Alokananda-royগল্প: হিজল ফুলের মালা

অলকানন্দা রায়

সেই তখন থেকে তনু একা বসে আছে শিল্পকলা একাডেমির অফিসরুমে। আজ তার নাচের ক্লাশ আছে। সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনো কারো দেখা নেই। অপেক্ষার প্রহর গোণা ছাড়া আর কিইবা করার আছে। খানিকটা বিরক্তি নিয়েই অফিসরুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই সে মুগ্ধ হয়ে যায়। বাহ্ বিকেলের সোনা রোদে করোতোয়া নদীটা কি সুন্দরই না দেখাচ্ছে! চারপাশটা আলোয় ঝলমল করছে। নদীর পাড় ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ গুলোর পাতায় পাতায় রোদ যেন লুটোপুটি খাচ্ছে। দুটো গরু আনমনে ঘাস খাচ্ছে। হঠাৎই বয়ে যায় যেন অনুরাগের বাতাস। বাতাস লেগে তিরতির করে কাঁপতে থাকে ওপাড়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের চিকন পাতাগুলো।

‘ও মাইয়া,কি দেহ অমন কইরা?’ প্রশ্নটা কানে আসতেই মুগ্ধতার ঘোর কাটে তনুর। একটু হেসে বলে, এইতো নদী দেখি। ও আইচ্ছা দেহ। তা তোমার কাছে কি দশটা টাকা হইবো? হ্যাঁ হবে তো এই যে নেন। কোলের উপর রাখা ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গেলে ঘুংঙুরটা ঝমঝম করে ওঠে। আলগোছে টাকাটা বের করে লোকটির হাতে দেয় তনু।

তাড়াতাড়িই ফিরে আসে লোকটা।বলে এই নাও মা তোমার টাকা। তনু নিতে চায় না সলজ্জ চাহ্‌নিতে  বলে আপনার কাছেই রেখে দিন না! লোকটা বলে আমি নিমু ! না না মা লাগবো না। তনু এবার জোর দিয়েই বলে রেখে দিন না মাত্রতো দশ টাকা।লোকটা সরল হাসে শিশুর মতো। বলে আইচ্ছা তাইলে তুমি বহ্। আমি এই টেহা দিয়া দুই খিলি পান কিন্না আনি। লোকটা বেরিয়ে যায়। তনুর ভেতরটা খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে। অবাক হয়ে ভাবতে থাকে মাত্র দশ টাকাতেই কেউ কেউ কী অপার খুশিই না হয়! কত সহজেই না মানুষ সুখি হয়। তারাই বোধহয় বেশী সুখি থাকে যাদের আছে অল্প।

তনুর ভাবনা আর বেশী দূর এগোয় না।সে দেখতে পায় বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে পান চিবুতে চিবুতে আব্দুল গণি মিয়া আসছে। শিল্পকলা একাডেমির কেয়ার-টেকার সে। বুড়ো হয়ে গেছে,বয়সের ভারে পিঠটাও নুয়ে পড়েছে।মাথার চুলগুলোও বেশীর ভাগই সাদা। দাঁতও পড়ে গেছে কয়েকটা। এই শিল্পকলা একাডেমিই তার ঘর-বাড়ি। দশবারো বছরের এক ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। ছেলেটি তাদের বহু সাধনার ধন।

অফিসরুমে ঢুকেই ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে গণি মিয়া। তার চোখেমুখে খুশি চিকটিক করছে তখনও। হঠাৎ খুশিতে পাওয়া গণি মিয়া একবার হাসে আরেক বার হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁটের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানের রস মোছে। মুছতে মুছতেই বলতে থাকে…

জানো মা,পান আমার আর তোমার চাচীর খুউবই পছন্দ। হেই ছোটবেলায় যখন আমগোর বিয়া অইছিলো তহন আমরা পয়সা জমাইয়া স্বাদের পান কিন্না আইন্না পলাইয়া পলাইয়া খাইতাম।

