চারতলা বাড়ির মত সব উঁচু উঁচু টিলা! একটাও গাছ টাছ কিস্যু নেই! তুমুল পচা গন্ধ! আর গন্ধ ঠাসা সেই পাহাড়ের নানা জায়গা থেকে বিলবিল বিলবিল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে! বাবা বলছিল, ‘বুঝলি বেলো, এই হলো রৌরব নরক! এখনও আমরা অভ্যাস না শুধরোলে ড্যাঙ্গসের গুঁতো খাওয়া ঠেকায় সাধ্য কার? গোটা পৃথিবীতে ছেয়ে যাবে এই নরক আর টিকে থাকবে কেবল ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস! আর ওই যে দেখছিস, ওরাও থাকবে। ওরা হলো এই নরকের একমাত্র জীবন্ত পাহারাদার!’ বাবার ইশারা মত তাকিয়ে দেখি, ও বাবা! এ তো সর্বাঙ্গে খিঁচ মাখা নির্ভেজাল শুয়োর!

বরাহ অবতারে বিরাজ করতে করতেই হঠাৎ করে সেই ব্যাপারটা মনে এল, আর অমনি যেন সেই ভাগাড়ের পেটেন্ট ছুঁচো পচা গন্ধটা ভক করে ভিতরে ঢুকে গেল! কেশে ওয়াক তুলে যা তা দশা একেবারে!

বরাহ অবতার কম্পলিট! এবার ভাবছি দুপুরে স্নান করার সময় বাথরমে জল জমিয়ে আবার খানিক মাছ হয়ে সাঁতরাব। মাও আজ বাড়িতে নেই, কী কাজে যেন বেরিয়েছে! বাড়িতে কেবল রাবেয়াদি, আমি আর বাবা। কাজেই সোনে পে সুহাগা! রাবেয়াদি তো রান্নাঘরেই ব্যস্ত, আর বাবাকে নিয়ে তো সমস্যাই নেই! এখন মুখ গুঁজে কি একটা পড়ছে পড়ুক, যদিও বা পড়া সেরে আমায় দেখেই ফেলে, তো খেলা নিয়ে নেব। একটু হয়ত উড়ুম ধুড়ুম লাফাবে, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কাজেই ভর দুপুরে আমার মৎস্য অবতার হওয়া আটকায় কে?

আচ্ছা, কচ্ছপ কী খায় বলো তো? হুঁ হুঁ বাবা, তোমার মত কাঁচা খেলোয়াড় আমি নই। খেলা শুরুর আগেই বাবার ফোনে গুগুল করে নিয়েছি। খাবারের দিক থেকে যদি ভাবো, তবে কিন্তু কচ্ছপ সত্যি সত্যিই অবতার। যেমন সব জায়গায় থাকে, তেমন সবই খায়। এই ধরো না, ওদের মধ্যে কেউ কেউ সি উইড খায়, কেউ কেউ ছোটো ছোটো মাছ আর পোকামাকড় খায়, কারও আবার দু’রকমই চলে। পুরো আমাদের পরিবার। জুজুদাদা নিরামিষ, আমি পুরোটাই আমিষ, আর বাবা, জ্যাঠা, মা, রাবেয়াদি- এরা সব্বাই দু’রকমই চালায়।

যাই হোক, এ সময় মহান কচ্ছপ আমি সাঁতরাচ্ছি। পুরো ঘরটা এখন সাগর। মেঝের সাদা পাথর হলো সি বেড। সেন্টার টেবিল, শোকেস, খাট, আলমারি সব এখন সাগরের নিচের খানা খন্দ সামুদ্রিক ঘাস। আলনা থেকে বেশ কিছু কাপড় চোপড় নামিয়ে এনে চেয়ারে খাটে লটকে নিয়েছি। সে সব এখন সামুদ্রিক লতার জঙ্গল। জলের দোলায় সব দুলছে খলবল করে! এই ঘাস লতার দেশের শেষে আছে কচ্ছপদের স্বর্গরাজ্য। সেখান থেকে সোনার রঙের লতা আনতে হবে আমায়। সেই লতার রস থেকে বনবে ওষুধ, যে ওষুধ খেলেই বিভ্রান্ত কচ্ছপকুল ফের হয়ে উঠবে সাগরসম্রাট- কূর্ম অবতার! কাজেই সুপার কছুয়ার মত সেই নিবিড় জঙ্গল ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে।

