শাশ্বত কর

ঘুটঘুটে রাত্তির! চারদিকে চাপচাপ অন্ধকার! একে ভরা কৃষ্ণপক্ষ, তার উপর এই গাছে জঙ্গলে ভরা বাগান বাড়ির মত ফাঁকা রিসর্ট! এমন অন্ধকারে তারাদের থেকে যে অল্প আলোটুকুও আসতে পারে, গাছেরা সব জড়াজড়ি করে তার পথ আটকে দিয়েছে। লোকালয় থেকে অনেকটা ভিতরে বলে এখানে কোনও রকম পরিচিত আওয়াজ পাওয়ার সম্ভাবনাই নেই। পরিচিত বললাম এই জন্যেই যে, আলো নেভার পর থেকে যে সমস্ত আওয়াজ এ পর্যন্ত আমার কানে এসেছে, তার নাইনটি নাইন পয়েন্ট নাইন নাইন পার্সেন্ট আমার অচেনা! অবশ্য পদ্মদার কল্যাণে তার অনেকগুলোই এখন জানা হয়ে গেছে।

ওই যে মাঝে মাঝে ঝড়ঝড় খড়খড় করে বা কখনও ঝুমঝুমির মত আওয়াজ আসছে, সেটা শিরিষ গাছের। এখন মার্চের মাঝামাঝি। শিরিষ গাছের পাতা ঝরে গেছে। টিকে আছে শুধু শুকনো লম্বাটে সিমের মত ফলগুলো! হাওয়ার দোলায় সেগুলোয় দোলা লাগছে, আর অমনি সুন্দর শব্দ হচ্ছে। সুন্দর বলছি বটে, তবে প্রথম শুনে আমার খানিক ভয়ই লেগেছিল! মনে হয়েছিল যেন পায়ে নূপুর পরে কত জন ছুটে যাচ্ছে আর ফিরে ফিরে আসছে! যেন অন্ধকারের দেশে নেচে চলেছে অচেনা অজানা কোন অন্ধ দেশের রাজ কন্যা! সঙ্গে তার বন্ধুর দল! অথবা যেন উইচ হান্টিঙে নেমে এসেছে কোনও উইচ হান্টারের টিম আর মরিয়া উইচ ঝাঁটায় চেপে গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে দিয়ে উড়ে পালাচ্ছে, তার ইশারায় সরসর করে শুকনো ডালপালা গজিয়ে উঠছে! তাতে আটকা পড়ছে হান্টারের দল আর অমনি অমানুষিক উল্লাসে চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ করে হেসে উঠছে বিজয়ী উইচ!

ওই চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ আওয়াজ নাকি শকুনের বাচ্চা অথবা বালি হাঁস জাতীয় পাখির বাচ্চাদের শব্দ! পদ্মদা যাই বলুক, এই তুমুল ফাঁকা জায়গায় সেই অমানুষিক আওয়াজে আমার তো মাঝে মাঝেই পিলে চমকে চমকে উঠছে! পদ্মদাও যা বলছে সেও তো অনুমানই রে বাবা! হতেও তো পারে এ কোনও অমানুষিক অশরীরীর আক্রমণে আহত বাচ্চার আর্তনাদ! হয়তো সেই অশরীরী এক জন নয়! হয়তো অশরীরীর দল থলিতে বেঁধে বেঁধে নিয়ে এসেছে বাচ্চাদের! আর থলির গিঁট খুলতেই প্রচণ্ড ভয়ে হয় তো শেষ আর্তনাদ করে উঠছে সেই শিশু! হয় তো এরপরেই শিশুর গলার কাছে নেমে আসবে অশরীরীর ধারালো শ্বদাঁত! হয় তো..!

এই সাংঘাতিক রকমের ভয়ের ভাবনা চিন্তা ক্রমশ আমার চার পাশের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলছে! এর উপর আবার মাঝে মাঝে হায়নার পিলে চমকানিয়া হাসি, রাত জাগা পেঁচার চেঁচানি, পেঁচা তাড়া করে যাওয়া শিকারি কুকুরের শ্বাস সর্বস্ব দৌড়, পার্কের লোহার পাইপগুলোর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের বিচিত্র শব্দ, থেকে থেকে দাঁড় কাকের ডাক! সব কিছু মিলিয়ে একটা চরম ভৌতিক আবহ তৈরি হয়েছে। তার সাথে উপযুক্ত সঙ্গত দিয়েছে এই লম্বা লোড শেডিং!

