কথার পিঠে উঠে আসে কথা৷ কথাই দিয়ে যায় নতুন কথকতার হদিস৷ ‘ছেঁড়া ঘুড়ি, রঙিন বল’ও স্মৃতির মহাফেজখানা থেকে সুতোয় Souvik-Bandopadhayজড়িয়ে টেনে আনছে নানা কথা৷ অতীত মানে নস্ট্যালজিয়া৷ অতীত মানে মনখারাপের ভালোলাগা৷ তবে শুধুই কি ভালো? সবই কি ভালো? এমন কিছু অভ্যাস,রেওয়াজ, রীতিনীতি চালু ছিল যার কুপ্রভাব থেকে আজকের দিনও মুক্ত নয়৷ অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে সে কথাও উঠে আসবে বৈকি৷ লিখলেন শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সেই যে মেলার কথা লিখতে লিখতে দুর্গা-দশমীর কথা এসে গেল গত পর্বে, সেই প্রসঙ্গে একটা অন্য জগতের কথা মনে এল। বলি…

 এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয় সব সত্যি সব সত্যি… এই গান কে না জানে। কথা বা সুর তো অনন্য প্রতিভাধর সলিল চৌধুরির। সঙ্গে অভিনয়! ছবি বিশ্বাসের মারাত্মক স্ক্রিন প্রেজেন্স। মাল টেনে টাল একদম।

 এমন বন্ধু আর কে আছে, তোমার মতো সিস্টার… ইনিও বড় কম যান না। অনিল চট্টোপাধ্যায়। সমসাময়িকদের মধ্যে একটু ইচ্ছাকৃত লো প্রোফাইল মেনটেন করে যাওয়া, রোববারে রোববারে রেস্টুরেন্টে গিয়ে জমিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আবার রুপোলি পর্দায় ঝড় তোলা। এই গানেতেও মান্না-হেমন্ত-গৌরীপ্রসন্ন কি জাদুই না দেখিয়েছিলেন, আহ্‌।

 বিপিনবাবুর কারণ সুধা মেটায় জ্বালা মেটায় ক্ষুধা… উত্তমকুমার তখন আর ছিপছিপে নেই, চোয়ালের দার্ঢ্য কমেছে। তবু তিনি উত্তমকুমার! বহুদিনের বন্ধু শ্যামল মিত্র আর কিশোরকুমারের যুগলবন্দী, কথায় এখানেও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তখনকার বোম্বাইয়ে শক্তি সামন্ত হিট মসালা সিনেমা বানাতে ওস্তাদ।

 কী নিয়ে বলতে চাইছি তাহলে? না, সিনেমা নয়, মদ্যপান। আটের নয়ের দশকের মধ্যবিত্ত বাঙালির মদ্যপান। সে ট্যাবুর ধার অনেক কমেছে। বাঙালি পুরুষ এখন বারে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে পান করে। বাড়িতে নিয়ে এসেও চালিয়ে দেয় ঢুকুঢুকু। বউকে সে সাথী হিসেবে পেয়ে যায় আজ। তিনিও গলা ভিজিয়ে নেন এক-দু’ পেগে, কিম্বা হালকা নরম কোনও পানীয় নিয়ে বসেন পাশে, সঙ্গত দেন। ইচ্ছা হলে ভেজে আনেন ফিঙ্গার চিপস বা মোরগা-কলিজা। শুরুর আগে একটি ডিশে দুজনে মিলে কুঁচিয়ে সাজিয়ে নিলেন হয়তো শসা, পেঁয়াজ, টমেটো, গাজর, কাঁচালঙ্কা। স্যালাড, না না, সালাদ।

