অর্ণব সাহা

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, উলটোদিকের ফুটপাথ থেকে রাস্তা ক্রস করে ফার্ন রোডের দিকে হেঁটে আসতে গিয়ে আকস্মিক ভাবেই শ্রেয়া মুখার্জির ডানপায়ের চপ্পলের স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে যায়। ঈষৎ খুঁড়িয়ে, পরপর দু-তিনটে অটো, একটা সরকারি বাস, বেশ কয়েকটা ট্যাক্সি-প্রাইভেট কারের ধাবমান গতি সামলে সে যখন রাস্তার এপারের ঝালমুড়িওয়ালার সামনে এসে পৌঁছেছে, ততোক্ষণে, পুরো জুতোটাই প্রায় পা থেকে খুলে বেরিয়ে যাবার উপক্রম। আশেপাশে কোনো জুতোসারাইয়ের দোকান আছে কি না ভাবতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হল পিছনদিকের বন্ধ হয়ে-যাওয়া রিসর্ট, যেটা ভেঙে এখন থ্রি স্টার হোটেল আর জুয়েলারির দোকান তৈরি হয়েছে, তার পাশেই এক বিহারি মুচি বসে। অনেকদিন ধরেই।

শ্রেয়া আরও একবার কোনোক্রমে রাস্তা পেরিয়ে ওই ফুটপাথে পৌঁছয়, কিন্তু, দুর্ভাগ্য, লোকটা আজ বসেনি ওখানে। অগত্যা সে আবারও মেডিসিন শপ আর পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর দিকে ফিরে আসে। হ্যান্ডব্যাগে পার্স হাতড়ে দেখে নেয় ঠিক কতো টাকা আছে। না, নেই। মোড়ের জুতোর দোকান থেকে কেনার মতো অবশিষ্ট টাকা একটুও নেই। আজ হায়দ্রাবাদ থেকে অয়ন ফিরেছে। সারাদিন ধরে অনেক ঝুটঝামেলা পেরিয়ে মানিকতলার বাড়িতে ফিরেছে বেচারা। আজ রাতে তারা একসঙ্গে ডিনার সারবে, আজকের দিনটা উদ্‌যাপন করবে। আর আজ, সেটা স্পনসর করবে শ্রেয়া নিজে। আজ পাঁচ তারিখ, তাদের রিলেশনশিপের ঠিক এক বছর পূর্ণ হল। ভাবতেও অবাক লাগে, গতবছর, ঠিক এই দিনে তারা প্রথমবার মিট করেছিল নন্দন চত্বরে। তার আগের ছ’সাত মাসের ফেসবুকের পরিচয়, আলাপ থেকে প্রেম, তা থেকে আস্তে আস্তে কমিটমেন্টে পৌঁছনোর একটা ছোট্ট, গোপন ইতিহাস আছে তাদের। একান্তই ব্যক্তিগত, অথচ তীব্র, অমোঘ। যা আর কারও সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না সে। অয়ন তো আরোই বেশি রিজার্ভ। ভিতরের অনুভূতি একটুও বাইরে প্রকাশ করে না। অদ্ভুত এই ছেলেটা। ওকে আজও পুরোটা বুঝে উঠতে পারে না শ্রেয়া। আর, যতো কম বোঝে, ততো বেশি করে ওর প্রতি এক তীব্র প্যাশন ও আকর্ষণ কাজ করে তার ভিতরে। অন্তত, এর আগের সম্পর্কগুলোয় যা সেইভাবে অনুভব করেনি সে। যা, আজ টের পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত। নতুন করে।

