সরোজ দরবার

মানুষকে যে পূর্বজন্মে মানুষই থাকতে হবে, তার কোনও মানে নেই। এমনকী গরু-ছাগল বা বাঘ-সিংহও না হতে পারে। রতিকান্তর মনে হয়, আগের জন্মে সে পেয়ারাগাছ ছিল। নইলে এখন, এ জন্মেও এমন করে গায়ের ছাল উঠবে কেন! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুকে-গলায় কুঁকড়ে কুঁকড়ে উঠে যাওয়া চামড়ায় হাত বোলাতে বোলাতে বারবার তার শুধু এই কথাই মনে হয়।

মনে যদিও হয়, তবে তত্ত্বটা সঠিক না-ও হতে পারে। কারণ রতির সঙ্গে পেয়ারাগাছের অবশ্যই বেশ কিছু পার্থক্য আছে। যেমন,

১) পেয়ারাগাছ কোনোদিন কেবলের ব্যবসা করতে পারবে না। গাছেরা এমনিতে সব জানে-বোঝে, অনুভূতিপ্রবণ, অথচ কিছু কিছু জায়গায় কোনোভাবেই যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। অথবা অন্ন সংস্থানের চিন্তা নেই বলেই সম্ভবত গাছেরা এই লড়াইটাতেই থাকে না। অনেকটা বড়লোকের বাড়ির আহ্লাদে ছোকরার মতো। কিন্তু রতিকান্তর মতে, ঘামের গন্ধই মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে তোলে। তার মনে হয় গাছেরা দার্শনিক হতে পারে, কবি হতে পারে, এমনকী আশ্রয়দাতা-অক্সিজেনদাতা-জীবনদাতা মহাপুরুষ হতে পারে, তবু এই ঘামের প্রশ্নে মানুষ একটু এগিয়েই। গাছের কি ঘাম ঝরে! রতি জানে না, জানার চেষ্টাও করেনি। যাই হোক, পড়াশোনা সে করেছিল ঠিকই। কিন্তু চাকরিটা আর কিছুতেই জোটাতে পারল না। পরীক্ষা দিয়েও নয়। দাদা ধরেও নয়। এদিকে তখন পাড়ায় হু-হু করে টিভি ঢুকছে। কেবল-এর চাহিদা তুঙ্গে। রতি ঝোপ বুঝে কেবল-এর ব্যবসাটা শুরু করে দিয়েছিল। দাদারা চাকরি দিতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু ব্যবসাটা চালু করতে এবং দাঁড় করাতে হেল্প করল। রতি দাঁড়িয়েও গেল। রতি জানে, মানুষের দাঁড়ানো আর গাছের দাঁড়ানোর মধ্যে এই সূক্ষ্ম প্রভেদটা আছে এবং থাকবেও।

২) পেয়ারাগাছ কোনোদিন ক্লাবের সেক্রেটারি হতে পারবে না। রতিকান্ত কিন্তু হয়েছে। এমনিতে তার ব্যস্ততার শেষ ছিল না, এখনও নেই। তবে একটা সময় সে নিজে বুঝেছিল, কেবলের ব্যবসায় তার আর তেমন কাজ নেই। লাইন ফেলার কাজ জনাকয় ছেলে করে দেয়। মানে তারই মাইনে করে রাখা ছেলেরা। আর কালেকশনের জন্যও এরিয়া ভিত্তিতে কমিশন নেওয়া ছেলেপুলে রাখা আছে। ফলত রতির হাত একরকম ফাঁকাই।