কাচের জানালা দিয়ে দু চারবার বাইরে চেয়ে দেখছি। জানালার বাইরের উঁচু গাঢ় সবুজ পাহাড়টা এখন পেল্লায় দৈত্যের মত কালো হয়ে ঝুঁকে আছে! আবছা অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন ওর গা থেকে কীসের বিকিরণ উঠছে কেঁপে কেঁপে! রহস্যে ভরা ওই পাহাড় থেকেও যেন কীসের চিৎকার ভেসে এল! ভয় পেয়ে পদ্মদার হাতটা ধরতেই পদ্মদা বলে উঠল, ‘ভয় পাস না বেলো। পাহাড়ের জঙ্গলে নিশাচররা এখন জেগেছে। এই তো তাদের চরার আসল সময়! এ সময়ই তো তারা হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়বে শিকারের উপর! তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিকার খতম!’

পদ্মদার বলার ধরণটায় ভয় দেখানোর পুরো কম্পলিট এলিমেন্ট ছিল। ভয় পেয়ে বললাম, ‘পদ্মদা! ভয় দেখিয়ো না! বাবাকে বলে দেব কিন্তু!’

‘ওরে বেলো! বাবাকে পাবি কোথায়? এখানে যে কেউ নেই! শুধু আমি আর তুই! আমি, তুই আর এই নিকষ রাত্রির অতল নৈশব্দ!’

বলার সাথে সাথে হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ করে তীক্ষ্ণ গলায় ডাকতে ডাকতে একটা পাখি উড়ে গেল। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ‘পদ্মদা’ বলে প্রায় কেঁদে উঠলাম!

পদ্মদা অমনি ফ্যা ফ্যা করে হেসে উঠে আমার বুক পিঠ থাবড়ে টাবড়ে বলল, ‘ও বাবা! এই তোর সাহসের দৌড়! ভয় পাস না। আমি তো আছি। সে আমি মানুষ হই চাই না হই, তোকে তোর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি যখন বাড়িতে ঠিক ফিরিয়ে দেব!’

‘পদ্মদা!’ রাগের ডাকটাও আমার কেমন যেন আর্তনাদের মত শোনালো আমার। মার জন্য মনটা হু হু করতে শুরু করল। তবু পদ্মদাকে তো আর সে সব বুঝতে দেওয়া যায় না, কাজেই মুখ গোমড়া করে চুপ করে রইলাম।

মনে মনে মনকে বললাম, সত্যি তো! এত ভীতু তো তুমি নও হে বেলো! তোমার কান্ডিতে বরং আর সবাই ভয় খায়! তবে এখানে এসে এমন করে ভয় পাওয়া কি তোমার সাজে?

সব বোঝালাম, সব বুঝলাম। কিন্তু ভয় যায় কই? আচ্ছা, এমন করে ভয় পাচ্ছি কেন বল তো?

পদ্মদা বলে উঠল, ‘আরে! বাবা মাকে ছাড়া প্রথম বেড়াতে এসেছিস। ছোটোবেলায় অমনি অমনি সবারই হয়। সারা দিন হই চই করে কাটে, তারপর রাত হলেই মায়ের জন্য মন খারাপ হয়। আমার তো ফি বছর মামার বাড়ি গিয়ে বাবার জন্য মন খারাপ হত!’

পদ্মদার এই থট রিডিং এর ক্ষমতাটা আমার জব্বর লাগে। ঠিক কী ভাবে যেন বুঝে যায় কী ভাবছি! অবশ্য পদ্মদার আরও অনেক গুণ আছে যেগুলো পুরো তাক লাগিয়ে দেবার মত! হবেই তো। যেমন তেমন ছেলে তো আর নয়! ইসরোর স্কলার! পদ্মদার সাথে আলাপটাও আমার অদ্ভুত ভাবে। সে তো আমি আগে এক জায়গায় লিখেওছি। সেই যে সে বার আমাদের বাড়ি এল, তারপর থেকে ছুটিছাটা জুটলেই ফ্লাইট পাকড়ে চলে আসে। বলে, ‘আসি কেবল বেলোর জন্য। ওর মধ্যে আমার ছোটো বেলাটা খুঁজে পাই!’

