Rohon-Da

রবিঠাকুরের ফেসবুক

রোহণ কুদ্দুস

শঙ্কুর ইমেল

 

প্রিয় প্রবীরেন্দ্রবাবু,

আশা করি আমায় ভুলে যাননি। বছর কুড়ি আগে আপনার রবিঠাকুর সম্পর্কিত একটি ব্লগপোস্ট পড়ে আমি একটা পরীক্ষায় হাত দিই এবং সেই সূত্রে আপনার সঙ্গেও দেখা হয়েছিল একবার। আজ সেই পরীক্ষার ফলাফল আমার সামনে। পরীক্ষাটি বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সফল হয়েছে কতটা জানি না, ব্যক্তি-মানুষ হিসাবে আমি একেবারেই খুশি হতে পারিনি। বর্তমানে আমি প্রায় শয্যাশায়ী, শারীরিক অবস্থা সংকটজনক। সত্যি বলতে কী, এ যাত্রা আর পরিত্রাণের উপায়ও দেখছি না। আপনি যদি কষ্ট করে একবার আমার বাড়ি আসেন, তাহলে আপনার কাছে আমার কনফেশান করে হালকা হই।

          আপনার সম্মতি পাব কি না জানি না, তবে এই মেলেই আমি ইস্তানবুল-কলকাতার একটা রাউন্ড ট্রিপ টিকিট এ্যাটাচ করে দিলাম। আপনি এলে কৃতজ্ঞ থাকব।

শুভেচ্ছায়,

শঙ্কু দ্য থার্ড

মেলটা বার দুই খুঁটিয়ে পড়লেন প্রবীরেন্দ্র। শঙ্কুর কথা তিনি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন। প্রথম দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন ছিলেন। কিন্তু গত দু’ দশক স্বেচ্ছা-নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও গবেষণাপত্র বা সংবাদ পাওয়া যায়নি। বরাবরই অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন, তাই তাঁকে ভুলে যেতে বেশি সময় লাগেনি কারোরই।

কিন্তু শঙ্কু দ্য থার্ড এই ই-মেলে যে পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, সেটার কথা বিলক্ষণ মনে আছে প্রবীরেন্দ্রর। কিন্তু সেই পরীক্ষা সফল হলে এতদিনে সারা পৃথিবীতে সাড়া পড়ে যাওয়া উচিত ছিল। অথচ শঙ্কু কাউকেই সম্ভবত জানাননি এ সম্পর্কে। কেন? কারণটা কি সেটাই, যেটা মেলে লিখেছেন? নিজের পরীক্ষার ফলাফলে তিনি খুশি নন? প্রবীরেন্দ্র নিজে নিজেই যুক্তি সাজানোরর চেষ্টা করেন। শঙ্কু যা নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, তার দুটো ধাপ ছিল। একটা জীববিজ্ঞানের, অন্যটা সমাজবিজ্ঞানের। প্রথম ধাপে সাফল্য পেলেও দ্বিতীয় ধাপের সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে তাঁকে অপেক্ষা করতেই হত। প্রথমটার সাফল্য সম্পর্কে ঢাক পেটালে দ্বিতীয় পরীক্ষাটা, যেটার জন্যেই কিনা এত কাঠখড় পুড়িয়েছেন, সেটা মাঠে মারা যেত। কিন্তু এখন শঙ্কু তাঁকে কি জানাতে চান? আর সবাইকে ছেড়ে তাঁকেই কেন? এই গবেষণার পরিকল্পনাটা তাঁর আলোচনা থেকেই শঙ্কু পেয়েছিলেন বলে?

Story-picমেলের সঙ্গে যে টিকিটটা আছে, সেটা আগামী এক মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। এক মুহূর্ত ভাবলেন প্রবীরেন্দ্র। শঙ্কু রোগশয্যায়, হয়তো খুব বেশি সময় হাতে নেই আর। তার ওপর একটা অদম্য কৌতূহল অস্থির করে তুলছে তাঁকে। ইউনিভার্সিটিতে গোটা দুই ফোন করে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে প্রোফেসর প্রবীরেন্দ্র চ্যাটার্জী এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

 

তর্কটা শুরু হয়েছিল ফেসবুকের ‘বাংলা আড্ডা/ ক্যুইজ’ গ্রুপে। ঐ গ্রুপের সদস্য প্রবীরেন্দ্র চ্যাটার্জী তাঁর ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ ব্লগ থেকে একটা পোস্ট শেয়ার করেছিলেন – ‘রবিঠাকুরের ফেসবুক’। তাঁর লেখার মূল বক্তব্য ছিল, রবিঠাকুর এই সময় জন্মালে সাহিত্যিক কম, সেলেব্রিটি বেশি হতেন। ধরা যাক, ভানুসিংহ পদাবলীর কবিতাগুলো সিরিজ হিসাবে এক এক করে পোস্ট করতে থাকলেন তাঁর টাইমলাইনে। লাইকের ঠেলায় ফেসবুক সার্ভারের জান জেরবার হয়ে যেত। তারপর ধরা যাক, একটা স্ট্যাটাসে লিখলেন – “আজ শরীরটা বিশেষ ভালো ছিল না। বউঠানকে বললাম, বেলের শরবত বানিয়ে দিতে।” চোদ্দো মিনিটে চোদ্দো হাজার লাইক পড়ে যেত। মন্তব্যও কি কম আসত? উপদেশ, টিপ্পনি, শুভেচ্ছা, এমনকী ওবামা বা মমতা ব্যানার্জীর ছবিসহ মেমে – একেবারে জবরজং ব্যাপার হয়ে উঠত ব্যাপারটা। হয়তো রবিঠাকুরের একজন আপ্ত সহায়ককে সারাদিন বসে তাঁর টাইমলাইন সামলাতে হত।

