ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

রোজ রাতেরবেলায় তাদের হুল্লোড় শুরু হয়ে যায় যথারীতি। রাত বাড়লেই তাদের তামাশা বাড়ে। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে মা-মেয়ে দুজনে। তাদের ফ্ল্যাটের ওপরে আরেকটা ফ্ল্যাট। সেটা খালি‌ই পড়ে থাকে। তাহলে? তাহলে আবার কি?

রাত্তিরের আওয়াজগুলো তো সেই ফ্ল্যাট থেকেই অবধারিত আসে। কেউ যেন টেবিল টানছে। কেউ বা চেয়ার সরাচ্ছে। কেউ গটমট করে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। কলের জল খুলে রেখেছে। হুড়হুড় করে জল যাচ্ছে সুপর্ণাদের বাথরুমের পাইপলাইন দিয়ে। কখন আবার অবিরাম জলের আওয়াজ রান্নাঘর থেকেও। দুদ্দাড় বাসনকোসনের ঝনঝনানি, টয়লেটে বালতির শব্দ হতেই থাকে। এলোমেলো, বিক্ষিপ্তভাবে। ঠিক মনে হয় ওপরে কারা যেন নিশ্চিত বাস করছে।

সুপর্ণা আর তার মা এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে তার বাবা মারা যাবার পরেই। তার বাবা এই ফ্ল্যাটটি বুক করেই মারা যান। চিরটাকাল ভাড়াবাড়িতে থেকে ভদ্রলোকের আর নিজের বাড়ির মুখ দেখবার সৌভাগ্য হয় নি। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সুপর্ণার মায়ের মনে হয়েছিল স্বামীর কথা। তাই শান্তি স্বস্ত্যয়ন করে তাদের ফ্ল্যাটের শুদ্ধিকরণ করে নিলেন। কিন্তু ভবি ভোলার নয়।

প্রতিদিন রাত হলেই অস্থির হয়ে ওঠে সুপর্ণা আর তার মা। এই ফ্ল্যাটবাড়িতে আর যারা থাকেন তাঁরা সেইসব শব্দ শুনতে পান না? নাহ! সবাই হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। সেটা আরও অস্বস্তির কারণ মা-মেয়ের। কেন এমন হয় কেবল তাদেরই ? ডাক্তার দেখালেই এক্ষুনি গাদাগাদা টেস্ট করাতে বলবে। অথবা বলবে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে। হয়ত বলবেন নিছক হ্যালুসিনেশন।
একজনের না হয় রোগ। আরেকজনেরও এক‌ই সিম্পটমস?

সুপর্ণার মায়ের উচাটন। অনেক ভাবনাচিন্তা করে তিনি একদিন প্রোমোটারকে ফোন করলেন।
নিরালাকুঞ্জ নামে পুরনো বাড়িখানি ভেঙে সুপর্ণাদের ফ্ল্যাট উঠেছে। বাড়ির মালিকদের সম্পর্কে তথ্য পেলেন সুপর্ণার মা । সে বাড়ির মেয়েদের নাকি বিয়ে হত না। পাড়ার লোকে কানাঘুষো করত এই নিয়ে। সে বাড়ির কর্তা বাড়িখানির ভিতপুজো করেই আচমকা মারা গেছিলেন। তাঁর ছেলেরা পরে চাকরীবাকরী করে সেই বাড়িখানি দাঁড় করায়। বাড়িটিতে ছেলেদের বিয়ে হয়ে যে দুটি বৌ এসেছিল তারাও কেউ বেশিদিন বাঁচেনি। বাড়ির রাশভারী গিন্নী তাঁর দুই ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে আজন্ম বাস করেছেন সেখানে। বড় মায়া তাদের বাড়িখানির ওপর। কিছুতেই প্রোমোটার কে দিতে চাইছিলেন না তাঁরা। উপায়‌ও ছিলনা।

বাড়ির এধার থেকে খসে পড়ছে, ওধার থেকে জল পড়ছে । নিয়মিত দেখভালের অভাব বট-অশ্বত্থের করালগ্রাস বাড়িকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছিল। অতএব না পেরে তাঁরা একপ্রকার রাজী হয়ে যান। প্রোমোটার বাড়ির মালিকদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এবার যা হল তা বেশ চিন্তার। বাড়ির গা ঘেঁষে এ বাড়ির বড় মেয়ের হাতে লাগানো শিউলি ফুলের গাছখানি যেদিন কাটা হল সেদিনই তাঁর আচমকা মৃত্যু হল। আর যেদিন এ বাড়ির বড় ছেলের শখের গ্যারেজখানি ভাঙা হল সেদিন সেই ছেলের মৃত্যু হল ভয়ানক দুর্ঘটনায়। পরপর ছেলে আর মেয়ের শোক না নিতে পেরে বয়োবৃদ্ধ গিন্নী হার্ট ফেল করলেন।তাঁর ছোট ছেলের আগেই মৃত্যু হয়েছিল ক্যানসারে।বাকী ছিলেন ছোট মেয়ে মণিমেখলা।অনেকদিন আগে তাঁর ইংরেজির গৃহশিক্ষকের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল।

