তাপস রায়

আকন্দকেশরী-র দিকে টেনে আনা গেল। নবীন শহরের হয়ে ওঠার সৌন্দর্য আর হাই-রাইজারের পরাক্রমের বিভা দেখতে দেখতে দয়াময় যেন অনাবিল হয়ে উঠতে পারে। ‘ধরিত্রী ’র পাঠানো গাড়ি সাপুরজী-পালনজী বাস স্টপ থেকে ডান হাতের কাঁচা রাস্তার ভেতর ধুলো উড়িয়ে নেমে পড়েছে। অ্যাজবেস্টরের ছাদের এক কামরার একটা কুঠুরির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়ে ড্রাইভার বলল, “ভেতরে লোক আছে, আপনাকে সাইট দেখিয়ে দেবে।”

সপ্রতিভ বছর পঁচিশের শ্যাম যুবক সামন্তক সাহার কাছে খবর পৌঁছে গেছিল, পার্টি যাচ্ছে। ফলে সে চা-কফি অফার করেছে। আর সে অফার ঠেলেই আঁখি বুঝতে লেগেছে সামনের জলাশয় এড়িয়ে ধু ধু ধান খেত পর্যন্ত কোথায় কোথায় বাংলোগুলি হবে আর কোথায় টু বিএইচকে আর থ্রি বিএইচকে-র সাতখানি টাওয়ারের এই কমপ্লেক্স।

সামন্তক নামে ছেলেটি অনেক কিছুই বোঝাচ্ছিল তার পারদর্শিতার সবটুকু দিয়ে, হাতের মুদ্রায়। ফাঁকা জায়গায় প্রাসাদের হাওয়া চলাচলটুকুও যেন ফুটে উঠছে। কিন্তু আঁখির কানে সেসব ঢুকছে না, সে ঢুকতে দিচ্ছে না। তার হাওয়া চলাচল করছে দয়াময়ের মুখের উপরে। দয়াময়ও কিছু শুনছে না। সে দেখছে সিমেন্টের দু’ফুটের ব্লক দেয়াল আর লোহার বিমের রেডিমেড জঞ্জালের ভেতর কেমন করে তখনও গরু চরে বেড়ানো একখানি গ্রাম ধুকপুক করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেকোনো মার্জিনাল পেশেন্টের মতো তার মৃত্যদিন স্থির হয়ে আছে। কিন্তু কী যেন সরল শ্যামলিমায় মায়াময় হয়ে আছে গ্রামখানি। দু’পাশ থেকে শহর তাকে ঘিরে মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

সামন্তক বলেছে প্রজেক্ট হ্যান্ডওভার হবে আড়াই বছরের ভেতর। আর দয়াময় চোখের উপর দেখতে পাচ্ছে আকন্দকেশরী গ্রামখানির নাম মুছে দিয়ে সাত টাওয়ার ঘেরা এই প্রজেক্টের মাথায় নিশান উড়ছে ধরিত্রী গ্রুপের। প্রাইমারি স্কুলে কালো স্লেটের উপর থেকে আগের ক্লাসে লেখা বাংলা ছড়া জল-ন্যাতায় মুছে দিয়ে অঙ্ক ক্লাসের জন্য তৈরি হত তারা, নামতা লিখবে। সেরকম মুছে দেয়া যেন।

আঁখিও মুছে নেয়াটা দেখছে। সেক্টর ফাইভের ঝা চকচকে অফিসের লিফটে নামতে নামতে গল্প করছিল, তাড়াতাড়ি ফ্লাটটা করে উঠতে পারলে একটা নিশ্চিন্তি তার। বাবা-মাকে শেষক’টা দিন একটু ভাল রাখতে পারলে জীবন খানিক জুড়োয়। অবশ্য আঁখির সমস্ত কুশলতা এই কয়েকমাস ধরে ধাবিত হচ্ছে এই মুছে নেবার নিখুঁত ব্যবস্থাপনায়। দয়াময়ের মনের কোনও কোণেও যেন মলিনতা না থাকে। না হলে কেন এই বিশেষ দিনে নিজের ভালোলাগাকে চেপে রেখে শহরের বাইরে আর একটা শহরের হয়ে ওঠা দেখাতে নিয়ে এসেছে!আজ মহালয়া।

আঁখি জানে দয়াময় খুব সেনসিটিভ। ছোটো ছোটো দুঃখে সে সহজে কাতর হয়। একদিন বাজার করতে গিয়ে মুরগি কাটার সময় তার মৃত্যু চিৎকার শুনে সে এমন কষ্ট পেয়েছে, যে মাংস খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বাইরের খাবার খেতে হলে হলদি-রাম সে প্রেশার করে, সেখানে নিরামিষ খাবার। আজ এখানকার কাজ সেরে ‘অ্যাকাডেমির’ আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনী দেখে হলদিরামে বসবে কফি আর স্নাক্স নিয়ে।

প্রমোটারের পাঠানো গাড়ির ভেতর বসে আঁখি তার শরীরের আসঙ্গতা দিয়ে দয়াময়ের ভেতর থেকে সমস্ত বৈরিতা মুছে নিতে চাইছিল। কেন যে সে নিজের ক্লায়েন্ট-কাম বন্ধু গতিনাথকে শত্রু ঠাওড়েছে! খানিক টাকা টাকা করা ছাড়া বেচারা গতিনাথের আর কোনও লোভ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট গতিনাথের বাড়ি উত্তর ২৪পরগণার থাকদাড়ি। তার সুপুরুষ চেহারার জন্যই শুধু নয়, কী যেন এক ভালোলাগা দিয়ে গতিনাথ আঁখির মন জড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু তা প্রকাশ্যে আনার উপায় নেই। পাছে দয়াময় হার্ট হয়। দয়াময় যে অনেকদিনের বন্ধু।

আজ নিজের ভালোলাগাকে আড়াল করার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে এই বাধ্যবাধকতা আঁখিকে মানতেই হবে। নাহলে কবেই রেজিস্ট্রেশন করে ফেলে বারাসতের ফ্ল্যাট। সেখানেই সুবিধে আঁখির। মসলন্দপুর থেকে বারাসত পর্যন্ত চলে আসাটা কোনও কম কথা নয়। বারাসত বেশ উন্নত হয়ে উঠেছে। অম্বুজা, বেঙ্গল পিয়ারলেস-দের ফ্ল্যাটগুলো

সেখানে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সেখানে ‘ধূত’ গ্রুপের স্বপ্নের বাড়ি নামে একটা রেডি-বিল্ট ফ্ল্যাট পছন্দ হয়ে গেছে আঁখির। কিন্তু মাঝখানে এই দয়াময় কাঁটা, মানে ওই গতিনাথের সাথে বৈরিতা কাঁটা ঢুকে পড়তেই যত গন্ডগোল।

নাহলে এই ধ্যাড়ধেড়ে গ্রামে সে আসতে যাবে কেন !এই আইওয়াশটা গতিনাথকে দয়াময়ের বৈরিতা থেকে বাঁচানোর জন্য যে জরুরি। সে বলতে পারবে, তোমার সাথে এত ফ্ল্যাট তো দেখলাম, কিন্তু দর-দামে না পোষালে কী করব বল! নিরুপায় হয়ে নিতে হয়েছে বারাসতের ফ্ল্যাটটা। আঁখি ভেবে রেখেছে বারাসতে গৃহপ্রবেশে গতিনাথকে নেমন্তন্ন করবে না। কোথাও সন্দেহের কোনও জায়গা রাখা যাবে না।