Chobi-Biswas
মাতাল ছবি বিশ্বাস, এও সত্যি৷

 এমন ছিল না বিলকুল। মদের সঙ্গে আমজনতার চরিত্রের একটা খুব ঘন যোগ ছিল তখন। জিভে পড়লে মদ, চরিত্রও হড়াস করে পড়ে যেত অনেক নীচে। গুরুজন লঘুজন বন্ধুজন স্ত্রী-সন্তানাদি সকলের চোখেমুখে ফুটে উঠত এক দিগবিদিক পরিমাণ ঘৃণা। ছাড় ছিল বছরের একটি দিন। দুর্গা-দশমী। মদ সেভাবে ব্যাপক অনুমোদন পেত না, তবে সিদ্ধি বা ভাং চলত, বাবার প্রসাদ বলে কথা! কোনও বাড়িতে আঙুলের ডগায় এক চিমটি নিয়ে জিভে ফেলা, আবার কোনও বাড়িতে সকলে মিলে শরবত বানিয়ে এক গেলাস করে, ব্যস। এতে সারা বছরের তৃষ্ণা মেটে? তিন রকম উত্তর –

ক) মিটত অনেকের

খ) না মিটলেও অনেকের গণ্ডি পেরনোর সাহস বা বাসনা থাকত না

গ) পড়ে থাকত কিছু, রসিক যারা, আসুন তাদের কথাই বলি

সিনেমা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। ঘোর বাস্তবে যাবার আগে আরেকটু সিনেমা হোক। ‘গল্প হলেও সত্যি’-র সেই বড় খোকা। আপিসের কেরাণি। অনুমান, সওদাগরি আপিস। তিনি দেশি মদের একটা ছোট ফাইল নিয়ে আসেন চেপেচুপে। বাড়ি ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে গামছাটা জড়িয়ে ঘরের মধ্যে চেয়ার টেবিলে বসে একটু ঢুকুঢুকু করে নেন। তাঁর স্ত্রী জানেন। ভাইয়েরাও জানেন। কিন্তু বাড়ির বুড়ো কর্তাকে বাদ দিলে ইনিই বড় সবার। তাই সেই সময়টা তাঁর সামনে কেউ যান না। ওটুকু স্বাধীনতা সংসার দিয়েছে তাঁকে। তিনিও সকলের সামনে নয়, পান করেন নির্জনে, ঘেরাটোপের মধ্যে। পরে ঘরের বাইরে এসে অবিশ্যি ভাইপোকে জড়িত গলায় বুঝিয়ে বলেন যে তিনি ভাইপোর বাবার থেকে বড়, ‘তোমার জে-এ-ঠু’। ভাইপোকে তার বাবা ধমকে মাতাল জেঠুর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন।

 এবার আমার দেখা কয়েকটি নমুনা পেশ করা যাক। মনে হয়, অনেকে এমনটাই দেখেছেন, স্থান-কাল-নাম কিঞ্চিৎ বদলাবে, এই যা।

 শিবশম্ভু চক্রবর্তীকে দেখেছিলাম রোজ রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরতে। পা পড়ছে এলোমেলো, টলটল। এক রাতে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেল, কিন্তু পাশের বাড়ির গেট পেরনোর আগেই ধপাস করে পড়েই উঠে দাঁড়াল। চারপাশটা

একটি পেগে..হুঁ হুঁ বাবা..- দীপ জ্বেলে যাই ছবিতে অনিল চট্টোপাধ্যায়
একটি পেগে..হুঁ হুঁ বাবা..- দীপ জ্বেলে যাই ছবিতে অনিল চট্টোপাধ্যায়

