nitaনীতা মণ্ডল

(১)

পাঁচিলের ওপাশের গর্গ বাড়ির মেয়ে মনু জমকালো লাল চোলি-ঘাগরা, মাথায় ঘন সবুজ চুন্নি, আর গা ভর্তি গয়না ঝলমলিয়ে মোঙ্গা বাড়িতে প্রবেশ করল। পাত্রের মা শশী পুত্রবধূকে বরন করতে এসে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। দুটো চোখে লালচে আভা আর চোখের পাতাগুলো ভেজাভেজা দেখালেও মনুর সৌন্দর্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি। শশীর একটু মায়া হল, সেই কোন ছোটবেলা থেকে দেখছেন মেয়েটাকে। ‘খুব কেঁদেছে হয়ত! যতই হোক, নিজের বাবা-মাকে ছেড়ে আসা!’ ভেবেই বৌমার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু বললেন। অমনি নববধূ আর শাশুড়ি দুজনেই হেসে লুটোপুটি। অতিথিরা সব হতবাক।

ভিড়ের মাঝখান থেকে কারোর ব্যঙ্গ ছিটকে এল, ‘এই তো শুনলাম, ওই বাড়ি থেকে গুরুদুয়ারা, আবার গুরুদুয়ারা থেকে এই বাড়ি, পুরোটাই নাকি কেঁদে ভাসিয়েছে!’

তাই শুনে ছেলের মাসি বলল, ‘তা কাঁদবে না, হলেই বা পাঁচিলের এপার ওপার, আসা তো সেই পরের ঘর করতে।’

পাত্রের ছোটপিসি বলল, ‘সব নাটক। তলায় তলায় নির্ঘাত রিঙ্কুকে ফাঁসিয়েছে। নাহলে আমাদের বাড়ির নিয়মকানুন শিকেয় তুলে বেনেদের বাড়িতে ছেলের বিয়ে দেয় দাদা!’

পাত্রের কাকিমা, জেঠিমারা ব্যস্ত ও বাড়ি থেকে আসা জিনিসপত্র নিয়ে। তত্ত্বের জাঁকজমকে অনেকেই বাক্য হারা। সকলের জন্যে আলাদা উপহার, প্রতিটা জিনিসের মূল্য পর্যন্ত স্পষ্ট চোখে পড়ছে। আত্মীয়স্বজনদের জন্যে জামাকাপড় দিলেও পাত্রের মা, বাবা আর ভাইয়ের জন্যে সোনা।

পাত্রের ছোটপিসির সঙ্গে তাল দিল বড়মামিমা, ‘আমাদের শশীটাও কেমন ধারা। তুই শাশুড়ি হচ্ছিস, প্রথমদিন থেকে নিজের ওজন বজায় রাখতে না পারলে পরে সামলাতে পারবি?’


স্ত্রীর কাছে মাঝেমাঝেই বলেন, ‘মোঙ্গা সাহেবের সব ভাল। তবে বাচ্চাদের উপর বড্ড জুলুম করেন। কি দরকার এত রাত জেগে পড়াশুনো করে এনট্রান্স দেবার! টাকা ফেললেই তো ভর্তি হওয়া যায়। তাছাড়া এসব টাকাপয়সা তো ছেলেমেয়েদের জন্যেই রোজগার করা।’


সে কথায় বেশ কয়েকজন ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিলেও সকলের মনে একই কৌতূহল উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। পাশের বাড়িতেই বিয়ে, নাহয় মেয়ে কাঁদলই না, তাই বলে ‘হি হি’ করে হাসতে হাসতে ঢুকবে! তাও আবার শাশুড়ির সঙ্গে কানফুসফুস খেলতে খেলতে! কি এমন বলল, শশী?’