ক্লাবটা তখন চায়ের দোকান থেকে সবে দানা বাঁধবে দানা বাঁধবে করছে। রতি ফুলদমে লেগে গেল সেই কাজে। এ অঞ্চল নামেই কলকাতা। আসলে তো ২৪ পরগণা। এ তল্লাটের বেশিরভাগই লোকই ওপার বাংলা থেকে এসে এককালে এই যাদবপুর-বাঘাযতীন-বিজয়গড় অঞ্চলে মাথা গোঁজার জমি পেয়েছিল। পরে সেই ছিটেবেড়ার ঘরগুলোই আস্তে আস্তে পাকা দোতলা বাড়ি হয়ে উঠতে লাগল। কোনও কোনওটা ফ্ল্যাটবাড়ি। এরা ওই নামেই বাঙাল। না কথার টান, না ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন- কেউই আর সেই অর্থে তথাকথিত ‘বাঙালত্ব’ ধরে রাখতে আগ্রহী নয়। অথবা বলা যায়, মুছে দিতেই চায়। দেশভাগ নিয়ে বাকি যা চর্চা, যন্ত্রণা, নস্ট্যালজিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি আগের জেনারেশনের মুখে মুখে ছিল, এতদিনে তা সরিয়ে আলাদা করে রাখার সময় হয়েছে। অমুখ কলোনি, তমুখ উদ্বাস্তু বিদ্যালয় ইত্যাদি নাম থেকে গেল বটে, কিন্তু পাড়ার চেহারাগুলো হু-হু করে বদলে যাচ্ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, অতীতের অনেক কিছুরই নিছক অতীত হওয়ার সময় এসেছে। একটা বেশ জাঁকালো বদল গোপনে গোপনে ছুরি চালাচ্ছিল, অবশ্য সে রক্তপাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলেই মনে হয়েছিল সেদিন। ফলে এদের অনেক কিছুই গেছে, শুধু কচুর লতি আর কোজাগরীতে লক্ষ্মীপুজোটা রমরমিয়ে বজায় থাকল।

তো এরকম একটা সময়েই ক্লাবটা তৈরি হচ্ছিল এই তল্লাটে। দিনে দিনে রতি তার হর্তা-কর্তা-বিধাতা হয়ে গেল। কেবলের ব্যবসার সুবাদে পাড়ার নাড়ি-নক্ষত্র তার জানা। ফলত ক্লাব চালানোয় তার থেকে ভাল লোক আর পাওয়া যাবে না।

যে ‘দাদা’রা রতিকে কেবলের ব্যবসা দাঁড় করাতে সাহায্য করেছিল, তারাই তাকে ক্লাবের মাথা করে দিল। হাতের লোক ক্লাবের মাথা, আর ক্লাবকে দিয়ে পাড়াকে বশে রাখা- অঙ্ক সহজই। অনেকেই বলত, এগুলো হল ছদ্মেবেশে পার্টি অফিস। অনেকেই নাকি জানত, লাঠি না ভেঙেও সাপ মেরে কী করে ভোটের বাক্স উপচে তুলতে হয়! তবে যারা এসব গোপন খেলা জানত তারা সহজে সামনে আসত না। ফোরফ্রন্টে থাকত রতিই।

এভাবে পার্থক্য ধরতে গেলে আরও অনেক কিছুই বেরোবে। তবে পেয়ারাগাছের সঙ্গে তার আশ্চর্য একটা মিল রতি আজকাল নিজেই খুঁজে পায়। তারা দুজনেই মূলত একা। কেবলের ব্যবসা, ক্লাবের সেক্রেটারি এইসব করে হল কী, রতি একরকম পাড়ার মাই ডিয়ার দাদা হয়ে গেল। ‘ও রতিদা আমার লাইনটা আসছে না’, ‘রতিদা এটা একটু দেখবে গো, অনেক বলে বলেও হচ্ছে না’… ইত্যাদিতে সে একসময় অভ্যস্ত হয়ে পড়ল। বরং এরকম বায়নাক্কা না শুনলেই মনে হত, সূর্য পশ্চিমে উঠল নাকি! ক্রমে একদিন দেখল, পাড়ার বউ-ঝি-মেয়ে, এমনকী অল্পবয়সি যাদের রতির একটু একটু ভালও লাগত তারাও তাকে দাদাই বলছে। ইউনিভার্সাল দাদা হওয়ার কারণেই রতির সম্ভবত আর বিয়ে করা হল না।

উঠে উঠে যাওয়া চামড়াগুলোয় ডাক্তারের দেওয়া পাউডার বোলাতে বোলাতে এখন রতির মনে হল, জীবনে কেউ একজন থাকলে ভাল হত। ভালই হত। এই প্রায় বুড়োবেলার মুখে দাঁড়িয়ে তার বেশ ফাঁকা ফাঁকাই লাগে। কে জানে কোনও পেয়ারাগাছেরও এরকম গা ছমছম করে কি না!