খুব সন্দেহ নিয়ে চোখ বোলাতে গেল, কিন্তু চোখ তখন কতটা দেখছে তা চোখই জানে, মস্তিষ্ক নয়। আবার শুরু হল হাঁটা। মোড়ের কাছে গেলেই শুরু হত মজাটা। আড্ডা মারতে মোড়ের বাড়ির রকে যারা বসে গুলতানি করত, তাদের কেউ শুরুটা করেছিল আওয়াজ দেওয়া, জয় শম্ভু। শেয়ালের হুক্কাহুয়ার মতো ছড়িয়ে গেল আড্ডাবাজদের মধ্যে ‘জয়শম্ভু’। শম্ভুর কানেও গেছে। পালিয়ে গেলে পরাজয়, সিনা টান করে এসবের সামনা করতে হয়, ওর দ্রব্যস্থ মস্তিষ্ক ওকে সেই বার্তা দিচ্ছে হিন্দি মিশিয়ে। অতএব ঘুরে দাঁড়িয়ে ও-ও গলা ছাড়ল, ‘জয় শম্ভু’। আগুন লাগতে আর বাকি কীসে? বছর দুয়েকের বেশি চলেছিল, রোজ রাত সাড়ে আটটায়, চলত প্রায় ঘণ্টাখানেকের ওপর। প্রথমে দু’দিক থেকে জয়-শম্ভু, খানিক পরে, আড্ডাবাজরা হাল ছাড়বে ভেবে শুধু ‘হো’ করে আওয়াজ দিলে শিবশম্ভুও ‘হো’ করে উত্তর দেয়। সে পর্বও ক্রমে মিলিয়ে যায়, যেভাবে কিছু গান আগেকার দিনে শেষ হত, শেষ লাইনটা রিপিট, তিন থেকে চারবার, ক্রমে আস্তে, আরও আস্তে…


অধিক রাত্রে তিনি ফিরে এসে বউ নয়, কোলের মেয়ে নয়, কেন যে শ্যালিকার নাম ধরে ডাকতেন সে বোঝার বয়স আমার হয়নি তখনো। প্রথমে শ্যালিকার নাম ধরে, ‘স্বপ্না, এইই স্বপ্না, স্বপ্না, স্বপ্নারে’ – এই ডাক চলত প্রায় পনেরো কুড়ি মিনিট। এরপর দরজায় দুমদাম লাথি, সঙ্গে বাংলার সঙ্গে হিন্দির পাঞ্চ, ‘শালী, ইতনা নিদ, মড়ার ঘুম, ওঠ, খোল দরওয়াজা। আমি অউর কিতনা খাড়া থাকব এখানে। ওঠ শালী’


জয়দেব প্রধান। জিলিপির ওস্তাদ কারিগর। হাত কথা বলে জিলিপির কানে কানে, প্যাঁচে প্যাঁচে। কড়ার ওপর দিয়ে একপাক ঘুরে আলতো কায়দায় ভিতরের বৃত্তে ঢুকে যায়। গলায় গুনগুন গান, নামকীর্তন। গলায় বোষ্টমের কণ্ঠী, কপালে দিব্য চওড়া রসকলি। চুল কানে ঘাড়ে বাবরি হয়ে এসে পড়েছে। যেন কবি জয়দেব, গীতগোবিন্দটাই যা লেখা হল না। তবে ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’ জাতীয় কিছু বলতে চেয়েছিল যাকে, সেই আশ্রমকন্যা যে তলে তলে গুরুর কোলঘেঁষা, গুরুমা-ও ওকে যত্নে সাজিয়ে পতিদেবতার কাছে নিবেদন করে থাকেন প্রায় প্রতি রাতে, এতশত বুঝলে কি আর এমনি এমনি লোকে ওকে কেলানে-জয়দেব বলে? এই হোটেল সেই দোকান ঘুরে এখন মিষ্টির দোকানে দুবেলা জিলিপি। আশ্রমের দিন অনেক দূরের হয়ে গেছে, রয়ে গেছে গলায় গান। ওই গুনগুন। রাতে জিলিপির পাট চুকিয়ে টং হয়ে বাড়ি ফেরা। শিবশম্ভুর মতো সাড়ে আট নয়, অন্তত সাড়ে বারো। রাত নিশুত। শুক্লপক্ষে দেখা যেত, ছোটখাটো রোগা চেহারা, বাঁ কাঁধে একটা কাপড়ের শান্তিনিকেতনী ব্যাগ, ডান হাতে আরেকটা ছাঁট কাপড় দিয়ে বানানো বাজারের ব্যাগ। আর গলায় গান, বিরহ-আকূতিতে মাখামাখি একদম, অনেক দূর থেকে তা কানে আসত, অনেক দূর অবদি যাওয়া পর্যন্ত শোনা যেত। উদাত্ত গলায় গাওয়া নামকীর্তনে নিঝুম চরাচর যেন ভেসে যেত। একটি বউয়ের সঙ্গে থাকে, আসলে বউ নয়। ওই মহিলাটি বাড়ি বাড়ি বাসন মাজা, ঝাড়ু-মোছা, কাপড় কাচার কাজ করত। কোন বাড়ির বড় ছেলে কর্তৃক তার পেট বেঁধে যায়। জয়দেব তখন যে হোটেলে ফাইফরমাশ খাটে সেখানে মেয়েটি রোজ দুপুরে গিয়ে এঁটোকাঁটা, আনাজের খোসা, আবর্জনা ইত্যাদি সাফ করে। সেখানেই আলাপ, ঘনিষ্ঠতা। তারপর যা হয়… সেই বাচ্চার বাবা জয়দেব, সেই মহিলার স্বামী জয়দেব। আর হরির নামে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া সেই আশ্রমের জয়দেব যে কোথায় হারাল?