“কিন্তু শুধু পিএ-তে কি কুলিয়ে উঠতে পারতেন?” গ্রুপের আরেক সদস্যা অমৃতরূপা একটা বড় স্মাইলি দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন – “দু-তিনজন সফোকেও রাখতে হত তাঁর টিমে। কখন বলতে কখন এ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে উলটো-পালটা ভিডিও পোস্ট হতে শুরু করে, তার ঠিক আছে?” গ্রুপে যে দু-চারজন সফো ছিলেন, তাঁরা হয়তো লিখতে যাচ্ছিলেন ফেসবুকে হ্যাকিং আটকানো কেন সফোদের কম্মো নয়। কিন্তু তার আগেই চৈতালি লিখলেন, “শেষ বয়সে রবিঠাকুর সত্যিই কি সেলেব্রিটি হয়ে ওঠেননি? গুরুদেব হয়ে গিয়েছিলেন তো।” সেই মন্তব্যের নীচে আবার এক প্রস্থ তর্ক শুরু হল।

একটি চ্যাট ট্রান্সক্রিপ্ট

শঙ্কু দ্য থার্ডঃ গ্রুপে শেয়ার করা লিংক থেকে আপনার ব্লগ পোস্টটা পড়লাম।

প্রবীরেন্দ্র চ্যাটার্জীঃ কেমন লাগল?

শ দ্য থাঃ কেমন লাগল সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, আপনি আমার মাথায় একটা পোকা নাড়িয়ে দিয়েছেন।

প্র চ্যাঃ কীরকম?

শ দ্য থাঃ রবিঠাকুর এখন জন্মালে কেমন হতেন বা তিনি ফেসবুকে থাকলে কী হত, সেসব নিয়ে সবাই চেল্লামেল্লি করছে। কিন্তু যে যার নিজের নিজের কল্পনামাফিক বলে চলেছেন।

প্র চ্যাঃ সেটাই তো স্বাভাবিক। আসল রবিঠাকুর আর আপনি পাবেন কোথায়? হয়তো তিনি ওপর থেকে এই চেঁচামেচি দেখছেন, আর স্বর্গের কোনও ভিলার বারান্দায় বসে শেক্সপিয়ার এবং কিটস-এর সঙ্গে আমাদের সামান্য জ্ঞানগম্যি নিয়ে হাসাহাসি করছেন।

শ দ্য থাঃ কিন্তু ভেবে দেখুন, যদি পাওয়া যেত? যদি রবিঠাকুরকে আজকের এই সময়ে নিয়ে আসা যেত? একটা দারুণ সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট করা যেত কিন্তু।

প্র চ্যাঃ আপনি কি টাইম ট্র্যাভেলের কথা ভাবছেন নাকি মশায়?

শ দ্য থাঃ আরে না, না। আপনার মাথা খারাপ? একটা জলজ্যান্ত মানুষকে দেড়শো বছর উজিয়ে নিয়ে এলে স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়ামের বাপ-পিতেমোর শ্রাদ্ধ হয়ে যাবে। হয়তো একেবারে জন্মক্ষণেই তাঁকে চুরি করে নিয়ে এই সময়ে পালিয়ে এলে ঠাকুরবাড়িতে কেউ তেমন একটা গা করত না। তেরোটার একটা গেল কী রইল, তাতে কী যায় আসে? কিন্তু রবিঠাকুর গায়েব হলে আপনার বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে ভারতের ইতিহাস মায় পৃথিবীর ইতিহাসে যে একটা বড় গর্ত তৈরি হত, তা ব্ল্যাকহোলের মত আমাদের সবাইকে জায়ান্ট সাকারের মত শুষে নিত না?

প্র চ্যাঃ একদম। তা আপনি কী ভাবছেন?

শ দ্য থাঃ দেবজ্যোতি ভটচায্যির নাম শুনেছেন?

প্র চ্যাঃ শোনা শোনা লাগছে। কে বলুন তো?

শ দ্য থাঃ কে জানি না। তবে তাঁর একটা গল্পের বই গত সপ্তায় হাতে এসে পড়েছিল। বইয়ের নাম ঈশ্বরী।

প্র চ্যাঃ নাম শুনিনি।

শ দ্য থাঃ সেটাই স্বাভাবিক, অনামা পাবলিশার। তবে নামী পাবলিশারের বই হলেও যে আমি জানতাম, তা নয়। সাধারণত সাহিত্য পড়ি না। কিন্তু এই বইটা হাতে এসেছে একটু অদ্ভুতভাবে। প্রতিদিন রাতের খাবার শেষ করে একবার ল্যাবে যাওয়া আমার অভ্যাস। গত মঙ্গলবার ঘণ্টাখানেক কাজ করে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে যখন আলো বন্ধ করতে যাব, তখন হঠাৎ চ্যাট করে একটা আওয়াজ হল। যে কোনও চ্যাটই মানুষের কাছে বোধ হয় আকর্ষণীয়, বুঝলেন? তাই ল্যাবে আবার ঢুকে এসে শব্দটা অনুসরণ করে দেখি একটা টিকটিকি সিলিং থেকে খসে পড়েছে একটা পেপারব্যাক বইয়ের ওপর। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে তড়িঘড়ি পালাল। যে মেয়েটি আমার ল্যাব দেখাশোনা করে, সে এনেছিল বোধ হয় বইটা। মনের ভুলে ফেলে রেখে গেছে একটা বেঁটে ফ্রিজারের মাথায়।

প্র চ্যাঃ তা সে বইয়ে কী ছিল?

শ দ্য থাঃ বলছি। আমি শুয়ে পাতা ওলটাতে ওলটাতে ঘুমোই। সাধারণত কোনও বিদেশী জার্নাল বা আমার কোনও ছাত্র-ছাত্রীর জমা দেওয়া থিসিসের ড্রাফট। কিন্তু সেদিন কী মনে করে ঐ গপ্পো বইটাই টেনে নিলাম। সেই কোন ছোটবেলায় স্কুলে বাংলা সাহিত্য পড়েছিলাম। তা এখন কেমন কী লেখা হয় বোঝার জন্যে র‍্যানডামলি ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা গল্পে আটকে গেলাম। গল্পের নাম বাইশে শ্রাবণ। রবিঠাকুরের জীবদ্দশায় গল্পের নায়ক আর নায়িকার মধ্যে একটা সম্পর্ক অঙ্কুরিত হয়। পরে রবিঠাকুরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আবার দুজনের দেখা হয় এবং তাঁদের মধ্যে প্রেম সুদৃঢ় হয়। গল্পটা খুব সুন্দর করে লেখা হয়েছে। এতদিন পর বাংলা সাহিত্য পড়ে চোখে জলও হয়তো আসত। কিন্তু গল্পের মধ্যে একটা বিশেষ ঘটনা পড়ে আমি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ি।

প্র চ্যাঃ রবিঠাকুরের মৃত্যু?