আর এবার তো পুরো সারপ্রাইজ! আমার অ্যানুয়াল শেষ হল সাত তারিখ। আর আট তারিখ ঘুম থেকে উঠেই দেখি পদ্মদা বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। একদম প্ল্যান করেই এসেছে। আট তারিখে এলো, আর ন’ তারিখেই ট্রেনে চেপে আমায় নিয়ে চলে এল পুরুলিয়ার এই নির্জন পাহাড়লগ্ন রিসর্টটায়! মা যে গাঁইগুঁই করে নি তা নয়, তবে পদ্মদার চাপাচাপিতে রাজি হতেই হয়েছে। আর বাবা তো রাজিই।

আমরা ট্রেনে চেপে এসেছি আসানসোল পর্যন্ত। তারপর সেখান থেকে রিসর্টের গাড়ি চেপে এখানে। গাড়ি চালাচ্ছিল অরূপ নামের এক জন ড্রাইভার। চালাতে চালাতে আমার অনেক প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল। আমি অবশ্য প্রশ্নগুলো করছিলাম পদ্মদাকেই; কিন্তু সে তখন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে, মাঝে মধ্যে একটা আধটা হুঁ হাঁ করছে! কাজেই অরূপ কাকু স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই আমার উত্তরগুলো দিতে থাকে। তারপর একে একে লোকালয় ছাড়িয়ে, ধু ধু মাঠ পেরিয়ে, ধোঁয়া ঢাকা কয়লা খনির এলাকা ছেড়ে আমরা ক্রমশ ঢুকে পড়লাম লাল পলাশে ঢাকা সরু পাথুরে পথে! রাস্তাটা এখানে ভারি সুন্দর! যে দিকে তাকাই ছোট বড় টিলা মাথা উঁচু করে রয়েছে। আর সেই সব টিলার চার পাশে সার বেঁধে মাথা ভর্তি লাল ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সার সার পলাশ! শুধু লাল কেন, আমি ওই দূরের একটা পাহাড়ের শির ধরে টানা হলুদ পলাশের গাছও দেখেছি। এত সুন্দর, অথচ নির্জন!

গাড়িটা রিসর্টে ঢোকার মুখে খানিক দাঁড়িয়েছিল ফটক বন্ধ বলে। দারোয়ান ফটক খুলতেই দেখি বাঘের মত চার চারটে কেঁদো কুকুর! তাদের লালা ভরা জিভ বেরিয়ে রয়েছে এক বিঘত করে! ওরা নাকি এই রিসর্টের পাহারাদার! পাহারাদার বলে পাহারাদার! পদ্মদা বলল, একটা ডোবারম্যান, একটা ডালমেশিয়ান আর বাকি দুটো অ্যালসেশিয়ান। রাত হলে গার্ডরা এদের ছেড়ে দেয়। গোটা প্রপার্টিটায় ওরা টহল দিয়ে বেড়ায়। খুব ইচ্ছে করছিল ওদের নামগুলো জানতে, কিন্তু অরূপকাকু সাবধান করে দিল। ওরা না কি ওই গার্ডদের ছাড়া আর কাউকে চেনে না!

তবে বলতেই হবে, প্রথম দেখেই জায়গাটা আমার খুব ভালো লেগে গেছিল। সামনে তাকালেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরো সবুজ একটা পাহাড়! বেশ উঁচু! আর রিসর্টটা হল সেই পাহাড়ের একটা অংশ জুড়ে। রিসর্টটায় লোক জন তেমন বড় একটা চোখে পড়ল না বটে কিন্তু যা চোখে পড়ল তাতে আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠল! অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা পার্ক! আর কী নেই সেখানে! ফাঁকা ফাঁকা চারখানা সুসজ্জিত দোলনা দুলে দুলে যেন আমায় ডাকছে! ছুটে গিয়ে চড়ে পড়লাম একটায়। পাহাড়টা এখন আমার সাথে সাথে নড়াচড়া করছে! একবার এগিয়ে আসছে, আবার পরক্ষণেই পিছিয়ে যাচ্ছে!

পার্কটা জুড়ে শুধু ফুল আর ফুল! আমি কারো নাম জানি না। এখানেও অনেক পলাশ। তাদের ডাল সব ফুলে ভরে লাল হয়ে আছে। লাল মাথার মাঝখান থেকে উঁকি দিচ্ছে টিয়া! একটা দুটো তিনটে…আরেব্বাস! এ যে ঝাঁক ঝাঁক টিয়া পাখি! ছুটে যেতেই ফড় ফড় করে টিয়াগুলো ঝাঁক বেঁধে উড়ে গেল! দৌড়লাম পিছনে। পদ্মদার ডাক শুনলাম, ‘বেলো একা একা যাস না! দাঁড়া। আমিও যাব!’ শুনেই অ্যাবাউট টার্ন নিয়ে দৌড়লাম পদ্মদার কাছে।