 আমাদের বাড়ির সামনে একটা বেশ গোছানো রোয়াক ছিল। খোলা, আবার ঠিক খোলা নয়। সামনে করাতের পাঁচিল, আর সার দিয়ে লাগানো বাহারি গাছ এমন এক আড়াল তৈরি করত, যে পথচারী আমাদের দেখতে পেত না সেভাবে, আমরা পেতাম। সেখানেই বিকেল, সেখানেই গ্রীষ্ম সন্ধ্যার অবসর আমাদের। এক বিকেলের কথা। পাড়ার শান্তশিষ্ট শুকদেব দাস, ডাকনামের দেবু, মোড় ঘুরে রাস্তার ধার দিয়ে দিয়ে হেঁটে আসছে, সন্ধে নামবে এবার, হঠাৎ দেখি ড্রেনে নেমে গেল! আরে আরে!! ও মদন, ইনিও তবে… এরপর যখনই দেবুকাকাকে রাস্তায়, বাজারে, পুজোমণ্ডপে দেখেছি, সেই সেই সময় দেবুকাকা বিলকুল স্বচ্ছ-সুন্দর, তবুও আমি কৌতুহল চাপতে পারিনি। হাঁ করে দেখেছি। সে সময়ের মধ্যবিত্ত বাঙালি চোখ আমায় সেভাবেই দেখতে ভাবতে শিখিয়েছিল যে।

 ফিল্ম তথা তারকা জগতের মানুষদের কথা বাদ রাখছি, সাধারণ গেরস্ত মধ্যবিত্ত বাঙালিদের চোখে তারা তো খরচার খাতায়। মদ-মেয়েছেলে-নেশা জলভাত যেন বা ওঁদের। ছাড় ছিল শুধু ডাক্তার আর উকিল-ব্যারিস্টারদের। ওঁরা রাতের বেলা দু’ঢোক খেতেই পারেন, কত্ত কাজের চাপ ওঁদের। যুক্তি পাবেন না, তবে আমজনতার গরিষ্ঠ অংশ এভাবেই ভাবত। সাহিত্যিক কবিদের কথাই ভাবুন না। কলকাতা শাসন করা যুবকেরা, পুলিশকে কবি দেখে টুপি খুলতে বলা, মদের দোকানের সেই ছেলেটাকে ৬/১ রফি আহমেদ কিদোয়াই-এ এখন তত দেখা যায় না কি, লেখায়? সাহিত্যিকদের যাপিত জীবনে বলুন বা লেখায়, রাস্তায় প্রকাশ্যে মাতলামো করা বা তা নিয়ে উচ্চকিত স্বকীয় ঘোষণা, নয়ের দশকের শেষাশেষি থেকে পড়তির পথে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে।