২)

‘মিনতিদি একদিন আসবে বলছিল।’- খবরটা দিয়ে ঠেকুয়া হাসিমুখে বসল। কিন্তু ফল হল উলটো। যারপরনাই খেপে গেল রতিকান্ত। তার চোখমুখ লাল হয়ে গেল।

এখানে দুটো কথা বলে রাখা দরকার, প্রথমত, প্রায় মাসখানেক হল ঘরের বাইরে বেরনো বন্ধ করেছে রতিকান্ত। ঘরে কাউকে আসতে দিতেও চায় না। কাজকর্ম সব ফোনেই সারে। অবশ্য কাজেও ইদানীং তার অনীহা দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রতিকান্তর ঘরে ঠেকুয়ার একটা আলাদা স্বাধীনতা আছে। বলা ভাল তার জীবনেই। ঠেকুয়া তার বন্ধু। ওর বাবা সেই কোনকালে বিহার থেকে চলে এসেছিল তার ঠিক নেই। তারপর এখানে এসে চায়ের দোকান। সেই হাফ প্যান্টুল বেলা থেকে ঠেকুয়ার দেশ যেন বদলে গেছে, সে এখানকারই ছেলে। এমনকী মাতৃভাষাটাও সে তেমন বলতে পারে না, যতটা ভাল বাংলায় কথা বলে। ঠেকুয়া বয়সে রতির থেকে ছোটই হবে, রতিদা বলেই ডাকে। কিন্তু প্রায় সমবয়সী ছোট-বড় হলে যা হয়। ঠেকুয়া আর রতিকান্তর একটা গভীর বন্ধুত্ব আছে। এবং নানা বিষয়ে ঠেকুয়া রতিকান্তর উপর অভভাবকগিরিও করে। যেন সেটা তার অধিকার। আর কী মন্ত্রবলে, রতিকান্ত সে সব মেনেও নেয়।

তো এই ঠেকুয়া কিছুদিন খেয়াল করেছিল, মিনতি নামে যে মহিলাটি ইদানীং ক্লাবে আসেন, তাঁর দিকে দেড় ইঞ্চি মতো সরে বসে রতি। কী একটা সংস্থা থেকে ক্লাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় সপ্তাহে একবার। মূলত বয়স্কদের জন্য। ডাক্তারদের নিয়ে আসেন ওই মহিলা। সঙ্গে আরও অনেকে থাকে। ঠেকুয়া পরে রতির মুখেই শুনেছিল, ওঁর নাম মিনতি।

মিনতি বিবাহিতা, বিধবা না ডিভোর্সি, ঠেকুয়া জানে না। জিজ্ঞেসও করেনি রতিকান্তকে। শুধু দেখেছে, ডাক্তাররা যখন কাজে লেগে পড়েছে তখন ক্লাব সেক্রেটারির সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলে মিনতি। তারপর বলে, চলুন চা খেয়ে আসা যাক। এমনিতে হাঁক পাড়লেই ঠেকুয়ার দোকান থেকে চা যায়। কিন্তু মিনতি এলে রতি তাকে নিয়ে দোকানে আসে। চা দিতে বলে। বয়াম থেকে দুটো প্রজাপতি বিস্কুট নেয়। তারপর পাশাপাশি বসে বিস্কুট দেওয়ার সময় ওই দেড় ইঞ্চিখানেক ঘেঁষে বসে। এমনিতে কারও কিছু চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু ঠেকুয়া রতিকান্তর কথায় যাকে বলে হাড়ে হারামি। সে বোঝে, সবই বোঝে।