শ দ্য  থাঃ একজ্যাক্টলি। রবিঠাকুরের মরদেহ ছোঁয়ার জন্যে উন্মত্ত জনতা ঠাকুরবাড়ির গেট ভেঙে ঢুকে পড়েছে। এমন ঘটনা আমার জানা ছিল না। এরপর আরও বিশদে জানার জন্যে আমি ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। বাঙালির অসভ্যতার দৃষ্টান্তে আক্ষরিক অর্থেই থ হয়ে গেলাম কয়েকটা লেখা পড়ে। রবিঠাকুরের চুল-দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছিল লোকে। ভাবতে পারেন?

প্র চ্যাঃ হ্যাঁ, পড়েছি এই ঘটনা।

শ দ্য থাঃ আমি তখন থেকেই ভাবছিলাম, যদি ঐ চুল বা দাড়ি কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া যেত।

প্র চ্যাঃ আপনিও?

শ দ্য থাঃ আরে না, না। পুরোটা শুনুন। চুল বা দাড়িতে কী থাকে?

প্র চ্যাঃ ডি এন এ?

শ দ্য থাঃ বিঙ্গো। আমি সেদিন থেকেই এটা ভাবতে শুরু করেছিলাম। রবি ঠাকুরের ডি এন এ থেকে যদি আরেকটা রবিঠাকুর বানানো যায়। কিন্তু তাঁর ক্লোন বানিয়ে করবটা কী? আপনার লেখা পড়ে একটা কারণ পাওয়া গেল। রবিঠাকুর বানিয়ে তাঁকে ফেসবুকে ছেড়ে দেব।

প্র চ্যাঃ কিন্তু আসল জিনিসটাই তো আপনার হাতে নেই। চুল বা দাড়ি।

শ দ্য থাঃ চেষ্টাতে কী না হয়। আমার দাদামশায় ইউনিকর্ণ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছিলেন। আর আমি চেষ্টা করে রবিঠাকুরের চুল-দাড়ি খুঁজে পাব না। কলকাতা কতটাই বা বড়?

নুরুদ্দিনের শিশি

না, কলকাতায় পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেল নুন্টিয়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়েতে হাওড়া থেকে খড়গপুর যাওয়ার পথে পড়ে বাগনান। বাগনানে নেমে অটোরিক্সায় আরও আধ ঘণ্টার রাস্তা নুন্টিয়া।

          খবরটা দিয়েছিল আলতামির। সে নাকি দারুণ কাজের লোক। মহাভারতের বিদুরের মত। ফরমায়েশ করলে চাঁদকেও চৌকো করে আকাশে টাঙিয়ে দিতে পারে। আলতামিরের মাথায় জরির গোল টুপি, নাকের নিচে সরু গোঁফ, গোঁফের নিচে পান খাওয়া ঠোঁট, ঠোঁটের নিচে ছাগল-দাড়ি। পরনে লাল-হলুদ সিল্কের শার্ট আর জংলা ছাপের সিল্ক লুঙ্গি। চিৎপুরের একটা সরু গলিতে দোতলা বাড়ির চিলেকোঠায় তার অফিস। টেবিলের উলটোদিকে একটা গদি-আঁটা চেয়ারে হেলান দিয়ে সে বলেছিল – “আমার নাম আলতামির খিদমদগার। আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন রাণা প্রতাপের বডিগার্ড। রাণা যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর তাঁরা চিতোর থেকে কলকাতায় শিফট করেন।” কানের পাশ থেকে একটা বিড়ি বের করে আঙুলের মাঝে পাকাতে পাকাতে আলতামির শঙ্কুর দিকে সরু চোখে দিকে তাকিয়ে হেসেছিল – “ফরমায়েশ করুন। আপনার কী খিদমত করতে পারি।”

          শঙ্কু কী করে আলতামিরের সন্ধান পেয়েছিলেন, বা আলতামির অমিত পোদ্দারের সে কথা প্রবীরেন্দ্রর কখনও জানা হয়নি। ঘটনাচক্রে তখন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। তাই শঙ্কুর আমন্ত্রণে এবং কিছুটা নিজের কৌতূহলেই প্রবীরেন্দ্র এই সফরে সঙ্গী হয়েছিলেন।


রবিঠাকুরের মরদেহ ছোঁয়ার জন্যে উন্মত্ত জনতা ঠাকুরবাড়ির গেট ভেঙে ঢুকে পড়েছে।  রবিঠাকুরের চুল-দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছিল লোকে। ভাবতে পারেন?আমি সেদিন থেকেই এটা ভাবতে শুরু করেছিলাম। রবি ঠাকুরের ডি এন এ থেকে যদি আরেকটা রবিঠাকুর বানানো যায়। কিন্তু তাঁর ক্লোন বানিয়ে করবটা কী? আপনার লেখা পড়ে একটা কারণ পাওয়া গেল। রবিঠাকুর বানিয়ে তাঁকে ফেসবুকে ছেড়ে দেব।


নুন্টিয়া নেমে আরও মিনিট কুড়ি রিক্সা ভ্যানে যেতে হল। প্রথমে পিচের রাস্তা, শেষ কিছুটা মাটির রাস্তা। কখনও হয়তো লাল সুরকি পড়েছিল কোনও নির্বাচনের আগে। কয়েকটা বর্ষার পরে এখনও সামান্য দাগ থেকে গেছে। প্রবীরেন্দ্র ভাবছিলেন, কলকাতা থেকে প্রায় ষাট-সত্তর কিলোমিটার দূরে এমন একটা মফস্বল এলাকায় কবিগুরুর চুল দাড়ি কত বছর ধরে পড়ে আছে কে জানে। তার থেকেও বড় কথা, এই আলতামির, যাকে দেখলে অনায়াসে লক্ষ্ণৌর বিশেষ এলাকার গোলাপফুল বিক্রেতা মনে হতে পারে, সে কী করে এমন আশ্চর্য একটা জিনিসের খোঁজ পেল এখানে!