পদ্মদা মালপত্র ঘরে রেখে নেমে এসেছে। আমাদের ঘরটা দোতলায়। ঘরের ঠিক বাইরেই, বাঁ দিকটায় একটা পলাশ রাঙা হয়ে আছে। আর দিকে একটা শিরিষ গাছ। আমাদের ওই বিল্ডিংটা থেকেই রিসর্টার শুরু বলা যায়। তারপর কেয়ারি করা রাস্তার দু ধারে শুধু বড় বড় গাছ! পদ্মদা বলল, এমন পথকে বলে বীথি। গাছগুলোর মধ্যে বেঁটে বেঁটে আম গাছও আছে। ঝেড়ে মুকুল এসেছে সেগুলোয়। মুকুলের গন্ধে মো মো করছে চারদিক। আমি গাছ অনেক দেখেছি। দাদানদার বাড়ি ভর্তিই তো শুধু গাছ আর গাছ। কিন্তু এমন নির্জনে গাছগুলো যেন একদম অন্যরকম লাগছে! যেন মনে হচ্ছে এটা আসলে ওদেরই এলাকা। আমরা যেন ওদের এলাকায় হঠাৎ করে ঢুকে আসা কেউ।

পদ্মদাকে পার্কটা দেখালাম। বলল, ‘একটু ঘুরে নিই, ফেরার সময় নয় পার্কে কাটাব’।

পার্কটাকে ডান দিকে রেখে আরও একটু এগোলে ডান পাশে সার সার টেন্ট। সামনে ইজি চেয়ার পাতা। কোনও কোনও টেন্টে মনে হল লোক আছে। চার পাঁচ জন বাচ্চাকেও দেখলাম সামনে খেলে বেড়াচ্ছে।

আমাদের রাস্তার বাঁ পাশে হঠাৎ করে এবার এসে গেল একটা গ্রাম! সত্যিই সার সার মাটির ঘর, তুলসি মঞ্চ- একদম গ্রাম। পদ্মদা বলল, ‘এই গ্রামটাও বানানো। দেখছিস না, সব কটা হাট কেমন এয়ার কন্ডিশন্ড!’

সেই বানানো গ্রামের ভিতরের পথ দিয়ে ডাইনিং হল যেতে হয়। আর ডাইনিং পেরিয়ে যেতে হয় পুকুরে। পুকুরে তখন ছিপ ফেলে মাছ ধরছেন দাদানদার মত বয়সের এক জন। টকটক করছে তার গায়ের রঙ! পদ্মদা বলল, ‘কাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমি আর তুই ওখানে ফিশিং করব’!

‘আরে ফিশিং তো আমার প্রিয়! আমি এই ব্যাপারটায় মাহির!’

‘তাই না কি! কোথায় ধরেছিস মাছ?’

‘ধরিনি, কিন্তু জানি কীভাবে ধরে! অনেক বার টিভিতে দেখেছি’। কথাটা বলেই আমার একটা সম্ভাবনা মনে হল, ‘আচ্ছা পদ্মদা! এই পুকুরটায় জল আসে তো ওই পাহাড় থেকে, তাই না?’

‘বোধ হয় তাই। বৃষ্টির জল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এসে জমা হয় বোধ হয় পুকুরটায়’

‘তা হলে তো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেক কেমিক্যাল এই জলে মিশতে পারে। হতেও পারে সেই কেমিক্যালে এখানকার মাছের মিউটেশান হয়ে গেছে। হতেও পারে ওরা এখন মনস্টার ফিশ! কেউ নামলেই সঙ্গে সঙ্গে চুষে নেবে তার রক্ত, অথবা বুঝতেও পারবে না কখন কুচ করে কেটে নিয়ে গেছে তার পা!’

ভুক ভুক করে খানিক হেসে নিয়ে পদ্মদা বলল, ‘এই গ্যাঁজাগুলো তোর মাথায় আসে কী করে? এইটুকু ছেলে, মিউটেশানের নাম জানলি কোত্থেকে?’

‘আরে রিভার মনস্টার দেখ না অ্যানিমাল প্ল্যানেটে? কত তো এরকম ঘটনা ঘটে। অ্যামাজনে, অ্যারিজোনায়, চেরনোবিলে, সুমাত্রায় কত তো এরকম মনস্টার ফিশ আছে রিভারে!’