কয়েক পা এগোলেই শতাব্দীপ্রাচীন স্কুলবাড়ির গেটটা খোলা। খোলাই থাকে এই সময়ে। সপ্তাহে ছ’দিন সন্ধেবেলা এখানে নাটকের রিহার্সাল চালায় কলকাতার একাধিক থিয়েটার দল। শ্রেয়া যে গ্রুপে অভিনয় করে, সেই ‘কলকাতা ২৯’ দলের নতুন প্রোডাকশন মঞ্চস্থ হবে আর মাসখানেকের মধ্যেই। আজ প্রায় দু’বছর গ্রুপে থাকার পর এই প্রথম সে একটা বড়ো রোলে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছে এবার। এক উঠতি সাংবাদিকের রোল, যে এক বিগতযৌবনা অভিনেত্রীর ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে বাংলা সিনেমার ষাট-সত্তর দশকের ইতিহাসের সঙ্গে একটু একটু করে জড়িয়ে পড়ছে। খুবই চ্যালেঞ্জিং রোল। শ্রেয়া যদিও খুব একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয় কেরিয়ারের ব্যাপারে, তবু, অভিনয় তার প্যাশন। সে স্টার হতে চায় না, কিন্তু ভালো কাজের মধ্যে দিয়ে দর্শকের মনে দাগ কাটতে চায়। আজ একটু লেট হয়ে গিয়েছিল। শ্যামলীদি, গ্রুপের ডিরেক্টর, একবার ঈষৎ বিরক্তি নিয়ে তাকালেন তার দিকে। ঘরের এক প্রান্ত থেকে শৌভিকদা এগিয়ে এল। বলল:

–কী রে শ্রেয়া, আজও দেরি করে এলি?
–দেখতে পাচ্ছ, পায়ের অবস্থা!
–ওমা! একী! এক পায়ে তোর জুতো নেই প্রায়…কি করে ছিঁড়ল স্ট্র্যাপ?
–রাস্তা ক্রস করার সময়। পায়ে ভালোরকম মোচড় লেগেছে শৌভিকদা।
–আচ্ছা আচ্ছা। তুই এক কাজ কর। টয়লেটে যা। পায়ে একটু জলের ছিটে দিয়ে আয়…
–লাগবে না। আমি ঠিক আছি। তোমরা কতোক্ষণ এসেছ?
— প্রায় এক ঘণ্টা। তুই একটু রেস্ট নে। তারপর তোর সিকোয়েন্সটায় যাচ্ছি। ওকে?

বাইরে থেকে দেখলে কেউ বলবে, এই শৌভিক লোকটা ভিতরে ভিতরে কতোখানি কামুক আর সুযোগসন্ধানী? ইচ্ছেমতো নানা অছিলায় পিঠে, কোমরে, মাথার চুলে হাত দেয় শ্রেয়ার। অস্বস্তি হয়। ঘেন্না হয় শ্রেয়ার। কিন্তু কিছু করার নেই। অন্য থিয়েটার গ্রুপগুলোতেও একই জিনিস চলে কম-বেশি। এখানে বরং শ্যামলীদি, অরুময়দার মতো কয়েকজন সিনিয়ার আছে, যাদের উপস্থিতিতে কেউই খুব বেশি দূর বেচাল করতে পারে না। এরাই এই গ্রুপে শ্রেয়ার কমফোর্ট জোন। শ্যামলীদি এগিয়ে আসে এবার। খুব আন্তরিক ভাবে জানতে চায়— “তোর কি খুব যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে?”
–না না তোমরা একদম ভেবো না দিদি। আমি ঠিক আছি।
–শোন, তুই একটা জুতো কিনে আন। টাকা না থাকলে বল, আমি দিচ্ছি…
–কেন এতো ভাবছ শ্যামলীদি? আমি পার্ট মুখস্থ করে ফেলেছি…টেনশন নিও না…