“আমরা পৌঁছে গেছি।” আলতামিরের কথায় চটক ভাঙল। কাছে একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে ছিল। খালি গা, হাফপ্যান্ট পরা। তাকে ডেকে আলতামির জিজ্ঞাসা করল – “হ্যাঁ রে কচি, নুরুদ্দিন বাড়ি আছে? ডেকে দে তো একটু।” ছেলেটা একটু সন্দেহের দৃষ্টিতে আলতামিরের দিকে তাকাল। তারপর নাকের সর্দিটা ডান হাতের তেলো দিয়ে মুছে নিয়ে সামনের ছিটেবেড়া একটা বাড়ির দিকে দৌড়াল – “আব্বা-আ-আ-আ।” মিনিটখানেকের মধ্যে দরকচড়া মারা সিড়িঙ্গে একটা লোক বেরিয়ে এল। খালি গা, পরনে একটা ময়লা চেককাটা লুঙ্গি। মুখময় সপ্তাখানেকের খোঁচা-খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি। আলতামিরকে দেখে একগাল হেসে বলল – “স্লামালাইকুম আলতামির ভাই। কাজ হয়ে গেছে।” তারপর কোমরের কাছ থেকে লুঙ্গির ভাঁজ খুলে একটা বাদামি রঙের কাচের শিশি বের করে আলতামিরের হাতে দিল। শিশির মুখে কর্কের ছিপি লাগানো।

আলতামির শিশিটা নিয়ে সেটা শঙ্কুর দিকে বাড়িয়ে দিল। শঙ্কু সন্তর্পণে কাঁধের ঝোলা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর আলতামির জামার ভেতরের পকেট থেকে বেশ কয়েকটা একশো টাকার নোট বের করে আনল। বুড়ো আঙুলের মাথায় থুতু মাখিয়ে তার থেকে গুনে গুনে দশটা নোট নুরুদ্দিনকে দিয়ে বলল, “এই রইল হাজার টাকা। কাজ হয়ে গেলে আরও হাজার দেব। আমার অফিসে এসে নিয়ে যাস।” নুরুদ্দিন বিগলিত হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “ঠিক আছে।” শঙ্কু আলতামিরের দিকে অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “পুরো কাজ মানে? এই শিশিতে কী আছে, তাহলে?” আলতামির তাঁকে টেনে নিয়ে এল রিক্সাভ্যানের দিকে। চালককে বলাই ছিল, সে অপেক্ষা করছিল।

শঙ্কু আরও একবার জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আলতামির ইশারায় চুপ করতে বলল। প্রবীরেন্দ্রর মাথাতে কিছুই ঢুকছিল না। নুরুদ্দিনের মত ওরকম হাভাতে একজন লোকের কাছে রবিঠাকুরের দাড়ি বা গোঁফ বা চুল কী করে এল? আর অর্ধেক কাজের মানেই বা কী? ঐ শিশিতেই বা কী আছে তাহলে?

 আলতামির পুরো রহস্যটা ট্রেনে উঠে ফাঁস করল। সে জানালার ধারে আয়েশ করে বসে খৈনি ডলতে ডলতে বলল, “দেখুন বাবু। এরা হল আমার এজেন্ট। এদের পুরো গল্প বলতে নেই। এদের কাজ প্রবলেম সলভ করা।” জানা গেল, বাদামি শিশিতে রবিঠাকুরের একগোছা চুল আছে। কিন্তু নুরুদ্দিন জানে ওতে বদমাশ একটা জ্বিন ঘুমিয়ে আছে, তাই বোতলের ছিপি খোলা বারণ। শঙ্কু হলেন একজন বড়মাপের সাধক। তিনি ঐ জ্বিনকে নিয়ে আমেরিকা চলে যাবেন। সেখানে জ্বিন পুড়িয়ে সর্ষের তেলে ঢেলে ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হয়। কিন্তু জ্বিন কী করে পোড়ানো হয়, আর তার ছাই কতটা পরিমাণ সর্ষের তেলে মেশাতে হবে, সেটা শুধু শঙ্কুই জানেন। যাই হোক, মাসখানেকের মধ্যেই তাঁর ওষুধ বানানোর কাজ হয়ে যাবে। তখন নুরুদ্দিন বাকি এক হাজার টাকা পাবে।

          মুচকি হেসে আলতামির সামনের দিকে ঝুঁকে বলল, “এবার বুঝলেন বাবু, কেন আপনাকে বলেছিলাম কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরে আসতে? এই দাড়ি আর কমলাতে আপনাকে বিলকুল ফকির-দরবেশ লাগছে।” প্রবীরেন্দ্র এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন, “তা আপনার এই গল্পে আমার ভূমিকাটা কী?” আলতামির হেসে বলল, “আপনার রোল? আপনি আমার এ্যাসিসটেন্ট। নতুন নতুন ট্রেনিং নিচ্ছেন।” প্রবীরেন্দ্র কিছু বলার আগেই শঙ্কু এবার মুখ খুললেন, “কিন্তু আলতামির, নুরুদ্দিনের হাতে এই শিশিটা এল কী করে?” আলতামির এদিক ওদিক দেখে নিল সতর্ক দৃষ্টিতে। রবিবারের ট্রেন, যাত্রীরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে। আলতামির তাও গলা নামিয়ে বলল, “মালটা ছিল বাগবাজারের এক পার্টির কাছে। বছরখানেক আগে একবার সওদা করার চেষ্টা করেছিল। পুরো এক লাখ চেয়েছিল। কিন্তু অত টাকায় কে রাজি হবে বলুন। আমি তাই আপনার জন্যে নাইন্টি পারসেন্ট ডিসকাউন্টে করিয়ে দিলাম। নুরুদ্দিনকে বাড়ি দেখিয়ে দিলাম।”