পালাতে গিয়েও পালাতে পারেন নি দুজনে।পাড়ার সবাই জানত তাদের কথা। দাপুটে মা, দিদি আর দাদাদের ভয়ে হেরে গেছিলেন নিরালা কুঞ্জের কনিষ্ঠা কন্যা মণিমেখলা। নিরালা কুঞ্জের পারিবারিক জীবনটি ছিল এক সুতোয় গাঁথা। তাদের পরিবারে ছিল বড্ড মায়া। একের ওপর অন্যের নির্ভরশীলতা। দাদাদের ব‌উ বিয়োগের পরেও তারা মা কে আঁকড়ে, দুটি বোনকে নিয়ে দিব্য ছিলেন সুখে। মণিমেখলা বিয়ে হয়ে চলে যাবে ভেবেই বুঝি বাড়ির কেউ রাজী হননি তার বিয়েতে। এতদূর শোনার পর সুপর্ণার মা ভাবলেন সেই মায়া ছেড়েই কি তবে নিরালাকুঞ্জের মালকিনরা আজো তাদের এই নবনির্মিত ফ্ল্যাটে এসে হুজ্জুতি করেন? বাড়ির মায়া কাটাতে পারেন না?

এইসব শোনার পর একটু আবেগতাড়িত হয়েই সেদিন সন্ধেবেলায় সুপর্ণার বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে তার মা বেশ অভিযোগ, অনুযোগ জানালেন। কেন তিনি এই ফ্ল্যাট কিনে বিপদে ফেলে চলে গেলেন ইত্যাদি।
সুপর্ণার মা একদিন প্রোমোটার ভদ্রলোককে রাতে ঠিক ঐ সময়ে আসতেও বলেছিলেন, শব্দগুলি শোনানোর জন্য। প্রোমোটারবাবু এসে সুপর্ণাদের মাথার ওপরের অবিক্রীত খালি ফ্ল্যাটটির তালা খুলে তাদের নিয়ে হাজির হলেন সেখানে। বন্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে ঢুকতেই একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশ যেন ঝাপটে এসে লাগল সুপর্ণার মায়ের চোখেমুখে। শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছিল চারিদিক।

শুনতে পাচ্ছেন প্রোমোটারবাবু? গন্ধ পাচ্ছেন ফুলের? বলতে বলতে সুপর্ণার মা সেখানেই মূর্ছা যান সেদিন। সুপর্ণা বেশ স্টেডি ছিল। মায়ের চোখেমুখে জল দিতেই জ্ঞান ফিরলে তিনি বলে উঠলেন, আমি তো আর এতসব জানতাম না। আমার কাছে সুপর্ণার বাবা একজন নিপাট ভালোমানুষ ইশকুল টিচার ছিলেন। আজ উনি এসে আমায় বলে গেলেন সব। মণিমেখলার সঙ্গে প্রেম থেকে শুরু করে নিরালাকুঞ্জের মায়ার কথা। মনেপ্রাণে তিনিও বুঝি সারাজীবন ধরে লালন করে গেছেন এ বাড়ির কনিষ্ঠা কন্যা মণিমেখলার সঙ্গে তাঁর প্রেমের স্মৃতি। তাই বুঝি ঘুরতে ঘুরতে এখানেই আমাদের ফ্ল্যাট বুকিং করেছিলেন। এ বাড়ির সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা হয়েও হয়নি। তবু মনেপ্রাণে তিনিও এ বাড়ির একজন ছিলেন বলেই ফ্ল্যাট বুকিং করেই আচমকা মারা যান । স্বপ্ন দেখতেন বুঝি এ বাড়ির ছোট জামাই হবার।

সুপর্ণা বলে আর ঐ শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ?
প্রোমোটারবাবু বললেন, ওনাদের এই বাড়িতে একটি ফ্ল্যাট দিতে চেয়েছিলাম। রাজী হননি মণিমেখলা দেবী। কারণ একে একে সবাই মারা গেছেন তাই তিনি আর এখানে এসে একা থাকতে চাইলেন না। বড় মায়া তাঁর মা, দাদা, দিদির ওপর। ওহ! দ্যাট রিমাইন্ডস মি!

একদিন অবিশ্যি তিনি এসে নিজের হাতে তাঁর দিদির স্মৃতিতে একটি ভরন্ত শিউলি গাছ লাগিয়ে গেছেন নীচে। বারোমেসে শিউলি। ঠিক যেমনটি আগে ছিল এখানে, তাঁদের বাড়িতে। আপনারা বোধহয় খেয়াল করেন নি। এবছর পুজোয় আরও ফুল ফুটবে গাছটিতে। সুপর্ণার মা বললেন, ওমা তাই বুঝি রোজ এত শিউলির পাগল করা গন্ধ পাই আমি।