‘আরিব্বাস! এ তো গোটা দুনিয়ার সফর করে গেলি রে! বেশ! কালকে তো ধরছিই। দেখাই যাবে তেলাপিয়া মিউটেশনের ফলে পিরানহা টিরানহা হয়ে গেল কি না!’

‘হলে কিন্তু বেশ হয় বল!’

এই সব বলতে বলতে গোটা রিসর্টটা ঘণ্টাখানেক ধরে জরিপ করে অনেকগুলো লাল হলুদ পলাশ, রুদ্রপলাশ কুড়িয়ে, টোপা কুলে পকেট ভর্তি করে আমরা এসে উঠলাম ডাইনিঙে। আদ্ধেক আদ্ধেক গন্ধরাজ লেবু চটকে মুগ ডাল দিয়ে গরম ভাত! ডালের উপর ঝিরিঝিরি আলু ভাজা। ডুমো ডুমো ফুলকপির ঝোল আর চিকেন কারি। শেষে দুটো রসগোল্লা। এই সব দিয়ে লাঞ্চ সেরে ঘরে ফিরেই পদ্মদা দিল টানা ঘুম, আর আমি কুড়িয়ে আনা একটা লাঠির ডাল নিয়ে ব্যালকনিতে খেলতে শুরু করলাম।

সন্ধেবেলাটাও খুব সুন্দর ছিল। সানসেট যে এত সুন্দর হতে পারে ভাবিনি! আমার ফুটবলের ব্লাডারের মত পুরো অরেঞ্জ হয়ে গেল সূর্যটা, তারপর যত নামে তত লাল হয়! নামতে নামতে এক সময় টুক করে ডুবে গেল সবুজ পাহাড়ের ঘাড়ের পিছনে! ঠিক তক্ষুনি চোখে পড়ল সবুজ পাহাড়টা কেমন যেন কালচে হয়ে গেছে! আর কোত্থেকে যেন রাজ্যের ধোঁয়া এসে জড়িয়ে ধরেছে ওকে! ঠিক তক্ষুনি আমার মায়ের মুখটা ভেসে উঠল মনে। মার জন্যে খুব মন কেমন করে উঠল। আর পাহাড়টাকে মনে হতে লাগল ভুতুড়ে কাণ্ডের আখড়া!

তবু ঘরে ফিরে টিভি ঠিভি দেখে একরকম লাগছিল। এখানে মোবাইলে না কি সিগন্যাল মেলে না, পদ্মদা বলছিল। যাই হোক বাড়ির সাথে কথা না হলেও গরম গরম পনির পকরা আর চিকেন পোকার স্বাদ সন্ধেটা ভাল করে দিয়েছিল। আর সাথে ছিল পদ্মদার কাছ থেকে মহাকাশের নানান কথা। ও, এখানে আকাশ এত পরিষ্কার যে পদ্মদা আমাকে অনেকগুলো তারা চিনিয়ে দিল আর অনেকগুলো কনস্টিলেশানও!

ডিনারটাও যাকে বলে ছিল একেবারে জম্পেশ। লাঞ্চের মতই ঝিরিঝিরি আলুভাজা, ডাল তো ছিলই। আর ছিল ওমলেট আর চিকেন! পদ্মদা পেটুক মানুষ। কাজেই ও তো খুব খুশিই। আমারও ভালোই লাগছিল তবে কী যেন একটা নেই নেই মনে হচ্ছিল খালি খালি। আসলে এখানে সব কিছুই কেমন যেন ভীষণ রকমের চুপ! আর আমি হলাম গিয়ে হই চই করা বেলো। বাবা বলে হুপো বেল। এমন চুপ চাপ আমার আর কত ভাল লাগবে, বল!

ডাইনিং হল থেকে ফেরার সময় অল্প আলোয় রহস্যময়ী সেই বীথিতে পদ্মদা বলল, ‘প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যা বেল। এখানে দেখ সব কিছুই নেচার। এই গাছ, ওই ঝিঁঝি পোকার সুর, শেয়ালের ডাক, রাতচোরার ডানা ঝাপটানো সব নেচারের আপন সম্পদ! সুযোগ পেয়েছিস যখন, শুধু সেই সম্পদ দেখে যা! চোখ ভরে দেখ, কান ভরে শোন আর প্রাণ ভরে শ্বাস নে!’