          “মানে? তুমি চুরি করেছ জিনিসটা?” শঙ্কুর গলায় একরাশ বিস্ময়। “আমায় জানালে পুরো টাকাটাই দিয়ে দিতাম। তুমিই বললে, হাজার দশেক লাগবে।” প্রবীরেন্দ্র নিশ্চিত জানেন, ঐ শিশির মধ্যে যা আছে, আর তা দিয়ে শঙ্কু যা করতে চাইছেন, তার জন্যে তিনি এক লাখ টাকা খরচ করতে পিছপা হতেন না। আলতামির একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজের দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি কী করে জানব বাবু, কয়েক গাছি চুল কিনতে আপনি লাখ টাকা ফেলে দেবেন।” তারপর ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে বলল, “বাঙ্গালিরা একটু অদ্ভুতই আছে সবসময়।”


দেখুন বাবু, এরা হল আমার এজেন্ট। এদের পুরো গল্প বলতে নেই। এদের কাজ প্রবলেম সলভ করা।” জানা গেল, বাদামি শিশিতে রবিঠাকুরের একগোছা চুল আছে। কিন্তু নুরুদ্দিন জানে ওতে বদমাশ একটা জ্বিন ঘুমিয়ে আছে, তাই বোতলের ছিপি খোলা বারণ। শঙ্কু হলেন একজন বড়মাপের সাধক। তিনি ঐ জ্বিনকে নিয়ে আমেরিকা চলে যাবেন। সেখানে জ্বিন পুড়িয়ে সর্ষের তেলে ঢেলে ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হয়।


“কিন্তু যদি পুলিশ কেস হয়?” শঙ্কু নিজের ভয় চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারছেন না। আলতামির হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করল। “চিন্তা করবেন না। নুরুদ্দিনকে ঐ জন্যেই ইস্তেমাল করেছি। ও লোকাল নয়। পার্টি পুলিশের কাছে গেলেও কিচ্ছু হবে না।”

শঙ্কু দ্য থার্ড

শঙ্কু নামটা উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে টাকমাথা চশমা চোখের দাড়িওয়ালা যে বিজ্ঞানীর চেহারা মাথায় আসে, ইনি তেমনটি নন। যদিও সম্পর্কে ইনি ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর নাতি, তবু যদ্দূর মনে পড়ে দাড়ি আর বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ ছাড়া বিখ্যাত সেই বিজ্ঞানীর সঙ্গে এই মানুষটির আর কিছু মিল আপাতদৃষ্টিতে ধরা যেত না। সবমিলিয়ে তাঁর চেহারায় একটা সুশৃঙ্খল পরিপাট্য ছিল, যেটা সম্ভ্রম আদায় করে নিত। কিন্তু ডাইনিং টেবিলের অন্যদিকে প্রবীরেন্দ্রর সামনে এখন যে বৃদ্ধ মানুষটি হুইলচেয়ারে বসে আছেন, তাঁর চুল অযত্নে কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখের লম্বা দাড়িও অবিন্যস্ত। যদিও চোখ দুটো এখনও জ্বলজ্বল করছে। প্রবীরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন – “রাস্তায় কোনও সমস্যা হয়নি তো?”

          প্রবীরেন্দ্র এয়ারপোর্টের বাইরে এসেই দেখেছিলেন, তাঁর নাম লেখা বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বছর কুড়ির এক ছোকরা। তার দিকে এগিয়ে যেতেই একগাল হেসে বলল, “আসুন স্যর। আমার নাম ভানু। শঙ্কুবাবু আপনাকে রিসিভ করতে পাঠিয়েছেন।” ছেলেটাকে দেখে ঠিক ড্রাইভার শ্রেণির মনে হয় না। পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তায় ঝকঝকে সে। নিজের মনেই বকবক করছিল। প্রবীরেন্দ্র প্রথম প্রথম খবরের কাগজে মুখ লোকানোর চেষ্টা করলেও, একই খবরের চর্বিতচর্বণে বিরক্ত হয়ে ভানুর গল্পেই যোগ দিলেন। জানা গেল, ছোটবেলায় তার বাবা-মা মারা যায়, এক মাসির বাড়ি থাকত। ঘটনাচক্রে তার মাসি ছিল শঙ্কুর পরিচারিকা। মাসির সঙ্গে সারাদিন প্রায় শঙ্কুর বাড়িতেই সময় কাটাত সে। পরে তাঁর সাহায্যেই সে স্কুলে ভর্তি হয়, লেখাপড়া শেখে। এখন বি এ পাস করে, টিউশানি পড়ায় কয়েকটা। দরকারে শঙ্কুর ফাইফরমাস খাটে। তাই ঐ বাড়িতেই তার খাওয়াদাওয়া, রাতে থাকা।

একজন পরিচারক এসে খাবার দিয়ে গেল। শঙ্কু ডাক দিলেন, “প্রহ্লাদ, সেই করমচার আচারটা দিয়ে যেও। প্রবীরেন্দ্র পছন্দ করেন।” তারপর প্রবীরেন্দ্রর বিস্মিত মুখ দেখে সাফাই দিলেন – “আপনার ব্লগে পড়েছি।” প্রবীরেন্দ্র মাথা নাড়লেন – “আমি সেজন্যে অবাক হইনি। প্রহ্লাদ?” শঙ্কু এবার গলা খুলে হাসলেন – “আমি যেমন শঙ্কু দ্য থার্ড। ও তেমন প্রহ্লাদ দ্য সেকেন্ড।” তারপর ভাতের ওপর কিছুটা মুগডাল ঢেলে বললেন – “সে এক মজার গল্প।”