Hijal জানো, যখন আমাগোর বিয়া অয় তহন আমার বয়স আছিলো বারো কি তের আর তোমার চাচীর তো আরো কম। বিয়া তো অইছে,কিন্তু হে আমগো বাড়ি আইলে থাহে আমার মায়ের সাথত। আমার সাথে দেহাই অয় না অইলেও কতা অয় না। এমুন কইরাই দু-এক বছর কাটলো। হেরপর একদিন বউ বাপের বাড়ি যাবো তার আগে আমার সাথে লুকাইয়া দেহা কইরা কইলো, হোন কয়েকদিন পর আমার বাপের বাড়ির এলাকায় বৈশাখী মেলা হইবো তুমি কিন্তুক যাইও। আমি তোমার সাথে মেলাত যামু। শুইন্না তো আমার মনে, কী খুশি কী খুশি!

হে তো কইয়াই খালাস। বাপের বাড়ি গেল গা। এদিকে আমার তো আর দিন ফুরায় না। কবে যামু কেমনে যামু। বাপ মারে এই কথা কেমনে কমু! চিন্তায় চিন্তায় তো আমার ঘুম অয় না। হেষমেশ আইলো হেইদিন। কইতে পারলাম না কাউরে। মায়ের বাকস্ থাইক্কা চুরি কইরা আর এক দোস্তর থাইক্কা কিছু টেহা  ধার কইরা লইয়া চইল্লাম শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশে। পৌঁছিলাম গিয়া সন্ধ্যাবেলা।

কাউরে তো কইয়া আহি নাই। তাইলে হেই বাড়ি কেমনে ঢুকি! নানান চিন্তা কইরা ঢুকলাম না। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতে অস্থির হইয়া আল্লারে ঢাকতে লাগলাম। আল্লার কি কাম ! তহনই দেহি তহুরা হেগো বাড়ির পাশে যে খালডা আছে হেইখানে যাইতাছে। আমিও চললাম তার পিছন পিছন। এদিক ওদিক তাকাইয়া দেহি কেউ নাই। তখন পিছন থিকা যাইয়া ধরলাম তার চোখ।

ও মাগো ! সে কি চিক্কুর তার ! কোন রকমে তার মুখে হাত চাপা দিয়া কই ডরাইয়ো না আমি তোমার সোয়ামী। তয় সে থামে। আর কি যে খুশি সে হইলো। তার আর কি কমু! কয় এবা কইরা কেউ আহে? চলো বাইত চলো। আমি কই না না বাইত যাওন যাইবো না। তুই কাইল বিয়ান বেলা আহিছ।আমি নৌকা জোগাড় কইরা থুমুনে। হের পর মেলাত যামু দুইজনে।

হের চোখে মুখে য্যান আন্ধ্যার নামে। কয় এই রাইতের বেলা তুমি থাকবা কোন হানে? আমি তারে এইডা সেইডা নানান কথা কইয়া বুঝ দিয়া বাড়িত পাঠাইয়া দিলাম। হে তো গেল। কিন্তু আমি এহন কি করি,কোন হানে রাইত কাটাই! অনেক চিন্তা ভাবনা কইরা কাছেরই একটা মুদি দোকানে বইসা খাইলাম গুড়-মুড়ি। ওই হানেই বইয়া থাকলাম অনেকক্ষন। কেউ তো আমারে চিনে না তয় সমস্যা কি?

যখন দেখলাম দোকানডা বন্ধ করবো করবো ভাব। তহন উইঠা পড়লাম। আইলাম খালের পাড়। দেহি  ঘাটে একখান নৌকা বান্ধা আছে। ওই নৌকায় উইঠা বইয়া থাকলাম। ঘুমানোরর চেষ্টা করলাম আহে না। খালি ভাবতাছি কহন সকাল হইবো আর তহুরা আইবো। এমন কইরা রাইত যহন দুপুর চাইয়া দেহি কুপি হাতে কেডা জানি আইতাছে এইদিকেই।বুকের মইধ্যে কেমন জানি ঢিপঢিপ করা শুরু করলো। কিছুক্ষন চাইয়া থাইকা মনে হইলো একটা মাইয়া মানুষ। তহন আর বুঝতি দেরি হইলো না। মনরে কইলাম এইডা আর কেউ না আমার বউ তহুরা।