রতির এই স্বেচ্ছানির্বাসনের গল্পে এবার যে একটু হালকা রোমান্সের দরকার ছিল তাও ঠেকুয়া ঠিকঠাকই বুঝেছে। তাই মিনতিকে বলেছিল, অসুখের জন্য রতি ইদানীং বেরচ্ছে না। আপনি চাইলে যেতে পারেন। মিনতি বলেছিল, রতির আপত্তি না থাকলে বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখে আসতেই পারেন। এখন যে অসুস্থ, যাকে দেখতে যাওয়া হবে, তার আবার আপত্তি কী! ফলে এই অপ্রাসঙ্গিক অংশটুকু ঠেকুয়া নিজের অসামান্য বিচক্ষণ ক্ষমতায় বাদ দিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, মিনতি দেখতে আসবে বলেছিল। কিন্তু শুনে রতি গেল খেপে।

এই ছাল-চামড়া ওঠা রতিকান্ত আসলে কিছুতেই মিনতির সামনে আসতে চায় না। প্রতিবার স্বাস্থ্যপরীক্ষার দিন মিনতি এলে সে হালকা ঝুঁকে পড়ত তার দিকে। মিনতি সম্ভবত একটা ফ্রেঞ্চ পারফিউম ইউজ করে। তার সঙ্গে মিশে যায় সারাদিনের শ্রম-ঘাম। সব মিলিয়ে একটা অন্য গন্ধ এসে বারবার করে ধাক্কা দিত রতির স্নায়ুতে। রতি আপ্রাণ তা শুষে নিত। বুঝতে পারত, মিনতি অল্প হলেও তাতে সায় দেয়। চুল খুলে রাখে এক একদিন। মিষ্টি শ্যাম্পুর গন্ধ ভেসে আসে। তেতেপোড়া ওঠা জীবনে এসব হালকা ব্যাপারগুলোকে কেউ তেমন পাত্তা দেয় না। তাছাড়া আলোচনার জন্য নোট বাতিল থেকে ফ্যাসিজমের মতো বড় বড় বিষয় আছে। ফলত এসব কারও চোখেও পড়ে না। তবু দু-একটা মুহূর্ত শুধু কারও কারও কাছে এরকম কস্তুরী হয়ে থাকে। রতি চায় না তা হারিয়ে যাক। এই ছাল-চামড়া ওঠা রতিকান্তকে দেখে মিনতি দূরে সরে যাক।

কখনও কোনও তরুণী এসে দাঁড়ালে পেয়ারাগাছেরও কি ইচ্ছে করত না যে, মেয়েটি আরও দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে থাক। মিনতি তরুণী তো নয়ই, যুবতীও নয়। তবুও মিনতি। তবুও ফ্রেঞ্চ পারফিউম। তবুও শ্যাম্পু চুলের গন্ধ।

ঠেকুয়ার উপর রাগটা চনমনিয়ে ওঠে রতিকান্তর।

৩)

অথচ মিনতি হেসেই হাল্লাক। অন্তর্ঘাতটা ঠেকুয়াই করেছে। একদিন সোজা মিনতিকে বাড়িতে এনে, বসিয়ে, চা আনি বলে কেটে পড়েছে। বলে কিনা, দিদি রাস্তা চেনে না। তাই সঙ্গে করে নিয়ে চলেএলাম। আসলে সে যেন চাইছিল, মিনতি রতিকান্তর বাড়িটা আসুক। আর তারপরযেটুকু যা আছে, সব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হোক।

কপাল ভাল, ঘটনা অবশ্য সেদিকেএগোচ্ছে না।রতিকান্তকে দেখে মিনতির দূরে সরে যাওয়ার কোনও ইঙ্গিত এখনও মেলেনি। বরং পুরো ব্যাপারটায় মিনতি যেন বেশ মজাই পেয়েছে।সে বলল, ভাবুন রতিকান্ত, চামড়া উঠতে উঠতে আপনি একটা আস্ত নতুন মানুষও হয়ে যেতে পারেন!