শশীও প্রত্যেকের মুখ দেখে তাদের অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড়িয়ে পড়ল।

(২)

পাঞ্জাবের বর্ডার ঘেঁষা, হরিয়ানার এক ছোট্ট শহর রতিয়া। শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় পাশাপাশি দুটি বাড়ি। এক বাড়ির মালিক সুরিন্দর গর্গ, এ শহরের নাম করা ব্যবসায়ী। অন্যবাড়ির মালিক প্রবীণ মোঙ্গা, স্বামী-স্ত্রী দুজনই স্কুল শিক্ষক। প্রায় একই সময় এই পাড়ায় আসার ফলে দুই বাড়িতে খুব যাতায়াত। সুরিন্দরের এক ছেলে ও এক মেয়ে, মন্টি আর মনু। প্রবীণের দুই ছেলে, রিঙ্কু আর টিঙ্কু। রিঙ্কু আর মন্টি এক ক্লাসে পড়ে। আবার মনু আর টিঙ্কুও একই ক্লাসে।

মোঙ্গা বাড়িতে ছেলেদের জন্যে কড়া নিয়মকানুন। দুবেলা বই নিয়ে বসতে হয়। সুরিন্দরের ছেলে মেয়েও বই নিয়ে এবেলা ওবেলা হাজির হয় মোঙ্গা বাড়িতে। বাকি সময়টা রিঙ্কু, টিঙ্কু গর্গবাড়িতে কাটায়। সুরিন্দর আর ওর স্ত্রী দোকান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তবুও গর্গ বাড়িতে হাজারটা মজা। সুরিন্দর ছেলেমেয়েদের জন্যে সবরকম আরাম ও আয়েশের ব্যবস্থা রেখেছেন। গরমকালে এসি চলে। সারাদিন টিভি চলছে, নাহলে স্টিরিওতে গান। মোঙ্গা বাড়িতে এসি নেই, টিভিও নেই। থাকার মধ্যে একটি রেডিও। তাও সেটা শুধু প্রবীণের খবর শোনার জন্যে। গর্গ বাড়িতে বিশাল বড় একটা গাড়িও আছে। সুযোগ পেলেই সুরিন্দর সেই গাড়িতে দুই পরিবারকে নিয়ে বেড়াতে যান। ক্রমশ দুই বাড়ির সম্পর্ক এমন ঘনিষ্ঠ হল যে, কে কোন বাড়ির ছেলেমেয়ে তাই গুলিয়ে ফেলে পাড়ার লোকে।

স্কুলের পড়া শেষ হতেই রিঙ্কু ইঞ্জিনিয়ারিং এনট্রান্স পাস করে দিল্লীতে পড়তে চলে গেল। টিঙ্কু ঠিক করেছে ডাক্তারি লাইনে যাবে। সেই রকম তৈরি হচ্ছে ও। বেশ কয়েক লাখ টাকা ডোনেসন দিয়ে মন্টিকে সাউথে ডাক্তারি পড়তে পাঠাল সুরিন্দর। মনুর পেছনেও টাকা ঢালতে পিছপা হন নি। ওকেও ডোনেসন দিয়ে টেক্সটাইলে ডিপ্লোমা করাচ্ছেন। বাড়িতে স্ত্রীর কাছে মাঝেমাঝেই বলেন, ‘মোঙ্গা সাহেবের সব ভাল। তবে বাচ্চাদের উপর বড্ড জুলুম করেন। কি দরকার এত রাত জেগে পড়াশুনো করে এনট্রান্স দেবার! টাকা ফেললেই তো ভর্তি হওয়া যায়। তাছাড়া এসব টাকাপয়সা তো ছেলেমেয়েদের জন্যেই রোজগার করা।’galpo-1

মন্টি ডাক্তারি পাস করার আগেই হাসপাতাল তৈরি করে দিলেন সুরিন্দর। চাকরি বাকরি খোঁজার কোনও দরকার নেই। মন্টি শিশুবিশেষজ্ঞ। বুদ্ধি করে সুরিন্দর নিজের এক বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ের ব্যবস্থাও পাকা করে রেখেছেন। মেয়েটি গাইনোকোলজিস্ট। ওর মতে এর চেয়ে ভাল জোড় আর হয় না। বৌমা ডেলিভারি করিয়েই সেই বাচ্চা তুলে দেবে ছেলের হাতে। তারপর সেই বাচ্চাটাই হয়ে যাবে পরবর্তী কয়েক বছরের জন্যে ছেলের বাঁধা কাস্টমার।