এই আবছা আলোয় পদ্মদাকে বেশ ভাল লাগছে। বড় হয়ে আমিও এরকম হব। শুধু জানব, শুনব আর আনন্দে ঘুরে বেড়াব। তবে একা একা না বাবা! মাকে নিয়ে নেব।

ঘরে এসে ঢোকার পর থেকে লোড শেডিং! সেই যে গেল, আর এল না! আড়াই ঘণ্টা হয়ে গেল! আমরা দু’জন ব্যালকনিতে বসে আছি চেয়ারে। হাওয়ায় কেমন শীত শীত ভাব! বাঁচোয়া একটাই, এখানে একটাও মশা নেই। এই যদি আমাদের কলকাতা হত, ভাব তা হলে এতক্ষণ পায়ে গায়ে চাকা চাকা গোল গোল ফুলে যেত, তা ছাড়া কানের ভিতর পুনপুনানি নাকের ভিতর আচমকা সুড়সুড়ানি তো আছেই! বাপরে বাপ! মশার মত জ্বালাময়ী পতঙ্গ বোধ হয় আর একটাও জগতে নেই!

কাজ নেই, কাজেই মশা নিয়েই পদ্মদার সাথে গপ্প শুরু করলাম। পদ্মদা যে কত কী জানে! কোন মশা কেমন দেখতে, কার কামড় কেমন, কে কামড়ালে কতটা ভোগান্তি সব বলতে শুরু করল। তারপর বলতে থাকল আফ্রিকান আদিবাসীদের মশার লার্ভা থেকে কুকি তৈরি করার গল্প। ওরা নাকি মশার লার্ভা থেকে এক রকমের কুকি বানায়, যা কিনা ওদের প্রোটিনের ঘাটতি মেটায়! ভাবা যায়!

এই সব মশাচর্চা চলছ চলছে এমন সময় হঠাৎ করে কী যেন একটা হুউউসস করে দৌড়ে গেল আমাদের ব্যালকনির নিচ দিয়ে! যেন একটা অন্ধকার জড়ানো দমকা হাওয়া! পদ্মদাকে বলতে যাব, দেখি পদ্মদা নিজেই কপাল কুঁচকে দেখছে! বলল, ‘দেখেছি। কী গেল বুঝতে পারলাম না! মানুষের মতই তো মনে হল!’ তারপর খানিক এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বলল, ‘আশ্চর্য! কুকুরগুলো তো ছাড়াই! কিন্তু কই একটা আওয়াজও তো করল না!’

‘পদ্মদা! চল ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ি’

‘কথাটা খানিক আগেও যদি বলতিস, ভাবা যেত। এখন তো আর তা হয় না বেল। অমন উড়ন্ত না কি ছুটন্ত বস্তুটি আদতে কী, সে না জানলে তো আর আমার শোয়া হবে না!’

‘বাদ দাও না। আমাদের কী?’

‘ও মাই লিটিল এসকেপিস্ট, সমাজে এর থেকে দায় এড়ানো কথা আর হয় না। বাদ দেওয়া যদি একবার মজ্জায় ঢুকে যায়, অনেক অদ্ভুত সুন্দরের দেখা পাওয়ার রাস্তা কিন্তু পুরোপুরি আটকে যাবে। তুই তো তেমন ছেলে নস বেল! তা ছাড়া আমি আছি তো! ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি যে তাইকুন্ডোর সেনসেই, সে খবর জানিস?’

‘না জানি না পদ্মদা! আর তা ছাড়া, হলেও বা ভূতের সাথে তোমার তাইকুন্ডো কোন কাজে লাগবে বল তো?’

‘ভূতই যে তুই এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে?’

‘ভূত না হলে এমন ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে কে আর অমন করে আসবে? ও পদ্মদা! চলো না, ভিতরে চলো!’

‘চল’

ভিতরে এসেই পদ্মদা হ্যাঙ্গার থেকে ট্র্যাকশুটটা নামিয়ে পড়তে শুরু করল।

‘ও পদ্মদা! এটা পড়ছ কেন? কোথায় যাবে?’

‘নীচে নেমে ব্যাপারটা দেখতে হবে’

‘কী যা তা বলছ?’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, ‘আমি কী করে একা একা থাকব ঘরে?’

‘পারবি না তো তুইও চল আমার সাথে। ভূত দেখতে পাস চাই না পাস, এমন নিরালায় ওই পাহাড়টাকে উপভোগ করতে পারবি। ঘরের কোণায় এমন অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে ক’জন পারে বল তো?’