এরা কেউ বুঝবে না, আজ শ্রেয়ার টেনশন জুতোর স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে যাওয়া নিয়ে নয়। অয়ন গত একবছরে তার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে গিয়েছে। একটা সম্পূর্ণ অচেনা ফেসবুকে আলাপ-হওয়া ছেলে যে কীভাবে তার মনের গভীরে এতোটা জায়গা করে নিল, বুঝে উঠতে পারে না শ্রেয়া। আজ সকালে দমদম এয়ারপোর্টে নেমেছে অয়ন। আজ ওর প্রথমে একবার সরাসরি গড়িয়াহাটে আসার কথা ছিল। ট্যাক্সি নিয়ে আসার পথে চিংড়িহাটায় একটা মারাত্মক গণ্ডগোলে আটকে যায় অয়ন। প্রায় দু-আড়াই ঘণ্টার জন্য। একটা স্টেট বাস দুজন স্কুলছাত্রীকে চাপা দিলে এলাকার মানুষ ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা পরপর চার-পাঁচটা সরকারি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় ও লোকাল থানা অবরোধ করে। আসলে ওই এলাকার অটোচালক, হকার, ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের উপর পুলিশের জুলুম দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সেই অবদমিত ক্রোধ হিংস্র প্রতিক্রিয়ায় তাণ্ডব চালিয়েছে আজ গোটা অঞ্চল জুড়ে। অগত্যা ট্যাক্সি ঘুরিয়ে অয়ন ফিরে গেছে নিজেদের মানিকতলার বাড়িতে। রাতে সে আসবে এখানে। আনন্দমেলার সামনে দাঁড়াবে শ্রেয়া। ঠিক আটটায়। ‘রেড চিলি’-তে খেতে যাবে তারা। যখন প্রথম পরিচয় হয়, অয়নের ফেসবুক নেম ছিল ‘অগাস্টিনো অয়ন’। অবাক শ্রেয়া জানতে চেয়েছিল এই নামের মানে। অয়ন বলেছিল, কোনো কারণে নয়, এমনিই, খানিকটা চমকে দেবার জন্য এই নাম তার। এখন ভাবলে হাসি পায়, ‘অগাস্টিনো’ থেকে শুধু ‘অয়ন’-এ নিয়ে আসতে কতোখানি লেবার দিতে হয়েছে শ্রেয়াকে…অয়ন বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়ত দুর্গাপুরে্র একটা প্রাইভেট কলেজে। তখনই একদিন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় সে শ্রেয়াকে। মাত্র তিন-চার মাস হল কোর্স কমপ্লিট করে হায়দ্রাবাদের একটা বড়ো ফুড চেইনে ট্রেনি হিসেবে ঢুকেছে অয়ন। চাকরিতে জয়েন করার পর এটাই তার প্রথমবার কলকাতায় আসা। লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ নিয়ে গোড়ায় যথেষ্ট সংশয় ছিল শ্রেয়ার। এখন আর নেই। তার দিনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত আজ ভরিয়ে রেখেছে এই ছেলেটা। বহুদূর থেকেও এমন একটা তীব্র কেয়ারিং দেয় সে, যা শ্রেয়া তার আগের কোনো বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে পায়নি। শ্রেয়া তাই অয়নকে হারাতে চায় না। কোনোমতেই নয়।

এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই টানা হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল তাদের দুজনের। চিংড়িহাটায় ট্যাক্সি যখন জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে, উদ্বিগ্ন শ্রেয়া আর থাকতে না পেরে ফোন করে:

–কী অবস্থা ওখানে ? তুই কি ট্যাক্সিতেই?
–হ্যাঁ। কী ভয়ানক জ্যাম কল্পনা করতে পারবি না…
–জানি। টিভিতে দেখছি তো ঘরে বসেই…পরপর বাস জ্বালিয়ে দিয়েছে…
–জানি না এখন আর তোর সঙ্গে দেখা হবে কীনা!
–শোন, চাপ নিস না । জোর করে আসার দরকার নেই।
–আসব না? অয়নের গলায় অভিমানের সুর…
–রাগ করিস না বাবু…অনেক দেরি হয়ে গেছে…বাড়ি যা…রাতে তো দেখা হচ্ছেই…
–তোর জন্য গিফটটা এতোক্ষণ ধরে রেখে দিতে হবে?
–পাগল তুই? রাতে দিস…হেসে ফেলে শ্রেয়া…