ধুস! এমন মোক্ষম সময় পাটা কীসে যেন আটকে গেছে! ছাড়াতে পারছি না! যত চেষ্টা করছি ততই জড়িয়ে যাচ্ছে! বেগতিক দেখলে খোলের ভিতর ঢুকে পড়াই তো আমার মত কচ্ছপের করণীয়, সেই মত চেষ্টা চালাচ্ছি আপ্রাণ, কিন্তু হচ্ছে না! হাত পা ক্রমশঃ জড়িয়ে যাচ্ছে নরম অথচ শক্ত কী এক জালে!

জাল! তার মানে আমি শিকারীর জালে আটকা পড়ছি! হে ঈশ্বর! এই নিষ্ঠুর মতলবি দুনিয়া কচ্ছপদের কিছুতেই তাদের অবতারত্ব ফিরে পেতে দেবে না বলে চক্রান্ত করে আমায় জালে ফেলেছে! কিন্ত আমিও সুপার কছুয়া! জাল আমি ছিঁড়বোই!

নাআআআআ! কে আছো, বাঁচাও আমায়! ছটফট করতে করতে যে আরও আরও জড়িয়ে যাচ্ছি জালে! জালের ফুটোয় আমার বুড়ো আঙুল আটকে গেছে! হাত দুটো চোর বাঁধান বাঁধা পড়েছে! হে ভগবান! এই নির্জন সাগরে কেউ না হোক, তুমি তো আছ! তুমিই বাঁচাও! প্লিজ! ভেবে দেখ, আমি তো তোমারই অবতার!

নাঃ! ভগবান রেসপন্স করছে না যখন, আমাকেই পারতে হবে। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে! আমাকে একার চেষ্টাতেই বাঁচতে হবে! নইলে কচ্ছপ সমাজের কী হবে! আমি জানি, এই জাল তোলার সাথে সাথেই আমায় চিৎ করে ফেলে রেখে দেবে নৌকোর খোলে, তারপর নোংরা আঁশটে জলের হাঁড়িতে ভরে নিয়ে যাবে হাটে। সেখান থেকে হয় কোনো পাজি ছেলে কিনে নিয়ে ভরে রাখবে শ্যাওলা ধরা অ্যাকোরিয়ামে-পাম্পের ভুড়ভুড়ির সাথে সাথে আমার রাত দিন ওঠা নামা খাবি খাওয়া দেখে ক্লিপ বাঁধা দাঁত বার করে হাত তালি দিয়ে দিয়ে মজা করবে, না হয় সোজা চালান করে দেবে বাজারে! অ্যালুমিনিয়ামের টোল খাওয়া হাঁড়ি থেকে থপাস করে ফেলবে বাজারের সিমেন্ট চটা মেঝেয়! তারপর যখনই কারো নজরে আসব, তখনই ভবলীলা সাঙ্গ! ওরে বাবা!

আরো জোরে জোরে ঝটাপটি করে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই বুঝলাম মতলবি দুনিয়ার জালে আমি আরো জড়িয়ে গেছি! পরমুহূর্তেই মনে হল আমায় জালশুদ্ধ টেনে উপরে তুলছে কেউ!

কিন্তু কী ভাবে সম্ভব! আরে বাবা আমি তো আর সত্যি সত্যি কচ্ছপ নই! আমি যে বেলো! নীল গামলা পিঠে চড়িয়ে সাজা কচ্ছপ- কূর্ম অবতার! আমায় জালে করে টেনে তুলছে কেন? কেই বা তুলছে? না বাবা! বেশ ভয় করছে এবার! ‘ও বাবা! বাঁচাও! ও বাবা বাঁচাও!’

‘চুপ কর বেলো! খামোখা চ্যাঁচাস না!’

