দীপ শেখর

আমার মনে হল ঘূর্ণিটা থেকে একে একে কাঠের ঘোড়াগুলো ছুটে চলে যাবে এদিক ওদিক। আমি শীতের সন্ধেতেও তার ঘেমে যাওয়া হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম। অথচ সময়ের বিরাট নদীতে তার হাত মাছের মতো পিছলে যাচ্ছে আমার হাত থেকে।

তাকে দেওয়ার তেরোতম এবং পূর্বের পরিকল্পনা অনুসারে শেষতম চিঠিটি আমার পাঞ্জাবির পকেটের ভেতর তার ধারালো দাঁত বার করে কামড়ে ধরছে মাংস। বুকের ভেতর সেই প্রতিটি যন্ত্রণা পাক খেয়ে উঠে ধুলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে মুখচোখ।

আমি কি চাইনি শেষবার ভালোবাসা এসে ধুইয়ে দিয়ে যাক আমার মুখ?

দু’জনে মিলে ঢুকলাম ভাগ্যগণনাকারীর তাঁবুটায়। আমার ঘেমে যাওয়া হাত তার হাতের সীমাবদ্ধতা ছেড়ে কোমরে এসেছে। পেটে মেদের নরম এতটা ভালোয় মেতেছে যতটা এ কয়দিন সমস্ত সঙ্গমে একেবারেই লাগেনি। সুতির শাড়ির ভেতর দিয়ে এক অন্য হাওয়া বইছে যেন আমার হাতের ওপর দিয়ে।

তাঁবুতে ঢুকতে ঢুকতে মাথার মধ্যে বয়ে চললো এই সামান্য কথাটি। আসলে তো আমাদের সম্পর্ক ছিল মাত্র তেরোটি চিঠির আদানপ্রদান এবং তারপর দু’জনে দু’জনের কক্ষপথ থেকে সরে যাওয়া। তবু কেন বিচ্ছেদ এসে সবকিছু এমন স্পষ্ট দেখায়। অথচ জীবনের সুন্দর কেবল সঠিক সময়ে চলে যাওয়া ছাড়া কিছুই নয়, এই তো বুঝেছি এতদিন।

বৃদ্ধা ভাগ্যগণনাকারী আমাদের দুজনের হাত পরপর দেখে তার ঘোলাটে চোখ নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বড় মার্বেলের গোলকটির দিকে। এটি ব্যবসায়িক ছল, কারণ আমরা তিনজনেই জানি কাঁচের গোলকে কিছুই দেখা যাবে না কখনও। তারপর একটা মোহময় হাসি হেসে জানালেন আমাদের একসাথে চলার পথ এভাবেই বয়ে যাবে, কোনওদিন ফুরোবে না।

তাঁবুর বাইরে এসে তার কথা নিয়ে আমরা বেশ খানিকক্ষণ কিছুটা নকল হাসি হাসলাম। আমি তাকে শ্যাওলা রঙের পাথরের একটা কানের দুল কিনে দিলাম মেলার দোকানির কাছে হাঁটু মুড়ে বসে। অথচ এমন কথা ছিল না। আমাদের কথা হয়েছিল কেবল তেরোটি চিঠি বাদে কেউ কারও কোনও কিছু নিজেদের কাছে রাখব না।

তার সপ্তম চিঠিটি আমার সব থেকে বেশি মনে আছে যেখানে সে লিখেছিল ছোটবেলায় এক ফিতের চরকি বিক্রিওয়ালা তাকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল অনেকদূর। অবশেষে পাড়ার লোকের তৎপরতায় তাকে উদ্ধার করা হয়, বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে বলে সে চিৎকার করে কেঁদেছিল।

নিজের এগারোতম চিঠিটির কথা মনে আছে সবথেকে বেশি যেখানে আমি লিখেছিলাম ঠাকুমা কোলের ওপরে মাথা রেখে মারা যাওয়ার ঠিক আঠেরো সেকেন্ড পরে সবার কান্নার আড়ালে ঠাকুমার চোখ একবার আচমকা খুলে এক মুহূর্ত তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। চোখ থেকে একফোঁটা জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল আমার ডান হাত।