সামন্তক খুব মিশুকে ছেলে। সে ম্যাডামের থেকে স্যারকে নিয়ে পড়েছে বেশি। “ ওই যে দেখছেন, ধানের পাতা লকলক করছে, ওই অত দূর পর্যন্ত আমাদের জায়গা। এই গ্রুপের মোটো হল, প্রতিটি রেসিডেন্টকেই গুরুত্ব দেয়া। বলতে পারেন যত্ন দেয়া। এজন্য টাওয়ারগুলির ভেতর এতখানি জায়গা ছেড়ে রাখা হবে যে সব দিকই লাগবে খোলামেলা। সাতটা টাওয়ারের প্রত্যেকটার পাশেই থাকবে ঢোকা বের হবার গেট। ক্লোজ সার্কিট টিভি। আর প্রত্যেকটাতেই প্রহরী। ”

“ আচ্ছা, এই জমির মালিক, আপনি যাকে বলছেন চাষি, সে যখন জমি বিক্রি করে তার মন খারাপ হয়নি? এই যে পরের বছর সে আর ধান ফলাতে পারবে না, তার যে কষ্ট হবে, তার কথা বলেনি? ”

দয়াময়ের কথার উৎসের হদিস সামন্তক করতে পারে না। সে পাখি পড়ার মতো শেখানো কথা ম্যানেজমেন্ট পাশের কুশলতা নিয়ে সেখানে ফেলে। “ তার মন খারাপ করবে কেন, তাকেও তো একটা টাওয়ারে হাজার ফুটের দু’টো ফ্ল্যাট দেয়া হবে!”

দয়াময়ের চোখের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে চাষির বীজতলা তৈরি থেকে ধান তোলা পর্যন্ত প্রতিদিনের স্বপ্নের চলাফেরা। ওই যে গর্ভবতী ধানের গুচ্ছের গায়ে, যখন দুধ এসে খানিক বেদনায় ধান মাথা নুয়ে রাখে, তখন পরম মমতায় চাষি হাত বুলিয়ে দেয়। দয়াময় কেন শুনবে সামন্তকের সাজানো কথা। সে বিড় বিড় করে, “ চাষির বউ তো আর ধান সেদ্ধ করবে না। ধান শুকোতে হবে না তার। নতুন চালের গুড়ো দিয়ে গোবোর-লেপা উঠোন সাজাতে পারবে না আলপনায় আর কোনোদিন। কত প্রাণ ধুকে ধুকে মরে যাবে, তাই না !”

সামন্তক তোতা পাখি। সে তার জানাটুকু উগরে দিয়ে কাস্টমারের নজর নিজের দিকে আনতে চায়। “ হ্যাঁ, তা যা বলেছেন স্যার। প্রথম দিন, মাঠের মাঝখানে ধান আর জঙ্গলের ভেতর যেদিন ভিত পুজো হল, পুরোহিতের সাথে জ্যোতিষীও এসেছিল। সে কীসব খড়ির দাগ কেটে বলে, এই জমিতে নাকি কোনও এক মৃত্যু যোগ আছে। এজন্যই তো কেউ এ-জমি কিনতে চায় না। ”

এরপর সে হা হা করে হাসে। “ জানেন তো স্যার, পরে শুনেছি, ‘সিদ্ধা’ গ্রুপ খুব ঝাঁপিয়েছিল এই জমিটার জন্য। পারেনি। আমাদের স্যারের মন্ত্রী মহলে জোরালো কানেকশন। সেই জোরেই বের করে নেয় একলপ্তে এতখানি জায়গা। সেই সিদ্ধা গ্রুপই জ্যোতিষকে টাকা খাইয়ে পাঠিয়েছিল অমন ভয় দিতে। এই তো প্রায় তিন বছর আছি এই সাইট-এ। কই কোনও টু ফু তো শুনিনি। খুবই শান্ত আর শান্তির জায়গা এই আকন্দকেশরী। ”

দুই

“এটা কোনও মোটিভ হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে না! আরে মশাই পুলিশ কত আর বিনা দোষে লোকজনকে হ্যারাস করবে ! থানায়, জেলে আটকে রাখবে! পুলিশেরও এভিডেন্স দরকার হয়। চোখের সামনে জলজ্যান্ত লোকটা, আপনি বলবেন মারা গেছে!”

“ হ্যাঁ গেছে। ওটা ডুপ্লিকেট গতিনাথ চক্কোত্তি। ওটা ওর ভাই হবে গিয়ে দেখুন। সাজানো, সাজানো, সব সাজানো। থিয়েটারের সেটের মতো।”

“ দয়াময় বাবু, আপনি কী করে যে হাইকোর্টে প্রাকটিস করেন! মক্কেল-টক্কেল হয়?”

“ আরে হয়, হয়। ওই গতিনাথই তো আমার মক্কেল ছিল। কলকাতা কর্পোরেশনে কাজ করে। আর হ্যাঁ খুব প্রভাবশালী। কর্পোরেশনে যান একডাকে সব্বাই চেনে ওই চক্কোত্তিকে। সবাই দেখিয়ে দেবে।”

“ তালে আপনি বলছেন মারা গেছে! ”

“ হ্যাঁ, গ্যাছেই তো। সে নেই, কিন্তু আছে। সবাই দেখিয়ে দেবে পারচেজ সেকশন। দেখবেন, ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে জল ধুলো সয়ে সয়ে একখানা দীর্ঘ কাঠের কারুকাজ করা চেয়ার। মশাই আপনার মনেও হতে পারে সেটা ময়ূর সিংহাসন। তার হ্যান্ডেলে সাদা একখান তোয়ালে ঝুলছে। সামনে লাল ফিতের অজস্র ফাইল আর জলের লাল জাগ। না লাল নয়, আগে লাল ছিল, এখন নীল। আর মোটা কাচের গ্লাসের উপর হলুদ ঢাকনা। কর্পোরেশনের সবচে দামি বড়বাবুর ওই চেয়ার। কাজ কিচ্ছুটি আটকাবে না। পিয়ন সুরদাসের হাতে সাদা খামের ভেতর যথাযোগ্য সেলামী আর ফাইলের বিবরণ গোদা বাংলায় লিখে এলে নির্দিষ্ট দিনক্ষণে ঠিক মেয়রের স্বাক্ষর সহ ফাইল আবার ফেরত পাওয়া যাবে। ”

হেস্টিংস থানার মেজবাবু দয়াময় ব্যানার্জীকে হাইকোর্টের জাঁদরেল উকিল হিসেবে চেনেন বলে অনেক্ষণ বকোয়াস সহ্য করে নিয়েছেন। কিন্তু আর এই চাটাচাটি সহ্য হচ্ছিল না। উকিলের অভিসন্ধির ফাঁদে পড়তে তিনি রাজি নন। একবার লেদার কমপ্লেক্স থানায় ফোন করে এই উকিলের এক পার্টিকে জামিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন চটপট। বিনিময়ে কিছুই পাননি। শুধু একদিন চায়না টাউন-এ সপরিবারে এর পয়সায় ডিনার করেছেন মাত্র। এবার গাত্রোত্থান করলেন তিনি।