গলাটা শুনেই বুকের দমদমানি এক মুহূর্তে স্টপ! জালের ভিতর থেকে টুকটুকিয়ে মাথা উঁচিয়ে চেয়ে দেখি খাটের উপর থেকে ঝুলে আছে বাবার মুখ। দু হাতে টেনে তুলছে জাল বন্দী আমায়।

‘কাপড়টায় এমন করে পেঁচিয়ে গেলি কী ভাবে?’

‘পরে বলব! আগে তোলো না আমায়! ঝুলছি তো!’

‘ও সোনা বাবা! মার জামদানিখানায় অমন করে ঝুলতিছো ক্যান?’

ব্যস! হয়ে গেল! রাবেয়াদি জানল মানে মাও জানল, তার মানে রাত্তি বেলায় আজকে কপালে ভাদ্র মাসের তাল! সব রাগ গিয়ে পড়ছে বাবার উপর। এত ঢিলা কেন কে জানে? একটু জলদি তুললে তো আর গুপ্তচর এসে হাজির হতে পারত না! রেগেমেগে বেশ চেঁচিয়েই বললাম, ‘ও বাবা! তোলো না!’

‘তুলছি তো দাঁড়া! অত হড়বড় করলে হয়!’ বলে রাবেয়াদিকে বলল, ‘এই রাবেয়া, বেলোকে একটু চাগিয়ে দে তো!’

মুখে আঁচল চেপে এগিয়ে এল রাবেয়াদি। রকম সকম দেখলে পিত্তি জ্বলে যায় আমার! না হয় জালে ফেঁসেছি, দুর্দশায় পড়া মানুষ দেখে এতে এত হাসির কী আছে?

রাবেয়াদির মুখটা দেখে পুরো ব্যারাকুডার মত লাগছে! কিন্তু হাব ভাব যদি ঠিকঠাক বিচার করি, তবে রাবেয়াদিকে বলা যায় সি অ্যানিমোনে। মায়ের সাথে ওর পুরো অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। ঠিক যেমন সি অ্যানিমোনে আর ক্লাউন ফিশ!

ইস! মা যদি জানে না, আমি মাকে ক্লাউন ফিশ বলেছি একেবারে রণচন্ডী হয়ে যাবে। তা ছাড়া, রেগে থাকলে মাকে ক্লাউন ফিশ বলাও যায় না। বরং ম্যাগলাডন হাঙর বলা যায়। কিন্তু রাবেয়াদি তবে কী? ধুত্তোর! মরুক গে যাক!

খাটের উপর জামদানি জাল থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্র তড়াং করে লাফ মেরে ভাগতে গেছি, অমনি কোমরে টান পড়ল। বাবা প্যান্টের কোমর টেনে রেখেছে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে, ‘পালালে তো হবে না চাঁদু! আটকা পড়ার কিসসটা তো জানিয়ে যাও!’

‘আগে রাবেয়াদিকে যেতে বল!’

‘যাচ্ছি গো বাবা যাচ্ছি! সব সময় অমন করো কেন গো সোনাবাবা?’

‘করব না কেন? তুমি সব সময় আমার কথাগুলো যে মাকে গিয়ে লাগাও, তার বেলা? ‘

‘মাকে তো বলতিই হবে। তুমি সারাদিন যা দুষ্টামি করো, মা কি একা তার সবতা ধরতি পারে? তা মাকে তো সেগুলা জানার জন্যি সাহায্য আমায় করতিই হবে’।

‘তালে তাই করো, আমিও এমনিই করব!’

‘করো গা!’ জামদানিটা চুমড়ে নিয়ে তুম্বোমুখ করে রাবেয়াদি চলে গেল।

বাবার দিকে চেয়ে দেখি, জুলজুল করে তাকিয়ে হামু দিয়ে রয়েছে আমার দিকে। আমি তাকাতেই ভুরু দুটো উপর দিকে দু’বার নাচিয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা বল!’

কী আর করা! বলতেই হলো! সবটা শুনেই চটাস করে একটা চড় কসালো আমার পিঠে। আমিও বাবার পায়ে রামচিমটি ঘুরিয়ে বললাম, ‘মারছ কেন?’