‘থাক না! সকাল হলে না হয়…’

দেখলাম আমার কথায় কর্ণপাতও করছে না পদ্মদা। প্রায় তৈরি হয়ে গেছে। কাজেই আমাকেও ট্র্যাকশুটটা পড়তে হল। বেরোতেই হবে যখন একটা অস্ত্র থাকুক হাতে এই ভেবে বিকেলে আনা সে গাছের ডালটা হাতে নিলাম। পদ্মদা সেই দেখে মুচকি হাসল। তারপর টেবিল থেকে দরজার চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল। দরজা বন্ধ করে আমরা বেরিয়ে এলাম করিডোরে।

এমনিই দোতলায় আর কোনও ঘরে লোক নেই। নীচের রিসেপশনও শুনশান! দরজা বন্ধ করার শব্দ যেন গমগম করে উঠল গোটা বাড়িতে! আমার বুকের ভিতরেও সেই শব্দের রেশ ঢেউ তুলে দিল। পদ্মদার হাতটা ধরলাম।

গোটা করিডোরটা মনে হচ্ছে অন্ধপুরীর মায়াপথ! একটা আলোও জ্বলছে না! মোবাইলের টর্চ জ্বালল পদ্মদা। অন্ধকার ছিঁড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল সাদা আলো। আস্তে আস্তে নেমে এলাম আমরা।

নীচেও কেউ নেই। রিসেপশন ডেস্ক লাগোয়াই ম্যানেজারের ঘর। বন্ধ। পদ্মদাকে ইশারায় বললাম ম্যানেজারকে ডাকতে। মাথা নাড়ল।

সিঁড়ি পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে মাটিতে নামলাম। বেশ ঠাণ্ডা এখন চারপাশ। ব্যালকনি থেকে যেদিকটায় সেই ছুটে যাওয়া দেখেছিলাম, সে দিকে বেশ কিছু গাছ জড় হয়ে আছে। সেদিকে এগোতে এগোতেই মোবাইলের টর্চটা সামনের দিকে ফেলল পদ্মদা! যা দেখলাম তাতে ভয়ে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো! চোখের সামনে সব কিছু দুলে উঠল! মা বলে চিৎকার করতে গিয়েও গলা থেকে একটুও আওয়াজ বেরল না!

আমাদের চোখের সামনে সেই গাছের গুঁড়ির ভিড়ে কালো কাপড়ে সর্বাঙ্গ ঢাকা কতগুলো ছায়া মূর্তি ঝুঁকে পড়ে কী যেন খাচ্ছে! মাটি থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে কী যেন খাচ্ছে! আমাদের টর্চের যতটুকু আলো ওদের কাছে পৌঁছেছে, সেই আবছা আলোয় তাদের ঘোমটা ঢাকা মুখে কেবল ঠোঁটটুকু ঠাহর হচ্ছে! আর সেই ঠোঁটের চারপাশে ভেজা ভেজা কী সব যেন লেগে আছে! কী অমানুষিক কা!

পদ্মদাও থমকে দাঁড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরেছে! তবে সাহস বটে পদ্মদার! গলা খাঁকড়ে মুহূর্তের মধ্যে ছায়ামূর্তিগুলোকে প্রশ্ন করে বসেছে, ‘কে তোমরা? এত রাতে এখানে কী করছ?’

ছায়ামূর্তিগুলো উঠে দাঁড়িয়েছে। এক জন আসতে আসতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে! বাকিরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দুলছে! সামনে পিছনে অদ্ভুত ছন্দে তাদের দুলুনি! আমার হাত পা সব কাঠ হয়ে গেছে! হয় তো আর কিছুক্ষণ, তারপরেই ওই ছায়ামূর্তিদের হাতে ধরা পড়ে যাব আমরা! আর হয় তো যাওয়া হবে না আমার সাধের কলকাতার বাড়িতে! মায়ের কাছে যাওয়া হবে না! মা, মাগো! কেন যে তোমায় ফেলে এলাম এখানে! মা! মাগো!

‘বাবু গো!’

ওরে বাবা! সেই অশরীরী আমাদের সামনে এসে কথা বলছে! কিন্তু বাবু বলছে কেন?

‘বাবু গো! এরা সবাই এই গাঁয়েরই সব লোক জন গো বাবু!’

পদ্মদার গলার স্বরে কোনো ভয়ের ছোঁইয়াচ নেই! স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তবে এত রাতে এখানে কেন?’