কিন্তু দয়াময় তো জানে সেদিন রাতে গিয়েছিল গতিনাথের বাড়িতে থাকদাড়িতে টাকা উদ্ধারের জন্য। বেশি দূরে না, করুণাময়ীর কাছে। আর ভোর বেলায় হাঁটতে হাঁটতে, কথা বলতে বলতে অল্প আলো-আঁধারিতে ভেড়ির পাড়ে ধস্তাধস্তি। টাল সামলাতে না পেরে ভেড়ির ভেতরে পড়ে গেল সে। তারপর বুড়বুড়ি। আর ওঠেনি। অফিসেও সে আসছে না বেশ কিছুদিন।

এদিকে গতিনাথ ভেবেছে, এবার সলভ করে নেবে নিজের কেস নিজে। আর কোনও উকিল নেবে না। উকিলের খপ্পরে পড়াটা সে হাড়ে হাড়ে বুঝছে। কিছুতেই দেনা শোধ হয় না যে ! সে ঠিক করে, মাস ছয়েক উধাও হয়ে যাবে । ত্রিফলা আলোর কেসটায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অডিট ডাকছে। এই সময় তাকে উধাও হতে হবে। মাস ছয়েক চোখের সামনে না থাকলে সবাই ভুলে যাবে। এপ্রিলের অডিট শেষে আর কেউ মনে রাখবে না। এমনিতেই অফিসে তাকে কেউ বিশেষ দেখতে পায় না। ফলে চাপ নেই। সুরদাসকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। ছ’মাসে তিনটের বেশি ফাইল ছাড়বে না। আর হিস্যা সুরদাস নিজেরটুকু নিয়ে বাকিটা যত্ন করে রেখে দেবে। গতিনাথ চক্কোত্তি অফিসে জয়েন করলেই যেন হাতে পায়।

গতিনাথ ঠিক করেছে, এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারবে। কর্পোরেশনের প্রতিটি খোপে খোপে অনেক পাখি মারার বিদ্যে। একুশ বছরের অভিজ্ঞতা তার, পারবে না! পারবে পারবে।

ত্রিফলার ফলা এড়ানো ছাড়া, আর একটা ছোটো কাজ তাকে পারতে হবে। দয়াময় ব্যানার্জীকে হাপিস করে দেবে। থাকদাড়ির কাছে বনবিবি তলার বাজারে তোলা তোলার সময় একদিন সে ফেঁসে গিয়েছিল। পুলিশ হাতে নাতে ধরেছিল। চাকরিটা চলে যেত, কর্পোরেশনের প্যানেল্‌ড ল-ইয়ার দয়াময় ব্যানার্জী জামিন করিয়ে এনে চাকরিটা বাঁচিয়ে দিয়েছিল। দয়াময়ের সাথে কথা হয়েছিল গতিনাথ একলাখ দেবে। কিন্তু সেটা দেবে দেবে করে হাজার, দু’হাজার করে দিয়ে এখনো আশি হাজার বাকি।

গতিনাথ ভেবেছে দয়াময়কে সাপটে দিলে আঁখির-ও একটা হিল্লে হয়ে যায়। আঁখি ওই দয়াময়ের জন্যই খোলামেলা মিশতে পারছে না তার সঙ্গে।

গতিনাথের বিয়াল্লিশ বছরের নির্জন জীবন বেশ তুখোড় চলেছে। একাকিত্ব তার ভালো লাগে। বিয়ে-ফিয়ে তার পোষায় না। করেওনি। বেশ আছে। কিন্তু এই কয়েক বছর কেন যেন আঁখিকে ভাল লাগছে তার। মানে অফিসে এসে

আঁখিকে দেখতে পারলে কাজে মন বসে। ওটুকুই। আঁখি তার পারচেজেরই ক্লার্ক। অফিসে কম আসে। গতিনাথ সব সামলে নেয়। ঊর্ধ্বতনের কানে কোনও কথা যায় না। গতিনাথ জানে আঁখির তার প্রতি একটা জোরালো দুর্বলতা আছে। কিন্তু আঁখি আবার কীভাবে যেন দয়াময়ের কাছের লোক। দয়াময়ের নাটক দলের জন্য বিজ্ঞাপন টিজ্ঞাপন জোগাড় করে দেয়। সে নিজে আঁখির কথায় তা জুটিয়ে দিয়েছে। মাঝে মধ্যে দয়াময়ের সাথে আঁখি যে নাটক দেখতে যায় তা জানে গতিনাথ। কর্পোরেশনের কোপারেটিভের ক্লাবের নাটকে আঁখি নায়িকা। আর দয়াময়কে হায়ার করা হয়েছিল ডিরেকশনের জন্য। দয়াময় সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে গেছে। প্রতিবছর শুধু নাটকই পরিচালনা করে না, সে কর্পোরেশনের প্যানেল্ভূক্ত ল-ইয়ার হয়ে গেছে। যারা দীর্ঘদিন মোটা টাকার ট্যাক্স জমা না দিয়ে বসে আছে, তাদের হাইকোর্ট থেকে উকিলের চিঠি পাঠানো, কোনও লিটিগেশনে কোর্টে কেস কেমন করে উঠবে ঠিক করা, এসব তার কাজ। তবে অবশ্য আরও চার জন উকিল আছে লিগাল সেলের।

দয়াময়কে সরিয়ে দিলে অনেক হ্যাপা দূর হবে। ভেবেছে গতিনাথ। ওয়ান শর্টার কেনা আছে। কানের ভেতর ঠুসে দিয়ে ভেড়ির জলে ঠেলে দিলেই হল মর্নিং ওয়াকের সময়। আঁখির আর তার, দু’জনেরই পথের কাঁটা নিকেশ হবে। বাড়িতে ডিনারে নেমন্তন্ন করবে দয়াময়কে, ভাবল সে। গতিনাথ যেকোনো কাজেই একটু বেশি ডেয়ার ডেভিল।

তিন

‘হরিবোল’ ক্লাবের সদস্য হওয়ায় সুবিধে হয়েছে। চিমটে খবর পেতেই, ম্যাটাডোর, ফুলের মালা, কাতার দড়ি, কোদাল, মালসা, কোড়া কাপড়, এমনকি পুরোহিতও জুটিয়েছে। ক্লাবে এই কাজের কো-অর্ডিনেটর সে। ক্লাবের নিজস্ব শববাহী গাড়ি আছে। দর দামের ব্যাপার নেই। কম্বো সাপ্লাইতে খানিকটা কম তো হয়ই। তাছাড়া ছিদাম এ ক্লাবের দীর্ঘ দিনের সদস্য। ওর রেট অনেক কম হবে। যতটুকু না হলে নয়। অবশ্য ছিদাম বলেই রেখেছে,বাবার কাজে কোনও কঞ্জুসি করবে না। আর এখন কঞ্জুসি করে হবে টা কি! নয় নয় করে ছ’খানা প্রজেক্ট চলছে কলকাতার পিঠোপিঠি। সবচে বড় প্রজেক্ট সাত টাওয়ারের, আকন্দকেশরীতে।

