অনন্যা দাশ

এই সময়টায় মনটা বড্ড অন্য রকম হয়ে যায় জয়ার। শিউলির গন্ধ, কাশের দোল খাওয়া বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে দিয়ে যায়। মনে পড়ে যায় সেই তিরিশ বছর আগেকার দিনটার কথা। সেই যখন গ্রামের মেয়ে হতদরিদ্র জয়াকে রোজ দু ক্রোশ দূরের পথ পেরিয়ে স্কুলে যেতে হত। পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছে ছিল জয়ার তাই অতটা কষ্ট করত সে রোজ। আত্মীয় প্রতিবেশী সবাই বাবাকে কেবল বলত, “কী হবে মেয়েকে অত পড়িয়ে? ওর বিয়ে দিয়ে দাও!”

বাবা শুধু হুঁ-হাঁ তে উত্তর দিতেন। বাংলাদেশ থেকে এদেশে পার হয়ে এসে সেই যে বিছানা নিয়েছিলেন আর কিছু করে উঠতে পারেননি শুধু তিনটে ছেলেমেয়েকে জন্ম দেওয়া ছাড়া। মা-ই সংসারের ঘানি টানতেন। ক্লাস ইলেভেনে পড়ছে তখন জয়া। বিজ্ঞান পড়ার মতন সাধ্যি তার ছিল না। কোনমতে আর্টস নিয়ে পড়ছিল, তাও বই কেনার ক্ষমতা ছিল না। সেই তখনই ওদের ক্লাসে শহর থেকে পড়তে এল আদিত্য। ওর বাবার বদলি হয়েছিলেন গ্রামের ব্যাঙ্কে তাই সে এসেছিল। সে ছিল বিজ্ঞানের ছাত্র। নামের মতনই দ্যুতি তার। সব কিছুতেই সে ভালো, দারুণ ক্রিকেট খেলত, ক্লাসে ফার্স্ট হত, ভালো গান গাইত। ক্লাসের সব মেয়েরা আদিত্য বলতে অজ্ঞান। তখনকার দিনে ওদের গ্রামের স্কুলে ছেলে মেয়ে এক সঙ্গে পড়লে কী হবে তাদের মধ্যে কথাবার্তা বিশেষ হত না। এখন জয়ার মনে হয় সেই না বলা কথাগুলোই হয়তো বেশি রোমাঞ্চকর ছিল। সবার মতন সেও হাঁ করে দেখত আদিত্যকে। একসঙ্গে ইংরেজি আর বাংলা ক্লাস হত যখন তখন। জয়া জানত আদিত্য ওর ধরা ছোঁওয়ার বাইরে তাও ভালো লাগা তো আর সেই সব নিয়ম মেনে হয় না।

সেদিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে জয়ার। পুজোর ছুটির আগের দিনটা। বাতাসে তখন এই রকম শিউলির গন্ধ, কাশের বনে হাওয়ার দোলা। সেই কাশ বন দিয়ে যেতে গিয়েই হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল জয়া। ভালো রকম চোট পেয়েছিল পায়ে। প্রচণ্ড ব্যথার মধ্যে কোন রকমে পাটাকে টানতে টানতে রাস্তার ধারে এসে পড়েছিল। সেই রাস্তা দিয়েই সাইকেল করে যাচ্ছিল আদিত্য। আশ্চর্য কাণ্ড, ওকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল আদিত্য, বলেছিল, “আরে জয়া না? তুই তো আমাদের ক্লাসে পড়িস। তোকে দেখেছি বাংলা ক্লাসে। কী হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে কেন? বাড়ি যাবি না?”