          “দাদামশায়ের নিরুদ্দেশ হবার পর ওঁর গিরিডির বাড়িতে যাই আমি। আমার বাবা ব্যবসার কাজে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতেন। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ বিশেষ ছিল না। তাই দাদামশায়ের সঙ্গে তাঁর বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। তবে বাবার অর্থের জোরেই আমি স্বাধীন গবেষণা চালিয়ে এসেছি এতদিন, কোনও কর্পোরেটের সামনে মাথা ঝোঁকাতে হয়নি। তা যা বলছিলাম, দাদামশাইয়ের ল্যাব থেকে তাঁর আবিষ্কারের কিছু নমুনা পাব ভেবেছিলাম। স্বার্থপর মানুষের হাত এড়িয়ে একের পর এক সব অবিস্মরণীয় জিনিস তিনি তৈরি করেছিলেন। আর কিছু না হোক, শুধু মিরাকিউরাল বা ওমনিস্কোপের মত দু-তিনটে জিনিস পেলেই চলত। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি সব ভোঁ-ভাঁ। যাতে তাঁর গবেষণা অপাত্রে না পড়ে, তাই মঙ্গলগ্রহে রওনা দেওয়ার আগেই তাঁর ল্যাবের যাবতীয় সরঞ্জাম হয় নষ্ট করে ফেলেছিলেন। নাহলে কোথাও লুকিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র প্রতিবেশীর বাড়িতে খোঁজ করার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, বাড়ি তালাবন্ধ। কোথাও বেড়াতে গেছিলেন হয়তো। অগত্যা দাদামশায়ের বাড়ি ঘুরে ঘুরে তাঁর একগাদা ডায়েরি পেয়েছিলাম, যেগুলো আমার এক লেখক-বন্ধুকে ধার দিয়েছিলাম। সেসব গল্প তো তোমরা পড়েইছ পরে। আর ডায়েরি ছাড়া পেয়েছিলাম একটা চিরুনি।”

          প্রবীরেন্দ্র খেতে খেতে এতক্ষণ শঙ্কুর কথা শুনছিলেন। প্রহ্লাদ একটা চিনেমাটির বাটিতে খানিকটা আচার দিয়ে গেল। সেটা থেকে কিছুটা আচার তুলে নিয়ে আবার শঙ্কুর কথায় মনোনিবেশ করলেন।

          “চিরুনিটাতে সামান্য কয়েকটা পাকা চুল লেগেছিল। নিশ্চয় দাদামশায়ের। আমি সেটা নিয়ে ফিরে এলাম কলকাতায়। তারপর…” তরকারির বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললেন, “কী ঘটেছিল আন্দাজ করুন তো।” প্রবীরেন্দ্র সেকেন্ড দশেক চিন্তা করে বলতে শুরু করলেন – “আপনি ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ক্লোন বানাতে চেয়েছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে সেই ডি এন এ, মানে চুলগুলো ছিল প্রহ্লাদের।” শঙ্কু আমোদে মাথা নাড়তে শুরু করলেন – “ফুলমার্কস। আমার তখন বছর তিরিশ বয়স। সেই থেকে এই প্রহ্লাদ আমার বাড়িতে।” তরকারি মেখে কিছুটা ভাত মুখে দিয়ে বললেন, “ছোকরা রান্নাটা অপূর্ব করে।”

          প্রবীরেন্দ্র খাওয়া থামিয়ে শঙ্কুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “সেই জন্যেই, রবিঠাকুরের চুল-দাড়ির কথা পড়ে আপনার মাথায় আবার রবি ঠাকুরের ক্লোন বানানোর ইচ্ছা হয়েছিল?” শঙ্কু উত্তর না দিয়ে মাথা নাড়লেন। “বানিয়েছিলেন?” প্রবীরেন্দ্র উৎকণ্ঠা ধরে রাখতে পারছিলেন না। শঙ্কু উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে খেতে লাগলেন।

শেষ অনুরোধ

খাওয়ার পর শঙ্কু প্রবীরেন্দ্রকে নিয়ে নিজের ল্যাবে ঢুকলেন। শেষ আধঘণ্টা মূলত দুটো প্রশ্ন নিয়ে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করেছেন প্রবীরেন্দ্র। শঙ্কু কি রবি ঠাকুরের ক্লোন বানিয়েছিলেন? বানিয়ে থাকলে সেই ক্লোন কোথায়? কিন্তু শঙ্কুকে জিজ্ঞাসা করেও জবাব না পেয়ে অপেক্ষায় আছেন। যিনি কয়েক হাজার কিলোমিটার উড়িয়ে এনেছেন, তিনিই নিশ্চয় সঠিক সময়ে সব উত্তর দেবেন।

          “এই যে, এইটা প্রহ্লাদের জেনেসিস চেম্বার।” একটা বড়সড় ফুটবল আকারের গোলকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন শঙ্কু। কাচের একটা গ্লোব থেকে বেশ কিছু তার-ইলেক্ট্রোড যোগ করা। তারপর চাকা গড়িয়ে হুইলচেয়ারটা আর একটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ওরকমই আরেকটা কাচের গোলকের দিকে তাকিয়ে বললেন – “আর এটা ছিল রবিঠাকুরের।” প্রবীরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বললেন, “তিরিশ বছর পরে আবার আমি ভুল করেছিলাম।” গোলকের পাশের টেবিলে একটা শিশির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটার কথা আশা করি ভুলে যাননি।” না, প্রবীরেন্দ্র ভোলেননি। নুরুদ্দিনের বাড়ি গিয়ে এই কর্ক-আঁটা বাদামি রঙের শিশিটাই এনেছিলেন শঙ্কু।

          “আমি জানি না, ওতে সত্যিই রবিঠাকুরের চুল ছিল কিনা। কিন্তু সেটা যাচাই করার কোনও উপায়ও ছিল না।” তারপর শঙ্কু মাথা নাড়লেন, “কিন্তু যে জন্ম নিল, তার সঙ্গে রবিঠাকুরের দূরতম কোনও মিল নেই। স্কুলে দারুণ সাধারণ রেজাল্ট করত। চারপাশে নানা বিষয়ের বই ছড়িয়ে রাখতাম। সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন – কিন্তু কোনওটাতেই সে হাত দিত না। কম্পিউটার গেমস, কমিক্স – ওই সময়ের আর পাঁচটা বাচ্চার মতই বেড়ে উঠল সে। আলাদা কিচ্ছু না। শুধু ওকে অবজার্ভ করতেই আমি দিনের পর দিন আর সব কাজ সরিয়ে রাখলাম। কিন্তু কোনও কিছু আলাদা ব্যাপার ঘটল না। একটা অতিসাধারণ মানুষ তৈরি হল। এখন কলেজ শেষ করে টিউশানি পড়াচ্ছে এ-বাড়ি ও-বাড়ি।”