রতিকান্ত জিজ্ঞাসু মুখে মিনতির তাকিয়ে থাকে। বলে কী! জীবনভর সে মহিলাদের থেকে দূরে থাকা লোক। তাই এসব কথার অর্থ তার কাছে একেবারেই অধরা। প্লাস এই মুহূর্তে তার বেজায় ঘাম হচ্ছে, গেঞ্জি গোপনে সপসপে হয়ে উঠছে, সে টের পাচ্ছে। ফ্যানটা বাড়াতে গিয়ে দেখল, রেগুলেটর এর বেশি আর ঘোরে না।

মিনতি বলে, আসলে কী জানেন, মানুষের যত বয়স বাড়ে, চামড়ায় তত সময় লেগে থাকে।

রতি এবার একটু অবাক গলায় বলে, সময় থাকে? চলে যায় না?

মিনতি মাথা নেড়ে বলে, না চামড়া থেকে যায় না। এই ধরুন আমাদের বাবা-কাকাদের চামড়ায় স্বাধীনতা থেকে দেশভাগ লেগে ছিল। ওরা মরে গেছে, সেই চামড়াও চলে গেছে। তারপর ধরুন কারও কারও চামড়ায় মরিচঝাঁপি-সাঁইবাড়ি লেগে আছে, আছে মানে আছেই, সে চাইলেও তা সরাতে পারবে না। আবার ধরুন এখন আপনার-আমার চামড়ায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম লেগে আছে। এসব তো থাকবেই। জীবনভর থাকবে। কিন্তু আপনার কী মজা ভাবুন!

– কী মজা? ফের অবাক প্রশ্ন রতিকান্তর।

– আপনার এই যে নতুন চামড়া, তাতে কিছুই লেগে নেই। আপনি মানুষটা সেই একই আছেন। অথচ আপনার চামড়ায় কোনও ইতিহাস লেগে নেই। একেবারে ফ্রেশ। আপনার তাই কোনও কিছু বয়ে বেড়াবারও দায় নেই।

রতিকান্ত মনে মনে ঠেকুয়াকে গাল পাড়ে। বোঝে, মিনতি এই সব অবোধ্য কথাবার্তাতেই আসলে তার থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে।এটাই তো চেয়েছিল, হারামজাদা! সে কাতর গলায় বলে,

– আমি কি তাহলে বদলে যাব মিনতি? নতুন চামড়া না উঠলে তো আমি বাঁচবও না। ডাক্তার লোশন দিয়েছে। বলেছে, নিয়মিত লাগালে পুরনো চামড়া উঠে, নতুন গজাবে।

– আহ বদলালেনই বা! আপনি একটা একটা আস্ত পুরনো নতুন মানুষ হয়ে উঠছেন রতিকান্ত। ইটস ফ্যানটাস্টিক।

– সে আবার কীরকম? নতুন তবু পুরনো? কীরকম উদ্ভট শোনাল না!

– ভেবে দেখুন রতিকান্ত, ব্যাপারটা উদ্ভটই কিন্তু। আপনি এমন একজন মানুষ যার স্মৃতিতে সব জমা আছে, কিন্তু চামড়ায় কোনও দাগ নেই। ফলে আপনি স্বছন্দে যা ইচ্ছে তা-ই হয়ে যেতে পারেন। কোথাও কোনও বাধা নেই।

– মানে? আমি কী হব?

– ধরুন ফিল্ম স্টার হয়ে গেলেন। ঝকঝকে তকতকে ত্বক। কোথাও কোনও দাগ নেই। একেবারে পিকচার পারফেক্ট।

– যাহ্‌, কী যে বলেন না। আমি আবার নায়ক-ফায়ক…

– তা না হলেও, যা কিছু হতে পারেন। বড় অফিসের সাহেব হয়ে যেতে পারেন, ডিস্কে গিয়ে নাচতে পারেন, শপিংমলে দিনরাত কফি খেতে পারেন। কিংবা বিয়ার পাবে বসে সেলফি তুলতে পারেন। সকলেই আপনাকে অ্যাকসেপ্ট করবে। কারণ আপনার চামড়া নতুন। সেখানে কোথাও কোনও সময়ের দাগ নেই। কেউ বলবে না, একি এরকম কাটা-ছেঁড়া চামড়া নিয়ে আপনি ফুর্তি করতে এসছেন কেন?