কসবা বড়োবাগানের মুখে দোতলা ছোট্ট বাড়ি শ্রেয়াদের। জয়েন্ট ফ্যামিলি, তবে হাঁড়ি আলাদা। বেলা তখন প্রায় দেড়টা। মা রান্নাঘরে। পাশের ঘরে বসে বাবা একলা ভায়োলিন বাজাচ্ছে। সেই কোন্‌ ছোট্টবেলা থেকে শ্রেয়া শুনে আসছে বাবার ঘর থেকে বাজনার শব্দ। বাবা কোনোকালেই সেভাবে কেরিয়ার করে উঠতে পারেনি। নামকরা ওস্তাদদের সঙ্গে বাজিয়েছে। বাজনা শিখেছে। এখন ভায়োলিনের টুইশনই বাবার একমাত্র রোজগার। একটা বিষণ্ণ অথচ অদ্ভুত ভালোমানুষ বাবা, যাকে কোনোদিন কারও উপর রেগে যেতে দেখেনি শ্রেয়া। মুখ দিয়ে একটাও খারাপ শব্দও বেরোতে শোনেনি তার। এই চব্বিশ বছরের জীবনে বাবা তার একমাত্র আশ্রয়, যাকে এতোটা ভালোবাসে সে। এতোটা বিশ্বাস করে। অনলের সঙ্গে রিলেশনশিপ ভেঙে যাবার পর কিছুদিন ছন্নছাড়া, উদ্‌ভ্রান্ত লাগত শ্রেয়ার। তার সেই ক্লাস ইলেভেনের প্রেম অনল। তখন বাবার বুকে মাথা গুঁজে রাতের পর রাত ঘুমিয়ে পড়েছে শ্রেয়া। বাবার খাটে শুয়ে গভীর রাত অব্দি সে শুনত একমনে ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে লোকটা। কিচ্ছু হতে না-পারা, কিচ্ছু না-হয়ে ওঠা একটা লোক, অথচ তার ভিতরে কী অপার্থিব প্রশান্তি কাজ করে, প্রক্ষোভবিহীন, শান্ত একটা জীবনযাপনে নিজেকে বেঁধে রেখেছে বাবা। এই ছোট্ট জীবনে অনেক ধরনের মানুষের সংস্পর্শেই এসেছে শ্রেয়া। বিশেষত গ্রুপ থিয়েটার করার সূত্রে তাকে মেলামেশা করতে হয় অনেক লোকের সঙ্গেই। সে টের পায় একটা ঊর্ধ্বশ্বাস, দুর্বিনীত জগতের ব্যস্ত সড়কে যেন কতকগুলো গ্ল্যাডিয়েটর বুনো শুয়োরের মতো কামড়াকামড়ি করছে প্রত্যেকদিন। আর এসবের বিপরীতে কতোখানি শান্ত তার বাবা, প্রায় ঋষিদের মতই প্রজ্ঞাবান ও স্থির।

–তোর কী হয়েছে মাম্পি? জিগেস করল বাবা।
–কিছু না বাবা, একটু টেনশন হচ্ছে কেবল…
–অয়ন আসছে আজ, তাই না?
–হ্যাঁ, চিংড়িহাটায় আটকে গেছে মারাত্মক জ্যামে…
–কী হয়েছে ওখানে?
–চার-পাঁচটা বাস পুড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোল হচ্ছে খুব…
–ওকে বল, ট্যাক্সি উলটোদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে যাক…
–উলটোদিক মানে?
–যদি সম্ভব হয়, কাদাপাড়া দিয়ে, সুভাষ সরোবর হয়ে বেরিয়ে যাক। আজ দেখা করার কথা?
–হ্যাঁ বাবা। আজ ওকে রাতে আসতে বলেছি…শ্রেয়ার গালদুটো অজান্তেই সামান্য লালচে হয়ে ওঠে…
–হ্যাঁ, সেটাই ভালো। রাতে আসুক। এখানে আসতে বলেছিস?
–না। রাস্তায় মিট করব…

কিছুক্ষণ টিভি দেখল, গতবারের পুজো সংখ্যার পাতা নেড়েচেড়ে দেখল শ্রেয়া। মন বসল না। দুপুরে খিদে পায়ই না সেভাবে। বেশিরভাগ দিনই লাঞ্চ স্কিপ করে সে। এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে খিটমিট লেগেই থাকে তার। কমার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের পর আর পড়া কন্টিনিউ করেনি শ্রেয়া। একটা মার্কেন্টাইল ফার্মে অ্যাকাউন্টান্টের চাকরি নিয়েছিল। সামান্য মাইনে দিত ওরা। তাও পেমেন্ট হত মাসের পনেরো-ষোলো তারিখে । গতমাসে সেই চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে সে। থিয়েটারটাই এখন তার একমাত্র ফোকাসের জায়গা। যদিও সে জানে এই সার্কিটেও সামনের দিকে এগোনো রীতিমতো কঠিন। অসম্ভব ট্যালেন্ট তো লাগবেই, তারসঙ্গে আরও কিছু লাগবে, যে জিনিসগুলো আদৌ তার ভিতরে আছে কিনা তা নিয়ে নিজেরই রীতিমতো সংশয় আছে তার। কোনো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া, ব্যাকিং ছাড়া সে হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে মঞ্চ থেকে। হয়তো আর পাঁচটা সাধারণ গৃহবধূর মতই স্বামী-সন্তান-সংসারময় জীবন হয়ে দাঁড়াবে তার, যেখানে থিয়েটার একটা নেহাতই শখের পাসটাইম হয়ে থাকবে। সেরকম মহিলাও সে প্রচুর দেখেছে এই থিয়েটারের জগতে। শ্যামলী ম্যাডাম তাকে খুবই স্নেহ করেন, কিন্তু তিনিও একটা সময়ের পর আর কতোটা পাশে থাকবেন, তা নিয়েও সংশয় আছে…

