অরিজিৎ ভট্টাচার্য

আসক্তি এবং বৈরাগ্য, বন্ধন আর মুক্তির যে দ্বন্দ্ব তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কেন্দ্রীয় শক্তি l যে ঘর ও বাহিরের হাতছানি ও প্রত্যাবর্তন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বার বার চঞ্চল করে তুলেছে, তা শক্তির কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে বর্তমান l শক্তির কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অকপট সারল্য। জীবনের সামগ্রিক উন্মোচনে তিনি এই সহজতার অনুসরণেই কবিতায় তুলে ধরেছেন অনেক অকাব্যিক বিষয়। প্রথাবদ্ধ কাব্যিকতাকে আধুনিক করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর কবিতায় নিসর্গ, পথ, সমুদ্র, সর্বোপরি মানুষকে ভালোবেসেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এক মহা কবিশক্তিত্বে।

হেমন্তকে একটি বিশেষ কালের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এই সময়ে মানুষের মনে যে কর্মচাঞ্চল্য ও প্রত্যাশার সম্মিলন ঘটে তাকে চিত্রায়িত করেছেন কবি। ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’ বলে মানবপ্রেমের নতুন পথ উন্মোচন করেছেন। ফসল কাটার খবর নিয়ে আসতে চেয়েছেন কৃষকের ঘরে ঘরে। তার কবিতা-

‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি অনেক।
তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিলো ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতন
কতকালের পুরনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছে
অই হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানগুলি
আমি দেখছি, কেবল অনবরত ওরা খুঁটে চলেছে
বকের মতো নিভৃতে মাছ।
এমন অসম্ভব রহস্যপূর্ণ সতর্ক ব্যস্ততা ওদের-
আমাদের পোস্টম্যানগুলির মতো নয় ওরা
যাদের হাত হতে অবিরাম বিলাসী ভালোবাসার চিঠি আমাদের
হারিয়ে যেতে থাকে।’

আবার এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই কি অবলীলায় ‘হেমন্ত যেখানে থাকে’ কবিতায় উচ্চারণ করেন –

‘হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে।
সাড়া থাকে, সচ্ছলতা থাকে।
মানুষের মতো নয়, ভেঙে ভেঙে জোড়ার ক্ষমতা
গাছেদের কাছে নেই
হেমন্ত বার্ধক্য নিতে আসে
খসায় শুকনো ডাল, মড়া পাতা, মর্কুটে বাকল
এইসব।
হেমন্ত দরোজা ভেঙে নিয়ে আসে সবুজ নিশ্বাস…
মানুষের মতো নয় রক্তে পিত্তে সৌভাগ্য সরল
শিশুটির মতো রাঙা ক্রন্দন ছিটিয়ে চারিপাশে
হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে।’

‘হাত পেতে দাঁড়িয়ে’ কবিতায় মোহময় এক টান আমাদের চেতনাকে নাড়া দিয়ে যায় l শস্যের হলুদ হয়ে আসার প্রতীকী হেমন্তে একা লোকটি, তবু অন্নপূর্ণার প্রতি বেঁচে থাকার আসক্তিময় করুণ আর্তি ঘিরে থাকে কবিকে l

‘হলুদ শস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে / সারাদিন l’

আপাত দৃষ্টিতে হেমন্তকে শীতের মতোই মনে হলেও কবিদের চোখে তা ধরা পড়ে অন্য মহিমায়। সামগ্রিক আলোচনায় যা মনে হয়, তাতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে অগ্রগামী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ শক্তির কবিতায় যতবার হেমন্তের প্রসঙ্গ এসেছে, তাতে সাম্প্রতিককালের কবিরাও সম্ভবত পিছিয়ে পড়বেন। সে হিসেব না হয় আপাতত তোলা থাক। যেহেতু কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে হেমন্ত বিরাজ করবে। সেহেতু কবিদের কবিতায় ভেসে উঠবে তার প্রতিচ্ছবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জলবায়ু বিপর্যয়েও হেমন্ত টিকে থাকবে কবিতার চরণে চরণে। হেমন্ত বয়ে আনুক শীতের বার্তা। বয়ে আনুক শীতের আগমনী গান। কবিরা বাঁচুক হেমন্তের অপার সৌন্দর্য হৃদয়ে মেখে। কবিতায় হেমন্ত আসুক বারবার। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাও দীর্ঘজীবি হোক l অনুপ্রাণিত করুক বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কবিদের l