চিন্তা শুধু মেয়েটাকে নিয়ে। ডিপ্লোমা পড়া শেষ হয়ে গিয়েছে। সেরকম ছেলে পেলে সুরিন্দর একটা ফ্যাক্টরি খুলে দেবেন মেয়ের বিয়ের যৌতূক হিসেবে। কিন্তু সেরকম মনের মত ছেলে পাওয়াই দায়। মনুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মন্টির বিয়েটাও আটকে থাকবে।

ওদিকে মোঙ্গা বাড়িতে রিঙ্কু বিটেক পাশ করার পর এমবিএ করে চণ্ডীগড়ে ভাল চাকরি পেয়েছে। মেসে থাকে। তাই প্রবীণও ছেলের বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছেন। খোঁজাখুঁজি চলছে তবে এগোচ্ছে না। তাই সুরিন্দর আর প্রবীণ অনেক আলোচনা করে একই দিনে একই কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন।

বিজ্ঞাপন বের হয়েছে আর দুদিন ধরে দুই বাড়িতেই অনবরত বেজে চলেছে টেলিফোন। একদিন দুপুরবেলা ফোনের ঝনঝনানিতে বিরক্ত হয়ে মনু চলে এল মোঙ্গা বাড়িতে। শশী আন্টির সঙ্গে সুখ দুঃখের গল্প হচ্ছে। বিচ্ছিরি শব্দে ঘরের কোনায় টেলিফোনটা বেজে উঠল।

‘আর পারি না, এই ফোন নম্বরটা দেওয়াই কাল হয়েছে। যা না মনু তুই ধর, আমি উঠতে পারছি না। সেরকম কেউ না হলে বলে দে পরে ফোন করতে।’ শশী বললেন মনুকে।

মনুও এগিয়ে গেল ঘরের কোনায়। ফোন ধরে ‘হি হি’ করে হেসে গড়িয়ে পড়ল।

‘আরে কী হল বলবি তো!’ বসেবসেই অধৈর্য হন শশী। সদুত্তর না পেয়ে ভারি শরীরটা নিয়ে উঠে যান। যা ভেবেছিলেন তাই। জনৈক পাত্রীর বাড়ির ফোন, ওই বিজ্ঞাপনের কুফল।

ফোন রেখে শশী জিজ্ঞেস করলেন, ‘মনু, হাসছিলি কেন রে?’

মনুর হাসির বেগ আরও বেড়ে গেল। একমাথা ববছাঁট চুল ঝাঁকুনির চোটে ওর মুখচোখ ঢেকে দিল। শশী ধমক দিলেন, ‘কি হচ্ছে মনু? দুদিন পর শ্বশুরবাড়ি যাবে, আর এখনও কারণে অকারণে হি হি?’

চুলগুলো দু’হাত দিয়ে কানের দুপাশে ঠেলে দিয়ে মনু বলে, ‘তোমাকে কি বলে ডাকল? মিসেস ম্যাঙ্গো? আমি ফোন ধরতেই বলে, ‘মিসেস ম্যাঙ্গো বলছেন?’ আমি ভাবলাম বলি, না না, আমি তো মিস আপেল। কিন্তু এমন হাসি পেয়ে গেল বলতে পারলাম না!’

(৩)