শ্রেয়ার মনখারাপের রেমিডি অবশ্য বাড়ির কাছেই হাজির রয়েছে। তার আশিস স্যার। মধ্য-পঞ্চাশের এই মানুষটি তার যাবতীয় আহ্লাদ, খামখেয়ালিপনা সহ্য করে আসছেন সেই ক্লাস এইট থেকে। স্যারের কোচিং-এ সে ঢুকেছিল অংক শিখতে। স্যার কোনো স্কুলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না কখনও। টিউশনই তাঁর বরাবরের পেশা। কীভাবে যে আশিস স্যার তার জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে গেলেন, তা সে নিজেও ভালো বোঝে না। আসলে আশিস স্যারের মধ্যেও সে খুঁজে পায় একধরনের পিতৃসত্তা। ভিতরে ভিতরে হয়তো বাবার কাউন্টারপার্ট হিসেবে দেখে সে এই লোকটাকে। অথচ, একইসঙ্গে, স্যারের প্রতি তাঁর আকর্ষণটা কেবল গুরুর প্রতি শিষ্যার নিবেদনের মতো নয়। লোকটা আসলে তাঁর গোপন প্রেমিক, তাঁর নিভৃত নিশ্বাস। আর সেটা আশিস স্যার খুব ভালোই বোঝেন। আর, এই একতরফা নিবেদনের সুযোগ উনি কোনোদিন নেননি শ্রেয়ার কাছ থেকে। স্যারকে মনে মনে একটু ভয়ও পায় শ্রেয়া। বিশেষত, ওঁর বাইরেটা খুব কঠোর। আর ভিতরটা শিশুর মতো। বেশ কিছুদিন বাদে গেলে, মাঝখানে যোগাযোগ না রাখলে রীতিমতো রিয়্যাক্ট করেন। আর সেটা খুব অদ্ভুতভাবে। যেমন, গতমাসের এক বিকেলবেলায় শ্রেয়া ঢুকেছে স্যারের কোচিং- এ, তখন উনি পড়াচ্ছিলেন। প্রথমটায় চিনতেই পারলেন না। তাকালেন না পর্যন্ত। ইচ্ছে করেই অ্যাভয়েড করছিলেন। রীতিমতো রাগ হচ্ছিল শ্রেয়ার…

–কী হল স্যার? আমি যে আধ ঘণ্টার উপর বসে আছি, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?
–কে তুই? তোকে আমি চিনি না…
–চেনেন না তো? আচ্ছা বেশ! আমি উঠলাম তবে। টা টা স্যার…
–তুই কি মানুষ? রাগে ফেটে পড়ল লোকটা…মুখচোখ লাল হয়ে গেছে আশিস স্যারের। শ্রেয়া মনে মনে হাসি চেপে রাখতে পারল না…
–ওমা! আপনিই তো বললেন আমায় চেনেন না…
–সারাদিন টো টো করে ফুর্তি করে বেড়াস রাস্তায় রাস্তায়…বুড়ো স্যারের কথা একবারও মনে পড়ে? উত্তেজনায় থমথম করছে লোকটার মুখ-চোখ…
–কে বলল পড়ে না? কোমর বেঁধে ঝগড়া করার মুডে তখন শ্রেয়া…
–অ্যাই, তোরা আয় আজ…আমি ওর সঙ্গে কথা বলব আজ…উপস্থিত জনা আট-দশ ছাত্রছাত্রীকে উঠে যেতে বললেন আশিস স্যার…এরকম উনি আগেও করেছেন…
–কী আশ্চর্য ওদের তুলে দিচ্ছেন কেন? আমি বরং ঘুরে আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে…
–না। তুই কোথাও যাবি না…
–কেন যাব না? আপনার কথায়?
–তুই গেলে আর ফিরবি না আজ। জানি আমি…