যখন আমাগোর বিয়া অয় তহন আমার বয়স আছিলো বারো কি তের আর তোমার চাচীর তো আরো কম। বিয়া তো অইছে,কিন্তু হে আমগো বাড়ি আইলে থাহে আমার মায়ের সাথত। আমার সাথে দেহাই অয় না অইলেও কতা অয় না।


হাচা হাচাই হে আইসা কয় তোমার লাইগা খাওন আনছি খাইয়া নেও। আমি তারে কইলাম আহ আমরা দুইজনে মিল্লা খাই। খাইতে খাইতে কতা কইতে কইতে দেহি রাইত পার। নৌকা দিলাম ছাইড়া। ভোর ভোরই হাজির হইলাম মেলায়। কত্তো কি যে আছিলো হেই মেলায় ! সারাদিন কতো যে ঘুরলাম,কতো কি যে খাইলাম তার ঠিক ঠিকানা নাই। হেই মেলায় জীবনের পরথম আমি তারে হাত ভইরা কাঁচের চুড়ি,চুলের ফিতা,আলতা,তেল,সাবান কিন্ন্ দিলাম। কি যে খুশি হইছিলো তহুরা তা কওনের না। আমরা দুইজনে পুতুল নাচ দেখলাম,সার্কাস দেখলাম সাপের খেলা দেখলাম, নাগরদোলায় উঠলাম আরো কতো কি যে করলাম! দেখতে দেখতে তো প্রায় সন্ধ্যা ! আমাগোর তো হুস্ই নাই যে,বাড়ি ফিরন লাগবো। তহুরা তো পলাইয়া আইছে। তারে না জানি কি খোঁজাটাই না খুঁজতাছে বাড়ির বেবাকে। এইবার তো ধরলো দইজনরে চিন্তায়। তাড়াতাড়ি নৌকায় উঠলাম জোড়ে জোড়ে নৌকা চালাই আর তহুরা আল্লা আল্লা করে। তাগোর বাড়ির ঘাটে যহন পৌঁছিলাম তহন সন্ধ্যা পার হইয়া গেছে। একটা হিজল গাছের তলে নৌকাখান বাইন্ধ্যা ধুইয়া বউয়ের হাতে তুইল্লা দেই সন্দেশ, গজা আর জিলাপি কই বেবাকরে দিয়ো। কেউ জিগাইলে হাচা কথাই কইয়ো। ভ্যালা মতন থাইকো। আমি যাইগা। আর ধর এই দুইখিলি পান তুমি খাইয়ো।

হে আমার হাত টাইন্না ধইরা কয় তুমি যাইও না। থাইকা যাও।আমি তারে বুঝ দেই, কই  থাকন যাইবো না বউ। আইজ যাই। আবার সকলরে কইয়া বইল্লা আমুনে। বউ কানতে কানতে যায়। আমি চাইয়া থাহি। আমারো কেমুন চক্ষে পানি চইলা আহে। যতই মুছি ততই আহে। শেষে মুখ ধুই খালের পানিতে। চাইয়া দেহি খালের পানিতে বিছাইয়া রইছে লাল লাল হিজলের ফুল। আহারে! যদি এই ফুল দিয়া মালা বানাইয়া তহুরারে পড়াইতে পারতাম! কেমন সুন্দরই না লাগতো!

ধপ্ করেই বাস্তবে নেমে আসে কথক গণি মিয়া। বলে জানো,আমরা কী সুন্দর দিনই না কাটাইছি। সেদিনের সেই ঘোর যেন আজো খেলে যায় তার প্রাণমনে।

অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে তনু,বৃদ্ধ গণি মিয়ার দিকে। নপূরের সুর ভেসে আসছে, তা থেই থেই তাৎ বোলে। তনু উঠে এগিয়ে যায় নাচের ক্লাশের দিকে।

বিভোর গণি মিয়ারও ঘোর ভাঙ্গে,নেমে আসে এদিনের সমারোহে…।