উউউ করে চিমটির সাড়া দিয়ে বাবা বলল, ‘আরে মারছি না! সাবাসি দিচ্ছি। সর্দার খুস হুয়া, তাই সাবাসি দিয়া’।

‘থাক তুমি আর হিন্দি বোলো না’।

‘বেশ, সে না হয় নাই বললাম, কিন্তু শোন বেলো, তোর ওই কচ্ছপের ব্যাপারটা শোনার পরই আমার মাথায় একটা খেলা এসেছে। চাস যদি বলতে পারি’।

বাবার গেমগুলো মাঝে মাঝে বেশ ভালোই হয়। বিশেষ করে রোল প্লের সময় বাবা যা সব উড়ুক্কু ডায়ালগ দেয়, শুনলে আমার হাসতে হাসতে একেবারে হিক্কা উঠে যায়।

বললাম, ‘বলো’।

চশমাটা ভুরুর দিকে ঠেলে দিয়ে বাবা বলল, ‘ও বুঝলাম! শুনতে চাস না। বেশ! শুনিস না’

‘আরে! বললাম তো বলো!’

‘শুনিস না! আমার কী! এই রকম যাচ্ছেতাই রকমের ভালো একটা প্ল্যান, না শুনলে না শুনবি!’

‘আরেবাবা, বললাম তো…’ চেঁচিয়ে বলতে গিয়েই ব্যপারটা টকাস করে বুঝে গেলাম। এও এক ধরণের শিক্ষা। বাবা তার প্ল্যান বলার মূল্য চাইছে। কাজেই দুই হাতে বাবার মাথায় মিনিট দুয়েক আরাম দিয়ে বললাম, ‘বলো’।

‘বলছি, বলছি। তোর সেই খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড় মনে আছে?’

‘হ্যাঁ! থাকবে না কেন?’

‘চল, সেইটাই করা যাক’।

‘ব্যাপারটা মন্দ না, তবে গপ্পটা একটু বদলাও’।

‘কেমন বদল চাস বল?’

‘সে তুমি ভাব! ডায়ালগ আর আইডিয়া তো তোমারই দেয়ার কথা!’

‘তা তো বটেই। আর তোমার শুধু খেলার দায়!’

মুখ বেঁকিয়ে বিজ্ঞের মত হাসি ঝুলিয়ে বললাম, ‘ঠিক তাই! নাও, চলো কী ভাবলে বলো’।

বাবা বেশ গুছিয়ে বাবু আসন হয়ে বলল, ‘শোন তবে, ধরে নে জঙ্গলে বিরাট গোলমাল বেঁধেছে’।

‘কী নিয়ে?’

‘সে কিছু একটা নিয়ে হবে, সেটা বড় কথা নয়!’

‘না বাবা, বড় কথাই! খেলায় গাঁজাখুরি আমি পছন্দ করি না! কাজেই কিছু একটা হয়েছে বলে ব্যাপারটা না এড়িয়ে বরং ভাবো, যদি জঙ্গলে কোনো এলিয়েনের দল ইউ.এফ.ও. থেকে নেমে হামলা চালাচ্ছে এমন হয়, তা হলে কেমন হবে?’

‘তোফা হবে! আর বুঝলি বেলো, সেই এলিয়েনগুলোর মাথায় বলগা হরিণের মত শিং। শিঙের ডগায় লাল আলো দপদপিয়ে জ্বলে’।

‘লেজার লাইট। ওগুলো আসলে লেজার গান। টিপ করে নিয়ে ট্রিগার দাবালেই ছুঁই চুঁইই চিউম্মম!’

‘সে আবার কী হলো?’

‘আরে লেজার গানের আওয়াজ হলো! গায়ে আলো লাগার সাথে সাথে সব হাওয়া!’

‘তোর সব খেলাতেই এত মারধোর ধ্বংস টংস কেন রে বেলো? দিন দিন তো ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছিস দেখছি!’

‘বাবা, একটু আধটু ধ্বংস টংস না হলে খেলায় চার্ম আসবে বলো?’

‘তা অবশ্য আসে না! তবে বেশি চুঁই চাঁই চিউম্মম যেন না হয়!’