 শেষ করি আমার এক সময়ের পড়শি তিনটি মানুষের কথা বলে।

বিপিন বাবুর কারণ সুধায় ‘অমানুষ’ উত্ত্মকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায় এবার দর্শক৷
বিপিন বাবুর কারণ সুধায় ‘অমানুষ’ উত্ত্মকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায় এবার দর্শক৷

প্রথমজন ট্রাক ড্রাইভার। আমাদের পাড়ায় ভাড়া এল। সঙ্গে বউ, একটা হামা টানা মেয়ে আর শ্যালিকা। ট্রাকবাহনে তিনি প্রায়শই ভিন রাজ্যে চলে যেতেন। টানা দশ-বারোদিন বাইরে কাটিয়ে বাসায় ফিরতেন। এই বাসায় ফেরাটা দিবালোকে হত না কখনোই। অধিক রাত্রে তিনি ফিরে এসে বউ নয়, কোলের মেয়ে নয়, কেন যে শ্যালিকার নাম ধরে ডাকতেন সে বোঝার বয়স আমার হয়নি তখনো। প্রথমে শ্যালিকার নাম ধরে, ‘স্বপ্না, এইই স্বপ্না, স্বপ্না, স্বপ্নারে’ – এই ডাক চলত প্রায় পনেরো কুড়ি মিনিট। এরপর দরজায় দুমদাম লাথি, সঙ্গে বাংলার সঙ্গে হিন্দির পাঞ্চ, ‘শালী, ইতনা নিদ, মড়ার ঘুম, ওঠ, খোল দরওয়াজা। আমি অউর কিতনা খাড়া থাকব এখানে। ওঠ শালী’। কানে কানে খবর হয়েছিল, দরজা খুললেই নাকি সেই শ্যালিকার পেটে দমাদম লাথি মারত ওই মদে চুর ড্রাইভার। কিছুদিন পরেই প্রতিবেশী, ক্রমে ক্লাব, শেষে বাড়িওয়ালার আপত্তিতে ওদের ভাড়া এবং পাড়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। তবে শ্যালিকা, তার পেট, তার নাম ধরে গহন রাতে ডাকাডাকি কীভাবে যেন আমার মাথার মধ্যে ধোঁয়া হয়ে রয়ে গেছে সেই ফাইভ-সিক্স বয়স থেকে।

 দ্বিতীয় পড়শিকে দেখি না আজ কত বছর হয়ে গেল। ভারি অদ্ভূত ছিল এর আচরণ। আলমপুর থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত চলে ৬১ নম্বর রুটের পাবলিক বাস। আলমপুর থেকে ছেড়ে মৌড়িগ্রাম স্টেশন পর্যন্ত এই বাস চলে হেলেদুলে, গদাই লশকরি চালে, তার পর গতিপ্রাপ্ত হয় খানিক। আমার একদা এই পড়শি সন্ধেতে কাজ সেরে গলা পর্যন্ত গিলে, সাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরত রোজ। ওর কারখানা ছিল আলমপুর ছাড়িয়ে প্রায় ধূলাগড়ের কাছে। এইবার পথে সে অন্তত গোটা দুই, কোনওদিন তিনখানা ৬১ নম্বর রুটের বাসকে ওভারটেক করে তবেই বাড়ির গলি রাস্তায় ঢুকে যায়। বাস তো ঢিকির ঢিকির করে এগোচ্ছে, আর সাইকেলে চেপে তাকে হুশ টপকানো কোনও ব্যাপারই নয়। বাস ওভারটেক করেই সে সাইকেল রাস্তার ধারে স্ট্যান্ড করে বাসের ড্রাইভারের দিকে আঙুল উঁচিয়ে চালু করে খিস্তির তোড়। প্রথম কয়েকবার ড্রাইভার কনডাক্টরদের হাতে উত্তম মধ্যম খেয়েও যখন নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকে ও, হাল ছেড়ে দেয় বাকিরা। সে এক্কেবারে কাঁচা, বাপ-মা-বোন উদ্ধার করে দেওয়া কড়া ডোজের সব সুললিত শব্দবন্ধ উগরে দিয়েই সাইকেলে চড়ে বসত, পরের বাসের দিকে ধাওয়া করতে চলে যেত খুব দ্রুততায়।