এখন খানিক সুবিধে হয়েছে ছিদাম মন্ডলের। সোজা সুন্দরবন চলে গেলেও কলকাতার পিনকোড পেতে অসুবিধে নেই আর। দেখেছে কলকাতা নামটা থাকলে গ্রামের দিকের, বিশেষ করে বাংলাদেশের যারা এদিকে আত্মীয়তার সূত্রে সম্পত্তি করতে চাইছে, ফ্ল্যাট কিনতে তেমন আপত্তি করে না। সোনারপুর, রাজপুর, সুভাষগ্রাম — এখন সোনার জায়গা। ছিদামের নিজের লোক সব জায়গাতে ফিট করা আছে। প্ল্যান পাশ থেকে, ব্যাঙ্কলোন পাইয়ে দেয়া বা প্রিন্ট মিডিয়া কি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দেয়া — সর্বত্র নিজের ডান হাত রেখেছে। মানে অন্তত তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, সে-ই ডান হাত। আর হ্যাঁ, ছিলাম খুব সৌখিন। ফ্যাব ইন্ডিয়ার হালকা রংয়ের ফুল-স্লিভ জামা প্যান্টালুন্সের ব্লু জিনসের ভেতর ইন করে পরা থাকে। চোখে দামি রে-ব্যান কোম্পানির চশমা। গলায় টাই। আর পায়ে দামি কালো শু। একেবারে ঝাঁ চকচকে অফিসের মতো রোজ জিমে যাওয়া মেদহীন পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির তামাটে শরীরকে সে ব্যবসার কাজে লাগায়। তবে ‘ধরিত্রী গ্রুপ’ নামটা গুরুদেব হারাধন চক্রবর্তীর দেয়া।

হ্যাঁ, হারাধনদা শিখিয়েছেন এই ব্যবসায় সব সময় আগে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচার। অ্যাপিয়ারেন্স দিয়ে খদ্দের তুলে নিতে হবে। তাইত সব সুবেশী, সুন্দরী মেয়েতে ফ্রন্ট ডেস্ক সেজে থাকে ঠাণ্ডা ঘরের অফিসগুলিতে। তবে সেক্টর ফাইভের ‘ধরিত্রীর’ এই অফিসের পিআরও যেন একটু বেশি সুন্দরী হয়ে গেছে। সিনেমা-সিরিয়ালের নায়িকাদের মতো মাপা চেহারার। ক্লায়েন্ট অফিসে ঢুকলেই কাত। ওই অফিস থেকে বুকিং না করে ফিরে গেছে এমন কেস কম। মেয়েটাকে পেয়ে ব্যবসার সুবিধে যেমন হয়েছে, তেমনি অসুবিধেও। ছিদাম মন্ডলের বাকি দুটো অফিস, মানে চেতলা আর বারাসতে যাওয়া কিছুটা অনিয়মিত হয়ে গেছে। ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যের পাশে রাগিণীর সান্নিধ্যও কেমন যেন অমোঘ হয়ে এসেছে এই বছর খানেক।

এক একটা প্রোজেক্ট থেকে কম করেও ঘরে ওঠে কোটি খানেক। এর থেকে কিছু খাওয়াতে হয় দাদাদের। সে খাক। ঠেকা বে-ঠেকায় তারা যা মদত দেয়, তা এই সামান্য পার্সেন্টেজ দিয়ে মাপা যাবে না। পাড়ার ক্লাব, প্রায় হাতে তৈরি ক্লাব এই ‘হরিবোল’ ক্লাবকেও সে দিয়ে থাকে নানা অছিলায়। এই ক্লাবই তার লক্ষ্মী। ফুটো কার্তিক থেকে আজকের বিএমডব্লিঊ নিয়ে ঘোরা ছিদাম মণ্ডলের উত্থান একেবারে রূপকথার মতো। গত সাত বছরে তার ‘হরিবোল’ ক্লাব যেমন টিনের চাল থেকে তিন-তলা হয়েছে। ক্যারাম বোর্ড সরিয়ে টেবল-টেনিস বোর্ড ঢুকেছে। তার কোচ আর সুন্দরী মায়েদের ভিড় প্রতি বছর বেড়েই চলেছে, তেমনি ছিদামের প্রোমোটারির পালেও লক্ষ্মীলাগা। পার্টির ছেলেরাই খবরাখবর দেয় জমির, পুরনো বাড়ির। ছিদামের কাজ একবার সাইট দেখে আসা। তারপর নিজস্ব উকিল আর লোকাল ছেলে পাঠিয়ে ডিল করা। একেবারে মাছের তেলে মাছ ভাজা হয় একাজে। ফাঁকা জায়গা দেখিয়েই পার্টির কাছ থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে জমি কেনাটেনা সব হয়। খুব কম কাজে নিজের মূলধন লাগাতে হয়েছে।

মূলধন বেড়েছে ছিদামের লক্ষ্মী এই ‘হরিবোল’ ক্লাবেরও। বছরে দু’লাখ টাকা সরকারের কাছ থেকে পায়। এছাড়া বিয়ে-বাড়ি, শ্রাদ্ধ-বাড়ি ভাড়া দিয়ে টাকা ওঠে হু হু করে। ক্লাব আর তার মাঠের সাজ হয় সেই টাকায়। দুর্গা পুজো করে কর্পোরেট বিজ্ঞাপন আদায় করেও প্রচুর টাকা আসে। আর আছে মৃতদেহর সাথে শ্মশানে যাওয়া। এটা একেবারে প্রফেশনাল কাজ। মানে শ্মশানবন্ধুর কাজ। মানে এই ক্লাব চাকরির প্রভিশনও রেখেছে। শ্মশানবন্ধুর চাকরি। মাস গেলে সাত হাজার টাকা। সিভিক ভলান্টিয়ারদের মতো। এরা সবাই ক্লাবের নানা কাজে লাগে। পুজোর সময় চাঁদা তুলতে বেরোয়, পুজোর দিনে ভিড় সামলায়। আর ভোটের সময় বুথ ম্যানেজ করে। পুজোর সময় বকশিস আর শ্মশান থেকে উপরি আদায় করে এরা বেশ চালিয়ে নেয় সংসার । তবে মাস গেলে ওই সাত হাজারের বেশি ক্লাব দেয় না। বারোটা ছেলে আছে। ক্লাবের খরচ মাসে চুরাশি হাজার আর গাড়ির তেল ইত্যাদি নিয়ে তা গিয়ে দাঁড়ায় লাখ দেড়েকে। কিন্তু ‘হরিবোল’ ক্লাব এক একটা পার্টির কাছ থেকে কম করে নেয় ওই লাখ খানেক । মাসে অনায়াসে গোটা পনেরো কেস হয়। হবে না কেন, লোকাল কেবল চ্যানেলে ‘হরিবোল’ ক্লাবের বিজ্ঞাপন যায় যে। মেট্রো স্টেশনে ইনগোডা টিভি রোজ তারস্বরে চেঁচাচ্ছে — ‘হরিব্বোল, হরিব্বোল।’ আজকাল শহরের লোকজন কোনও হ্যাপা নিজেরা নিতে চায় না। বাড়িতে একজন গেস্ট এলেও তারা হোটেল থেকে রান্না করা ডিশ এনে পরিবেশন করে। তো খরচ টর্চের পর হরিবোল ক্লাবের মাসে জমে সাড়ে তেরো লাখের মতো।