‘বেশ। আগে বলো’

‘হ্যাঁ। সেই গোলমালের চরম সময় পরম পরিত্রাতা হিসাবে উঠে আসে মান্যবর প্রাজ্ঞ কচ্ছপের নাম’

‘এমনি এমনি আসে না! ওদের রাজা, মানে মহান বীর সিংহ, মানে ধরে নাও নৃসিংহ অবতারের দুর্গে একটা ভল্টে একটা ক্যাপসুল থাকবে। যেটা কি না সবাই জানবে ভবিষ্যতের দুর্যোগ থেকে বাঁচার উপায়’

‘ হ্যাঁ! কিন্তু সেই দুর্গ ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে! খবরটা মহান সিংহের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে এমন কাউকে দরকার, যাকে শত্রুরা সন্দেহ করতে পারবে না, আর যদিও বা পারে, নিজেকে রক্ষা করার কোশল যার হাতের মুঠোয়!’

‘ হ্যাঁ বাবা!’ নেচে নিয়ে বললাম, ‘কচ্ছপটার একটা রেডিয়ো অ্যাক্টিভ শেল থাকবে! আর প্রয়োজনে ইনভিজিবল হয়ে যেতে পারে!’

‘তোফা! তোফা!’ পিঠে দু বার হাত চাপড়ে দিয়ে বাবা বলল, ‘কিন্তু বেলোভূষণ! এলিয়েনরাও তো কম নয়! তারাও সেই মহাস্ত্রটিকে গাপ করবার জন্য হায়ার করেছে তাদের গ্রহের চ্যাম্পিয়ন দৌড়বাজ খরগোশকে!’

‘আর বাবা! এই খরগোশটা যেহেতু ইভিল, কাজেই ওর চোখ হবে লাল, আর গায়ের রঙ কালো! আর সাইজও হবে বড়! আর ওর অনেক রকম স্পেশাল অ্যাটাক থাকবে!’

‘ইয়েস মাই ডার্লিং বেলো! কিন্তু কেলোটি হলো এই ভিনদেশি খরগোশটির আলিস্যি ধরানোর জন্যে জম্পেশ একটি বুদ্ধি খাড়া করতে হবে। নইলে তো তিনি ঘুমোবেন না! আর না ঘুমোলে হারবেনও না!’

‘আরে! ও তুমি ভেবো না! এই খরগোশ ঘুমোবে না! বরং গাছ তলায় বসে ট্যাবে গেম খেলবে’

‘এক ঘর! তবে চল লেগে যাই! তুই খরগোশ আর আমি কচ্ছপ!’

‘বেশ! তবে তুমি এগোও!’

বাবা দারুণ কায়দা করে পিঠে সেই নীল গামলা নিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে গুটিগুটি ঢুকে গেল ড্রইং রুমে। এবার খরগোশের টার্ণ!

স্পেশাল অ্যাটাকগুলো মনে মনে ছকে নিয়ে তুড়ুং করে দিলাম এক লাফ!

সে কী! এক লাফে কী করে নৃসিংহ অবতার? নৃসিংহের মুখের চারপাশে কেশর উড়ছে! মুখটা লাল! অবতারের পাশে পারিষদ! সম্ভবত পারিষদই ইনফর্মার!

নৃসিংহ অবতার আমার ঘাড় ধরে ফেলেছে! গর্জন করে বলছে, ‘বাবু! আমার শাড়ি ছিঁড়লি কীভাবে?’

কচ্ছপ কোথায়? এই তীব্র সময় খরগোশের একমাত্র ত্রাণকর্তা হতে পারে সেই কূর্ম অবতার! কিন্তু সে তো দেখি টুক টুক করে নীল খোলস কাঁধে পিঠটান দিচ্ছে! হায় রে দুনিয়া!

নৃসিংহ অবতারের ক্রোধ ক্রমশঃ বাড়ছে। হাল ছেড়ে দিয়েছি। ভেউ করে কেঁদে ওঠার আগে বিদ্যুতের মত কথাটা মাথায় খেলে গেল! নৃসিংহ অবতারের পারিষদটা আসলে শেয়াল! হ্যাঁ, হ্যাঁ! রাবেয়াদি কোনো ব্যারাকুডা নয়, একটা খুব বিচ্ছিরি রকমের হুয়া হুয়া শেয়াল! এমন ধূর্ত গুপ্তচর শেয়াল ছাড়া আর কীই বা হতে পারে?