রতিকান্ত কী বলবে ভেবে পায় না। একেবারে চুপ করে যায়। মিনতি একটু দম নিয়ে বলতে থাকে, তারপর ধরুন আপনাকে বড় বড় সংস্থা লুফে নিচ্ছে। রোল মডেল করে ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। বলবে, এই লোকটিকে দেখুন। কীভাবে সবকিছু চামড়ার তলায় লুকিয়ে বিলকুল নতুন মানুষ হয়ে ওঠা যায়, ইনি নিজের জীবনে পরীক্ষা করে তা দেখিয়েছেন। ইনি একজন যুগপুরুষ নয় তো কী! আপনি রাতারাতি স্টার হয়ে উঠবেন রতিকান্ত, সকলেই আপনাকে ফলো করছে, সেলফি তুলছে, সেমিনারে সেমিনারে আপনি বক্তৃতা দিচ্ছেন। সবাইকে শেখাচ্ছেন, কীভাবে নিজেকে একটা আস্ত নতুন মানুষ করে তুলতে হয়। ক্যান ইউ ইমাজিন?

রতিকান্ত ফ্যালফ্যাল করে মিনতির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ঘাড় নাড়ে। তারপর কোঁত করে ঢোক গিলে বলে, চা খাবেন? বসাব?

মিনতি মাথা নেড়ে বলে, না, আজ থাক। এতক্ষণ আপনার ঘরে বসে আছি, লোকে কী ভাববে বলুন তো! সবার তো আর চামড়া বদল হয়নি।

৩)

ঠেকুয়া ফোন করেছিল, ধরেনি রতিকান্ত। মিনতিও ফোন করেছিল। কেটে দিয়েছে। নতুন লাইন ফেলা নিয়ে কী একটা সমস্যা হয়েছিল, তার অফিস থেকে ছেলেরা ফোন করেছিল। রাগে ফোনটাই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে রতিকান্ত।

তার শুধু মনে হচ্ছে, সে একটা দাগহীন নতুন মানুষ হয়ে যাচ্ছে। মিনতি যে কী কথা শুনিয়ে গেল! এখন এত দাগ সে ফেরত পাবে কী করে!

তারপরই মনে হল, দাগের কীই-বা দরকার! নতুন মানুষ হয়েও তো দিব্য থাকা যায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভয় হল। মিনতি যদি সেই নতুন মানুষকে স্বীকার না করে? কী করে বোঝাবে তখন যে সে আসলে সেই পুরনো লোকটাই। এদিকে যে চামড়া হারিয়ে যাচ্ছে, তাকে আর ফেরত পাওয়া যায় না। ফলত একটা জগাখিচুড়ি মানুষ হয়েই তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে।

ভাবতে ভাবতে ঘাম হয় রতিকান্তর। অন্ধকার নেমে আসে চারিদিকে, রাত বাড়ে। আলো জ্বালায় না সে।

তার মনে পড়ে সেই কোন ছোট্টবেলায় তাদেরও একটা পেয়ারাগাছ ছিল। এরকমই ছাল উঠত গাছটার। ছাল খসিয়ে খসিয়ে গাছটা দিব্যি বেঁচেও ছিল। তারপর একদিন বাড়ির বড়দের মধ্যে ঝামেলা হল। নতুন পাঁচিল উঠল। আর পেয়ারা গাছটাকে হুট করে কেটে ফেলা। দিনকয় রোদে পড়ে থেকে সে শুকিয়ে জ্বালুন হয়ে গেল।

আজ এতদিন পর রতিকান্তর আচমকা মনে হল, পেয়ারাগাছটা তাহলে কি সেদিন মরে গিয়েছিল, নাকি মরে বেঁচে গিয়েছিল? দাগহীন নতুন চামড়ার মানুষ হয়ে একদিন তাকেও কি তাহলে ওরকম মরে বাঁচতে হবে!

এই ঘন অন্ধকার হাতড়ে অবশ্য এর কোনও উত্তরই পেল না রতিকান্ত। নীলচে মশারীটা শুধু দুলে দুলে ফুলে উঠল রাতের হাওয়ায়।