          “ভানু!” অজান্তেই প্রবীরেন্দ্রর মুখ থেকে বেরিয়ে এল। শঙ্কু তাঁর দিকে তাকিয়ে মিনতির স্বরে বললেন, “ও যেন না জানে। যখন দেখলাম ওর থেকে আলাদা কিছু পাচ্ছি না। তখন শেষে একদিন ওর ছোটবেলার কিছু স্মৃতি প্রোগ্রামিং করে একটু অল্টার করে দিয়েছি।”

          “কিন্তু এটা ভুল প্রোফেসর।” প্রবীরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, “মানুষের জীবন আপনার গবেষণার বিষয় হতে পারে। কিন্তু তার স্মৃতি…” শঙ্কু ঘাড় নেড়ে বললেন, “এই অপরাধেই তো শেষ হয়ে যাচ্ছি। একটা পাপবোধ আমায় কুরে কুরে খাচ্ছে। হয়তো আমাদের একটা করেই ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু থাকা উচিত। একটা করেই রবি ঠাকুর। ঈশ্বর সাজার দম্ভে এই সহজ সত্যি ভুলে গেছিলাম আমি।”

          শঙ্কুর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রবীরেন্দ্র বুঝলেন, তাঁর এই অনুশোচনা কেবল অভিনয় নয়, সত্যিই যন্ত্রণায় আছেন এই বৃদ্ধ। তাই গলাটা যথাসম্ভব শান্ত করে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমায় শুধু এই জন্যেই ডেকে এনেছেন এখানে?”

          শঙ্কু একটা চেয়ার টেনে নিতে ইশারা করলেন – “বসুন।” প্রবীরেন্দ্র বসার পরে তাঁর হাতদুটো ধরে বললেন, “এটা একজন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের অনুরোধ। না কোরো না তুমি।” শঙ্কুর চোখ দুটো জলে ভরে এসেছে। “আমি চাই ভানুকে তুমি নিজের সঙ্গে নিয়ে যাও। ওর রহস্য আমি ছাড়া এ পৃথিবীতে আর একজনই জানে। আমি চাই আমার অবর্তমানে তার কাছেই থাকুক ও।” প্রবীরেন্দ্র হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন – “তা কী করে হয়? ও এখানে থাকলে কি অসুবিধা?” একটু থেমে যোগ করলেন, “আমাকে বা আপনাকে ওর আদৌ দরকার আছে কি? ও একজন স্বাবলম্বী মানুষ এখন।” শঙ্কু অনুনয়ের সুরে বললেন, “ওর ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট সব তৈরি করিয়ে রেখেছি আমি। তোমার কোনও অসুবিধা হবে না। ওর ভরণপোষণের অর্থ সব আমি দেব। আমার অবর্তমানেও…”

          প্রবীরেন্দ্র এবার একটু কড়া গলায় বললেন, “ভানু একজন সাধারণ মানুষ। আমি জানি না ওর ডিএনএ-র মধ্যে রবিঠাকুর আছেন কি নেই। কিন্তু ওকে আপনার এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট হিসাবে ভাবা বন্ধ করুন।” চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে যোগ করলেন – “ওকে নিজের মত বাঁচতে দিন। ওর ছোটবেলার স্মৃতি বদলে আপনি মানুষ হিসাবে দারুণ জঘন্য একটা কাজ করেছেন। সেই তালিকায় আর নতুন কিছু যোগ করবেন না। প্লিজ।”

স্থির ছিল, প্রবীরেন্দ্র সেই রাতটা শঙ্কুর বাড়ি কাটিয়ে পরেরদিন ইস্তানবুল ফিরে যাবেন। সারাদিনের যাত্রার ধকলে প্রবীরেন্দ্র ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বিকেলের পরে। হঠাৎ দরজায় ঘা পড়ল। বাইরে থেকে কে যেন ডাকছে। “স্যর, স্যর, দরজা খুলুন।” ভানু। প্রবীরেন্দ্র জানালার বাইরে তাকালেন, অন্ধকার। দেওয়াল ঘড়িতে দেখলেন নটা পঞ্চান্ন। এতক্ষণ ঘুমিয়েছেন তিনি! দরজায় আবার অসহিষ্ণু ঘা পড়ল কয়েকটা।

          দরজা খুলে প্রবীরেন্দ্র হকচকিয়ে গেলেন। ভানু হাউমাউ করে কাঁদছে – “শঙ্কুবাবু আর নেই স্যর। একটু আগেই…” বুঝতে একটু সময় লাগল। প্রবীরেন্দ্র ল্যাব থেকে ফিরে আসার পর শঙ্কুও নিজের ঘরে ফিরে যান বিশ্রাম নিতে। রাত সাড়ে নটা নাগাদ তিনি প্রথমে প্রহ্লাদকে ডাকেন, তারপর ভানুকে। বুকে হাত দিয়ে দেখাতে চাইছিলেন, কষ্ট হচ্ছে। তারপর ডাক্তার এসে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ।

ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত প্রবীরেন্দ্র ধীরে ধীরে গিয়ে হাজির হলেন শঙ্কুর শোওয়ার ঘরে। একজন অপরিচিত ভদ্রলোক মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন, বোধ হয় ডাক্তার। ‘পোস্টমর্টেম’, ‘হাই ডোজ’, ‘হার্ট-এ্যাটাক’ – টুকরো টুকরো কিছু কথা শোনা গেল। আরেকটু এগিয়ে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পাশের ছোট টেবিলে দু-তিনটে বই আর পত্রিকার মাঝে একটা হলুদ খাম চোখে পড়ল তাঁর। ওপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা – ‘প্রোফেসর প্রবীরেন্দ্র চ্যাটার্জি’। লেফাফাটা হাতে তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে নিজের ঘরে ফিরে এলেন প্রবীরেন্দ্র।

প্রিয় প্রবীরেন্দ্রবাবু,

          মানুষের হৃদয়ের গতি-প্রকৃতি বড়ই রহস্যময়। জানি, আমার আমন্ত্রণ না এড়াতে পেরে আপনি আসবেনই আমার বাড়ি। তাই আগে থেকেই এই চিঠিটা লিখে রেখে যাচ্ছি। সাক্ষাতে আমার শেষ অনুরোধটা তুমি না রাখলে, এটার দরকার পড়বে।