মেলার সময় শেষ হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলো নাগরদোলা, ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেলো কয়েকটা দোকানের। আলোগুলো একে একে নিভিয়ে দিচ্ছে কেউ, তাকে আটকাতে পারছি না।

চিঠিদুটো দেওয়ার পালা। দু’জনে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছি। সে কী চায়? যদি আরও কিছুটা সময়, ক্ষতি তো কিছু নেই। অথচ নিষ্ঠুরের মতো তার ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসে চিঠিটি তার ধারালো দাঁত নিয়ে। আমারটিও ধারালো দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে পাঞ্জাবির পকেট ছিঁড়ে শরীরের সর্বত্র। সেও বেরিয়ে আসতে চায়, খেয়ে ফেলতে চায় এই মুহূর্তটুকু।

তার চিঠি নিয়ে চলে আসি।অথচ নিজেরটি দেওয়া হয়নি। মিথ্যে বলেছি, লেখা হয়নি। তার চোখের মধ্যে এই মিথ্যেতে রাগ, অভিমান বা আনন্দ কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। খুবই নিষ্প্রাণ দুটি চোখ হয়ত ক্ষমা করেছে আমাকে এই অন্তিম ভুলের জন্য।

বহুদিন পর বাড়ির পথে ফেরা সত্যিই ফেরা মনে হয়। আমার তেরোতম চিঠিটি নিস্ফল আক্রোশে রক্তাক্ত করে তুলেছে আমার শরীর। হলুদ হ্যালোজেনের আলো মাঝে মাঝে স্পষ্ট করে তুলছে আমার অস্তিত্ব। বহুদিন পর মনে এলো একদিন প্রেমিক ছিলাম।

অথচ কাল থেকে কোন চিঠি লেখা হবে না আমার জন্য। তেরোতম চিঠিটি লেখা হয়ে গেছে। টেলিফোন আসবে না। খবর পাব না তার কোনও। কথা দিয়েছিলাম, অতিরিক্তকে অতিক্রম করে নিজেদের সুন্দরটুকু রেখে দেব।

তার শেষতম চিঠিটি এখনও রয়ে গেছে হাতে। উত্তরের শীতল হাওয়া কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের শরীর। অপেক্ষা করতে পারিনি আগের বারোটি চিঠির মতো। তার বিদায়ের অল্প সময় অতিক্রমেই খুলে নিয়ে পড়েছি। বহুবার বহুবার, কিছুতেই ফুরোচ্ছে না কথাগুলো। যত পড়ি মনে হয় তত যেন না পড়া রয়ে গেল।

অথচ একটি কালির আঁচড় ছিল না তাতে। একবিন্দু নয়। শুধু এক শাদা পাতা এমন অবিশ্বাস্য সুন্দর। তার চোখের মতো, তার হাতের নরমটুকুর মতো, তার বুকের গন্ধের মতো সুন্দর।

বৃদ্ধা ভাগ্যগননাকারীর মার্বেলের গোলকের কথা মনে পড়ে। ভাগ্যগণনার কথা মনে আসে।

শীতের রাতের ভেতর একটা রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে।কানে মাফলার গুঁজে ঘুমিয়ে আছেন তার চালক। তার শরীরের সামান্য অংশে আলো এসে পড়েছে। আমার এই মুহূর্ত যেন সেই চালকের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে অনন্ত নক্ষত্রের দিকে চলে যায়।

আসা যাওয়ার মাঝে যে কথাটুকু থেকে যায় তার নাম নেই

তার কোন শব্দ নেই

শুধু থাকে আঘাত

আসা যাওয়ার মধ্যে নিঃশব্দে জেগে থাকা আঘাত মানুষকে ভালোবাসা শিখিয়েছে।