জয়া লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিল, “পা মচকে গেছে, হাঁটতে পারছি না।”
“ও তাই? সাইকেলে বসতে পারবি? মানে সামনের হ্যান্ডেলে? তাহলে তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব। পারবি?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল জয়া। তারপর কী মনে হতে বলেছিল, “আমার বাড়ি কিন্তু অনেক দূরে।”
“আমি কী হেঁটে যাচ্ছি নাকি? যাবো তো সাইকেলে! নে উঠে বস।”

সারা রাস্তা ধরে অনর্গল গল্প করতে করতে ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল আদিত্য। আচ্ছন্নের মতন কেটেছিল সেই সমটা জয়ার। সে যেন এক স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হয়তো বয়সটাই সেই রকম ছিল। কে জানে। একটুকু ছোঁওয়াতেই মনে হত বুঝিবা স্বর্গের কাছাকাছি চলে গেছে সে। সেই ঘটনাটার পর আর তেমন যে কথা হয়েছিল ওদের মধ্যে তাও নয় কিন্তু জয়ার মনে জন্মেছিল অরুণ এক আলো। সেই দিনের ঘটনাটার কথা সে কাউকে বলেনি। তার মনে হয়েছিল সেই ঘটনাটা, সেই স্মৃতিটা শুধু তার, আর কারো সঙ্গে সেই আনন্দটা ভাগ করে নিতে চায় না সে।

“দিদিমণি, ও জয়া দিদিমণি?” সুখেনের ডাকে বর্তমানে ফিরে এল জয়া। এই সময়টাতে মাঝে মাঝে ওই ঘটনাটা মনে এসে ওকে আনমনা করে দেয়।
“কী হয়েছে?”
“কেষ্ট ব্যটা আজকে এসেছিল গো স্কুলে। হেডস্যার আর অন্য টিচারদের কী সব বলছিল ফিসফিস করে। আমার তাই মনে হল তোমাকে বলে দিই!”
“ভাল করেছিস। আমি জিজ্ঞেস করে নেবখন। ব্যাটা কোন কাজের নয় আর আমার সুখ শান্তি নষ্ট করতে চলে আসে। যাক তোর মেয়ে কেমন আছে?”
“ভালো আছে গো! তুমি সেদিন যে টাকাটা দিলে তাই দিয়ে ওকে জামা কিনে দিয়েছি। পুজোর সময় পরবে। বউ তোমার কাছে নিয়ে আসবে দেখাতে।”
“ঠিক আছে আসতে বলিস। এখন বাড়ি যা,” বলে জয়া সুখেনকে বিদায় করল। ওদের স্কুলের স্টাফ সুখেন। জয়াই ওকে চাকরিটা করে দিয়েছে। সেই জন্যে সে জয়াকে খুব শ্রদ্ধা করে। বেচারার একটা পা খোঁড়া তাই কাজ পাচ্ছিল না।

সুখেনের বলা কথাটা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কেষ্ট কেন এসেছিল কে জানে। অনেক কষ্টে সৃষ্টে পড়াশোনা শেষ করে স্কুলের চাকরিটা পেতে পেতে আর সংসারটাকে দাঁড় করাতে করাতেই তিরশের কোঠায় চলে গিয়েছিল বয়স। তখন বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না তার মোটেই তাও আত্মীয় স্বজন আর মার কথা শুনে রাজি হয়েছিল। কেষ্ট ছিল অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে কিন্তু কোন কাজ করত না। সবাই বলেছিল, “ওর আবার কাজের দরকার আছে নাকি? অত বিঘে জমি, অত পুকুর, হেসেখেলে চলে যায়।”

কথাটা যে কত বড় ভুল সেটা বিয়ের পর বুঝেছিল জয়া। ওর মাইনের পুরোটাই কেড়ে নিত কেষ্ট আর কেষ্টর মা। নিজের অসুস্থ মায়ের জন্যে ওষুধ পর্যন্ত কিনতে পারেনি তখন জয়া। ওদের অমতে একটা পয়সাও খরচা করলে তার ভাগ্যে জুটত লাথি, চড়, থাপ্পড় আর গালাগাল। তাও যদি চরিত্রটা ঠিক হত জয়া হয়তো সহ্য করে নিত কিন্তু সেখানেও গোলমাল। বিধবা বউদির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিল কেষ্টর। সেটা জানতে পারার পর আর ওখানে থাকেনি জয়া। এক কাপড়ে বেরিয়ে চলে এসেছিল। ওর গয়না, জামাকাপড়, ওর কেনা আসবাব পত্র সব কিছু নিয়ে নিয়েছিল ওরা। ভাগ্যিস তবু স্কুলের চাকরিটা ছিল। সেটাকে আঁকড়ে ধরেই বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেছিল জয়া। বিয়েটাকে ভেঙ্গে দিতে অসুবিধা হয়নি।