 এবার তৃতীয়জন। রিকশাওলাদের স্ট্যান্ডের কাছেই চালু হল চুল্লুর ভাটি। এসবের পিছনে প্রশাসন রাজনীতি মিলে মিশে অনেক বড় বড় হাত থাকে শুনি। বড় হাতেদের মধ্যে আরেক বড় হাত ঢুকে গেল। বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র পুত্র, ফুলটু সেজে ভটভট বাইকে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ইতিউতি ঘুরে বেড়ানো বাবুমশায় ক্রমে ওই চুল্লুতে রাতদিন মজল। আর শেষমেশ ভাটির কাছে কোথায় যেন ঘর ভাড়া নিয়ে উঠল একটি বাজারি শস্তার মেয়েমানুষকে নিয়ে। ঘর-সংসার, বিধবা মা, স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে। মা নিল উপযুক্ত পদক্ষেপ। কালবিলম্ব না করে বউমার নামে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিল, একমাত্র ছেলে পেল না কানাকড়িও। এবার টনক নড়ল তার, কিন্তু ততদিনে ওই চোলাই-মায়া তার সব কিছু গ্রাস করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে চড়া রোদের দুপুরে বা শীতের সকালে এক গলা চড়িয়ে একটা আধলা ইট নিয়ে মূর্তিমান চলে আসত। বাড়ির সামনে এসে তড়পাত, ওই আধলা বা ঢিল ছুঁড়ে বাড়িটাকে মারত, মুখ খারাপ করত তারস্বরে। বাড়ির উলটোদিকে বসে থাকত লাল ঘোরালো চোখ পাকিয়ে। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাবার কীর্তি দেখতে হয়তো একবার দোতলার বারান্দায় উঁকি দিল ছোট দুই ছেলের কোনওটি। নেশা-চোখে তাকে ঠাহর করতে পেরে রাস্তা থেকে বাবা হইহই করে পিতৃ-অধিকার ফলাতে শুরু করবার আগেই ছেলেকে তার মা ভিতরে ডেকে নিয়ে গেল চলে। আরও আক্রোশে ফেটে পড়তে চাইত, পারত না, নেশা যে কমে আসছে। কাঁদতে শুরু করে দিত। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশের অনুমতি তার ছিল না।

 অনুমতি সে পেয়েছিল একবার। মা মারা যেতে। কাছা নিয়ে আমাদের বাড়ি এসেছিল। বাবাকে দাদা, মাকে বউদি সম্বোধন করে খুব অনুরোধ করেছিল শ্রাদ্ধের দিন যেতে। আমায় বা আমার দিদিকে দেখে হেসে “কীরে! তোরা কত বড় হয়ে…” ইত্যাদি।

 কিন্তু আমরা খুব মনোযোগী ছিলাম না তার কথায়। আমরা এক মাতালকে খুব সামনে থেকে দেখছিলাম খুঁটিয়ে। অবাক হচ্ছিলাম তার সব স্বাভাবিক কথায়, আচরণে। যেন ভিনগ্রহের এক আজব জীব এসে বসল আমাদের, মানুষের অশৌচ চলাকালীন পোশাকে, বসল নিজস্ব কম্বলের আসন বিছিয়ে। মিষ্টিমুখ করছে।

 আগের পর্ব

ছেঁড়া ঘুড়ি, রঙিন বল