এখন নিজেকে একটু একা করতে গিয়ে ছিদাম নিজের ফ্লাটের বাইরে কদমগাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাবার মুখটা ক্রমে অস্পষ্ট হচ্ছে। বাবার গায়ে খুব অগুরু ছড়িয়েছে নিজের হাতেই। নাহলে বেড-সোর রুগীর ঘরে ঢোকাই যাচ্ছিল না। বাবার বুকের উপরে ফুলের মালা জমে উঠতে উঠতে বুক-মুখ ঢাকা পড়ে গেছে। শুধু চশমাটাই জেগে আছে। ফুল-চন্দন সহ আর সবই যেন গভীর ঘুমে।

নীচে নেমে কী যেন তার মনে হল, হ্যাঁ একবার কি জানাবে রোগিণীকে বাবা মরে যাওয়ার ব্যাপারটা! জানানো উচিত হবে। সে তো প্রায় সব জানে মণ্ডল পরিবারের। গত মাসে ডুয়ার্সের মূর্তি ট্যুরিস্ট লজে গিয়ে এ ওর শরীরের কিছুই জানতে যেমন অবশিষ্ট রাখেনি, তেমনি ছিদাম মন্ডল নিজের পরিবারের খুঁটি-নাটি সব গল্প করেছে। নাহলে আর করবেইবা কি দু’দিন ধরে! জানিয়েছিল। এই অসুস্থ বাবার কথাও জানিয়েছিল। আজ বাবা মরে যাওয়ায় যতটুকু দুঃখ হয়েছে তা শেয়ার করে ছিদাম পরিত্রাণ পেতে চাইল। জানাল সে।

“স্যার, কী বলছেন! হোয়াট আ স্যাড নিউজ! আ হা হা! আপনি তো একেবারে একা হয়ে গেলেন! মানে না, মানে বলছিলাম, যে আই থিংক উ হ্যাভ নো রেলেশনশিপ উইথ ইওর ওয়াইফ। মানে আপনার ছেলে থাকে জলপাইগুড়ির এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেলে, আর এদিকে আপনি আর বৌদি। তো বৌদির সাথে তো আপনার সদ্ভাব নেই। থাকতে হয় তাই থাকা। মানে আপনি তো নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। আ হা হা হা! খুবই কষ্ট আপনার!”

এক লপ্তে অনেকখানি বলে ফেলল রাগিণী। সে একটু আগেই ‘আকন্দকেশরী’-র সাইট-এ একটা খদ্দের পাঠিয়েছে। কি যেন নাম, মনে পড়েছে। চোখে হাত দিয়ে মনে করল আঁখি মজুমদার। ওনার সাথে ল-ইয়ার ভদ্রলোকের নাম দয়াময় ব্যানার্জী। প্রথম চোটেই ল-ইয়ার নিয়ে এসেছে মানে পার্টি একপ্রকার মনস্থির করে নিয়েছে, ‘আকন্দকেশরী’তে ফ্ল্যাট নেবে। সে খবর জানানোর জন্য রাগিণী নিজেই ফোন করত বস ছিদাম মন্ডলকে। আর তার পরে বলত, মহালয়ার দিন, একটু আগেই বাড়ি ফিরব স্যার। কিন্তু সেসব তো এখন আর বলতে পারল না।

ছিদাম এখন খানিকটা তো ভেঙে পড়েছেই। কিছু কথা বলতে তো হয়ই, নাহলে সে কেন তার কর্মচারীকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাবে। তাই খানিকটা নিজেকে সামলে নেবার ঢঙে বলল, “ হ্যাঁ, কাউকে তো জানাতে হয় মনোকষ্ট, আপনাকে জানিয়ে ফেললাম। আর আপনিও অফিসের সবাইকে জানাতে পারবেন। আমি তো আজ অফিস যেতে পারব না। ”

“ স্যার, আপনি শান্ত থাকুন। আমি এক্ষুনি আসছি আপনাদের বাড়িতে। ”

“ না না । তার কোনও প্রয়োজন হবে না।” ঐ ডাকসাইট-এ সুন্দরী এলে শুধু নিজের স্ত্রী কেন, ফ্লাটের অন্য প্রতিবেশীর ভেতরেও গুঞ্জন শুরু হয়ে যাবে। মণ্ডলবাবুর সাথে ওর স্ত্রীর সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজতে থাকবে।

“ না স্যার। এসময় আপনার পাশে কেউ তো একজন সমব্যথী দাঁড়াবে না কি! আপনি না বলবেন না। আমি আসছি। আপনি এক কথায় আমাকে টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়ি থেকে তুলে এনে জোকার অমন হাজার স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাট বিনা পয়সায় দিয়ে দিলেন! আর আমি এটুকু করব না! আপনার বারণ আমি শুনব না স্যার। ”

ছিদাম হা হা করে উঠল। এ তো এসে একেবারে কেলো করে দেবে। পাড়ায় এখন তার যথেষ্ট প্রভাব হয়েছে। মেয়র পারিষদ তাকে খুব স্নেহ করেন। তিনিও আসতে পারেন। কথা হয়েছে দু’হাজার কুড়ির কর্পোরেশন ইলেকশনে কাউন্সিলরের টিকিট পাওয়া যাবে। এখন কোনও নারী কেসে ফেঁসে গেলে তো বিপদ। সুপ্রিমের কানে চলে গেলে টিকিট তো দূরের কথা টাইট দিয়ে ছেড়ে দেবে। ছিদাম শ্যাম ও কূল রাখার বিড়ম্বনার ভেতর মাথা ঠাণ্ডা রেখে গেমটা খেলল।

ঠাণ্ডা গলায় বলল, “ আচ্ছা আসুন। আমাদের তো শবযাত্রা স্টার্ট করতে যাচ্ছে। অফিসের গাড়িতে সেক্টর ফাইভ থেকে এখানে আসতে খানিকটা সময় লাগবে। তো আপনি সোজা কেওড়াতলা শশ্মানে চলে আসুন। ওখানে আমার বাবাকে ফুল-টুলও দিতে পারবেন। ”

“ আচ্ছা স্যার, তাই হবে। আমি সোজা কেওড়াতলায় আসছি। আপনার বেয়ারা গোবিন্দকেও সঙ্গে নেব? লেকমার্কেট থেকে ফুল কিনতে হবে তো!”