স্যারের পায়ে পিঠ দিয়ে, মেঝেতে বসে, স্যারের ডানপায়ের বুড়ো আঙুলের নখ খোটার শখ শ্রেয়ার সেই বাচ্চাকাল থেকে। আজও তার ব্যতিক্রম হল না…মিনিট দশেকের মধ্যেই বুড়োর সব রাগ-অভিমান উধাও…উনি শ্রেয়ার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন… তারপর বলতে শুরু করলেন কলেজজীবনের গল্প। কলেজে যার সঙ্গে প্রেম ছিল, এখন সেও প্রৌঢ় গৃহিনী, তার সঙ্গে বাজারে গেলে মাঝেমধ্যে দেখা হয়, সেই গল্প। বাড়িতে বউয়ের সঙ্গে কী কী নিয়ে খিটিমিটি লাগে, নিজের ছেলে, যে এখন এমবিএ পড়ছে, সে কোন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে, সমস্তই শ্রেয়াকে খুলে না বললে পেটের ভাত হজম হয় না স্যারের। আর, শ্রেয়াও এইসব কথা এতো সিরিয়াসলি শোনে, মতামত দেয়, স্যার সেই মতামতের উপর এতো বেশি গুরুত্ব দেন, যেন শ্রেয়া ওঁর পুরোনো ছাত্রী নয়, শাগরেদ। বাবার মতোই একটা কমফোর্ট জোন লোকটা। যার প্রতি কম বয়সে একটা তীব্র প্যাশন অনুভব করত শ্রেয়া। এখনও করে, তবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় না আজ আর…সে তো বড়ো হয়ে গেছে, অন্তত নিজের কাছে…যদিও আশিস স্যার স্বীকার করেন না, সে আদৌ একটুও বড়ো হয়েছে…আর শ্রেয়াও তার যাবতীয় মনখারাপ, আবদার, মান-অভিমান উগরে দেয় স্যারের কাছে এসে…আজও দুপুরে মন ভালো লাগছিল না। সে দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে হাঁটা দিল স্যারের কোচিং-এর দিকে। পৌঁছে দেখল দরজা আলতো ভেজানো। সে পাল্লা দুটো ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখে ঘর প্রায়-অন্ধকার। জানলা বন্ধ। একটা বই মুখে নিয়ে চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আছেন আশিস স্যার। চোখ তুলে দেখলেন শ্রেয়াকে। ঘরে আর কেউ নেই…ছেলে-মেয়েদের এখনও আসার সময় হয়নি। এই বাড়িটা স্যারের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। ফ্যামিলি উপরতলায় থাকে। নীচের তলায় একটা বড়ো ঘরে ওঁর কোচিং। বাকি দুটো ঘরে ভাড়াটে থাকে…

–আয় । বোস…
–কী করছেন ?
–শীর্ষেন্দুর লাস্ট বারের পুজোর উপন্যাসটা পড়ছিলাম…আমার হয়ে গেলে তুই নিয়ে যাস…
–আমার দারুণ লাগে ওঁর লেখা…জানেন, আজ অয়ন আসছে…
–কখন আসবে ?
–রাতে । ডিনারে যাব…
–তার আগে এখানে একবার নিয়ে আয় ওকে…
–আজ নয় স্যার । ও তো আছে এখন কিছুদিন…আর একদিন নিয়ে আসব…
–আজ কিছু স্পেশাল ডে নিশ্চয়ই…
–আজ ফ্রেন্ডশিপের অ্যানিভার্সারি…
–একবছর হয়ে গেল ? হাসলেন আশিস স্যার…
–হ্যাঁ । কিন্তু আমার মন ভালো নেই…
–কি হয়েছে তোর ?
–জানি না স্যার…আপনি আমায় ভালোবাসেন ? খুব ?
–হঠাৎ এই কথা কেন ?
–উফ্‌ ! বলুন না । হ্যাঁ অথবা না বলুন…
–না । বাসি না তোকে ভালো । একটুও না…
–এইভাবে বললেন ? খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল শ্রেয়া…
–যেমন প্রশ্ন, তেমনই তো উত্তর পাবি …
–আচ্ছা, বলুন তো অয়নের সঙ্গে এই রিলেশনশিপটা টিঁকে যাবে আমার ?
–ওকে না দেখে কি করে বলব ? আমি কি হাত গুনতে জানি ?
–উফ্‌ । আপনি তো সব বোঝেন । বলুন না স্যার…
–কেন টিঁকবে না ? সবে তো একবছর । যদি একসাথে থাকিস, দেখবি রিলেশনটা বদলাতে বদলাতে যাচ্ছে…আজ থেকে দশ বছর বাদে একদম আলাদা শেপ নেবে পুরোটা…
–আমারও তাই মনে হয় জানেন…কিন্তু কদিন ধরে কিছু একটা হচ্ছে…
–কি হচ্ছে ?
–মনে হচ্ছে অয়ন ভালো নেই…অথচ ও এতো চাপা আমায় কিছু বলছেও না…
–কেন মনে হচ্ছে এরকম ?
–জানি না…মনে হচ্ছে ও একটা চাপা টেনশনে আছে…
–বেশ তো কথা বল ওর সঙ্গে…চা খাবি শ্রেয়া ?
–করুন…