 

যে কথাটা আমি কখনওই তোমায় বলতে পারব না, সেটা খুব কঠিন সত্যি। ভানুর মধ্যে শুধু রবিঠাকুরের ডি এন এ আছে তা নয়। ও আমারও অংশ। ভেবেছিলাম, ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর বংশধর আর রবিঠাকুরের সব গুণ নিয়ে একজন জিনিয়াস জন্ম নেবে। আমি এ পর্যন্ত ভানুকে পুত্র হিসাবেই জ্ঞান করেছি। তার বেড়ে ওঠার প্রতিটা মুহূর্ত পরম যত্নে আমি সাজিয়ে রেখেছি। আমি খুব কাছ থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা ঘণ্টা লগ করে রেখেছি আমার ল্যাবের সার্ভারের হার্ড ডিস্কে। আপনি বলবেন, এ কাজ একজন গবেষকের। আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে পেরেছি, এ মমতা একজন পিতারও।

কিন্তু আমি বৃদ্ধ হয়েছি। ধৈর্য হারিয়েছি, হয়তো মানসিক স্থিরতাও। তাই অপরিসীম সম্ভাবনাময় উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মানোর পরেও নিজের সন্তানকে খুব সাধারণ একজন মানুষ হয়ে উঠতে দেখে তার প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। তার স্মৃতি ধ্বংস করতে তৎপর হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপরেও তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারিনি। আমি এ পৃথিবীতে খুব বেশি মানুষকে চিনি না। জানি না, আমি চলে যাওয়ার পর ভানু কেমন থাকবে, কীভাবে থাকবে। তাই আপনার হাতে আমার জিনের উত্তরাধিকারীকে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই। আপনি ওকে কাছে রাখলে আমি জানব, আমার পুত্র কুশলে আছে।

ভানুর জন্মের অন্যতম কারণ হিসাবে আমি আপনার কাছে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকব।

 

শুভেচ্ছায়,

শঙ্কু দ্য থার্ড

শুরুর কবিতা

সিকিউরিটি চেকের সময় ভানুর হ্যান্ডব্যাগ থেকে বেশ কিছু জিনিস বের করে দেখাতে হয়েছিল। তার মধ্যে পেনসিল কাটার একটা ছুরি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এসব ঝামেলা মিটে যাবার পরে প্রবীরেন্দ্রর পাশের চেয়ারে বসে ভানু তার ব্যাগ আবার গুছিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ একটা বাঁধানো খাতা পায়ের কাছে পড়ল। প্রবীরেন্দ্র সেটা তুলে নিয়ে একটু চমকে উঠলেন। খোলা পাতায় পেনসিলে একটা কবিতা লেখা। ভানু তার জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। প্রবীরেন্দ্র পাতা ওলটাতে থাকলেন। পাতার পর পাতা কবিতা। নিচে তারিখ বসানো।

          “আমার কবিতার খাতা।” ভানু সলজ্জ হাসিতে কৈফিয়ত দিল। প্রবীরেন্দ্র অপ্রস্তুত হয়ে খাতাটা ফেরত দিলেন – “আসলে পড়ে গিয়েছিল… তাই তোলার সময়… খুলে গিয়েছিল আর কী।” স্বভাবসিদ্ধ ভদ্রতায় তিনি অজুহাত খাড়া করতে চান। তারপর গলা ঝেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “তুমি কবে থেকে কবিতা লেখো?” ভানু অপরাধীর মত মাথা নীচু করে বলল, “গত বছর আমার একটা এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। কিছুই মনে নেই বিশেষ। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন আমি হসপিটালে। ভর্তি ছিলাম মাসখানেক। তখনই আস্তে আস্তে লেখা শুরু করি।” তারপর পাতা উলটে খুব আগ্রহ নিয়ে প্রবীরেন্দ্রকে দেখাল – “এইটা প্রথম লিখেছিলাম। হাসপাতালের পাশের বাড়ির ডিস এ্যান্টেনায় একটা কাক বসেছিল, সেটাকে নিয়ে।”

          পাতাটায় চোখ বোলাতে বোলাতে প্রবীরেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, ইয়ে… শঙ্কু জানতেন, তুমি কবিতা লেখো?” ভানু ঘাড় নাড়ল – “শঙ্কুবাবু ব্যস্ত মানুষ, ওনাকে এসব দেখিয়ে বিরক্ত করার ঠিক সাহস… আপনি ছাড়া আর কেউ দেখেনি।” প্রবীরেন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানওয়ের দিকে চোখ ফেরালেন। একটা বিমান এসে নামল, মিনিটখানেকের মধ্যে একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তার পূর্বনির্ধারিত জায়গায়। পরক্ষণেই তার পাশের লেন থেকে একটা বিমান তীব্রগতিতে ছুটে গিয়ে শূন্যে ডানা মেলল।

প্রবীরেন্দ্র উজ্জ্বলমুখে ভানুর দিকে তাকালেন – “তুমি যদি আরও অনেক মানুষকে তোমার কবিতা পড়াতে চাও, তাহলে ফেসবুকে এই কবিতাগুলো এক এক করে পোস্ট করতে পারো।” ভানু একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলল, “কিন্তু ফেসবুক আমার ভালো লাগে না খুব একটা।” প্রবীরেন্দ্র তার কাঁধে একটা হাত রেখে সামান্য চাপ দিলেন, “কবিতাগুলো পোস্ট করতে থাকো। দেখবে আস্তে আস্তে ভালো লাগছে।”

আহ! এই দিনটা দেখার জন্যে শঙ্কু যদি বেঁচে থাকতেন। প্রবীরেন্দ্র পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফেসবুকে আপডেট দিলেন – ‘ফিলিং গড…’ এক মুহূর্ত থেমে মুচকি হেসে সামান্য অঙ্গুলিহেলন করলেন স্ক্রিনের ওপর, শেষে যোগ হল – ‘ফাদার’।