“ না না। সে ড্রাইভারকে দিয়ে কিনিয়ে নেবেন। লোকজন বাড়িয়ে কাজ নেই। ”

ছিদামের মনে পড়ল এসময় হরেণদার কথা। হরেণ-দার স্ত্রী বিয়োগের সময় মৃতদেহ কাঁধে করে গাড়িতে তোলা থেকে শুরু করে, কেওড়াতলা মহাশ্মশানের ইলেক্ট্রিক চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য এক নম্বর লাইন ম্যানেজ করা টরা সব নিজে করেছিল। বার্ণিং ঘাট থেকে সার্টিফিকেট তোলা-টোলা সব একার হাতে। হরেণদার চোখে তো পড়বেই। হরেণদার চোখে কেন, হরেণদার মনে ঢুকে যেতে ছিদাম ‘হরিবোল’ ক্লাবের সাথীদের নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়েছে তখন, “ জোরসে বল, সবাই বল, আবার বল — হরিব্বোল।”

স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন হরেণ বাড়ুজ্যে। সে অত অল্প বয়সে চলে যেতে তিনি তো কাতর হবেনই। আর তার শেষ যাত্রাকে ছিদাম নিজের শুরুর যাত্রা করে নিতে পারল। সব পারলৌকিক কর্ম বাড়ির বড় ছেলের মতো দায়িত্ব নিয়ে

করে দিয়েছিল। ছিদামের মনে হল রাগিণী-ও হয়ত সেই একই দায়িত্ববোধ থেকে তার বাবার মরদেহ আর তার পাশে দাঁড়াতে চাইছে একটিবার।

আসুক, আসুক। শশ্মানে আসুক। কিন্তু সমস্যা হল রাগিণী কেওড়াতলায় পৌঁছানোর আগেই তো সেখানে তাদের পৌঁছাতে হবে। ছিদাম ফোন করল চিমটেকে। জানতে হবে শববাহী গাড়ি কোথায়।

চিমটে বলল, “ গুরু, তুমি এদিকে মোটেও মাথা দিয়ো না। আমরা তৈরি। গাড়ি তোমার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আত্মীয় স্বজন যারা বাড়িতে আসছেন, তুমি তাদের দিকে নজর দাও। আমরা ‘হরিবোল’ ক্লাবের মেম্বাররা ঠিক মেসোমশাইকে ফার্স্ট চান্সে পুড়িয়ে দেব। বাইক নিয়ে ছেলেরা চলে গেছে। পুরোহিত, ডোম, ধরার কাপড়-চোপর তুমি শশ্মানে গিয়ে একদম রেডি পাবে। এমনকি মেশোমশাইকে যাতে লাইনে শুয়ে থাকতে না হয়, তার জন্য ক্লাবের একজন সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবে সেখানে । মেশোমাশাইয়ের লাশ গেলে ও লাইন ছেড়ে উঠে আসবে। ”

ছিদাম জানে অন্যান্যদের মতো সব তৈরি থাকবে। এই ক’বছরে এরা তুখোড় প্রফেশনাল হয়েছে। কোথাও কোনও ফাঁক-ফোঁকর থাকবে না। এই শবযাত্রার ম্যানেজমেন্টটা ডিল করে চিমটে। ও সবার চাইতে সিনিয়র। ছিদাম জানে এতক্ষণে চিমটে সবটা গুছিয়ে করে ফেলেছে । ও খুব চটপটে। সবটা নজরে নেয়। কারা শ্মশানে গাঁজা খাবে, তাদের জন্য গাঁজা রাখবে। কয়েকটা বড় হুস্কির বোতল কেনা হবে। আর’হরিবোল’ ক্লাবের ছেলেদের জন্য ঢালাও বাংলা মালের ব্যবস্থা থাকবেই। কেনা হবে মাটির ভাঁড়। তাতেই মদ পরিবেশন হবে। পাড়ার কেউকেটা যদি যায়, তাদের জন্য থাকে স্কচের একটা বোতল। দরকার নাহলে খোলা হয় না। হরেণ-দাও নিজের গাড়িতে চেপে যেতে পারেন। আপ্যায়নে তো ফাঁক রাখা যায় না, ওরাও রাখে না। চিমটে বেশ অনেকগুলো বছর ছিদাম মণ্ডলকে কাছ থেকে দেখেছে। মানুষটার দিলও দরাজ আছে। তাছাড়া ‘হরিবোল’ ক্লাবের কম্বো প্যাকের ভেতর এসব আইটেম পড়েই। মানে শশ্মানে মরা মানুষটা আর তার পরিবারের দু’একজন যাবে, বাকি সব কিছুর দায়ভার ‘হরিবোল’ ক্লাবের। কোথাও কোনও ত্রুটি রাখা যাবে না। ক্লাবের রেপুটেশনের সাথে কোনও সমঝোতা নয় । ।

চার

না না কোনও সমঝোতা হবে না। রাগিণী ফোন নামিয়ে রেখে হাত ব্যাগ উপুড় করে দিল টেবিলের উপর। বুক ধকধক করছে। আসল জিনিসটা আছে তো ! সেটা সঙ্গে না থাকলে তো এত তাড়াতাড়ি পড়ে পাওয়া সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবে না। সবে মাত্র রেজিস্ট্রেশন হয়েছে জোকা মেট্রোকারশেডের কাছে বহুতলে বারোশ স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট। রেজিস্ট্রেশনের টাকাও দিয়েছে ছিদাম মণ্ডল। মানে তার বস । ‘মূর্তি’ ট্যুরিস্ট লজ থেকে ফেরার পর পরই হয়েছে তা। রাগিণী কৃতার্থ। অন্যান্যদের মতো তা না নানা করে সময় কাটায়নি। বা আর একটা আউটিং এর জন্য চাপ দেয়নি। খুব কথার মানুষ এই ছিদাম মণ্ডলকে তার ভালো লেগেছে। রাগিণীর এই অফিসও ভালোও লেগে গেছিল। কীরকম যেন কর্তৃত্ব করত। সবাই ম্যাডাম বলতে অজ্ঞান। ব্যবসাও ভালই দিয়েছে। স্যালারিও ঠিকঠাক ছিল। মাসে পঁচিশ হাজার। কিন্তু তার কাছে নতুন পার্টির খবর এসেছে। নতুন কাজ। এই প্রোমোটারটা গুজরাতি। কলকাতায় কম আসে। মুম্বাইতে বসে ব্যবসা চালায়। এখানে রিয়েল এস্টেটএ টাকা ঢালছে সে। স্কাইওয়াক থাকবে তার প্রোজেক্টে। রাগিণী নিজের ক্যারিয়ার সি ভি আর পোর্ট-ফোলিওর একটা প্রেজেন্টেশন ই-মেল-এ পাঠিয়ে দিয়েছে। খবর এসেছে

রাগিণী সিলেক্টেড। বস ভিডিও কলে সময় করে কথা বলে নিলেই লেটার এসে যাবে। অফিস হবে পার্কস্ট্রিটে।

রাগিণী চায় এবার সেটলড হতে। এবারের ফ্ল্যাটে সে থাকবে। ভাড়া দেবে না। কলকাতার মাথায় উঠে মর্নিং ওয়াক নয়, সে একদম চুড়োয় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে পায়ের নীচে কলকাতা দেখবে। ছোটো বড়ো সব মানুষই সেখান থেকে সমান। গুড়ি গুড়ি, মূল্যহীন। চাইছে সে নিজে এটাতে থাকবে। সেটল্‌ হবার সময় এসে গেছে। দশটা

ফ্ল্যাট তার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এই ন’ নম্বরটি তার মানসিকতার সাথে স্যুট করবে। এর আগে জোটানো সাতটা ফ্ল্যাটের সব কটাতেই ভাড়া বসিয়ে দিয়েছে। শুধু এই ছিদাম মণ্ডলের দেয়া ফ্ল্যাট এখনো ভাড়া দেয়নি। সবে মাস খানেক হল পেয়েছে সেটা রাগিণী। সব চুকে-বুকে না গেলে ভাড়া দেবে কী করে!