স্যার রোজই নিজে হাতে চা বানিয়ে খাওয়ান শ্রেয়াকে । এটা সেই ক্লাস নাইন-টেন থেকেই…এতো ভালো ভালো জায়গায় চা-কফি খেয়েছে শ্রেয়া । কিন্তু স্যারের হাতের চা সত্যিই অনবদ্য । স্যার একসময় কবিতা লিখতেন । কিছু কিছু লেখা ছাপাও হয়েছিল । একটা কবিতার বইও আছে স্যারের । মলিন, প্রায়-ছেঁড়া বইটার এক কপি শ্রেয়ার কাছে খুব যত্নে রাখা আছে । মাঝেমধ্যেই সেই বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে শ্রেয়া । সে যে খুব একটা কবিতা বোঝে এরকম নয় । কে জানে, স্যারের লেখা বলেই হয়তো এতো ভালো লাগে সেগুলো । স্যার কোনোদিন কিচ্ছু হতে চাননি, কোথাও পৌঁছতে চাননি…তাই বোধহয় তিনি এমন কিছু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, যা খুব কম লোকই পায় এই জীবনে । এরকম মানুষকেই শ্রদ্ধা করে শ্রেয়া,
ভালোবাসে । থিয়েটারের লোকজনকে সে এই কারণে ভিতর থেকে পুরোটা নিতে পারে না । ওরা সকলেই যেন কোন্‌ এক অদৃশ্য লক্ষ্য পূরণ করবে বলে লাগাতার ছুটে চলেছে । অথচ জানে না কোথায় পৌঁছতে চায় । মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে এই থিয়েটারের সার্কিট । মনে হয় সবকিছু ফেলে দূরে কোথাও চলে যাই…

আসলে অয়ন যেন কিছুটা মনমরা গত কয়েক দিন ধরেই । খুব চাপা স্বভাবের বলেই বাইরে কিছু বলে না সে । ফোন, ইনবক্স, হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কলে কথা হয় । তবুও শ্রেয়া জানতে পারে না আসল সত্যিটা । রিহার্সাল শেষ করে একবার বাড়ি গেল সে । স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিল । জামাটাও চেঞ্জ করল । জুতোটার যা অবস্থা হয়েছিল, সত্যিই কোনোক্রমে বাড়ি না এসে আর কোনো উপায় ছিল না । সময় প্রায় হয়ে গেছে । ঠিক আটটায় সে এসে দাঁড়াল আনন্দমেলার সামনে । দেখল, এককোণে দাঁড়িয়ে মোবাইল স্ক্রোল করছে অয়ন । ওকে দেখলে, কেন জানে না, ভিতরটা কেঁপে ওঠে শ্রেয়ার । বারবার এই একই ফিলিংস হয় । ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, মাত্র একবছর আগেও ও ছিল না তার জীবনে । গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি দিনটা সে তাই ভুলতে পারে না কোনোদিন । শ্রেয়া এগিয়ে যায় । অয়ন ততোক্ষণে দেখতে পেয়েছে তাকে ।

গড়িয়াহাট চারমাথার মোড় ক্রস করে তারা এগিয়ে যায় । ‘প্যান্টালুনস’ পেরিয়ে বাঁদিকের গলিতে ওদের খুব পছন্দের সেই রেস্তোঁরায় ঢোকে । খাবার অর্ডার করে । শ্রেয়া হঠাৎ খেয়াল করে অয়ন একদৃষ্টে চেয়ে আছে তার দিকে । শ্রেয়ার অস্বস্তি হতে থাকে । একই সঙ্গে সে বুঝতে পারে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটেছে ইতিমধ্যেই । মুখ নিচু করে দাঁতে কাটতে থাকে অয়ন খাবারের টুকরোগুলো । তারপর খুব শান্ত ভাবে বলে :