প্রথমবারের বিজ্ঞাপনে কোনও কাজের কাজ হল না। মোঙ্গা বাড়ির উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল না। গর্গ বাড়িও পেল না উপযুক্ত পাত্র। সুরিন্দরের বেশ মন খারাপ, বিজ্ঞাপনের পয়সা কটা জলে গেল। মন্টির জন্যে অতবড় আধুনিক হাসপাতাল বানিয়ে দিলেও নিজে এখনও পুরনো ওষুধের দোকানে বসেন। নিয়ম মত দোকানের কর্মচারীদের কিছু উপদেশ দিয়ে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন। ঘরে ঢোকার আগে গলির মোড়ে রিঙ্কুর সঙ্গে দেখা। রবিবারে বাড়ি এসেছে। সুরিন্দর ওকে ডেকে নিয়ে এলেন বাড়িতে। বিশাল লোহার ফটক ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে হাঁক দিলেন বাগানে চেয়ারটেবিল লাগাতে। তারপর মন্টি আর রিঙ্কুকে নিয়ে বসলেন। একে একে মদের বোতল এল, বরফ এল, রোস্টেড কাজু, পেস্তা এল আর একটু পরে এল তন্দুরি চিকেন। কাজের লোকটা ভাঙরা চালিয়ে দিয়েছে মিউজিক সিস্টেমে। সুরিন্দরের মনমেজাজ খারাপ থাকলে কী কী করতে হয় ও জানে। অনেক বছর আছে তো! আগে দোকানে কাজ করত এখন বাড়িতেই থাকে। মন্টি আর রিঙ্কু গল্প জুড়েছে। মন্টি বলছে, হাসপাতালে বসলেও সেরকম রুগি আসছে না ওর কাছে। রিঙ্কু বলছে, ওর প্যাকেজ পনেরো লাখ। তবে অনেকটা কেটে রাখে কোম্পানি।

এদিকে দু’পাত্র পেটে পড়তেই সুরিন্দরের মন খারাপ কমতে শুরু করেছে। ‘পনেরো লাখ, পনেরো লাখ’ বলে অস্ফুটে বিড়বিড় করলেন খানিকক্ষণ। তিনপাত্র যেই পড়েছে পেটে, অমনি ‘দিমাগ কি বাত্তি’ জ্বলে উঠল। ডান হাতের চওড়া থাবা দিয়ে এক থাপ্পড় মারলেন রিঙ্কুর থাইয়ে, ‘তুই থাকতে খবরের কাগজ টাগজ কি? শুধু শুধু মোঙ্গাসাহেবের টাকাগুলো নষ্ট হল।’

রিঙ্কু ভ্যাবলার মত একবার সুরিন্দরের দিকে তাকাল, একবার রিঙ্কুর দিকে।

‘লজ্জার কি আছে? তোর কোনও লস হবে না। এত্ত জিনিস দেব আমি মনুর বিয়েতে!’ কত জিনিস বোঝাতে সুরিন্দর দুহাত ডানার মত দুদিকে ছড়িয়ে দিলেন। ‘এখন তোর আপত্তি না হলেই হল।’

‘না… , মানে… আপনি যখন …।’ আমতা আমতা করতে লাগল রিঙ্কু।

গ্লাসের তলায় যেটুকু তরল পড়েছিল এক চুমুকে শেষ করলেন সুরিন্দর। মন্টিকে বললেন, ‘এখুনি মোঙ্গা সাহেবকে ডেকে নিয়ে আয়।’

সম্বন্ধ যখন পাকা হল তখন সাদা গোল টেবিলটাকে ঘিরে আরও কয়েকটা চেয়ার জড়ো হয়েছে সুরিন্দরের শখের বাগানে। সব চেয়ে কাছের তারিখটাকেই বেছে নিলেন সকলে।

‘সেদিন খুব হেসেছিলি, মিসেস ম্যাঙ্গো শুনে।’ মনুকে বলেই অতিথিদের দিকে ফিরল শশী, ‘এই শোন তোমরা সবাই আজ থেকে মনুকে মিসেস ম্যাঙ্গো বলে ডাকবে।’ কৌতূহলী জনতার মাঝখানে ‘মিসেস ম্যাঙ্গো’র রহস্য উন্মোচন করলেন শশী। হাস্যবদনা নববধূকে দেখে যাদের কপালে ভাঁজ পড়েছিল, তারা সবাই হেসে ফেলল। ‘হা হা’, ‘হি হি’, ‘খ্যাক খ্যাক’, ‘ফিক ফিক’ ‘হো হো’ এমন নানাবিধ ধ্বনির মাঝে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে সকলের মধ্যে মিশে গেল মনু। অনেকটা যেমন দুধের মধ্যে আম মিশে যায়।

                                                                                                                  -০-