তাও পয়সার লোভ ভুলতে পারে না কেষ্ট। মাঝে মাঝেই জয়ার স্কুলে চলে আসে। অন্যান্য টিচারদের এটা সেটা বলে ওর নামে। আবার মাঝে মাঝে বলে, “ওকে বলবেন যেন আমার কাছে ফিরে আসে। ওকে রানি করে রাখব!”
জয়া আর ওর ভালো মন্দ কোন কথাতেই কান দেয় না। শরীরের ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেলে কী হবে মনের ঘা তো দগদগেই আছে। স্কুলের টিচারদের আবার ধরে ধরে বোঝাতে হবে যে সে ভাল আছে। কেষ্টর কাছে ফিরে যাওয়ার তার কোন বাসনা নেই।

সত্যিই সে ভালই আছে। নিজের জন্যে একটা বাড়ি করেছে। দুই ভাইয়ের পরিবারকেও মোটামুটি দাঁড় করাতে পেরেছে। মা গত হয়েছেন কিন্তু তার আগে ওর তৈরি বাড়িটা দেখে যেতে পেরেছেন। মাঝে মাঝে শুধু একটু একা লাগে। তখন আজকের মতন ফেসবুকটা খুলে বসে সে।

নিজের বন্ধু তালিকার থেকে একজনের প্রোফাইলে চলে যায়। আদিত্য শেখর সেনগুপ্ত এখন একটা বিশাল চাকরি করে। ঘরে তার সুন্দর টুকটুকে বউ, দুটো ফুটফুটে বাচ্চা। জয়া ঘুরে ঘুরে সব দেখে। ফোনের দোকানের ছেলেটা ওকে সব কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। অবশ্য আদিত্যকে খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। ভাগ্যিস রত্না আর পার্থ মিলে রিইউনিয়ান ইত্যাদি করার কথা ভাবছিল বলে সবাইকে খুঁজে বার করেছিল। রিইউনিয়ান আর শেষমেশ হয়ে ওঠেনি কিন্তু ওদের ব্যাচের অনেককেই খুঁজে পাওয়া গেছে এবং তারা এখন বন্ধু।

জয়া খুব একটা কথা বলে না কারো সঙ্গেই কিন্তু সব কিছু দেখে। অন্যদের সবার সুন্দর আনন্দময় জীবন দেখতেও তার ভালো লাগে। তারপর একদিন আদিত্যই ওকে দেখতে পেয়ে মেসেজ করেছিল, “কেমন আছিস জয়া? এতদিন পর তোকে দেখে খুব ভালো লাগছে। ভালো আছিস তো?”
কী বলবে জয়া, বলেছিল, “হ্যাঁ, ভালোই আছি। স্কুলে পড়াই, চলে যায়।”

এই ভাবেই মাঝে মাঝে টুকটাক কথা হয়। আজ দেখল আদিত্য তার প্রোফাইলের ছবিটা বদলেছে। একটা কাশবনের ছবি দিয়েছে। অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে গেল জয়ার মন। কাশবন দেখলে কী আদিত্যর মনে পড়ে সেই দিনটার কথা? কে জানে।
কাল সকালে ঝরে পড়বে শিশির আর তার সঙ্গে কিছু শিউলি। সেই গন্ধ আর কাশের দোলা নিয়েই ভুলে থাকবে তার একাকী মন।