‘খেতে গো বাবু! এখানে বড় অভাব যে বাবু! আপনারা তার কিচ্ছুটি টের পাবেন না! ওই গেটের বাইরে যে গাঁ, সেখানেই এদের বাস। এই পাহাড়, এই জঙ্গল- এই এদের রুটি রুজি গো বাবু! জঙ্গল কেটে সব হোটেল হয়ে গেলো, যেই টুকু বন আর টিকে থাকল, তাতে আর চলে না যে বাবু! পেট ভরা খিদে নিয়ে সারা দিন এরা ঘুরে বেড়ায় বনে বনে। কিচ্ছু মেলে না গো বাবু আর! রাতের বেলা তাই মাঝে মাঝে এদের ডাকি গো বাবু। কত খাবার নষ্ট হয় হোটেলে! সব খাইয়ে দিই’

‘তুমি কে?’ পদ্মদা জিজ্ঞেস করল।

‘বাবু আমি মালি। আমিও ওদের এক জন। কিন্তু এখানে চাকরি করি বলে কুকুরগুলো আমায় চেনে। আমি ওদেরও চিনিয়ে দিয়েছি। কুকুররা তাই কিচ্ছু বলে না! এরা কিচ্ছু করে না বাবু! আসে, খায়, চলে যায়। সবাই জানে বাবু। দারোয়ান, সিকুরিটি সবাই জানে। সবাই তো এখানকারই মানুষ, তাই কেউ কিচ্ছু বলে না। আপনি বাবু দয়া করে ম্যানজারবাবুকে বলবেন না!’

‘বলব না!’

আমি এতক্ষণে বুঝে গেছি এরা কেউ ভূত নয়। পদ্মদাকে ডেকে বললাম, ‘ও পদ্মদা! ঘরে চারটে আপেল আর কেক আছে তো! ওদের এনে দেবে?’

পদ্মদা বলল, ‘যা। তুইই নিয়ে আয়’

সত্যি বলছি, আর একটুও ভয় করল না আমার। মোবাইলের টর্চটা নিয়ে ঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আপেল আর কেক এনে দিলাম পদ্মদার কাছে। পদ্মদা বলল, ‘তুইই দিয়ে দে’

আমি মালির কাছে গিয়ে ওকে দিতেই সে বলে উঠল, ‘কাল সকাল বেলা আপনারা দু’জন আসবেন বাবু। আমি আপনাদের উই পাহাড়ে নিয়ে যাব’

‘কিন্তু সেখানে যে হায়না আছে শুনলাম!’ আমি বললাম।

‘সে তো অন্যদের জন্যে খোকাবাবু। তোমাদের জন্য তো আমি থাকব। হায়না আর আসবে কোত্থেকে? উই পাহাড়ে তোমাদের আমাদের দেবতার থান দেখাব। বড় পাথরের থান দেখাব। দেখবে কেমন গাছের লতায় এই এত বড় পাথরটা আটকে আছে! তারপর কেন্দু গাছ দেখাব, গোবোইরার গাছ দেখাব, টিয়ার ঝাঁকের বিল দেখাব। উঠতে উঠতে হাঁফিয়ে গেল তুমি পাথরে বসে নেবে। পাহাড়ের হাওয়া এসে তোমার ঘাম মুছিয়ে যাবে’

‘সে তো হবে’, পদ্মদা বলল, ‘কিন্তু সকালে তোমাকে চিনব কেমন করে?’

‘আমি তো চিনে নিব তুমাদের। আর যদি আমায় খুঁজতে চাও, তাইলে উই পার্কের বাগানের কাছে দেখবে’

‘তোমার নাম কী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘নবু। তবে আমাকে এখানে সবাই বলে বড়বাবু’

‘বেশ, বড়বাবু! তা’লে সেরকমই কথা রইল। কাল সকালে আমরা যাব সবুজ পাহাড়ে!’, পদ্মদা বড়বাবুকে কথাটা বলেই আমার দিকে ফিরে বলল, ‘কেমন বেলো?’

আমি আর কী বলি! এর চে আনন্দের কিছু কি আর হয়?

বড়বাবুকে ‘গুড নাইট’ বলে যেই না আমরা উপরে ঘরে এসে ঢুকলাম অমনি লাইটও এসে গেল! ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই পদ্মদা বলল, ‘এমন জায়গায় লোডশেডিংটাই বেশি মানায়। না রে বেলো?’

এল.ই.ডি.র আলোয় প্রায় ঝলমল করা বাইরেটা দেখে নিয়ে বললাম, ‘একদম ঠিক বলেছো!’