অফিসের এস-ইউ-ভি তে উঠে ডায়েরির পাতায় সবুজ কালিতে লেখা ছিদাম মণ্ডল-এর গায়ে একটা টিক মারল। আট নম্বর। ন’নম্বর হাতে এসে গেছে। রাগিণীর নিজের উপর বিশ্বাস আছে দশ নম্বরও জুটিয়ে ফেলবে। ড্রাইভার রিয়ার ভ্যু মিররে দেখছে ম্যাডামকে। দেখুক। চোখে রে ব্যান সানগ্লাস। চোখ দেখতে পারছে না। রাগিণীও দেখছে আয়নায় মাঝে মধ্যেই ফুস্‌ করে ভেসে উঠছে একটা শব্দ — প্রতিশোধ। প্রতিবারই এই বিশেষ কাজের আগে রাগিণী ওই শব্দটি ফুটে উঠতে দেখেছে হয় আয়নায়, নয় সাদা দেয়ালে।

হাত ব্যাগের একেবারে তলায় চলে যাওয়া হোমিওপ্যাথির ওষুধের শিশি। গায়ে স্টিকার সাঁটা ন্যাট্রাম ফস্‌ ৩০। রাগিণী জানে এর ভেতর আছে ধুতুরার বীজের রস। এক ফোঁটাতেই কাজ হয়ে যায়।

চেতলাব্রিজ এ ওঠার আগে বাঁদিকে ঘুরেই গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভার বলল, “ ম্যাম ক্যাওড়াতলা শ্মশান এসে গ্যাছে, নামুন।”

মৃতদেহ চুল্লির লাইনে চলে গেছে। চুল্লিতে ঢোকার আগে যেসব পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করতে হয়, পুরোহিত তা শুরু করেছে। একমাত্র ছেলে, ছিদামকে তো সামনে থাকতে হয়। সে বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারছে না। উঠে উঠে চলে আসছে বাইরে। গাছতলায় ক্লাবের ছেলেরা আছে, তাদের সাথে কথা বলছে। এবার পুর-ভোটে নমিনেশন পাবেই। একশ শতাংশ কনফার্ম। ছিদাম জনসংযোগ করছে। প্রত্যেকের কাছে গিয়ে কথা বলছে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট দিচ্ছে। সুদৃশ্য বড় বড় মাটির ভাঁড়ে হুইস্কি পরিবেশন শুরু করে দিয়েছে চিমটে। বেশ লম্বাটে গড়ন। দু-পেগ আরামসে এঁটে যায়। ছিদামের হাতেও একটা ধরা আছে। এক সিপ্‌ দিয়েছে কি দেয়নি, তার চোখে পড়ল অফিসের গাড়ি বাঁক নিয়ে ঢুকে পড়েছে। তাহলে রাগিণী এসে গেল বোধ হয়। এত লোকের মাঝে ওকে আনাটা কি ঠিক হবে! ছিদাম পা চালিয়ে গাড়ির দরজার মুখে।

“ আরে আসুন, আসুন। আপনি আবার এতটা কষ্ট করতে গেলেন কেন!” রাগিণীকে কোনও কথা বলতে না দিয়েই ছিদাম বলল, “ বাবার শরীর চুল্লিতে ঢুকে যাবার মুখে। ড্রাইভার ভাই, আপনি এক ছুটে গিয়ে এই ফুলের তোড়া ওখানে দিয়ে আসুন তো। ম্যাডাম যেতে যেতে দেরী হয়ে যাবে। ”

ছিদাম দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে এমন যে গাড়ি থেকে রোগিণী নামতে পারছে না। ড্রাইভারকে সরিয়ে দিয়ে ছিদাম এবার বলল, “ তুমি এই শশ্মানে, নোংরা-টোংরার মধ্যে আসতে গেলে কেন!”

ছিদাম এটা করে মাঝে-মধ্যে। মানে একেবারে ম্যানেজ করার জন্য আপনি থেকে তুমিতে চলে যায়। উল্টোদিকের মানুষ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

“ না, আপনার বাবা চলে গেলেন, এই দুঃখের সময় আপনার পাশে না দাঁড়ালে মনকে তো বোঝাতে পারতাম না! আপনি তো শুধু আমার বস নন, আমার মনের কতটা যে জুড়ে বসে আছেন! একটু যাব না, একবার শেষ চোখের দেখাটা দেখব না!”

রাগিণী গাড়ি থেকে নেমে পড়তে চাইলে সসব্যস্ত ছিদাম বলে ওঠে, না না দরকার নেই। এতখানি দূরে এসেছ। মেয়েমানুষ হয়ে ওখানে আজেবাজে লোকের মাঝখানে যাওয়া শোভা পায় না। তা ছাড়া ওরকম মৃতদেহ দেখা যায় নাকি! ভয় টয় পাবে। ওখানে যেয়ে আর কাজ নেই। ”

নিজের হাতে ধরা মাটির ভাঁড়ের দিকে চোখ পড়ে ছিদামের। “ তুমি কি একটু ড্রিংক নেবে? নাও নাও। নিতে হয়। তুমি গাড়ির ভেতর বস। আমি নিয়ে আসছি। তুমি বরঞ্চ আমার হাতের এই ভাঁড়টা ধরো। আমার নতুন একটা নিতে সুবিধা হবে। ”

এ একেবারে মেঘ না চাইতে জল। অবশ্য আগের সাতবারও কোনও অসুবিধা হয়নি রাগিণীর। কোনও না কোনও সুযোগ এসে গেছে। সময় তো লাগবে কয়েকটা মুহূর্ত। গাড়িতে আসতে আসতে ব্যাগের উপরেই গুছিয়ে রেখেছিল। ন্যাট্রাম ফক্সের কাচের শিশিতে ধুতুরা বীজের রস। এক ফোঁটা যথেষ্ট। রোগিণী দু’ফোঁটা দিল। সে জানে ছিদাম জিম-টিম করে । হার্ট একেবারে তরতাজা। হুইস্কির সাথে এই ধুতুরার বিষ গেলে নাকি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হবেই। নেট ঘেঁটে সে দেখেছে। আর প্রমাণ তো হাতে নাতে আগের কেসগুলোর সফলতা।

রাগিণী গাড়ির ভেতর বসেই ছিদামের ভাঁড়ের সাথে ঠোকাঠুকি করে বলল, “চিয়ারস।”

ছিদামও চিয়ার্স বলতে বলতে চো চো মেরে দিল ভাঁড়ের সবটা। তার তাড়া আছে। ডাক পড়েছে মুখাগ্নির। গাড়ির দরোজা নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়ে সে বলল, “ ড্রাইভার সাহেব, ম্যামকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আপনি অফিসে গাড়ি পার্ক করবেন।”