–চাকরিটা বোধহয় আর থাকবে না শ্রেয়া…
–মানে ? কি হয়েছে অফিসে ?
–কোম্পানি ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে এখান থেকে… ডাউনসাইজ শুরু হয়েছে । যেকোনো দিন পিংক স্লিপ ধরিয়ে দেবে হাতে…
–বাব্বা ! তার জন্য এতো টেনশন গত দশদিন ধরে ?
–টেনশন ? তুই জানলি কি করে ?
–আমায় বুদ্ধু ভাবিস তুই ? তোর মনের ভিতর কী কী ঘটছে টের পাই আমি…সবকিছু…
–আমার জ্যোতিষ-সম্রাজ্ঞী এলেন রে !
–হ্যাঁ । সে তো বটেই । তুই কোন মেয়ের দিকে কবে কবে তাকাচ্ছিস, তাও টের পাই আমি কলকাতায় বসে…এতোটা অবজ্ঞা কোরো না বাবু…
–অবজ্ঞা করব কেন ? আমার ভিতরে ঠিক কী কী চলছে আমিই শুধু জানি…
–আমিও জানি । ঘাবড়াস না । অন্য কিছু একটা ঠিক পেয়ে যাবি…একটা কথা বলব ?
–কী কথা ?
–কলকাতায় চলে আয় । এখানেই কোম্পানি খোঁজ…কাকু-কাকিমার কাছেও থাকতে পারবি…
–এখানে স্যালারি অনেক কম হবে শ্রেয়া…বাবার ওষুধের খরচ প্রতিমাসে বাড়ছে…জানিস তো তুই…
–সে হোক । যেভাবে হোক চালিয়ে নেব সোনা । আমার কাছে তো থাকতে পারবি…
–দেখি । এখানে এখন টাফ কম্পিটিশন…মার্কেটের অবস্থা ভালো নয় কোথাও…বেঙ্গলে তো নয়ই…
–দূর পাগল । মার্কেট দিয়ে আমার কি হবে ? তুই পাশে থাকলে আমার আর কিচ্ছু চাই না…

একটু থমকায় অয়ন । খাওয়া বন্ধ করে চোখ তুলে তাকায়…চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আর প্রত্যয় খেলে যায় তার মুখে…এই বিরাট শহরে তাদের মতো মানুষেরা আসলে খড়কুটো, তুচ্ছ পোকামাকড়…সে অসম্ভব ভাগ্যবান আজকের দিনেও এরকম একজন সঙ্গিনীকে পেয়েছে বলে । কৃতজ্ঞতা আর আনন্দে বুক ভরে যায় তার…খুব শান্তভাবে বলে ওঠে সে :

–থ্যাংক ইউ শ্রেয়া…
–ঢং…কিসের থ্যাংক ইউ রে ?
–এই যে বললি পাশে থাকবি…

শ্রেয়া কোনো জবাব দেয় না । বাঁ-হাত দিয়ে অয়নের বাঁ-হাতের তালু জড়িয়ে ধরে…ধরেই থাকে…ডিনার শেষ হয় । শ্রেয়া বিল মিটিয়ে দেয় । অয়ন কিছুই বলে না । রাস্তায় নেমে আসে তারা । সামনে উড়ালপুল । বিশাল বড়ো বড়ো হোর্ডিং । নিয়ন আলোর ঝলকে রাতের কলকাতাও দিনের চেয়েও ঢের বেশি উজ্জ্বল । আর মাত্র কয়েকদিন পরেই ভ্যালেন্টাইনস ডে । সে ভেবেই রেখেছে একটা কোনো দামি গিফট সে এবার দেবে শ্রেয়াকে…অদ্ভুত ! শ্রেয়া বোধহয় থট-রিডিং করতে পারে…সে আরও একটু কাছে ঘেঁষে অয়নের হাতটা জড়িয়ে ধরে এবার…ওরা এগিয়ে যায় গড়িয়াহাট মোড়ের দিকে ।

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি । ঘড়িতে সাড়ে নটা…রাত ঘন হচ্ছে…