সৌমাল্য গরাই

বুড়ো হয়ে যাওয়া শিমুল গাছের তলটিতে তাদের আবার দেখা। গোধূলি তখন দিগন্তরেখাকে একটু একটু করে সাজিয়ে তুলছে। হঠাৎ করে একটা বেয়াড়া হাওয়া এসে তাদের ছুঁয়ে দিয়ে গেলো।
“কেমন আছিস সপ্তমী “? একটু থমকে যেয়ে সময়কে বললো ” মন্দ তো নয় “। আকাশ তখন মেপে নিচ্ছে ওদের বিগত স্মৃতিকে। তারপর বহুক্ষণ ধরে ওরা আলো মাখছিলো, কনে দেখা আলো। একটা পাখি বিউগলের মত সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ওদের অভ্যর্থনা দিলো। যেন কোনও এক সুদূরকালের হারিয়ে যাওয়া দুটি অতিথি অতীতের সেই চেনা নিয়ম মেনে তাদের বাসায় এসেছে। বুড়ো শিমূল গাছটা কাঁপতে কাঁপতে দু চারটে পাতা বিছিয়ে দিলো। বললো – ” বসো তো এখানে আগের মত। কতদিন দেখিনি। এখানেই তো কত চিঠি, বৈচিঁ ফুলের মালা, আরও কত গোপন কিছু, সেসব বলতে নেই…”
” কত রোগা হয়ে গেছিস “- অনেকক্ষণ পর নীরবতার সরোবরে একটি কথার ঢিল যেন আছড়ে পড়লো। চমকে ওঠা এক লাজুক ঢেউয়ের মত শশব্যস্ত হয়ে সপ্তমী বলল- ” এটাই তো তুই চাইতিস”।
আমি তো অনেক কিছুই চেয়েছিলাম – মনের নীরব যন্ত্রণাকে সযত্নে এড়িয়ে একটু মৃদু হেসে সময় বলল তা সংসার নামক বস্তুটিকে কেমন লাগছে”? এবার সপ্তমী একটু বিব্রত হয়ে বলল ওই একটি জিনিসেই তোরা পুরুষরা আমাদের বন্দিনী করে রাখতে চাস। জানিস আমার ইচ্ছে ছিল নদীর মত স্বতঃস্ফূর্ত হবো, স্বপ্ন ছিল নিজের মত বাঁচবো। আমার গান গাইবার ভীষণ ইচ্ছে ছিল, তুইও বলতিস গানটা আমি মন্দ গাই না। কিন্তু এখন টুবাইয়ের স্কুল, ওর অফিসের ব্যস্ততা এসব নিয়েই কেটে যায়… আর আমার স্বপ্নগুলো গুমঘরে লাশবন্দী হয়ে পচে মরে”।
সময়, তুই তো একা একা দিব্যি আছিস। নো টেনশন, নো চাপ। সময় মৃদু হেসে বলে ” নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ ওপারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস “। বলতে পারিস একরকম দিব্যি আছি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি যেন শব হয়ে গেছি। নির্জনতায় সুখ আছে কিন্তু আনন্দ নেই। মাঝে মাঝে দু চার লাইন কবিতা লিখি আর বাকী সময় স্কুলের কচিকাঁচাদের নিয়ে কেটে যায়। তবে দিব্যি না হলেও বেশ আছি- একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসের ভিতর কথাটা যেন বেরিয়ে এলো।
সন্ধ্যে ক্রমশ তারার পিদিম জ্বেলে রাত্রির দিকে এগিয়ে আসছে ঘোমটা পরা লাজুক দয়িতাটির মত। এবার ফেরার পালা। দুজনে পরস্পরকে ভালো করে দেখে নেয়। দূরত্ব বেড়ে চলে। দুটি বিন্দু যেন দুটি বিপরীত সমান্তরাল রেখার মত অসীমের দিকে এগোতে থাকে। দিগন্ত মেপে নিচ্ছে ওদের দূরত্বকে। সময় একবার থমকে ডাকে সমাপ্তি ইই-ইই…… আমরা যে খুব দূরে চলে যাচ্ছি। ফিক করে একটা অদৃশ্য হাওয়া হেসে বলে, “দূর পাগল দূরত্বটাই তো নতুন করে ভালবাসতে শেখায়”। ততক্ষণে একরাশ গাঢ় অন্ধকার ওদের দূরত্বকে কোথায় যেন মিলিয়ে দিলো।