গাড়ি হু হু করে ছুটে চলেছে জোকার দিকে। রাগিণীর মাথা পেছনে সিটের সাথে হেলান। তার কালো চশমার নীচ থেকে দুটো জলের ধারা নামছে। ড্রাইভার আয়নায় চোখ রেখে ভেবেছে ম্যাডাম খুব নরম মনের মানুষ। বসের বাবার মৃত্যুতে সমব্যাথী হয়ে অফিসের আর কেউই তো শশ্মানে আসেনি। আর এখন কাঁদতে লেগেছে ম্যাম।

রোগিণী জানে এই অশ্রু সে নিজে নিজে বের করেনি। বের হয়েছে। ছিদাম লোকটা খারাপ নয়। কিন্তু সে যে নিজেকে থামাতে পারছে না। সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকে এক প্রতিশোধ মন্ত্র তাকে চালিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে । আমগাছের ডালে বাবার ঝুলন্ত দেহ যে চোখ না বুজেও সে দেখে চলে অনবরত।

চোদ্দ বছর বয়সে নাগেরবাজারে নিজেদের বাড়ির পেছনের বাগানে প্রমোটার আর তার নয় সাকরেদ মিলে তাকে ধর্ষণ করেছিল। বাবা জমি ছাড়েনি বলে নাকি তারা শোধ তুলেছে অমন। বাবা নিজের উপর ঘৃণায় গলায় দড়ি দিয়েছিল। রাগিনী কি আর করতে পারত! সেও আত্মহত্যা করতে পারত। সবাই তাই করে। কিন্তু একটা প্রতিশোধ মন্ত্র তাকে বাঁচিয়ে রেখে, ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এতদিন। বাবার মুখাগ্নি করে সে যে উচ্চারণ করেছিল, দশ প্রোমোটার হত্যাই তার জীবনের ব্রত।

পাঁচ।

জীবন যে কোথা থেকে কোথায় গড়িয়ে যায়! গত তিন মাস গতিনাথ অফিসে আসে না। এই তিন মাসে আঁখির কি খুব একটা দরকার হয়েছে গতিনাথকে! না, হয়নি। এখন হলদিরামে বসে ভাবছে। অফিসে নিজের কাজ গড়্গড়িয়ে গড়িয়ে গেছে, গতিনাথের হেল্প ছাড়াই। সত্যি কথা বলতে দয়াময়ের সাথে এই কটা মাস তো দিব্য অফিস ফেরত ঘোরাঘুরি করেছে। গতিনাথ কোথায়! গতিনাথ যেন মুছে যাচ্ছে মন থেকে!

‘আকন্দকেশরীর’ সাইট দেখে ফেরার পর এক্সাইডের হলদিরামের দোকানে বসে কফি খেতে খেতে আঁখির মনে হল, ‘আকন্দকেশরী’ বেশ ভাল যায়গা। সেখানে সত্যি সত্যি ফ্ল্যাট নিলে মন্দ হয় না। শুধু মুধু গতিনাথের জন্য এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক নয়। আঁখির মনে হল দয়াময়েরও ভালো লেগেছে ‘আকন্দকেশরী’।

আঁখি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “ কি গো তোমার ভাল লেগেছে ‘আকন্দকেশরী’?

দয়াময় কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কাচের দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরেটা দেখছিল। এক জোড়া মানুষ, স্বামী-স্ত্রী হবে, তখন থেকে হাত ধরাধরি করে রাস্তা পার হতে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। এক্সাইডের

মোড়ে সব সময় তিন দিক দিয়ে গাড়ি আসে। এর ভেতর থেকে ম্যানেজ করে ওরা কিছুতেই পার হতে পারছে না। শহরের লোকেরা, তাদের অভ্যস্ততায় দ্রুতগামী গাড়ির ফাঁক-ফোকর দিয়ে দিব্য চলে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা যে শহরের

পায়ে পা মেলাতে জানে না। দয়াময়ের মনে হল শহরের বাইরের মানুষ। পারছে না। একটু যাচ্ছে, আবার পিছিয়ে আসছে। ভারী বিপদ তো ওদের! দয়াময় ভাবল, হাত ধরে পার করে দিয়ে আসবে না কি! কিন্তু হঠাৎ দেখল, এই সামনে পেছনে করতে করতে এক সময় হাত ছাড়িয়ে বউ মানুষটি অন্য পাড়ে চলে গেল। এ-পাড়ে পড়ে রইল ওর

১০

পুরুষ সঙ্গী। সে কি পার হতে পারবে! দয়াময়ের মুখ থেকে হাসি সরে গিয়ে অন্ধকার। দয়াময় দেখল, কীভাবে শহর ওই মানুষ দুজনের কাছ থেকে সারল্য মুছে নিল এক ঝটকায়! সম্পর্ক ছিঁড়ে দিল তবে!

“ কী হল, কথা বলছ না! ‘আকন্দকেশরী’ পছন্দ হয়েছে?”

দয়াময়ের কানে আঁখির কোনও কথা তেমন করে পৌঁছয়নি। সে ওই পুরুষ মানুষটির পক্ষ নিয়ে নিয়েছে তখন। একবুক নিঃশ্বাস বের করে হেরে যাওয়া মাথা নেড়েছে মাত্র।

তখন অল্প দূরে কেওড়াতলায় চিমটে আর ‘হরিবোল’ ক্লাবের দলবল, নিচু স্বরে ক্রমাগত বলে চলেছে, হরিব্বল হরিব্বল হরিব্বল । পাটকাঠির মুখাগ্নি নিয়ে নাকি ধরাধাম ছেড়ে ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা শুরু হয় মানুষের। এসময় কানে হরির নাম থাকলে স্বর্গ সুনিশ্চিত। আগুন হাতে যাত্রা শুরু করেছে ছিদাম। জ্বলন্ত পাটকাঠির আগুনের উপর তার চোখ। তাকে মৃতদেহ প্রদক্ষিণ করতে হবে পুরোহিতের মন্ত্র কানে নিয়ে। তারপর উপুড় করে রাখা বাবার মুখে অগ্নি সংযোগ করতে হবে।

পুরোহিত মন্ত্র পড়ছে, “ওঁ কৃত্বা তু দুষ্কৃতং কর্ম্ম জানতা বাপ্যজানতা। মৃত্যুকাল বশং প্রাপ্য নরং পঞ্চত্বমাগতং। ধর্ম্মাধর্ম্ম-সমাযুক্তং …।”

ছিদাম কেন যেন কানে আর কোনও মন্ত্র শুনতে পাচ্ছে না। এমনকি ওই সম্মিলিত নিচু স্বরের হরি্ববল হরিব্বল ধ্বনিও উধাও। তার পা কাঁপছে যেন। আর তো একটু। উত্তরমুখী করে অধোবদনে শোয়ানো আছে বাবা। পা নড়ছে না ছিদামের। ছিদামের হাত-পা লম্বা। হাত বাড়ালে কি সে বাবার মুখটা জ্বলন্ত পাটকাঠির আগায় পেয়ে যাবে! পাবে হয়ত। আর ভাবার সময় যেন নেই মনে হল তার। ছিদাম দু’ই হাত প্রসারিত করে, লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে উপুড় হয়ে দড়াম করে নিজেকে ফেলল মার্বেলে বাঁধানো শশ্মানভূমিতে। পাটকাঠির আগুন বাবার মুখ কি ছুঁতে পারল! কে জানে!